৪টি হরতাল হয়ে গেল মহাজোট সরকারের আমলে। আজ হচ্ছে ১৫তমটি। আর ঠিক এর সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশও ছুঁয়ে ফেলেছে হরতালের একটি মাইলফলক। আজকের হরতালটি হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক হাজার ২০০তম হরতাল।
গত বছর নভেম্বরে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি হরতাল ডাকার পরপরই ব্যবসায়ী মহল আইন করে ‘হরতাল’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু একে ‘গণতান্ত্রিক অধিকার আখ্যা’ দিয়ে এ অধিকার হরণ করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন সরকারের এক মন্ত্রী।
হরতালের কারণে এখন বিরোধীদলের যতই সমালোচনা করেন না কেন আগামীতে আবার বিরোধীদলে গেলে তাকেও একই কাজ করতে হবে। এ চিন্তায়ই হয়তো হরতাল বন্ধে কোনো আইন প্রণয়নের পক্ষে নয় বর্তমান সরকার। ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও হরতাল না দেয়ার ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি সে কথা রাখেননি।
এবার তার শাসনামলেই সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের ডাকেও একটি হরতাল হয়েছে। আর বর্তমান সরকারের আমলে হরতালগুলোর বেশিরভাই হয়েছে জেলা পর্যায়ে।
সারাদেশে শেষ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল হয় গত ৪ এপ্রিল। নারী উন্নয়ন নীতিমালা বাতিল ও জাতীয় শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে এ হরতাল করে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ডাকা। এই হরতালে মুফতি রাজনীতির লাইম লাইটে চলে আসেন।
২০০৯ সালের ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর রোববারের হবে বিএনপির ডাকা চতুর্থ ও জামায়াতে ইসলামীর প্রথম দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি।
এর আগে গত ৩০ নভেম্বর বিএনপির ডাকা সারাদেশের সকাল-সন্ধ্যা হরতালটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের এক হাজার ১৯৩তম ও এ সরকারের আমলে সপ্তম। দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ি ছাড়াকে কেন্দ্র করে বিএনপির ওই হরতাল হয়। গত ১৪ নভেম্বর একই কারণে হরতাল করে দলটি।
২০১০ সালের ২৭ জুন প্রথম সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিলেন বিরোধীদল নেত্রী খালেদা জিয়া। ১৯ মে পল্টন ময়দানে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় মহাসমাবেশ থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট; দখল, টেন্ডারবাজি, ছাত্রী লাঞ্ছনা, চাকরিচ্যুতি বন্ধ; ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি বাতিল, নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিচার বিভাগকে দলীয়করণ এবং গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে ওই হরতাল ডাকা হয়।
এছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক বিচ্ছিন্ন কিছু হরতাল হয়। এর মধ্যে চলতি বছরে পাঁচটি ও ২০১০ সালে হয় তিনটি।
গাইবান্ধায় সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দাবিতে গত ১৮ মে উপজেলা সদরে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার জের ধরে এমপি প্রকৌশলী ফজলুল আজিমের বাসভবনে ও পৌর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাটের প্রতিবাদে ও দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে ১৭ মে হরতাল করে ছাত্রলীগ। কুড়িগ্রামে ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে যুবদল নেতা বিপুল হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে জেলা বিএনপির ডাকা তিন দিনের বিভিন্ন কর্মসূচিরর অংশ হিসেবে ১৫ মে অর্ধদিবস হরতাল পালন করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের উপনির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ ও পুরঃনির্বাচনের দাবিতে ৩০ জানুয়ারি জেলায় হরতাল করে বিএনপি। এছাড়া মাশরাফি বিন মুর্তজাকে বিশ্বকাপ ক্রিকেট দলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে ২০ জানুয়ারি সকাল-সন্ধ্যা হরতাল হয় নড়াইলে।
ছাত্রদলের নেতা হত্যার প্রতিবাদে লালমনিরহাটে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর অর্ধদিবস হরতাল পালন করে বিএনপি। একই দল উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলীয় নেতা সানাউল্লাহ নূর বাবু হত্যার প্রতিবাদে ১০ অক্টোবর দিনব্যাপী হরতাল পালন করে। নেতা হত্যা ও কর্মসূচিতে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে বিএনপি বগুড়ায় অর্ধদিবস হরতাল পালন করে ৯ মে।
তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ-খনিজসম্পদ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে ঢাকা মহানগরীতে অর্ধদিবস হরতাল হয় ২০০৯-এর ১৪ সেপ্টেম্বর।
এর আগে ২০০৬ সালের ২১ ডিসেম্বর বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান না করতে আওয়ামী লীগ সর্বশেষ হরতাল পালন করেছিল। ১৮ ডিসেম্বর এ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এটি ছিল কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ডাকা একমাত্র হরতাল কর্মসূচি। এরপর ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর থেকে গত ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে পূর্ণদিবস ও অর্ধদিবস মিলিয়ে মোট হরতাল হয়েছে এক হাজার ১৯২টি। এর মধ্যে অর্ধদিবস হরতালের সংখ্যাই বেশি।
‘সংবাদপত্রে হরতালচিত্র ১৯৪৭-২০০০’ শীর্ষক গবেষণাগ্রন্থে সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত উল্লেখ করেছেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত (শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার) পাঁচ দিন পূর্ণদিবস আর ১২ দিন অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৮২ সালের ২৩ মার্চ পর্যন্ত (খন্দকার মুশতাক, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, জিয়াউর রহমান ও বিচারপতি আবদুস সাত্তারের আমল) ১০ দিন পূর্ণদিবস ও ৪৩ দিন অর্ধদিবস হরতাল ছিল। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত (হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমল) ১০৪ দিন পূর্ণদিবস আর ১৯৪ দিন ছিল অর্ধদিবস। ১৯৯০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত (বিএনপি’র আমল) পূর্ণদিবস ১৫৫ দিন, অর্ধদিবস ২২৩ দিন, ১৯৯৬ সালের ৩১ মার্চ থেকে ২০০০ সালের ১২ জুন পর্যন্ত (আওয়ামী লীগের আমল) পূর্ণদিবস ১৫৯ দিন, অর্ধদিবস হরতাল ছিল ১০৭ দিন এবং ২০০১-এর ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত (বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট আমল) মোট ১৭৩ দিন হরতাল হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



