বেশ কিছুদিন এ শহরে ছিলাম না। গিয়েছিলাম আমার সেই ছোটবেলার মফস্বলের শহরে। ওই শহরে যতবার যাই ততবার মন খারাপ হয়ে যায় কিন্তু তবুও যাই। ওই শহর থেকে আমার আর নেওয়ার কিছু না থাকলেও যে পিছুটানগুলো আছে সেগুলো ছেড়ে আজও বেরোতে পারিনি। সেই কারনেই যাই। মন খারাপ নিয়ে আবার ফিরে আসি।
আমার জীবনে এখন ব্যস্ততার বড় অভাব। এখন আমি ভীষণ ব্যস্ত হতে চাই, এতটাই ব্যস্ত যে আমার মনখারাপের জন্য যেন কোনও সময় না থাকে। আর এই শহরে আছে সেই ব্যস্ততা। বাড়ি থেকে বেরোনোর পর চারপাশে শুধু দেখি ব্যস্ত মানুষের ভিড়। এই শহরে সবাই এতটাই ব্যস্ত যে কারও দিকে তাকানোর সময় নেই। এই ঢাকা শহরটাকে যতই গালাগালি দিই না কেন, এই শহরটা ব্যস্ততার মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে সব খারাপ-লাগাকে ভুলিয়ে দিতে জানে।
ট্রেনে করে ফিরতে গিয়ে দেখলাম ভোরের ব্যস্ত ঢাকাকে। কমোলাপুর স্টেশনে আধো-ঘুম চোখে ব্যস্ত কিছু মানুষের ভিড়। এই সকালের ব্যস্ততা সেই সব মানুষদের বেশি যারা, শহরের বাজারে সব্জি যোগান দিতে চলেছে। দল বেঁধে গ্রামগঞ্জ উজাড় করে মহিলার দল শহরের বাবুদের ঘরে কাজ করতে ছুটছে, ঠিকে মজুরের কাজ খুঁজতে ভোর রাতে গ্রামের ছোট্ট রেলস্টেশন থেকে শহরে ছিটকে এসে জটলা করছে অসংখ্য যুবক, প্রৌঢ় মানুষও কিছু আছেন তাঁদের মধ্যে। রাতভোর প্ল্যাটফর্মে কাটানো ঘুমন্ত বাস্তুহারা মানুষজন এর মধ্যে উঠে পড়ে কোথাও দিনমানের জন্য অদৃশ্য হয়েছে, রাতে আবার আশ্রয়ের অভাবে এইখানেই ফিরে আসবে হয়ত।
আর এই ছুটে চলা দৃশ্য ও অদৃশ্যের ফাঁকে-ফাঁকে আমাদের মত কিছু মেল ট্রেনের যাত্রিরা রয়েছে যারা তাঁদের সদ্য ছেড়ে আসা মফস্বল শহরটাকে এর সাথে মেলানোর চেষ্টা করছে, পারছে না। এই ব্যস্ততার অবশ্য আরেকটি দিকও আছে। এখানকার সবকিছুকেই বড় নির্দয়, যান্ত্রিক বলে মনে হয়। এই যে ভিড়, এর যাবতীয় কোলাহলের মধ্যে ফেলে আসা মফস্বল শহর যেন একটু একটু করে সরে যেতে যেতে ক্রমশ হারিয়ে যেতে শুরু করে। ছুটে চলা জীবনের স্রোত সব কিছুকে গ্রাস করে ফেলে। আমিও জনসমুদ্রে মিলিয়ে যাই, ডুবে যাই মানুষের ভিড়ে, মিশে যাই ব্যস্ততার বলয়ে, যেখানে ভিড়ের মধ্যে প্রত্যেকটি মানুষ একাকিত্বে ভোগে।
এবার ধাতস্থ হতে অনেক সময় লাগবে আমার, একথাটা ভাবতে ভাবতেই ঘরে ঢুকলাম। দেখি সারা ঘর ধুলোয় ভরা, টবের গাছগুলি মৃতপ্রায়। নিজের উপরই প্রচন্ড রাগ হল, ‘কেন যাই এই শহর ছেড়ে, ফিরে আসি শুধু মন খারাপ নিয়ে। এখানেই যখন থাকতে হবে তখন বারে বারে যাই কেন?’ উত্তর জানা নেই!
দমবন্ধ করা ঘরের জানালা খুলতে গিয়ে ভাবলাম, সেই যে দোতলা-ছোঁয়া নিমগাছটি আমার ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যেত, সেটা কেমন আছে?
আগাছার মতো আবাসন উঠছে এই পাড়ায়, ওই একটিই এখনও অব্দি অবশিষ্ট গাছেদের মধ্যে। বেঁচে আছে বললে ভুল বলা হবে, বলা যায় মাটি কামড়ে পড়ে আছে জীবনের ইচ্ছেটাকে ধরে রেখে। বা এখনও তাকে কেটে ফেলা হয়নি এই যা। একদিন তো দেখি কয়েকজন গাছটার গোড়ার কাছে খুঁড়ে, বেশ কিছু শেকড় কেটে দেওয়ালের সীমারেখা তৈরি করছে। গাছটিকে যাওয়ার দিন অব্দি দেখেছি ভীষন রুক্ষ, সবকটা পাতা ঝরে পড়েছে, গোটা গাছটা কেমন প্রেতাত্মার মতো অতীতের কিছু স্মৃতি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর আজ অনেকদিন পর ফিরে এসে জানালা খুলে দেখি গোটা গাছ সবুজ পাতায় ভরে গেছে, সেই রুক্ষতা কোথায় হারিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ সজীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট সাদা ফুল আর কচি সবুজ পাতাদের নিয়ে সে আবার প্রচন্ড ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেখে মন খুশিতে ভরে গেল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



