somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হামদের দেখার কেউ নাই........./ভাস্কর চৌধুরী

১৫ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ৯:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হামরা চার দিন ধইরে না খেয়ে আছি বাবু। দুই লেরকা আর বউ লিয়া চাল বাইজে লবন চা খাইতেছি। হামদের দেখার কেউ নেই। ৩১ টাকা হাজরি লিয়া ১ কেজি চালের পয়সা হয়না। হামদের মরন আইছে বাবু। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে এভাবেই কথা বলছিলেন সিলেট বিভাগের ভাড়াউড়া চা বাগানের গোপাল ভূইয়া নামের এক চা শ্রমিক।

গতকাল সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় গোপাল ভূইয়া তার বউ আর ছেলে-পুলেদের নিয়ে কিভাবে যে দিনাতিপাত করছেন তা কেই সচক্ষে অবলোকন না করলে বিশ্বাস করতে পারবে না।
বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সাথে চা শ্রমিকরা নিজেদের খাপ খাওয়াতে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছেন। কথা হয় একই চা বাগানের রামপ্রসাদের সাথে। সে জানায়, সকালে লবন লিয়া লাল চা খায়েছি (খেয়েছি) বাবু। একবেলা রাইতে খাইলে দুইবেলা উপোস থাকি। হামদের (আমাদের) অনেক সমস্যা আসে। হামরা (আমরা) মাছ, মাংস খায়েনা কয় বছর যে হইছে কইতে পারিনা। একই বাগানের প্রতীমা রানী তাঁতী বলেন, বাগানে ভাতের জন্য হাহাকার চলছে। ভাত নাই, কাপড় নাই, তরকারী রানবার লবন মরিচ নাই। সকালে চিড়া খাইয়েছি (খেয়েছি) এখন পর্যন্ত পাচঁটা বাইচ্ছা নিয়া আছি। বাগানের কিনার থেকে কচুঁ শাক, কাটা শাঁখ তুইলে (তুলে) আনছি। লবন দিয়া সিদ্ধ কইরা রাইতে খায়েমি (খাব)।

চা শ্রমিকদের প্রচন্ড ক্ষোভ আর দুঃখ কষ্টের দিনাতিপাত কিভাবে কাটছে তাদের কথায় হয়তো কিছুটা ফুটে উঠে। কিন্তু বাস্তবে বড়ই হৃদয় বিদারক। ভাড়াউড়া চা বাগান, পুটিয়াছড়া চা বাগান, কালিঘাট চা বাগান, টিপড়াছড়া চা বাগান, খেজুড়ি ছড়া চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগানে দেখা গেছে একই পরিস্থিতি। যেনো চা বাগান শ্রমিকদের অবস্থা দিনে দিনে কাহিল হয়ে পড়েছে। কাহিল হয়ে পড়েছে তাদের দৈনন্দিন জীবনের গতিধারা। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান বাজারে ১কেজি মোটা চালের যে দাম তার চেয়ে ৫টাকা কম একজন চা শ্রমিকের মজুরী। এই মজুরীর টাকা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তারা ভালভাবে এক বেলা পেটভরে খেতে পারেনা। যেনো তাদের আয়ের সাথে ব্যায়টা বড়ই বেমানান।


নিউজ সংগ্রহের জন্য খুব সকালে উঠে শ্রীমঙ্গলের পুটিয়াছড়া চা বাগানে হাজির হই। গিয়ে দেখা যায় তাদের উঠুন একবারেই পরিষ্কার। ঝেড়েজুঁড়ে হাতের কাজকর্ম সেরে নাস্তা করবে। বাবুল কুর্মী নামের এক চা শ্রমিকের বাড়িতে ডুকে পরি। সে জানায়, হামরা চাল বাইজে (বেজে) কাঁচা চা পাতা দিয়ে লাল পানি জ্বাল দিয়ে খাইবেক (খাব) বাবু। জিজ্ঞাস করি রাতে কি খাবে? বউকে বইলবো (বলবো) নদীর কিনার থাইকে (থেকে) কচু শাক, ফুলি শাখ, কচুর মুড়া নিয়া আইনবার জইন্যে (জন্য)। হামরা (আমরা) শুধু লবন দিয়ে সিদ্ধ করে খাইবেক বাবু। এভাবেই দিনের যাত্রা রাতের শেষ অধ্যায়ের সূচনা করে চা বাগান শ্রমিকরা। আগে দু-এক গ্লাস হারিয়া খেলে দ্বিগুন দামে যুগের রীতির অভ্যাসটুকুও হয়তো ভূলে যাবে তারা।

পুটিয়াছড়া ঘুরে আসতে আসতে দুপুর ঘরিয়ে যায়। এসে পৌছি লাখাইছড়া চা বাগানে। সেখানে এসে সাংবাদিক পরিচয় যেনে ক্ষোভের সঙ্গে এক চা শ্রমিক বলেন, কেনে হামদের (আমাদের) লিয়া (নিয়া) লিখেন। পত্রিকায় ছাপলে হামদের (আমাদের) কি লাভ। হামদের (আমাদের) দেশ স্বাধীন কইরা কি লাভ হইলো। হামরা কি এইদেশের জনগন না··? (হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরটি আমার জানা নেই)

লাখাইছড়া চা বাগান থেকে কালিঘাট চা বাগান। বাগানের সাবেক পঞ্জায়েত সভাপতি বলেন, চা বাগানের শ্রমিকদের বাসস্থান আছে কিন্তু ৩১ টাকার মজুরী দিয়ে ৩৬ টাকার চাল কিনা সম্ভব হয় না।
এক বাগান থেকে আরেক বাগান ঘুরেই একই বানী বার বার ঘুরে আসে। সাধারণ এই চা শ্রমিক বাগানে খেটে খাওয়া হতদরিদ্র চা শ্রমিকদের সবারই একই কথা তাদের মজুরী আরও বাড়ানো।
চা শ্রমিক ইউনিয়ন, চা শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি ও স্থানীয় চা শ্রমিক নেতৃবৃন্দ বলেন, শ্রমিকদের মজুরী অত্যন্ত নগণ্য। একজন ভিক্ষুক দিনে যা ভিক্ষা করে চা শ্রকিকের একদিনের মজুরীর চেয়েও বেশি।

( শ্রমিকদের অবর্ণনীয় এই দুঃখগাথাঁ কথাগুলো শুনতে যতটা কষ্ট হয়েছে তার চেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে তাদের নিয়ে লিখতে। হয়তো পাঠকের কাছে কষ্টের আবরণের কিছুটা ষ্পর্শ গায়ে লাগবে। কিন্তু সাময়িক ক্ষনের জন্য হলেও ওদের নিয়ে ভাবতে হবে......।)

হামদের দেখার কেউ নাই···! দেখার কেউ থাকলে কেউ দেখে না।


সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ১১:১৮
২৭টি মন্তব্য ২৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×