একটা লাল পিপড়ে একটা কালো পিপড়েকে অতিক্রম করে গেল- গুরুত্ব বিচারে এটা কোন ঘটনাই নয়। কিন্তু এর থেকেও অগুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকতে পারে, আর তা হল, গায়ত্রী দত্ত হঠাৎ করেই ফয়েজ নওশাদকে এড়িয়ে চলছে, এ সংক্রান্ত ধারণা কিংবা অনুমান।
ফয়েজ নওশাদ গায়ত্রী দত্তের সামান্যই পরিচিত, তাও পরিচয়টা গড়ে উঠেছে ইস্কাটনে ভায়োলিন শিখতে গিয়ে। বয়সে বছর তিনেক বড় বলে ফয়েজ নওশাদ তাকে গায়ত্রী দিদি ডাকে। দীর্ঘদিন সম্পর্কটা ‘হাই হ্যালো’র চেকিং পোস্টে আটকে থাকার পর মাত্রই কিছুদিন হল তা ‘আজ দুপুরে কী করলেন, তোমার অফিস কেমন চলে’ জাতীয় মধ্যবর্তী কথা-বার্তার কফি হাউজে বসে কফিতে চুমুক দেয়ার ছাড়পত্র পেয়েছে, তবে সেই ছাড়পত্রটা কোনভাবেই ‘নওশাদ, এবার ভাইফোটার দিন আমার বাড়িতে আসিস একবার, অথবা গায়ত্রী দিদি, আমি কিচ্ছু বুঝিনা, ঈদের দিন তোমাকে আমাদের বাসায় দেখতে চাই’ ধর্মী অতি আন্তরিকতার আশ্বাস দেয়নি। এমনকি ‘নওশাদ, তোমার সেল অফ কেন; মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে যদি এতই অনীহা, তাহলে তো সেলটা সেল দিয়ে একটা দামী ঘড়ি কিনলেই পারো। কিংবা গায়ত্রী দি, আপনার গান শুনে আমি তো পুরো ‘প’; বয়সটা টেনেটুনে ৩বছর বেশি হলে শেষের এই বেরসিক দি’ টাকে ঝেটিয়ে বিদেয় করে সর্বক্ষণ গঙ্গোত্রী, শুধু গঙ্গোত্রীই জপতাম’- এর মত চটুল রসিকতারও অনুমোদন নেই এই ছাড়পত্রে। তাই গায়ত্রী দত্তের এড়িয়ে চলবার কোন অবকাশই নেই, বা চললেও তাতে ফয়েজ নওশাদের নিচের ঠোট মুখে ঢুকিয়ে ঠোটটাকে দাঁতচাপা দেয়ার মত কিছু হবে বলে মনে হয়না। মধ্যবিত্ত মানুষের মত মধ্যবিত্ত সম্পর্কগুলোতেও চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারগুলো বড্ড বেশি ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ইমেজের মত- চাইলেও সেখানে সম্পর্কের রঙ বোঝা যায়না।
তবে মানুষের কাছে গুরুত্ব-অগুরুত্বের তফাতটা মাত্র ‘অ’ তে হওয়ায় ফয়েজ নওশাদও ‘অ’ টাকে মুছে দিয়ে আপাত অর্থহীন অনুমানটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে; এই অনুমান এবং গুরুত্ব, দুটোই একজন বিশেষ মানুষের মানসপ্রভাবিত। সেই মানুষটি ভার্সিটি জীবনে তার আদর্শ ছিল, এরপর মানুষটির সাথে প্রায় ৪-৫বছরের মত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল, ৫বছর বাদে চলতি বছরের গোড়ার দিকে যে পুনর্যোগাযোগ হল তাতেও ঐ মানুষটিরই কৃপা বলতে হবে। অনেকটা জাতিস্মর আর কিছুটা কুকুরের মিশেলে কুকুস্মর বৈশিষ্ট্য প্রয়োগ করে সে প্রায় গন্ধ আর স্মৃতি শুকতে শুকতে একদিন দুপুরে ফয়েজের অফিসে এসে হাজির হয়েছিল। ভার্সিটিতে ফয়েজ তাকে ‘আরশাদ ভাই’ বলে ডাকত। সেক্ষেত্রে, বলার অপেক্ষা রাখেনা তার নাম আরশাদ। আরশাদ অফিসে আসার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ফয়েজও তা-ই জানত, এবং দীর্ঘ ৫বছর পর আচমকা লাঞ্চ আওয়ারে ভার্সিটির বড় ভাইকে নিজের অফিসে দেখে সে খালিচোখে হ্যালির ধুমকেতু দেখেছিল যেন।
- ‘হোয়াট এ প্লিজেন্ট সারপ্রাইজ! আরশাদ ভাই আপনি! সারপ্রাইজ অফ দ্য ডিকেডস’!
সম্ভবত আরশাদের কাছে এই বিস্ময়টা অতি প্রত্যাশিতই ছিল; সে ঠোট আর তর্জনীর জ্যামিতিক সমকোণ তৈরি করে তখনই ফয়েজের বিস্ময়ে গোলাপজল ছিটিয়ে দিয়েছিল- ‘নট আরশাদ ভাই, ছে মি মাধুকর দা’।
আরশাদ ওরফে তথাকথিত মাধুকর দা কে দেখে অপ্রকৃতস্থ ভাবার কোন সুযোগ ছিলনা- পোশাকে কেতাদুরস্ত, চলন-বলনে স্বাভাবিক। তাই এতবছর বাদে তাকে দেখার বিস্ময়টা তার জবাব শোনার পর কৌতূহলে বদলে গিয়েছিল।
-মাধুকর দা মানে?
-আরে এত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন। এতদিন পর এলাম। লাঞ্চ-টাঞ্চ করা। নিজেই যেচে বলেছি যখন, ভাবিসনা, যেচেই ব্যাপারটা খোলাসা করে যাব।
একটা উচ্চবিত্ত লাঞ্চ শেষে ফয়েজের অফিসের টেবিলে রাখা অর্ধবৃত্তাকার পেপারওয়েটটাকে লাটিমের মত ঘোরাতে থাকে আরশাদ। টেবিলের কাচের সঙ্গে পেপারওয়েটের সংযোগে একটা শব্দ হচ্ছিল,যে শব্দটাকে শিলাবৃষ্টির শব্দ মনে হচ্ছিল- ঘরের চালে শিলা পতনের শব্দটাও বোধহয় এমন; এই কৃত্রিম শিলাবৃষ্টি ব্যতীত রুমটাতে ফয়েজ আর আরশাদ নামের যে মানুষ দুজন ছিল, শব্দ উৎপাদনে তাদের কোন ঝোক লক্ষ্য করা যাচ্ছিলনা; তারা নৈঃশব্দের কুপ খননে সাময়িক মনোযোগ বিনিয়োগ করেছিল। এরপর ফয়েজই প্রথম বিনিয়োগটা তুলে নিয়ে শব্দ পুনোরোৎপাদনে নিয়োগ করে:
- এখন কী করছেন আরশাদ ভাই?
-ফের আরশাদ ভাই? এই পেপারওয়েট দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেব। বলেছিনা, মাধুকর দা বলবি।
ফয়েজ হাসে।
-স্যরি, স্যরি; আসলে মাত্র একবার শুনেছি তো। ভুলে গেছিলাম।
আরশাদ পেপারওয়েটটাকে টেবিলে নামিয়ে রাখে, কৃত্রিম শিলাবৃষ্টিও কাচের শরীরে মুখ লুকিয়ে নৈঃশব্দ হয়ে যায়।
-আচ্ছা নওশাদ, তুই জীবনে মোট কতজন মানুষের সাথে মিশেছিস, বলতে পারবি?
ফয়েজ এধরনের প্রশ্নে অসহায় বোধ করতে থাকে। এতদিন পর আরশাদ ভাই কেনই বা এলেন, আর এসে এমন উদ্ভট আচরণ করে নিজেকে কেন মাধুকর দা বলতে বলছেন, সেই ঘোর তার কাটছিলনা। তাকে চিন্তিত দেখে, আরশাদ নিজেই কথার ভরণপোষণ বইতে থাকে।
-‘অবশ্য পারার কথাও নয়। ২৫-২৬ বছর হয়ে গেছে, এর মধ্যে তো আর কম মানুষের সাথে দেখা হলনা’।
ফয়েজ নওশাদ বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে, আরশাদ তার সঙ্গে বয়ে আনা আয়তাকার ব্যাগটা খুলে, ব্যাগের ভেতরে লজ্জাবতী নববধূর আনত মুখের মত মৌনতায় একটা ল্যাপটপ স্থির বসে ছিল। সে ল্যাপটপটাকে টেবিলে নামিয়ে অন করে। স্ক্রিনে ছবি আসতে আসতে পকেটে রাখা বেনসনের প্যাকেট থেকে দুটো সিগারেট বের করে একটা ফয়েজের দিকে বাড়িয়ে দেয়। দুজনে একসাথে ধোয়া ছাড়ে; ধোয়ায় ধোয়ায় সঙ্গম শেষে নতুন ধোয়ার জন্ম দেয়, নবজাতক ধোয়াগুলো রুমময় উড়তে থাকে। ততক্ষণে ল্যাপটপ চালু হয়ে গেছে, সে একটা ফোল্ডার ওপেন করে।
-‘তবে আমি কিন্তু এই কাজটাই শুরু করেছি। বাচ্চাকালের ৬বছর বাদ দিয়েছি। এরপর থেকে যত মানুষের সাথে মিশেছি তার একটা লিস্ট করছি। তোর সিরিয়াল ৬৪১। অবশ্য আমার ধারণা তোর সিরিয়াল আরও পরে হবে, কিন্তু স্কুলের অনেকের কথাই মনে নেই।বাবা এতবার বদলি হয়েছে যে ক্লাশ ফোর থেকে টেন পর্যন্ত ৬বার স্কুল বদল হয়েছে আমার। সবার কথা কি আর মনে থাকে’।
ফয়েজ এই কথায়ও তেমন কিছু বলার পাচ্ছিলনা। শুধু সিগারেটে একটা দীর্ঘটান দিয়ে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে- ‘তাই নাকি? ভালই তো’।
আরশাদ বুঝতে পারে ফয়েজ ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেনা। তাই সিগারেটটা এ্যাশট্রেতে চেপে ধরে শেষ হওয়ার বেশ আগেই।
-‘আমার কাজটাকে চাইল্ডিশ ভাবছিস, তাইনা? ভাবলে ভাব্। শোন্, ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে গত ৬-৭বছরে জীবনে বলতে গেলে কোনকিছুই বাদ রাখিনি। চাকরি করেছি, বিয়ে করেছি, পোলাপান জন্ম দিছি, বয়স অনুযায়ী যথেষ্ট টাকা পয়সাও ইনকাম করেছি। কিন্তু এখন আর ভাল লাগছেনা। তাই একটা ২-৩বছরের ব্রেক দরকার। আমার মাথায় ঢুকে পড়ছে, ৩৭ বছর বয়সে আমি মারা যাব। এখন ৩২চলছে, ধর যদি সত্যিই মারা যাই, তাহলে তো জীবনটা একটা মশারী টাঙানো বিছানা ছাড়া কিছুই হলনা। আমি চাই সেই মশারিটায় কিছু ফুটো করতে, যাতে ভেতরে মশা ঢুকতে পারে। বলতে পারিস, এই কাজটা সেই মশা ঢুকানো প্রজেক্ট। এনিওয়ে, বাদ দে। তোর সাথে আমাদের পরিচিত কার কার যোগাযোগ আছে বল্, ওদের এড্রেস লাগবে। আমার হাতে টাইম খুব কম। ৩১শে আগস্টের মধ্যেই আমাকে ১০৯৬জনের একটা লিস্ট বানাতে হবে। সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে আমার মাধুকর জীবন শুরু হবে’।
ফয়েজ এবার সত্যিই কিছুটা অবাক হয়। তার চোখে চিন্তার পিরামিড তৈরি হতে থাকে। সেই চোখে সে আরশাদের হেয়ালীপনার পরিধি মাপতে চেষ্টা করে।
-ইয়ে.. মানে, ঠিক বুঝলাম না। আপনি ভিক্ষা-টিক্ষা করার প্ল্যান করছেন নাকি?
এই কথা শুনে আরশাদ একটা হাসি দিয়েছিল, এবং এর বেশ কিছুদিন পর ভায়োলিন ইনস্টিটিউটের একটা ফায়ার ক্যাম্পিংয়ে গান গাওয়া শেষে ফয়েজের কম্প্লিমেন্ট শুনে গায়ত্রী দত্তও হেসে ফেলেছিল। দুটো হাসিকেই তার একরকম লেগেছিল।
ফায়ার ক্যাম্পিংয়ের পরিকল্পনাটা অনেকটা হুট করেই করা হয়েছিল এক সন্ধ্যায় ক্লাশ শেষে, ভায়োলিন ইনস্টিটিউটের ক্যাফেটেরিয়ার এক ছন্নছাড়া টেবিলে ভবঘুরে ভায়োলিন আড্ডায় : শীতকাল চলছিল, শৈবাল নামের অসাধারণ ভায়োলিন বাদক তরুণটি সিগারেট-কফির সব্যসাচী টান-চুমুকের খেলায় আরশাদকে বলেছিল- ‘মাধুকর দা, দেখছেন এবারের শীতটা কেমন তনুশ্রী দত্তের চেহারার মত উগ্র। চলেন, তনুশ্রী দত্তকে রসিয়ে রসিয়ে এনজয় করতে একটা ফায়ারক্যাম্প করে ফেলি।
আরশাদ সিগারেটটা ঠোটের বামপাশে চালান দিয়ে ডান ঠোটে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলেছিল- ‘ভাগ্যিস শীতরে তনুশ্রী দত্ত বলছো; মুখ ফসকে গায়ত্রী দত্ত বললে কিন্তু খবরই আছিল’।
-হা হা হা হা।
ঐ টেবিলে ফয়েজও ছিল তাদের সাথে। কিন্তু সে তাদের দুজনের সাথে শুধু হাসিতেই যোগ দিয়েছিল; কথা-বার্তার ইন সুইং- আউট সুইং কোনকিছুতেই তার ভূমিকা ছিলনা, কারণ ভায়োলিন ইনস্টিটিউটে আরশাদ, রকিব, আর গায়ত্রী দত্তের বাইরে যে গুটিকয়েক মানুষের সাথে শৈবালের আলাপ হত সে তাদের মধ্যে ছিলনা। আড্ডায় থার্ড পারসন হিসেবে তার জুড়ে যাওয়াটা স্রেফ আরশাদের সূত্রে। তবুও হাসির শব্দের তীব্রতা কয়েক ডেসিবেল বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পেরে সে হয়ত তুষ্টই ছিল।
ফায়ার ক্যাম্পটা হয়েছিল প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল উয়ারি বটেশ্বরে। ফয়েজদের সাথে উপলা নামের যে দোয়েল পাখির মত চনমনে তরুণীটি ভায়োলিন শিখে, তার প্রস্তাবেই মূলত উয়ারি বটেশ্বরকে বেছে নেয়া। উপলা সিরিয়াসলি ফটোগ্রাফি করে। কিছুদিন আগে বন্ধুদের সাথে ফটোগ্রাফির প্রয়োজনে উয়ারি বটেশ্বর ঘুরতে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরতি পথে মনে মনে একটা আফসোস হচ্ছিল তার- ‘ইস, এখানে যদি রাত কাটাতে পারতাম’! তাই ভায়োলিন ক্লাশের বিরতিতে আরশাদের মুখে ফায়ার ক্যাম্পের পরিকল্পনা শুনে সে প্রায় অভিকর্ষজ ত্বরণে তার সামনে এসে রেডিও জোকিদের কণ্ঠের দ্রুততায় বলেছিল- ‘মাধুকর দা, ফায়ার ক্যাম্প করার জন্য বাংলাদেশের বেস্ট প্লেস হল উয়ারি বটেশ্বর। আমি তো প্ল্যান করেছি বিয়ের সময় হাজবেন্ডকে বলবো, ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট না হলেও চলবে, কিন্তু উয়ারি বটেশ্বরে অন্তত একটা কুড়েঘর হলেও চাই-ই চাই’।
দিনভর সমগ্র উয়ারি বটেশ্বর চষে বেড়িয়ে, সন্ধ্যায় হয়েছিল কাঙ্ক্ষিত ফায়ার ক্যাম্প। উপলার ক্যামেরাটা তার পোশাকের চেয়েও আকর্ষণীয় সব ছবি ধারণে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছিল সারাদিন, গায়ত্রী দত্ত একটা ডিজিটাল ক্যামেরা সঙ্গে নিয়েছিল বটে, কিন্তু চার্জ না থাকায় ছবির জন্য অন্যদের মর্জির উপরই নির্ভর করতে হয়েছিল। শৈবাল ব্যাগে কয়েক ছিলিম গাজা এনেছিল লাঞ্চের পরে সদ্ব্যবহার করতে, এবং লাঞ্চের পর সত্যিই সে দীর্ঘক্ষণের জন্য দলছুট হয়ে সবুজ পাতায় মেঘমালা-নক্ষত্ররাজি-লালন সাঁইকে খুঁজতে বেরিয়েছিল!
ভায়োলিন ইনস্টিটিউটের ১৯জন ছাড়াও, ইনস্টিটিউটেরই রেহনুমা নামের ৩০ পেরুনো মহিলাটির স্বামী-সন্তান, আর রকিবের টিউলিপ ফুল বা প্রেয়সীও ছিল আউটসাইডার হিসেবে। সন্ধ্যায় আগুন জ্বেলে ব্যস্ত বাবুর্চির বারবিকিউ ঝলসানো, আর আগুনের চৌহদ্দিতে কয়েকটি মানুষের সরসিক সময় কাটানো। গল্প-গুজব, একে অপরকে টিপ্পনি কাটা, উপলার স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি, তারই পরম্পরায় গায়ত্রী দত্তের ভরাট কণ্ঠে গাওয়া ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ গান। গানের সাথে ভায়োলিন বাজিয়েছিল শৈবাল। তার ভায়োলিনের সুরের মূর্ছনায় বাতাস বিবশ হয়ে এসেছিল যেন, আসরের সবাই এক বিবশতার বিসর্গ বুহ্যে ঢুকে পড়েছিল, এমনকি গান শেষ করেও অন্তত ১৫-২০সেকেন্ড বিহ্বল বসে ছিল গায়ত্রী দত্ত। বিবশ বাতাসে তার জামরুলের মত স্বচ্ছ টসটসে চুল মুখের উপরে আছড়ে পড়েছিল; সেই বিহ্বলতার দৃশ্য ফয়েজকে গ্রাস করতে চাইছিল, কোন কারণ ছাড়াই শৈবালের প্রতি তার মেজাজ খারাপ হচ্ছিল, মনে মনে বলেছিল- ‘শালা গাঞ্জাখোর’। যদিও সে নিজেও ধন্ধেয় পড়ে গিয়েছিল গান নাকি ভায়োলিন, কিসের সম্মোহনে আসরের মানুষগুলো এমন মাদাম তুসোর মোমের মূর্তি হয়ে গেল।
আসর ভাঙ্গে প্লেটে প্লেটে বারবিকিউ নেয়া উপলক্ষ্যে। সবাই যার যার মত বারবিকিউ দিয়ে পরোটা খাচ্ছিল। গায়ত্রী দত্ত প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খাচ্ছিল, ফয়েজ নিজেও প্লেটটা নিয়ে তার পিছনে আলগোছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। পিছন থেকেই কিছুটা নিচুস্বরে বলেছিল- ‘দিদি, আপনার নামটা গায়ত্রী রাখা একদমই উচিৎ হয়নি। যে গান শোনালেন, এখন ভাবছি গীতা দত্ত হলেই পারফেক্ট নাম হত’।
হঠাৎ পুরুষকণ্ঠ শুনে স্বভাবতই গায়ত্রী দত্ত চমকে উঠে পিছন ঘুরেছিল।
-কেন, গীতা দত্ত কেন?
- না মানে, গীত যার এমন দত্ত, সে তো গীতা দত্তই হবে।
- বুঝলাম না।
কথাটা বলে গায়ত্রী দত্ত ফয়েজের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেছিল, বিব্রত ফয়েজ তাকিয়েছিল বামে - ঠিক সরলরেখা বরাবর আরশাদ বসে ছিল প্লেট নিয়ে; সেও হাসছিল। সেদিন ফয়েজের অফিসেও অবিকল এই হাসিটাই তার মুখের মেঘে রোদ হয়ে হাসছিল।
ঐদিন আরশাদ হেসে বলেছিল- ‘আজ বরং যাই। তুই এড্রেসগুলো লিখে কাল রমনা পার্কে চলে আয় বিকেলে’।
ফয়েজ অপ্রসণ্ন মুখে বলেছিল- ‘এটা তো আমার প্রশ্নের উত্তর হলনা’।
-‘আরে কাল আয় না আগে। শুধু এটা না, আরও যত প্রশ্ন আছে, সব উত্তর গুলিয়ে খাওয়াবো। আজকে সময় নেই। এখন আবার মিঠুনের বাসায় যেতে হবে। মিঠুনকে মনে আছে তোর? ঐ যে ছাত্রফ্রণ্ট করত, বিরাট বাবড়ি চুল ছিল’!
-থাকবেনা কেন। সলিমুল্লাহ মেডিকেল থেকে এক আপু প্রায়ই দেখা করতে আসত উনার কাছে। আপু হলের গেস্টরুমে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর, উনি আগের রাতে মাল-টাল খেয়ে তখনো অঘোরে ঘুমাতো। একটা সেইরকম পিস ছিল। কই আছে এখন?
-‘তা তো জানিনা। তবে এড্রেস যোগাড় করেছি যখন, গেলে তো দেখবোই’। দরজার কাছে গিয়ে সে আবারো উল্টো ঘুরেছিল- ‘ আসিস কিন্তু’।
ঐদিন বাড়ি ফিরে বেশ ব্যস্ত সময় কাটে ফয়েজের। নাগরিক ব্যস্ততার কারণে একসময়ের যেসব ঘনিষ্ঠজনেরা ‘আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড’ তত্ত্বের বলি হয়ে গিয়েছিল, সবাইকে একে একে ফোন করে, তাদের থেকে অন্যদের ঠিকানা নেয়। কাজটা করতে গিয়ে তার কোলেস্টেরলপুস্ট ধমনীটা নির্মেদ লাগছিল অনেক, মনে হচ্ছিল ধূলি জমে যাওয়া সময়ের ফাক গলে উকি মারছে সোওদা স্মৃতির সজীব মেঠোপথ। সে প্রথমবারের মত অনুভব করেছিল, আরশাদ একটা অসাধারণ প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। আরশাদের মাধুকর দা হওয়ার মূল কারণ জানতে তার মনের সীমান্তে তখনই বিডিআর-বিএসএফ যুদ্ধ বেধে গিয়েছিল।
পরদিন ফয়েজ সময়মতই পার্কে পৌছে গিয়েছিল, ১০-১৫মিনিটের মধ্যে আরশাদও চলে আসে। ঈষৎ হাসি চালাচালির পর মাঠের ঘাসে বসতে বসতেই দুম করে আরশাদ প্রশ্নটা করে বসেছিল- ‘আচ্ছা, বিয়ে করেছিস? ভার্সিটিতে যেরকম হনুমান ছিলি, তাতে তো এতদিনে বউয়ের শাড়ি ধরে ঝুলার কথা’।
ফয়েজ তার আগেই বসে পড়েছিল। পকেট থেকে দুটো সিগারেট বের করে ওদের একই আগুনের সাথে বিয়ে দিয়ে আগুন-সিগারেট দম্পতির একটাকে আরশাদের হাতে গুজে দিয়েছিল।
-‘আপনি মিঞা. আর ভাল হলেন না। নাহ, এখনো শাড়ির দোকান খুঁজে পাইনি। তবে আব্বা-আম্মা-বড় আপা লেগে আছে। এই বছরই সম্ভবত শাড়ির দোকান খুঁজে পাব। আপাতত তাই ঝুলাঝুলি বন্ধ’।
ইতিমধ্যেই আরশাদ সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিল। সে কথাকে সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি করছিল।
-‘কিভাবে শুরু করব বুঝতে পারছিনা। তবুও তোকে সংক্ষেপে ব্যাপারটা বুঝাই : আমি অল্প বয়সেই জীবনটাকে বেশি কমপ্লেক্স করে ফেলেছি। ভার্সিটি পাশের পর এমন কোন খারাপ কাজ নেই যা করিনি, তোকে মিথ্যা বলবোনা, করে মজাও পেয়েছি। আমি আসলে একটা নতুন সার্কেলে ঢুকতে চাইছিলাম, আজন্ম গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকা মিডল ক্লাশ সিলটাকে মুছে ফেলতে চাইছিলাম। এখনো তা-ই চাইছি। কিন্তু তুইতো জানিস ই টেস্ট ম্যাচে বড় ইনিংস খেলতে হলে তোকে সেশন বাই সেশন খেলতে হবে, মাঝেমাঝে বিশ্রামে যেতে হবে। আমার এখন সেই সময় চলে এসেছে’।
- আরে মিঞা, ভূমিকা এত বড় করছেন কেন। ডেসক্রিপশন, কনক্লুশান বলেন।
- ১লা সেপ্টেম্বর থেকে তোদের এই সো কল্ড সভ্যজীবন থেকে ৩বছর মেয়াদী ছুটি নেব। পরিবারের সাথে কোন যোগাযোগ রাখবোনা, প্রতিদিন একজন করে নতুন মানুষের বাড়িতে গিয়ে থাকবো। সেজন্যই সবার এড্রেস যোগাড় করছি , আর নিজের পরিচয় পাল্টে মাধুকর দা রেখেছি।
-হোয়াট?
-ইয়েস। ধর্ আজ তোর বাড়িতে রাতে থাকলাম, ঠাট্টা-তামাশা করলাম, পরদিন তোর কাছ থেকে দুই-তিনশো টাকা চেয়ে সুজনের বাড়িতে গেলাম, তার পরদিন গেলাম সজলের বাড়িতে, এভাবে একদিন একদিন করে পুরো ৩বছরটাই পরিচিত মানুষদের সাথে কাটালাম।ধর্, ৩৭বছরে মরলে তো মরলামই; আর যদি না মরি, তাহলে আবারো গতানুগতিক লোভের জীবনে ফিরে এলাম, ব্যস ডিল ইজ ওভার।
- হুম, আইডিয়া খারাপ না। কিন্তু আপনার ফ্যামিলির কী হবে?
-বউকে একটা ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছি, ব্যাংকে টাকাও আছে । ওর ইচ্ছা হলে অপেক্ষা করুক, নইলে ফাকা ফ্ল্যাটে প্রতিদিন পুরুষমাছ ধরুক রূপের বরশিতে, আমার কী? নিজে তো কম মেয়ে চাখিনি। আর, মা-বাবাকে দেখার জন্য বাকি ভাই-বোনরা আছে।
পার্কের ঘাসে সাময়িক নৈঃশব্দের চাষ হচ্ছিল। এরপর আরশাদই সেই ঘাসে শব্দশস্যের আবাদ শুরু করেছিল আচমকা।
-ভায়োলিন শিখবি নওশাদ?
কিন্তু ফয়েজ বিরক্ত হয়েছিল শব্দের এই ফলনে।
-ধুত্তরি, দিনে দিনে ইমপ্র্যাকটিকাল হয়ে যাচ্ছেন। চাকরি-বাকরি ছেড়ে ভায়োলিন বাজিয়ে বিটোভেন হয়ে রাস্তায় ছালা গায়ে ঘুরি আরকি!
-আমি অবশ্য আরও টেরিবল রিএকশনের ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ, প্রথমদিন আমিও শৈবালকে যা-তা বলে অপমান করেছিলাম : বলে কি ছেলে, এত ব্যস্ততার মধ্যে ভায়োলিন শিখবো!
ফয়েজের আগ্রহ পুনর্জন্ম নিয়েছিল, এই কথা শুনে- ‘ শৈবাল কে?’
-‘ কী জানি! তবে অর্থহীন ব্যান্ডের ‘অদ্ভুত সেই ছেলেটি’ গানটা বোধহয় ওকে দেখেই লিখেছিল কেউ। বলতে পারিস, ওর প্রভাবেই আমি মাধুকর দা হয়েছি’।
-ও আচ্ছা।
-ইয়াপ। আমার পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে। মাঝে মাঝে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভায়োলিন বাজায়, শুনতে বেশ লাগে। গিটার-বাঁশি বাজিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করা যায়, কিন্তু একমাত্র ভায়োলিনই বোধহয় পারে মোহিত করতে। ভায়োলিন শুনতে শুনতে প্রায়ই স্কুল-কলেজের কথা মনে পড়ে যেত, ভার্সিটিকে মনে পড়তো। এমনিতে পাশের ফ্ল্যাটে তো কোনদিনই যাওয়া হয়না, ভায়োলিন সূত্রেই ওদের ফ্ল্যাটে যাওয়া-আসা শুরু হল। ওর বাবা কাস্টমস অফিসার, ও পড়ে চারুকলায়। সারাদিন ঘোরের মধ্যে থাকে, নেশা-ভাঙ করে। ওর সাথেই কথা বলে বুঝলাম, জীবনে শুধু বাস্তবতা না, কিছু ফ্যান্টাসিরও প্রয়োজন আছে। আমি সেই ফ্যান্টাসি খুঁজতেই বয়সের পার্থক্যকে পাত্তা না দিয়ে ওর সাথে খাতির জমালাম। ও ভায়োলিনের প্রতি আমার আগ্রহ দেখে বলল- ‘আপনিও শিখুননা’। শুনে, আমি তো পারলে ওকে আনারসের মত ফালি ফালি করে কাটি। কিন্তু মাঝে মাঝে ঐ যে ভায়োলিন বাজায় তাতেই আমার মধ্যে তোলপাড় হয়। কোন কোনদিন ভায়োলিনের সুরে আমার সব অপরাধগুলো ফিরে আসে, সে তুলনায় অর্জনগুলো ফিরে খুব কমই। এরপর থেকেই ভায়োলিন শুনলে মনে হয় আমি বোধহয় ৩৭বছরে মারা যাব।
দীর্ঘক্ষণ চুপ থেকে ফয়েজের ঠোটে চর্বি জমে যাচ্ছিল, তাই সে ঠোট দুটোকে ব্যায়াম করিয়েছিল।
-আপনার সাইক্রিয়াটিস্ট দেখানো দরকার।
কথাটা শুনে আরশাদ গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল।
-আজকের দিনটা লিখে রাখ্ । আজ থেকে সাড়ে তিনবছর পর ঠিক এই কথাটাই তোকে বলব। এনিওয়ে, যা বলছিলাম : আমার এই মনে হওয়াটার একটা কারণ ছিল। একদিন ও আমাকে বলল, ‘আরশাদ ভাই. আমার কি ধারণা জানেন, সব মানুষই আসলে অবচেতনভাবে নিজের ভবিষ্যত দেখতে পায়। আমি আজ যা হয়েছি, আজ থেকে ৪-৫বছর আগে কল্পনায় আমি এমনটাই দেখতাম। মাঝখানে কাজের চাপে সব ভুলে গিয়েছিলাম। ভেবে দেখেন, আপনার জীবনের বেশিরভাগ পরিণতিই আপনি আগে থেকে জানতেন’। ওর কথাটা যে ফালতু নয়, এটা মানবি নিশ্চয়ই। যাই হোক, এরপর ও একটা কথা বলল যা শুনে আমি ভয় পেলাম, ‘১মাস ধরে দুটো ঘটনা প্রায়ই ভাবছি। হয়তবা ৪-৫বছর পরে এটা বাস্তব হয়ে যাবে। ভাবলাম আপনাকে আগেই জানিয়ে রাখি। আমার মনে হচ্ছে, আমার একটা পা কেটে ফেলতে হবে অদূর ভবিষ্যতে । অন্য কথাটা অবশ্য লজ্জার। তবুও বলি: বেশিরভাগ রাতেই আমার এক বিবাহিত খালাত বোনকে স্বপ্ন দেখে সকালে ট্রাউজারের গায়ে ইলশে গুড়ি বৃষ্টি দেখছি’।
‘তবে লিস্টের এই আইডিয়াটা দুশ্চিন্তার সমান্তরাল সুচিন্তা হিসেবেই এসেছে। যতবেশি পারি নতুন মানুষের সাথে মিশছি, আর লিস্টে তাদের নাম উঠাচ্ছি। ভায়োলিন শেখাটা্ও শুরু করবো নেক্সট উইক থেকে। সপ্তাহে ২ দিন ক্লাশ। ধর্, সবার বাড়িতে বেড়ানোর সময় ভায়োলিন রাখলাম সাথে, রাতভর আড্ডার মাঝখানে ভায়োলিন বাজিয়ে শুনালাম। শৈবাল অবশ্য যে কোন গান শোনামাত্রই ভায়োলিনে তুলতে পারে, জিনিয়াস একটা ছেলে।
শৈবাল নামের ছেলেটির সাথে ফয়েজের কোন পূর্বযোগ ছিলনা, তবুও আরশাদের মুখে ছেলেটির অযাচিত প্রশংসা শুনে সে অনেকটা হিংসার বশবর্তীতেই ইস্কাটন ভায়োলিন ইনস্টিটিউটে নাম লিখিয়েছিল। সেখানেই অন্য অনেকের ভীড়ে গায়ত্রী দত্তকেও পেয়েছিল সতীর্থ হিসেবে।
ফায়ারক্যাম্পের পর গায়ত্রী দত্তের সাথে ফয়েজের একটু আধটু কথা হচ্ছিল কিছুদিন। সেইসব কথা থেকে তার সম্পর্কে একটা ধারণার ফ্রেম তৈরি হচ্ছিল: গান ছাড়াও সে একজন পুরস্কার পা্ওয়া নৃত্য ও অভিনয় শিল্পী। সর্বশেষ জানা গিয়েছিল সে ভাল ছবি আকে, গোপনে খাতার পৃষ্ঠায় গোটা গোটা অক্ষরে কবিতাও নাকি লিখে, যা তার ভাষ্যমতে শুধুই নিজের জন্য লেখা। এমন গুণবতী একজন রমণীর এই ২৭-২৮বয়সাবধি কেন পাণি অধরাই রয়ে গেছে, তা এক গবেষণার বিষয়। শৈবাল এই গবেষণাটাই করেছিল একদিন ক্যাফের আড্ডায়- বুঝলেন মাধুকর দা, এই গায়ত্রী দত্ত ক্যারেক্টারটার প্রতিভা থাকলেও রুচিবোধ অত্যন্ত স্থূল প্রকৃতির, অনেকটা ফারুকী গ্রুপের নাটকের মত। এটাই মেইন কনট্রাডিকশন।
যথারীতি সেদিনও ফয়েজ তাদের টেবিলে একটা চেয়ারের মালিকানা পেয়েছিল, কিন্তু সেদিন সে কথার আউট সুইং-ইনসুইংকে নিস্পৃহ ঘোড়ার মত শুধু শুনছিলনা, বরং একটু খাটো লেন্থের কথাটাকে সে সজোরে পুল করেছিল- ‘শৈবাল, তুমি কি জানো সুপারিওরিটি কমপ্লেক্স একটা মানসিক রোগ?
শৈবাল কিছু বলার সুযোগ পায়নি, তার আগেই তাদের পাশের টেবিলটাতে গায়ত্রী দত্ত, উপলা, রেহনুমা, সুমাইয়াসহ নারী দলটা এসে বসে চা-নাস্তার অর্ডার দিচ্ছিল। ফয়েজের ডানপিটে চোখ গায়ত্রী দত্তের চোখে বলাকা খুঁজতে চাইছিল. কিন্তু না খুঁজেই সেদিনের মত উঠে পড়েছিল আরশাদের ডাকে।
গায়ত্রী দত্তের এড়িয়ে চলা সংক্রান্ত অনুমানটি তার পরের সপ্তাহের।
ক্লাশ শুরুর একটু আগেভাগেই চলে আসায় ইনস্টিটিউটের গেটের বেঞ্চে বসে আরশাদের সাথে কথা বলছিল ফয়েজ। আগের দিন কনে দেখতে গিয়ে মা-বোন কেমন সার্কাস করে এসেছে , গল্পের সারবস্তু সেটাই।
- আমার মা-বোন বেঁচে থাকতে আর বিয়ে হওয়ার চান্স নেই। ৫০বছর আগের সিস্টেমে এখনো যেভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মেয়ে দেখে, কে রাজী হবে!
- সেজন্যই ভার্সিটি লাইফে এফেয়ার থাকা ভাল। প্লেবয়গিরি না করে তখন একটা রিয়েল প্রেম করলেই পারতি। এখন বোঝো ঠ্যালা।
- হুম, আমার কপালে শেষমেষ কাজের বেটি রহিমা টাইপ কোন মেয়েই জুটবে দেইখেন।
এসময় গেট দিয়ে গায়ত্রী দত্ত ঢুকছিল। তাকে দেখে দুজনেই মুচকি হাসে, ফয়েজ বাড়তি একটা কথাও যোগ করেছিল- ‘কেমন আছেন দিদি’?
গায়ত্রী দত্ত শূন্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়, সম্ভবত প্রশ্নটা শুনতে পায়নি। তাই ফয়েজ আবারও বলেছিল- ‘ভাল আছেন’?
গায়ত্রী দত্ত কিঞ্চিত মাথা ঝাকিয়ে সামনে এগোয়, সেসময় তার চিরায়ত চেরী ফুল হাসিটা মুখের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা। ফয়েজরা পেছন থেকে তার চলে যাওয়া দেখছিল। এসময়ই অভ্যাসবশত আরশাদ উদ্ভট কথাটা বলে ফেলেছিল
- এত মেয়ে না খুঁজে গায়ত্রী দত্তকে বিয়ে কর্।
ফয়েজ ধড়মড় করে বেঞ্চ থেকে উঠে পড়েছিল।
-ধুর মিঞা এসব কী বলেন!
আরশাদ তাকে টেনে বসিয়েছিল আবার।
-‘ধুর, বলার কিছু নাই। বয়সে বড়, আর ধর্ম আলাদা, এটাই তো সমস্যা? তা শেষ জুম্মার নামাযটা কোন্ বছর পড়েছিস বলতো’? আরশাদ নিজেই হাসে- ‘আর, বয়সের ব্যাপারটা নিয়ে একটা থিওরি আছে আমার। ধর্, সমবয়সী মেয়েরা বয়সে বড় ছেলেদের খুঁজে, আবার বয়সে ছোটদের জন্য নিশ্চয়ই ওদের কোন না কোন ক্লাসমেট দিওয়ানা থাকে। কিন্তু একমাত্র সিনিয়রদের ক্ষেত্রেই এই সমস্যাটা নাই। কেউ যদি থেকেও থাকে, তাও গন কেস।
ফয়েজ হাসতে হাসতে অসতর্কতাবশত হাত থেকে মোবাইল ফেলে দেয়। পতিত মোবাইলের গর্ভ চিড়ে বেরিয়ে আসে হৃষ্টপুস্ট চেহারার মোবাইল ব্যাটারি, আর ক্ষুদ্রকায়া সিমকার্ড। সেগুলো তুলতে তুলতে সে বলে- ‘আপনি মিঞা, একটা এবসার্ড মানুষ। প্র্যাকটিকাল লাইফের জন্য পুরো আনফিট। আপনার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মাধুকর জীবন শুরু করাই ভাল। তা, লিস্টে কয়জনের নাম উঠল?
আরশাদ তখনো মুচকি হাসছিল- আজকে দুপুর পর্যন্ত ৯৮৩ জন হল। ওই আলাপ পরে হইবো। কিন্তু গায়ত্রী দত্ত যে তোকে এভোয়েড করছে, এইটা বুঝছোস?
ফয়েজ কোন ভ্রুক্ষেপই করেনা- ‘করলে করছে, না করলে না-ই’। সে পকেট হাতড়ে সিগারেট খুঁজে না পেয়ে আরশাদের দিকে তাকায়- সিগারেট আছে নাকি?
আরশাদের পকেটও সিগারেটশূন্য।
-‘আহহারে, আমার কাছেও তো নেই। চল কিনে নিয়ে আসি’।
দুজনে সিগারেট কিনতে গেটের বাইরে বেরিয়েছিল। অদূরে একটা রিক্সা এসে থেমেছিল। শৈবাল রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মেটাচ্ছিল, তার সহযাত্রী তরুণীটি তাদের অপরিচিত। আরশাদের ভীষণ কৌতূহল হচ্ছিল তরুণীর সাথে শৈবালের সম্পর্কটা জানতে, মনে মনে সে প্রার্থনা করছিল- আর যা-ই হোক, অন্তত খালাতো বোন যেন না হয়। এই প্রার্থনার স্রোতেই তার ‘৩৭ বছর’অবসেশনটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল। দ্রুতপায়ে সে শৈবালের দিকে এগুচ্ছিল সম্পর্কটা জানতে, তার সাথে তাল রাখতে না পেরে ফয়েজ পড়ে গিয়েছিল কয়েক কদম পিছিয়ে। আরশাদ তবুও এগুচ্ছিল, এগুচ্ছিলই......
হিমালয়
২৭.২.১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




