somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অতঃপর, শূন্য দশমিক পাঁচ (গল্প)

২৭ শে আগস্ট, ২০০৯ দুপুর ১:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হাতের মুঠোয় স্বপ্ন থাকে, হতাশা থাকে, হয়তবা কারো কারো মুঠোয় সর্পিল আকাশও থাকে, কিন্তু কায়সারের মুঠোয় থাকে শুধুই বিন্দু বিন্দু ঘাম- পরাবাস্তব তুলনাকরণ তার অসহ্য লাগে; এত বিশাল আকাশটা হাতের মুঠোয় থাকা, এটা স্রেফ আজগুবি ভাবনা, নতুবা কতিপয় নিষ্কর্মা কবি-সাহিত্যিকের উদ্ভট কাব্যিকতা। তবে উদ্ভট শব্দটির প্রতি তার নিজেরই রয়েছে নিঃসীম প্রশ্নবোধকতা এবং কিঞ্চিৎ ব্যক্তিগত কৌতূহল।
এই যেমন, তার পড়াশোনার বিষয় কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং হলেও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রতি ম্যাগনেটিক আকর্ষণে তদসংক্রান্ত বই কিনে কিনে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দুর্লভ সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছে, অথচ এর কোন একটি বইয়ের একটি পৃষ্ঠাও কোনদিন খুলে দেখা হয়না, বরং তার সময় কাটে ফেইসবুকে বিভিন্ন কুইজ আর গেম খেলে। ফেইসবুক প্রসঙ্গে বললে বক্তব্যের অবকাশ আছে এখানেও। ভার্সিটি বন্ধুদের অধিকাংশেরই ফেইসবুক একাউন্ট থাকলেও, কেউই তার ফেইসবুক বন্ধু নয়; সেখানে শোভা বর্ধন করে ইংল্যান্ড-আমেরিকা-অষ্ট্রেলিয়ার অপরিচিত বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের একমাত্র মাধ্যম ফেইসবুক। তিনটা টিউশনি করা সত্ত্বেও মাসের শেষদিকে তাকে চলতে হয় ধারের উপর, কারণ টিউশনির টাকার সিংহভাগই বাষ্পীভূত হয় বিদেশী বন্ধুদের সাথে ফোনালাপে - উদ্দেশ্য স্পোকেন ইংলিশটা উন্নত করা!
বন্ধুমহলে অনেকেরই বিশেষ নাম থাকে, সেই নিকগুলোর নেপথ্যে থাকে হাস্যরসাত্মক কোন ঘটনা। কিন্তু কারো নিকনেম যদি হয় অগ্নি উপাসক, এর নেপথ্য ঘটনা জানতে আগ্রহ বাড়ে বইকি। কায়সারকে এই নামটা দিয়েছিল পাশের রুমের শাওন- ডিপার্টমেন্ট ভিন্ন হলেও হলসূত্রে দুজনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে স্বাভাবিক নিয়মেই ; তার দেয়া বিশেষ নামটি জনপ্রিয়তার দৌড়ে অনেক আগেই শীর্ষে পৌছে যাওয়ায় কায়সার খান হাসিব নামটি অগ্নি উপাসকের ছায়ায় এখন প্রায় মৃত ইতিহাস। তবে এতদিন পরেও নামটার শানে নযুল তার কাছে কিশোর কুমারের সেই গানের মতই- ‘পারিনা সইতে, না পারি কইতে/ তুমি কি কুয়াশা; ধোঁয়া, ধোঁয়া’। শাওনকে জিজ্ঞাসা করলে সে তার এমব্রোসের মত বিশাল দাঁত বের করা হাসিতে তাকে শীতল খুন করে - ‘বলবো বলবো, একদিন অবশ্যই বলবো। নাম যখন দিয়েছি, কারণ তো একটা আছেই’। সেই গুপ্ত কারণটি শুনতে সে ব্যাকুল হয়, খানিকবাদে জাগতিক নিয়মেই ভুলে যায়, কিন্তু সপ্তাহান্তে ডিপার্টমেন্টের জুনিয়ররাও মুখ ফসকে অগ্নি উপাসক ভাইয়া বলে ফেললে সে হয়ত ক্ষুব্ধ হয়ে শাওনের রুমে হানা দেয়, তাকে কড়া কথা শোনানোর প্রস্তুতি নেয়, এবং যথারীতি শাওনের এমব্রোস দাঁতের হাসির সামনে অসহায় বোধ করে নিজের রুমে ফিরে এসে পিসিতে উচ্চশব্দে মিলা'র ডিসকো বান্দর গান শুনে- তখনও মাথায় ঘুরপাক খায় অগ্নি উপাসক। এভাবেই অগ্নি উপাসকের আড়ালের কায়সার, অথবা কায়সারের উপরিস্থিত অগ্নি উপাসক, সত্তার পরিপূরক হয়ে এ্যাবসার্ডিটি লুপে পরিভ্রমণ করে জীবনের মিনিট-সেকেন্ডের ডোমেইনগুলো।


‘আরে অগ্নি উপাসক, তুই এখানে। তা কী খাচ্ছিস; কাচ্চি নাকি বিফ’- পলাশীর ভ্রাম্যমান দোকানগুলোতে বিকালে নাস্তা করতে গেলে শাওনের মুখে এধরনের প্রশ্ন শোনাটা অবধারিত বলে কায়সারের জবাবটাও থাকে হুমায়ূন আহমেদ প্রভাবিত- ভাবছি খরগোশের কলিজা ভুনা খাব, সঙ্গে বাতাসী মাছের সালুন’। তাদের কথোপকথনে যে কেউ বিভ্রান্ত হয়ে ভাবতে পারে, এখানে বুঝি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট খোলা হয়েছে; তবে স্বল্পমূল্যে আলুর চপ, পিয়াজু, বেগুনী, স্যুপ, নুডলস, হালিম প্রাপ্তির এই ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোই ভার্সটি পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে উড়ন্ত চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। খাবারের মান ও পরিবেশ যেমনই হোক, এখানে খাওয়ার একটা বড় বিড়ম্বনা হচ্ছে পথ শিশুরা- এরা ঝাঁকবেধে এসে বিরক্ত করতেই থাকে, টাকা অথবা খাবারের আশায়। শাওন এদেরকে বলে জোক শিশু- রূঢ় ধমক না দেয়া পর্যন্ত টাকা চাইতেই থাকে, ব্যাপারটির সঙ্গে সে জোকের সাদৃশ্য পায়। আলাদা পরিবারের হওয়া সত্ত্বেও এদের সবাই প্রায় একই বয়সের ; মহান ঈশ্বর বোধহয় দুর্ভাগ্যকে ড্রপারে ভরে সেগুলোকে একই সময়ে ফোটায় ফোটায় পৃথিবীতে ফেলেন!
ভ্রাম্যমান দোকানীদের কাউকে এদের দা হাতে তাড়া করতেও দেখা যায় মাঝে মাঝে। এই জোক শিশুগুলো বরাবরই শাওন কিংবা কায়সারের কৃপা আদায়ে ব্যর্থ- ওরা হাত পেতেই থাকে, তারা তাদের মত খেয়ে চলে, এরপর বিল মিটিয়ে হলের রাস্তা ধরে। তবুও কয়েকটা নাছোড়বান্দা জোক শিশু তাদের পিছু পিছু কিছুদূর হেটে যায়, কিন্তু ন্যুনতম সাড়াও না পেয়ে, আবার সেই গুটিকয়েক ভ্রাম্যমাণ দোকানেই ফিরে আসে।

শাওন আজ একটু আগেভাগেই টিউশনিতে চলে গেছে, কায়সারও একই উদ্দেশ্যেই হল থেকে বেরিয়েছে; তার প্রাক্কালে পলাশীর ভ্রাম্যমাণ দোকানের পিয়াজু, বেগুনী চেখে দেখা প্রতিদিনকার অভ্যাসবশত। কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবে আজ কুমুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল দোকানের সামনের চলতি পথে। কুমু তার ক্লাসমেট, হলে থাকে; এমনিতে ক্লাসে সচরাচর কথা না হলেও এ মুহূর্তটিতে আপনাআপনিই কথা বলা হয়ে গেল। কুমু এসেছিল পলাশীর কাচা বাজারে; অন্য অনেক শুচিবায়ুগ্রস্ত বা অত্যধিক সচেতন হলের মেয়েদের মত সে ও নিজে রান্না করে খায়, তাই বাজার করতে আসা।
কুমুর সঙ্গে কথা হল সামান্যই, তাও সেগুলো পরীক্ষা উপলক্ষে কেমন পড়ছো, সৈয়দ স্যারের ক্লাসনোট আছে কিনা, এই জাতীয় অতি সাদামাটা কথার স্তর পেরুতে পারেনি, কিন্তু এইটুকু সময়েই কায়সার আজ এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল- কথা বলার সময়টাতে সেখানে ভীড় করা প্রত্যেক জোক শিশুর হাতে একটা করে পিয়াজু ধরিয়ে দিল; এতে জোক শিশুর মোটামুটি একটা জ্যাম সৃষ্টি হয়ে গেলেও সে হাসিমুখ বজায় রাখতে চেষ্টা করল, সেইসাথে মনোযোগটা কুমুকে টপকে শিশুদের প্রতি নিবন্ধের ভান করল। কুমু ব্যাপারটা কিভাবে নিল বোঝা গেল সহসাই, কারণ তার অতর্কিত- ‘ আচ্ছা, তোমাকে সবাই অগ্নি উপাসক বলে কেন, বলতে পারো?’- প্রশ্নে কায়সারের দু ঠোট পরস্পর জোড়া লেগে গেল যেন। কুমু বিদায় নিল, তার মুখে কোন হাসি বা অভিব্যক্তি কিছুই ছিলনা, কিন্তু তার প্রতিটি ফেলে যাওয়া পথ ব্যঙ্গাত্মক কুণ্ডলী পাকিয়ে কায়সারকে বলছিল, কাউকে ইমপ্রেস করার জন্য পন্থটা একটু বেশিমাত্রায়ই হোমারযুগীয় হয়ে গেল বাছা। সেই কুণ্ডলীর প্রভাবেই হয়ত জোক শিশুদের বাকি অনেকেই পিয়াজুর স্পর্শ বঞ্চিত হল। এমনকি সে নিজেও সন্ধ্যায় টিউশনির বদলে ৭ নম্বর বাস ধরল, গন্তব্য গাবতলীর গরুর হাট!

ক্লাশে সে অমনোযোগী ছিল এটা সত্যি, কিন্তু এটা নিশ্চয়ই ক্লাশ থেকে বের করে দেয়ার মত কোন অপরাধ হতে পারেনা। এই ঘটনায় সে যতটুকু ক্ষুব্ধ, এর অনেক বেশি অপমানিত, বিশেষত স্যার যখন তাকে ‘গেট লস্ট’ বলে দরজার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করল, সেই মুহূর্তে কুমুর সিল্কি চুলগুলো বাতাসে উড়ে ওড়নার উপর আছড়ে পড়েছিল, পাশে বসা নীনাকে সে নিচুস্বরে কিছু একটা বলছিল। ‘আরে, কায়সার টাইপ ছেলেকে তো আমার চুলের মতই যখন ইচ্ছা বেনী বাধতে পারি, চাইলে এভাবে বাতাসেও উড়াতে পারি’- তার ধারণা, সে এমনটাই বলছিল হয়ত। তাই স্যার, নাকি কুমু, রাগটা কার বেশি প্রাপ্য, সেই সরল সুদকষার অংক কষতে কষতে সে ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে এল। একইসঙ্গে, কুমুর ওড়নার সংবেদনশীল অংশে অসভ্যতার দৃষ্টি দেওয়ায় নিজেকেও ঋণাত্মক গালি দিল কয়েকটা; সুতরাং কুমু নয়, সমস্ত ক্ষোভটা শালশিলাগ্রাম স্যারেরই প্রাপ্য। ব্যক্তিত্ত্বের গুণে তিনি ক্লাস জমাতে অক্ষম; কিছু স্লাইড লিখে এনে সেগুলো হুবুহু আউড়ে যাওয়া মানেই ক্লাশ করানো হলে, ঐ শিক্ষকের চেয়ে সে নিজে বহুগুণ দক্ষ এ কাজে। আরও দুঃখজনক হল, ঐ স্যারের অধীনেই তাকে থিসিস করতে হচ্ছে। কাজের ক্ষেত্রে তার একটা নিজস্ব ঘড়ি আছে, যা কোন গ্রীনিচমানের তোয়াক্কা করেনা; ইচ্ছে হল তো সন্ধ্যা সাতটার সময় ডেকে পাঠাবেন থিসিসের কাজে, দু-একটা সস্তা উপদেশনামা দিয়ে বিদায় দিবেন, ফলশ্রুতিতে কায়সারের টিউশনি কামাই হচ্ছে হরহামেশা। স্যারের তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, তিনি বরং ছুটির দিনেও কোন কোম্পানীর কনসালটেন্সিতে ব্যস্ত থাকবেন, কায়সারের মত দু-একজন ছাত্রের টিউশনি আছে কি নেই, সেটা তার ধর্তব্যের মধ্যে আদৌ পড়েনা। স্যার কি তাকে জোক যুবক ভাবে, নইলে তার আচরণে এত নির্লিপ্ততা কেন!

‘বুঝলি শাওন, সিদ্ধান্ত নিয়েছি ক্লাসমেট বিয়ে করবো, তা নাহলে একেবারে কলকাতার রূপা গাঙ্গুলী’। ‘কিন্তু রূপা গাঙ্গুলী তো বয়সে তোর মায়ের চেয়েও বছর পাঁচেক বড় হবে’, শাওনের কথার জবাব তার তৈরিই ছিল- ‘ তাহলে আমাদের ক্লাসের কুমুই থাকুক, তুই কী বলিস!’- তাদের গোলাপী রঙের বিকেলগুলোয় কথার পৃষ্ঠে কথা চলতে থাকে, সমানতালে এগোয় পিয়াজু, নুডলস খাওয়া। গতকালের অযাচিত দানখয়রাত আজ তাকে অনাকাঙ্ক্ষিত হ্যাপার সম্মুখীন করল - জোক শিশুরা অন্য ক্রেতাদের ভুলে তাকে ঘিরে ধরল; ঘটনার কার্যকারণ না বুঝলেও, শাওন বেশ উপভোগ করল তার দুরবস্থা - কিরে অগ্নি উপাসক, এতগুলো বাচ্চা দত্তক নিলি কবে, কুমু মানবে তো?’পক্ষান্তরে কায়সার আজ চোখ রাঙিয়েও জোক শিশুদের নিরস্ত করতে পারছেনা; একদিন খাবার পেয়েই ওরা তাকে সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁস ভাবতে শুরু করেছে, মনে হল। ক্ষিপ্ত মেজাজে সে আশেপাশে ইতি উতি করতে গিয়ে অদূরে দুই তরুণীকে তাদের দিকেই হেটে আসতে দেখল- তার ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র, পরিচয় না থাকলেও তরুণীদের একজনের নাম জিসান, এটা জানা আছে। আজ বিকেল অব্দি প্র্যাকটিকাল ক্লাশ ছিল, সম্ভবত নোট-পত্র ফটোকপি করাতে যাচ্ছে। কায়সার মুহূর্তেই কর্তব্য স্থির করে ফেলল: এতক্ষণ হাত ধরে টানতে থাকা জোক শিশুদের একজনের গালে সপাটে চড় মারল, শাওনসহ উপস্থিত অনেকেই এহেন আচরণে অপ্রস্তুত হল।‘মারার কী দরকার ছিল, গরীব পোলাপান, তুই টাকা না দিলে তো ঘাড়ে উঠে ব্রেকড্যান্স দিতনা’- শাওনের প্রতিক্রিয়ায় প্রত্তুত্তর না করে, সে দোকানে ঝুলানো একটা কলা তুলে নিয়ে পরম যত্নে খোসা ছাড়াতে থাকল; জিসানরা সেদিকে লক্ষ্য করল কিনা বোঝা গেল না! আশাহত জোক শিশুরা ধীরে ধীরে অন্য ক্রেতাদের মাঝে মিশে গেল, যেমনটি প্রতিদিন হয়ে থাকে।
উদ্ভাস কোচিংয়ে বেশ কয়েকটা ডেমো ক্লাশ নিয়েও চূড়ান্ত নিয়োগটা পাওয়া হলনা কায়সারের; তার পড়ানোর ধরনটা কর্তপক্ষের পছন্দ হয়নি, তাই আপাতত কোচিংয়ের পরীক্ষার খাতা দেখেই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।আত্মসম্মানবোধের টানাপোড়েনে ধানমন্ডির টিউশনিটা ছেড়ে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে কিছুদিন, তবুও সিদ্ধান্তের যথার্থতা নিয়ে সে নিঃসন্দিহান, কারণ তার প্রতি ছাত্রের অভিভাবকের আচরণ নেহায়েতই বেতনভূক কর্মচারীসুলভ। কোচিংয়ের খাতা দেখতে গিয়ে ইদানীং আজান্তেই নিজেকে জোক মানব মনে হয়, খাতার পৃষ্ঠাজুড়ে জ্যামিতি অথবা রসায়ন হয়ে আঁকা থাকে জোক শিশুদের প্রতিকৃতি!

আজ নাস্তা খেতে আসা হয়েছে দলবেধে; নিত্যদিনের সঙ্গী শাওন ছাড়াও দলে রেজা, সাজু, সঞ্জয় যুক্ত হওয়ায় ক্ষণিকের জন্য পলাশীর মোড়টাই আড্ডাকেন্দ্রে রূপ পেয়েছে। সঞ্জয়ের স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান শূন্যেরও কিছু কম- এমন উন্মুক্ত স্থানে তার আলোচনায় আদি রসাত্মক বিষয় উঠে আসছে, ক্লাশের মেয়েদের সম্পর্কেও অশ্লীল মন্তব্য করছে হাসতে হাসতেই। কায়সারের কান কুকুরের মত সতর্ক, যাতে কুমু বিষযক কোন খিস্তিখেউড় সঞ্জয়ের মুখে শুনতে না হয় । অকস্মাৎ সাজু তার ফুসফুসে বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহ করল, সঞ্জয়কে বিপদসীমার মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে। যথারীতি এই খণ্ড আড্ডাতেও জোক শিশুরা হামলে পড়ে - মাত্রই কিছুদিন আগে চড় মারা সেই শিশুটিও আছে ওদের দলে, আজও সেভাবেই হাত পেতে আছে সে। আশেপাশে অস্থিরভাবে তাকিয়ে এই সন্ধ্যাবেলা পরিচিত বিশেষ কাউকেই দেখা গেলনা, অন্যদিকে সেই জোক শিশুটি ঋষিসুলভ স্থিরতায় হাত বাড়িয়েই আছে। কিছুটা অনিচ্ছা, আর কিছুটা সম্মোহনগ্রস্ততায়, সেই জোক শিশুটিকে সে দীর্ঘক্ষণ পকেট হাতড়ে পাওয়া একটা পঞ্চাশ পয়সার আধুলি দিল; শিশুটি সেটি নেড়েচেড়ে দেখল, সেই দৃষ্টিতে যুগপৎ চড় বনাম ৫০ পয়সার লেখচিত্র অঙ্কিত হচ্ছিল। কায়সারের চিন্তায় তখন কোন কুমু ছিলনা, জিসান ছিলননা, এমনকি সে নিজেও ছিলনা; সবকিছু সেই জোকশিশু আর ৫০ পয়সার আধুলিতে মুহূর্ত কয়েকের জন্য দোদুল্যমান ছিল।

আজ বৃহস্পতির। ক্লাশ বন্ধ থাকে বলে ভরদুপুরও এদিন কাকডাকা ভোরের মত ; বড়ভাইয়ের ফোনে আজ তার অসময়েই ঘুম ভেঙ্গে যায়, এরপর আর ঘুমাতে ইচ্ছা হয়নি। ঘুম ঘুম চোখেই সে শাওনের রুমে চলে যায়, এটাকে ঘুমের প্রভাবও ধরা যেতে পারে। সবাই ঘুমুচ্ছে, রুমের জুনিয়রটি সকালবেলাই কোথাও বেরিয়েছে। শাওনের ঘুমানো দেখলে অন্যদেরই বিব্রত হতে হয়, ঘুমানোমাত্র তার লুঙ্গি স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসে, তাই কখনো সেটা পাওয়া যায় হাটুতে, অথবা কখনো মাথায়। আজ লুঙ্গি স্বাধীনতা ঘোষণার সুযোগ পায়নি, বা পেলেও ম্বাধীনতার অপব্যবহার করেনি, যথাস্থানেই তাকে দেখা যাচ্ছে।
রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসতে গিয়ে শাওনের খাটের লাগোয়া টেবিলে নজর পড়লো তার, সেখানে শাওনের মোবাইলটা মুচকি হাসছে। সমস্ত রুম ঘুমিয়ে, এমতবস্থায় ফোন খোয়া গেলে অন্তত তাকে কেউ ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করবে না; সিদ্ধান্তটা নিতে দেরি হলনা তার- তথাকথিত অগ্নি উপাসকের মানসিকতা অগ্নির মতই দাহ্য হওয়া উচিৎ , এই বোধটি তার কাজটাকে সহজতর করে দিল। তাই অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে সে যখন নিজের রুমে ফিরে এল, তার হাতের মুঠোয় কারো তাকানোর প্রয়োজন পড়েনি। কেউই জানলোনা তার হাতের মুঠোয় শুধু বিন্দু বিন্দু ঘামই থাকেনা, আজ একটা মুঠোফোনও ছিল!















২২টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×