ঘরে খাবার নেই। প্রায়ই অসুখে ভোগেন। চিকিৎসা করানোর মতো টাকাও নেই। শ্রীমঙ্গল উপজেলার সবুজবাগ গ্রামের রসময় কর্মকার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
দেশের টানে সেই ১৮ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। শায়েস্তাগঞ্জের বুলো বাবুর ওয়ার্কশপে কাজ করতেন তিনি। তখনই যুদ্ধ শুরু। পাক হানাদার বাহিনী যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলায় এসে পড়ে তখন তিনি মা-বোনদের নিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন। ভারতের খোয়াই গিয়ে শরণার্থী ক্যাম্পে এক রাত থাকার পর বাংলাদেশ থেকে আরো মানুষ সেখানে যায়। তাদের কাছে তিনি জানতে পারেন তার বাবাবে পাক হানাদার বাহিনী হত্যা করেছে। তখন তার মা-বোনের কান্না সহ্য করতে না পেরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার।
হবিগঞ্জের বৌলাগ্রামের ইউনুস চৌধুরী খোয়াইয়ের অমর কলোনিতে মুক্তিবাহিনী গঠনের লক্ষে একটি ক্যাম্প গঠন করেন। সেখানে রসময় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নিজের নাম লেখান। তার সঙ্গে ছিলেন কবীর, নিখিল পাল, সুনীল বাড়ৈ, গোবিন্দ, আনসার আলী, রামকৃষ্ণসহ ১২ জনের গ্রুপ। গ্রুপ কমান্ডার হবিগঞ্জের সৈয়দ জাহিরুল ইসলামের নেতৃত্বে তারা সেখানে ১৫ দিন ট্রেনিং নেন। এরপর অম্পিনগর ট্রেনিং সেন্টারে মেজর জেনারেল সফিউল্লার নেতৃত্বে ৩নং সেক্টরের আলফা কোম্পানিতে দেড় মাসের ট্রেনিং শেষ করেন।
ট্রেনিং শেষে বাঘাই ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন এজাহারের নেতৃত্বে যুদ্ধে নেমে পড়েন তিনি। রেমা, কালেঙ্গা, তুঙ্গেশ্বর এলাকায় পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে কোথাও গেরিলা, কোথাও সম্মুখযোদ্ধে অংশ নেন তিনি। যুদ্ধকালীন পাক হানাদার বাহিনী কতবার তার বাড়িঘর ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেন তারা। বাড়ি ফেরেন রসময়। ঘর পুননির্মাণও করেন। কিন্তু সেখানে বেশি দিন থাকতে পারেননি তিনি। অভাবের কারণে ১৯৮৫ সালে পৈতৃক ভিটেমাটি বিক্রি করে দেন।
সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার জন্য চলে আসেন শ্রীমঙ্গলে। তারপর থেকে ভাসমানের মতো জীবনযাপন- সঙ্গে স্ত্রী ও বৃদ্ধা মা। এরই মধ্যে গ্রামের অবশিষ্ট জমিজমাসহ বিষয়-সম্পত্তি জাল দলিল করে গ্রাস করে নিয়েছে ভূমিখেকোরা।
শ্রীমঙ্গল এসে উপজেলার সবুজবাগ গ্রামে প্রত্যন্ত এলাকায় ঠাঁই নেন তিনি। জীবিকার জন্য ঘুরতে থাকেন শহরের এপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। ঘুরে ঘুরে কান্ত হয়ে পড়েন, তবুও জীবিকার কোন সন্ধান হয়নি তার। তিনি বলেন, কত পাকিস্তানিদের গ্রেনেড ও মাইনের বিষ্ফোরণে কুপোকাত করেছি, তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ আমি নিজেই কুপোকাত।
অবশেষে মুক্তিযোদ্ধা রসময় যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্রটি কার্ড নং- ০৫০৩০১০০৫৫, যোদ্ধা নং- ১২৩১৪২ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দেখালে তিনি তাকে থানার প্রধান ফটকের পাশে একটি পান দোকান নিয়ে বসার জন্য জায়গা দেন। বেশ চলতে থাকে রসময়ের ছোট দোকানটি।
অভাবের সংসারে স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে দু’মুঠো খেয়ে-পরে সংসার চলতে থাকে রসময়ের। কিন্তু সেটিও বেশিদুর এগোতে পারে নি। পুঁজির অভাব ও বাকির কারণে দোকানটি বন্ধ করে দিতে হয়। এক পর্যায়ে রসময় আবার নিঃস্ব হয়ে পড়েন। জীবিকার জন্য পথে পথে ঘুরতে শুরু করেন আবার।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় ১৯৫৩ সালে লেঞ্জাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রসময়। বর্তমানে তিনি স্ত্রী ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে পত্রিকা বিক্রি করে বহু কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। টাকার অভাবে নিজের চিকিৎসা করতে পারছেন না। মুক্তিযোদ্ধা রসময় বলেন, ‘পেটে ভাত নেই, খুব দুঃখ লাগে। ইন্ডিয়ার শরনার্থী ক্যাম্পে যারা খাইছে আর ঘুমাইছে এরা অইছে সঠিক মুক্তিযোদ্ধা। আর যারা যুদ্ধে অংশ নিয়া রাইফেল গ্রেনেড চালাইছে তারা আজ ভাত খাইতে পায়না।’ মুক্তিযোদ্ধকালীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আক্ষেপের সুরে কথা বলার সময় তার চোখের জল টলমল করতে থাকে।
চোখ মুছতে মুছতে তিনি আরো বলেন, ‘যুদ্ধের সময় দেশরে লইয়া অনেক স্বপ্ন দেখতাম। ভাবতাম কেমনে দেশ শত্রুমুক্ত অইব। কেমনে মা-বোনের ইজ্জত রা অইব। দেশ স্বাধীন হইলে আর কোনো দুঃখ দুর্দশা থাকত না। কিন্তু আজ মুক্তিযোদ্ধারা দল করেন। আমি মনে করি, মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো দল নেই।’ আমরা সবাই একসঙ্গে যুদ্ধ করে জাতিকে একটি স্বাধীন দেশের পতাকা আইন্যা দিছি। মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো দল নাই। আমরা সবাই একদল।’
৫৫ বছর বয়সে পত্রিকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা বীর মুক্তিযোদ্ধা রসময় কর্মকার অশ্রুসিক্ত নয়নে তার জীবন-কাহিনী বর্ণনা করেন এভাবেই।
আলোচিত ব্লগ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ-পর্ব ২

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ: মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন ও টেকসই উন্নয়নের বিকল্প কৌশল
একটি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ফিজিবিলিটি স্টাডি ।
একটি ধারাবাহিক গবেষনামুলক পোস্ট
[link|https://www.somewhereinblog.net/blog/ali2016/30393976|প্রথম পর্বে থাকা গবেষনাটির পটভুমির লিংক – পর্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...
আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...
২০১০, এক-এগারোর পর থেকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত- যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, যারা গুম, নির্যাতন, কারাবাস, মামলা, চাকরি হারানো, পরিবার ভেঙে যাওয়া- সবকিছুর মূল্য দিয়েছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
আর্কাইভ থেকে: তান্নুদের বাড়ি-১

ফিরতে হলো কিম্ভূতকিমাকার ত্রিভুজাকৃতি ঘরে। পরিযায়ী পাখিদের ঈর্ষা হয়। মানুষের পৃথিবীতে শুধু দূষণ। রুক্ষ পাথুরে সড়ক—পর্বতারোহণ যেমন কষ্টদায়ক। নভেম্বরের শেষেও শীত নেই। যদিও আজ আর শীতের অপেক্ষায় থাকি না। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন
হাসিনা কি সত্যি প্রত্যাবর্তন করবেন?

নানা খবর আর প্রচার প্রোপাগান্ডা শুরু হয়েছে পতিত স্বৈরাচার হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে। রাজপথে এর কোনও উল্লেখযোগ্য প্রভাব না থাকলেও অনলাইনে আওয়ামী লিগারদের প্রচার প্রোপাগান্ডা আর... ...বাকিটুকু পড়ুন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর ভাবনা

আজ দেশজুড়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। ২৪ -এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভ্ন্নি সময়ে বহু নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরেছে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ ছাড়াও নাম জানা-অজানা হাজারো ব্যাক্তি তাদের প্রাণ হারিয়েছেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।