জিয়ার মাজার পাড় হয়ে সোজা পশ্চিমে গণভবনের কোণে এসে আপনি যদি সিগনালে আটকা পড়েন, দেখবেন ফুটপাত থেকে নমে আসবে ২৫/২৬ বছরের এক অন্ধ ভিক্ষুক। হাত পাতবে আপনার গাড়ির জানালায়। সে আমাদের মিজান! সেদিনই তাকে এ অবস্থায় প্রথম দেখলাম। আমার হল জীবন কাটিয়েছি একজন অন্ধের রুমে। সেখানেই তার সাথে পরিচয়। মাঝে মাঝে বেড়াতে আসতো রুমে, দল বেধে আড্ডা বসাতো। সেই মিজানকে আজ একি অবস্থায় দেখছি? সেদিন ফিরতে ফিরতে সারা পথ ভাবনা জুড়ে ছিল মিজান।
ঈদের ক'দিন আগে বৃষ্টিভেজা এক দুপুরে পরিকল্পিতভাবে দাঁড়ালাম গণভবনের কোণে। কাছে গেলাম, পরিচয় দিলাম, কথা বললাম। প্রথমে খুবই সংকুচিত হয়ে গেল। অতপর একটু একটু করে অনেক কথাই বললো। হতাশার কথা, আশার কথা। এইচএসসি পাশ করে ভিক্ষা করে এমন লোকের সংখ্যা বাংলাদেশে খুবই নগণ্য অথবা মিজানই একমাত্র ব্যক্তি। ছয় নম্বরের জন্য সে এইচএসসিতে দ্বিতীয় বিভাগ পায়নি। কথা বলতে বলতে হঠাত 'আব্বু' ডাক শুনে ফিরে তাকালাম। দেখলাম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দুটি পিচ্চি এগিয়ে আসছে। মিজান পরিচয় করিয়ে দিলো, তার দুই সন্তান সাব্বির ও সাবিনা। দুধে আলতা রঙের শিশু দুটি একেবারে বাবার গায়ের রং পেয়েছে। ইন্টার পাশ করে অর্থাভাবে পড়ালেখা ছেড়ে এদিক সেদিক বিভিন্ন জায়গায় চাকরীর চেষ্টা করে অবশেষে স্ত্রী ও ছোট ছোট দুই সন্তান সাব্বির ও সাবিনাকে নিয়ে পথে নামতে বাধ্য হয়েছে।
মনে পড়ে, কি চমৎকার প্রাণশক্তির অধিকারী ছিল এই মিজান। রুমে ঢুকেই হাক ছাড়তো, হো হো করে হাসলে রুমটা গমগম করে উঠতো। আড্ডায় বসলে মিজানের কণ্ঠ সবার ওপরে শোনা যেত। বিরক্তি লাগলেও কিছু বলতামনা। আজ গণভবনের কোণে দাঁড়ানো শিক্ষিত ভিক্ষুক মিজানের বিবর্ণ মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে মনে হল মাত্র ক'বছর আগেও কি এক প্রাণচঞ্চল যুবক ছিল মিজান, আর আজ তার নিজের সাথেই নিজের কত পার্থক্য।
চল্লিশ হাজার কোটি টাকার ঈদ মার্কেট দেখলো বাংলাদেশ। কিন্তু রাজধানীর কেন্দ্রে দাঁড়িয়েও সে টাকার প্রবাহের কানাকড়িও ছিটকে পড়েনি মিজানের কোলে। রাজধানীর সড়কগুলো সৌন্দর্য বর্ধনে অংশ নেয় বিভিন্ন কোম্পানী তাদের কর্পোরেট সোশাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে। প্রতিটি কোম্পনী যদি একজন করে শিক্ষিত অন্ধকে চাকুরী দান করে, হোক সে অল্প বেতনে, তবে দেশে মিজানের মত অসহায় বেকার অন্ধ খুঁজে পাওয়া যাবেনা। সরকার পারে এমন একটি বিধান করতে যাতে সিএসআর এর অংশ হিসেবে প্রতিটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানী একজন করে প্রতিবন্ধীকে চাকুরী দেবে অথবা খরচ দেবে। একটি কোম্পানির জন্য এটি কোন বিষয়ই নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে গেলে আপনি দেখবেন বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে অধ্যয়ন করছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিরা। ইংরেজী, আইন, সমাজবিজ্ঞানকি পলিটিকাল সাইন্স। প্রায় প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে পাওয়া যাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পদচারণা। আল্লাহ হয়তো তাদের চোখের দৃষ্টি দেননি, কিন্তু তাদের দিয়েছেন অসম্ভব তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তি। আপনি তাকে মোবাইল নম্বর একবার বললেই তার মুখস্ত হয়ে যায়। একটি পুরো লেনদেন অবলিলায় সে মুখস্ত বলতে পারে। ইংরেজী কিংবা আইনের ছাত্ররা সহজেই নিজেদের বিষয়ভিত্তিক পেশা খুঁজে নিতে পারলেও অন্যান্য বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা পেশার অনিশ্চয়তায় পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে অচিরেই। খুব নিকট থেকেই তাদের সে হতাশা আমি দেখেছি।
বস্তুত অন্ধ কিংবা প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয় বরং তাদেরকে কাজে লাগানো হয়না। তারা সহজেই বাঁশ বেতের মোড়া বানাতে পারে, হলে আমার রুমের মোড়াটা একজন অন্ধেরই তৈরী ছিল, তারা পারে পিএবিএক্স অপারেট করতে, সামান্য একটু প্রশিক্ষণ পেলে তারা কম্পিউটার চালাতে পারে এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে টকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে তারা ইন্টারনেট ব্রাউজ কিংবা ই-মেইল চেক করতে পারে। আপনি একটু খেয়াল করলেই দেখবেন তাদের কেউ কেউ অনর্গল ইংরেজীতে বক্তৃতা দিচ্ছে অথবা সংবিধানের ধারাগুলো মুখস্ত বলে যাচ্ছে। তাদেরও মেধা আছে, প্রতিভা আছে, সমাজের যারা কর্ণধার, যারা সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ব্যক্তি, তারা চাইলেই এসব মেধা প্রতিভাকে ব্যবহার করেত পারেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, সেবা প্রতিষ্ঠান অথবা সরকারী দপ্তরে। শুধু দরকার তাদেরকে পর্যবেক্ষণ করে তারা কি করতে পারে তা খুঁজে বের করা এবং পারফরমেন্স শো করার সুযোগ দেয়া। যথা যায়গায় বসাতে পারলে তারা মালিককে হতাশ করবেনা। আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা তাদের নিয়ে ভাবতে রাজি নই। নইলে আমাদের টুকু আদায় করে নিয়েই তাদের উপকার করা সম্ভব। আমরা যারা চক্ষুষ্মান, আমাদেরই দায়িত্ব চক্ষুহীনদের ব্যবস্থা করা। আমাদের সমাজের একজন এইচএসসি পাশ করে ভিক্ষা করবে এটি আমাদের জন্য যুগপতভাবে লজ্জার এবং আশংকারও বটে। আমরা সরকার, শিল্পমালিক এবং উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানাই মিজানদের দিকে দৃষ্টি দিতে, কিছু একটা করা প্রয়োজন, নতুবা আল্লাহর কাছে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধরা পড়তে হবে সন্দেহ নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


