দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের পুরস্কৃত করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার।
ব্যাংক পরিচালকের যোগ্যতা-উপযুক্ততা না থাকার পরও কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে সাবেক ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতা ও সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিতদের নেওয়া হয়েছে পরিচালক পদে।
দলীয় বিবেচনা ছাড়াও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক কোম্পানিগুলোতে চেয়ারম্যান ও পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব নিয়োগ নিয়ে ইতিমধ্যে ব্যাংকিং মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
গত দুই দিনে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ২৪ জন পরিচালক। আগামী সপ্তাহে আরও বেশ কয়েকজন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে বলে সুত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
নিয়োগ পাওয়ার মধ্যে রয়েছে মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক, বিগত সংসদ নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী জান্নাত আরা, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বলরাম পোদ্দার, ছাত্রলীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক শাহজাদা মহিউদ্দিন, যুক্তরাজ্য আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা জাকির আহমেদ, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক আবদুস সবুর এবং আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সহসম্পাদক নাগিবুল ইসলাম।
সুত্র জানায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে ইতিমধ্যে যেসব পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের নাম পাঠিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত চাওয়া হয়েছে। এমনকি কয়েকজনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার নামও দেওয়া হয়নি। পিতা-মাতার নাম না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি নামের সিআইবির তথ্য (খেলাপি ঋণসংক্রান্ত তথ্য) দিতে পারেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাঁদের পিতা-মাতার নাম জানতে চেয়েছে।
রেওয়াজ অনুসারে এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা-দক্ষতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত দেওয়ার কথা। সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তাঁদের তালিকা নয়, জীবনবৃত্তান্ত পাঠানোর কথা। এবার জীবনবৃত্তান্ত তো নয়ই, কয়েকজনের কেবল নামই পাঠানো হয়েছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মাথায় ১২ এপ্রিল রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদকে অধিকতর কার্যকর, দক্ষ ও পেশাভিত্তিক করতে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে পেশাজীবী শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করার কথা বলা ছিল। কিন্তু সরকার দুই দিনে যে নিয়োগ দিয়েছে, তা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ীও হয়নি বলে জানা গেছে। প্রজ্ঞাপনমতে, অর্থনীতিবিদ, চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট, আর্থিক বাজার, মুদ্রানীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি, সাবেক ব্যাংকার, আইনজ্ঞ, বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং কমপক্ষে একজন নারী-পেশাজীবী নিয়োগের কথা বলা হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনটি করা হয়েছিল, যাতে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য না পায় সে জন্য। তাঁর মতে, দক্ষতা-যোগ্যতা না থাকলে ব্যাংকের উপকারও হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, কেবল দলীয় বিবেচনায় যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের বাইরে অনেক যোগ্য অথচ দলীয় মানসিকতার লোক ছিল। সরকার এ ধরনের যোগ্য ব্যক্তিদের কথা ভাবতে পারত।
ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরাও এই নিয়োগের সমালোচনা করেছেন। নাম প্রকাশ না করে একাধিক ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী বলেন, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন তাঁদের বেশির ভাগেরই ব্যাংকিং, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই, যোগ্যতাও নেই। ফলে দক্ষভাবে ব্যাংক পরিচালনা করা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। এর প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতেও। নতুন পর্ষদ গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল বলেও অনেকে মনে করছেন।
সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংককে কোম্পানি করা হয় প্রায় দুই বছর আগে। আর বেসিক ব্যাংক শুরু থেকেই কোম্পানি হিসাব কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। কিন্তু সরকার ১৯৭২ সালের ব্যাংক জাতীয়করণ আদেশ (রাষ্ট্রপতির আদেশ-২৬) আদলে প্রজ্ঞাপন জারি করেই পরিচালক ও চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে।
কোম্পানি আইনানুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয় বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম)। বিধান অনুসারে, এরও একটা প্রস্তুতি রয়েছে। এজিএম পর্ষদ গঠন করার পর পর্ষদের সভায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকের কোনো এজিএমের প্রক্রিয়া ছিল না, উপরন্তু সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়েই সরাসরি চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে। ব্যাংকগুলোর সঙ্ঘবিধির সঙ্গে যা সংগতিপূর্ণ নয়।
এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, ১০০ ভাগ শেয়ার সরকারের হাতে থাকায় এজিএম করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। একই ধরনের মত দিয়ে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, কোম্পানি গঠন করা হয় ভবিষ্যতে শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়টি মাথায় রেখে। সরকারের বাইরে শেয়ার গেলে তখন এজিএম করার বাধ্যবাধকতার মধ্যে আসতে হবে।
তবে আইনের বিধান হচ্ছে, প্রতিবছর এক-তৃতীয়াংশ পরিচালক অবসর নেবেন। তাঁদের পরিবর্তে নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে। আর কেউ মারা গেলে বা স্বেচ্ছায় অবসর নিলে সৃষ্ট এই পদে সাময়িকভাবে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
বেসিক ব্যাংক: বাংলাদেশ স্নল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের (বেসিক ব্যাংক) পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয় গতকাল। অর্থ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন জারি করে ১১ সদস্যের পর্ষদের মধ্যে নিয়োগ দিয়েছে আটজনকে।
বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক সাংসদ শেখ আবদুল হাই। (শেখ বলে কথা
সোনালী ব্যাংক: সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান হয়েছেন সোনালী ব্যাংকেরই সাবেক কর্মকর্তা কাজী বাহারুল ইসলাম। নতুন নিয়োগ পাওয়া সোনালী ব্যাংকের সাত পরিচালক হলেন মাদারীপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও জনতা ব্যাংকের সাবেক পরিচালক লুৎফর রহমান খান, কক্সবাজারের ব্যবসায়ী সাইমুম সরওয়ার, দৈনিক সংবাদ-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কমিটির সদস্য কাশেম হুমায়ুন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সত্যেন্দ্র চন্দ্র ভক্ত, সবুজ কানন উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক জান্নাত আরা এবং বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সহসভাপতি কে এম জামান।
এর মধ্যে জান্নাত আরা নবম সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন।
জনতা ব্যাংক: জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত। ( ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় প্লাস ব্যাংক চেয়ারম্যান! এই পুরা বদ...
অগ্রণী ব্যাংক: অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক খন্দকার বজলুল হক। অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালকেরা হলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি, ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক শাহজাদা মহিউদ্দিন, যুক্তরাজ্য আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা জাকির আহমেদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক আবদুস সবুর, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক, আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সহসম্পাদক নাগিবুল ইসলাম এবং সাবেক কমিউনিস্ট নেতা, মণি সিংহ-ফরহাদ স্নৃতি ট্রাস্টের সম্পাদক শেখর দত্ত।
এর মধ্যে জাকির আহমেদ ব্রাਜ਼ণবাড়িয়া-৫ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন
চেয়েছিলেন বলে তিনি নিজেই প্রথম আলোকে জানান।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



