ঘটনার শুরু
বহু বছর ধরে চলছে এ ঘটনা। কিন্তু টের পায়নি কেউ। টের পেল সেদিন। তারল্য সংকটে যেদিন লেহম্যান ব্রাদার্স দেউলিয়া ঘোষিত হল। আতঙ্কিত হল জনগণ। যে যার ব্যাংকে জমাকৃত টাকার উঠানোর জন্য ভীড় করলো ব্যাংকে। কিন্তু ব্যাংকের হাতে তো টাকা নেই। আমেরিকার ব্যাংকগুলোতে অধিকাংশ টাকা বাহিরের দেশের। ওদের নিজেদের সঞ্চয় খুবই সামান্যই (ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদ, গতকাল এনটিভির আলোচনায়)। এই ঘটনায় বিদেশীরা দ্রুত তাদের টাকা উঠিয়ে নিচ্ছে। ফাকা হচ্ছে ব্যাংক। হাওয়াই বিনিয়োগ কি ডাবল ট্রিপল বিনিয়োগে সব টাকা মাঠে। ফলে দেউলিয়া হলো আরো ব্যাংক। কান টানলে মাথা আসে। সব আর্থিক ও ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের সাথে সম্পর্কিত। প্রত্যেকের ব্যবসা বন্ধের উপক্রম। পুরো আমেরিকা প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেল। এ ধাক্কার রেশ কোথায় গিয়ে শেষ হয় তার হিসেব নিকেশ চলছে এখন বোদ্ধা মহলে। ওয়াহিদুদ্দীন মাহমুদের মতে (গতকালের এনটিভি লাইভ টক শো) এ সংকট বা পতন আরো তিন কি চার বছর ব্যাপি চলতে পারে। কি ভয়াবহ অবস্থা।
কে দায়ী এ জন্য? অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী দুইদিন কি তিনদিন আগে বললেন, এটি পুজিবাদি অর্থনীতির পাপের ফসল। আসলেই তাই। যে পুজিবাদি, নিয়ন্ত্রণহীন ও ভোগবাদী, অর্থব্যবস্থার উপর ভর করে পাশ্চত্য অর্থনীতি সদম্ভে বিশ্বে খবরদারী করেছে, এবার তা ডিম পারা শুরু করেছে। কিন্তু সে ডিম বড় বিষাক্ত, বড় ভয়াবহ। ডিম ফুটে বেরুচ্ছে কার্টুনে দেখা সেই আজদাহা ডাইনোসর, সব খেয়ে ফেলছে। সুদ নির্ভর পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে একদিকে দেদারছে বিনিয়োগ হতে থাকে, কোন খাত চিন্তা না করেই, প্রফিট্যাবিলিটি চিন্তা না করেই। অন্যদিকে পুজিবাদি অর্থনীতির অন্যতম পিন্সিপল হচ্ছে ভোগই সবকিছু। মানুষ উদভ্রান্তের মত ভোগের পেছনে ছুটতে থাকে। পুঁজিবাদি অর্থনীতির আরেকটি নীতি হচ্ছে, যে যেভাবে পার আয় করবে, যেভাবে পারবে ব্যয় করবে। এ কারণে হাওয়াই ব্যবসার প্রসার ঘটে। স্পেকুলেশন, হেজিং ইত্যাদি ফটকা ব্যবসার রমরমা অবস্থা, হাজার হাজার কোটি টাকার কারবার।
ইসমাঈল হানিয়া বলেছেন, এটি হচ্ছে আমেরিকার উপর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে গজব। প্রথমে চিন্তা করেছিলাম কথাটি বলার জন্য বলা। কিন্তু চিন্তা করলে বোঝা যায়, সম্ভবত এটিই সত্য। আল্লাহর বিধান অমান্য করে কোন জাতিই পার পায়না। একসময় আল্লাহ ঠিকই পাকড়াও করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক প্রতাপশালী জাতি আল্লাহর বিধানকে থোরাই কেয়ার না করে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। পুজিবাদি অর্থনীতিও আজ হোক কাল হোক পতিত হতে শুরু করবে, সমাজতন্ত্র যেমন অল্পদিনেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে সেই পতন কি এখান থেকেই শুরু হল। এ প্রশ্নের জবাব পেতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
ইসলামী অর্থনীতির শ্রেষ্ঠত্ব
পুজিবাদী অর্থনীতির মূল ভিত্তিই হচ্ছে সুদ। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, সুদ হচ্ছে যুলুম। ইসলামী অর্থনীতির প্রথম কথাই হচ্ছে সুদমুক্ত অর্থনীতি। পুঁজিবাদি অর্থনীতির সার কথা হচ্ছে ভোগ। ইসলামী অর্থনীতিতে ভোগ নিয়ন্ত্রিত। পুঁজিবাদি অর্থনীতিতে যেভাবে পার আয় কর, যেমন ইচ্ছা ব্যয় কর। ফলে অপ্রয়োজনীয় খাতে বিনিয়োগ হয়। ইসলামী অর্থনীতিতে সরকার বিনিয়োগের খাত নির্ধারণ করবে জনগণের কল্যাণের প্রায়রিটি বিবেচনায়।
প্রশ্ন হচ্ছে এই মহাপতনের পর বিশ্ব কি কল্যাণময় ইসলামের নীতির দিকে টার্ন করবে? সব ব্যবস্থাই তো দেখা শেষ। এবার কি ইসলামের দিকে ঝুঁকবে? নাকি নতুন করে মিশ্র আরেকটি অর্থনীতির জন্ম হবে?
কি হতে পারে/ হতে যাচ্ছে
তার আগে একটু আলোচনা করা যাক, কি সর্বনাশ হতে যাচ্ছে এই সংকটের? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমেরিকায় আরো ব্যাংক দেউলিয়া হবে। ফটকা বাজারে বিনিয়োগ বন্ধ হবে (ইতোমধ্যে বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণের জন্য আমেরিকার সরকার নির্দেশনা দিয়েছে)। ফলে এগুলোর সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষ বেকার হবে। ফরেন কর্মচারীরা বেকারহবে। উন্নয়নশীল দেশের রেমিটেন্স ঘাটতি হবে। আমেরিকা হচ্ছে আমদানী নির্ভর জাতি। মানুষ ব্যাংকের সাপোর্ট না পাওয়ায় ভোগ কমিয়ে দেবে। ফলে তাদের আমদানী হ্রাস পাবে। আমেরিকায় রপ্তানির উপর নির্ভর করছে অনেক উন্নয়নশীল দেশ। তারা পড়বে বিপাকে। ইতোমধ্যে আমেরিকার অনেক তৈরী পোষাক আমদানীকারক বাংলাদেশের গার্মেন্টসগুলোতে শিপমেন্ট পেছানোর অনুরোধ করে মেইল করা শুরু করেছে। আজকের পত্রিকাগুলোতে পাওয়া যাবে এ খবর।
আমেরিকা সরকার যুদ্ধ ব্যয় কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে। জাতিসংঘের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাবে। সারা বিশ্বের উপর খবরদারি মাস্তানি হ্রাস পাবে। আল্টিমেটলি সুপার পাওয়ার থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের মত পতন হবে। বিশ্বে নতুন করে পোলারাইজেশন হবে। এগুলো অর্থনীতিবিদও বিশেষজ্ঞদের প্রেডিকশন। আমরা দেখার অপেক্ষায়।
ইসলামের সম্ভাবনা
প্রশ্ন ছিল, এই মহাপতনের পর বিশ্ব ব্যবস্থা ইসলমী অর্থনীতির দিকে ঝুঁকবে কিনা। এটি আলোচনা সাপেক্ষ। এটি নির্ভর করে মুসলিম বিশ্ব এক্ষেত্রে কি ভূমিকা নেবে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী অর্থনীতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মত যোগ্য স্কলারের সংখ্যা এখনও খুবই কম। অন্যদিকে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোতে সরকারে আসীন রয়েছে এমন ব্যাক্তিরা যারা নামেই মুসলিম। ইসলামের প্রতি তাদের কমিটমেন্ট ও আগ্রহ সামান্যই। ফলে বোঝা যাচ্ছেনা ইসলামী অর্থনীতি কতটুকু অগ্রসর হতে পারবে।
ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে আগামী মাসের শুরুতে আইডিবি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করতে যাচ্ছে। মূল বিষয় থাকবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মুসলিম দেশগুলোর কি করণীয়।যতটুকু শোনা গেছে, সেখানে বিভিন্ন দেশথেকে ইসলামী ক্লিয়ারিং হাউস স্থাপনের জোড় দাবী জানানো হবে। বিশেষত বাংলাদেশ থেকে যিনি যাবেন পর্যবেক্ষক হিসেবে, জনাব ফরিদ উদ্দীন , তিনি জানিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে জোড় দাবি জানাবেন। এশিয়ান ক্লিয়ারিং হাউস (আকু) যদি হতে পারে, তবে ইসলামী ক্লিয়ারিং হাউস হতে পারবেনা কেন। যদি এমন একটি ক্লিয়ারিং হাউস গঠন করা যায়, তবে একদিকে পুজিবাদি অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ থেকে অনেকখানি মুক্তিপাবে, অন্যদিকে নিজস্ব একটি বিকল্প শক্তি হবে।
আরো অনেক কিছুই করার আছে। কিন্তু সরকারগুলো কতটুকু করে তার উপর নির্ভর করছে পুজিবাদি সর্বগ্রাসী অর্থব্যবস্থার মোকাবেলায় ইসলামী অর্থনীতির ভবিষ্যত।
আলোচ্য পোস্টে ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে সামান্য টাচ দেয়া হয়েছে। মূল ফোকাস ছিল পুজিবাদী অর্থনীতির টালমাটাল পতন এবং বর্তমান পরিস্থিতি।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৯:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


