গতকাল সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় গোপাল ভূইয়া তার বউ আর ছেলে-পুলেদের নিয়ে কিভাবে যে দিনাতিপাত করছেন তা কেই সচক্ষে অবলোকন না করলে বিশ্বাস করতে পারবে না।
বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সাথে চা শ্রমিকরা নিজেদের খাপ খাওয়াতে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছেন। কথা হয় একই চা বাগানের রামপ্রসাদের সাথে। সে জানায়, সকালে লবন লিয়া লাল চা খায়েছি (খেয়েছি) বাবু। একবেলা রাইতে খাইলে দুইবেলা উপোস থাকি। হামদের (আমাদের) অনেক সমস্যা আসে। হামরা (আমরা) মাছ, মাংস খায়েনা কয় বছর যে হইছে কইতে পারিনা। একই বাগানের প্রতীমা রানী তাঁতী বলেন, বাগানে ভাতের জন্য হাহাকার চলছে। ভাত নাই, কাপড় নাই, তরকারী রানবার লবন মরিচ নাই। সকালে চিড়া খাইয়েছি (খেয়েছি) এখন পর্যন্ত পাচঁটা বাইচ্ছা নিয়া আছি। বাগানের কিনার থেকে কচুঁ শাক, কাটা শাঁখ তুইলে (তুলে) আনছি। লবন দিয়া সিদ্ধ কইরা রাইতে খায়েমি (খাব)।
চা শ্রমিকদের প্রচন্ড ক্ষোভ আর দুঃখ কষ্টের দিনাতিপাত কিভাবে কাটছে তাদের কথায় হয়তো কিছুটা ফুটে উঠে। কিন্তু বাস্তবে বড়ই হৃদয় বিদারক। ভাড়াউড়া চা বাগান, পুটিয়াছড়া চা বাগান, কালিঘাট চা বাগান, টিপড়াছড়া চা বাগান, খেজুড়ি ছড়া চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগানে দেখা গেছে একই পরিস্থিতি। যেনো চা বাগান শ্রমিকদের অবস্থা দিনে দিনে কাহিল হয়ে পড়েছে। কাহিল হয়ে পড়েছে তাদের দৈনন্দিন জীবনের গতিধারা। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান বাজারে ১কেজি মোটা চালের যে দাম তার চেয়ে ৫টাকা কম একজন চা শ্রমিকের মজুরী। এই মজুরীর টাকা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তারা ভালভাবে এক বেলা পেটভরে খেতে পারেনা। যেনো তাদের আয়ের সাথে ব্যায়টা বড়ই বেমানান।
নিউজ সংগ্রহের জন্য খুব সকালে উঠে শ্রীমঙ্গলের পুটিয়াছড়া চা বাগানে হাজির হই। গিয়ে দেখা যায় তাদের উঠুন একবারেই পরিষ্কার। ঝেড়েজুঁড়ে হাতের কাজকর্ম সেরে নাস্তা করবে। বাবুল কুর্মী নামের এক চা শ্রমিকের বাড়িতে ডুকে পরি। সে জানায়, হামরা চাল বাইজে (বেজে) কাঁচা চা পাতা দিয়ে লাল পানি জ্বাল দিয়ে খাইবেক (খাব) বাবু। জিজ্ঞাস করি রাতে কি খাবে? বউকে বইলবো (বলবো) নদীর কিনার থাইকে (থেকে) কচু শাক, ফুলি শাখ, কচুর মুড়া নিয়া আইনবার জইন্যে (জন্য)। হামরা (আমরা) শুধু লবন দিয়ে সিদ্ধ করে খাইবেক বাবু। এভাবেই দিনের যাত্রা রাতের শেষ অধ্যায়ের সূচনা করে চা বাগান শ্রমিকরা। আগে দু-এক গ্লাস হারিয়া খেলে দ্বিগুন দামে যুগের রীতির অভ্যাসটুকুও হয়তো ভূলে যাবে তারা।
পুটিয়াছড়া ঘুরে আসতে আসতে দুপুর ঘরিয়ে যায়। এসে পৌছি লাখাইছড়া চা বাগানে। সেখানে এসে সাংবাদিক পরিচয় যেনে ক্ষোভের সঙ্গে এক চা শ্রমিক বলেন, কেনে হামদের (আমাদের) লিয়া (নিয়া) লিখেন। পত্রিকায় ছাপলে হামদের (আমাদের) কি লাভ। হামদের (আমাদের) দেশ স্বাধীন কইরা কি লাভ হইলো। হামরা কি এইদেশের জনগন না··? (হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরটি আমার জানা নেই)
লাখাইছড়া চা বাগান থেকে কালিঘাট চা বাগান। বাগানের সাবেক পঞ্জায়েত সভাপতি বলেন, চা বাগানের শ্রমিকদের বাসস্থান আছে কিন্তু ৩১ টাকার মজুরী দিয়ে ৩৬ টাকার চাল কিনা সম্ভব হয় না।
এক বাগান থেকে আরেক বাগান ঘুরেই একই বানী বার বার ঘুরে আসে। সাধারণ এই চা শ্রমিক বাগানে খেটে খাওয়া হতদরিদ্র চা শ্রমিকদের সবারই একই কথা তাদের মজুরী আরও বাড়ানো।
চা শ্রমিক ইউনিয়ন, চা শ্রমিক সংগ্রাম কমিটি ও স্থানীয় চা শ্রমিক নেতৃবৃন্দ বলেন, শ্রমিকদের মজুরী অত্যন্ত নগণ্য। একজন ভিক্ষুক দিনে যা ভিক্ষা করে চা শ্রকিকের একদিনের মজুরীর চেয়েও বেশি।
( শ্রমিকদের অবর্ণনীয় এই দুঃখগাথাঁ কথাগুলো শুনতে যতটা কষ্ট হয়েছে তার চেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে তাদের নিয়ে লিখতে। হয়তো পাঠকের কাছে কষ্টের আবরণের কিছুটা ষ্পর্শ গায়ে লাগবে। কিন্তু সাময়িক ক্ষনের জন্য হলেও ওদের নিয়ে ভাবতে হবে......।)
হামদের দেখার কেউ নাই···! দেখার কেউ থাকলে কেউ দেখে না।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ১১:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


