প্রাকৃতিক বিপর্যয় সত্ত্বেও চা উৎপাদনে নতুন রেকর্ড
ইসমাইল মাহমুদ
দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল চায়ের উপর ৩ বছরের মাথায় আবারও প্রাকৃতিক বিপর্যয় মাঝে চলতি চা মৌসুমে চায়ের বাম্পার ফলন হয়েছে। অনাবৃষ্টি, খরাসহ বড় রকমের প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা করেও এবার দেশে চায়ের উৎপাদন অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। উৎপাদন শুরুর সময়ে খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে চা বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এ বছর চা উৎপাদন ৫০ মিলিয়ন কেজির নিচে হবে। কিন্তু তাদের এ ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে ২০০৯ সালে উৎপাদন দাঁড়ায় প্রায় ৬২ মিলিয়ন কেজি। এর আগে চায়ের সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছিল ২০০৫ সালে ৬০.১০ মিলিয়ন কেজি।
২০০৯-এর শুরুতে বিলম্বে বৃষ্টিপাতের কারণে চা উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ২০০৮-এর তুলনায় চা উৎপাদন মার্চ পর্যন্ত প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পিছিয়ে ছিল। পরবর্তী পর্যায়ে মে মাস থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হলে এবং নিয়মিত বিরতিতে চাহিদা অনুযায়ী বৃষ্টিপাত হওয়ায় এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠে চা উৎপাদনের ঘাটতি কমতে থাকে। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ মিলিয়ন কেজি বেশি উৎপাদন হয়। যা চা উৎপাদনে অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। গত বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আগের বছরের তুলনায় ‘মনু ধলই ভ্যালির’ বাগানগুলো উৎপাদনের দিক থেকে ৯.১১ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে। একই সময়ে ‘বালিশিরা ভ্যালি’ ০.৮১ শতাংশ এগিয়ে আছে। বালিশিরা ভ্যালির ২৭টির মধ্যে ১৬টি বাগান গত বছরের উৎপাদনের পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে। জুরি ভ্যালিতে এই সময়ে ২৮টি বাগানের মধ্যে ১৬টি বাগান এগিয়ে। চট্টগ্রাম ভ্যালির ২২টি বাগানের মধ্যে একটি বাগান উৎপাদন থেকে পিছিয়ে ছিল। বাকি ২১টি বাগানের অধিকাংশই এগিয়ে। লংলা ভ্যালির ২৮টির মধ্যে ২০টি বাগান এগিয়ে এবং গত বছরের তুলনায় ৪.২১ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে। লস্করপুরে ১৮টির মধ্যে ৮টি বাগান উৎপাদনে পিছিয়ে। বাকি ১০টি বাগানই ভালো উৎপাদন করেছে।
তবে এ বছর বড় রকমের উৎপাদন ধস হয়েছে সিলেট ভ্যালিতে। এখানকার ১৬টি বাগানের মধ্যে ১৫টি বাগানেই উৎপাদনে ধস নেমেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ভ্যালির ২২টির মধ্যে ১টি বাগান ছাড়া ২১টিতে ভালো উৎপাদন হওয়ায় এটি অনান্য ভ্যালির তুলনায় এগিয়ে রয়েছে (গড় হিসাব এখনও হয়নি)।
এ বছর পঞ্চগড়ের উৎপাদনও খুবই আশাব্যাঞ্জক। পঞ্চগড়ে গত বছর উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৪ মিলিয়ন কেজি। গত বছর নভেম্বর পর্যন্ত এর উৎপাদন দেড় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রত্যেক ভ্যালি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-এর নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে চায়ের মোট উৎপাদন ছিল ৫৮.৬৫ মিলিয়ন কেজি আর ২০০৯-এর এ সময়ে হয়েছে প্রায় ৬০ মিলিয়ন কেজি। তাছাড়া এ মৌসুমে অক্টোবরের শেষ সাপ্তাহে আশাব্যাঞ্জক বৃষ্টিপাত হওয়ায় ডিসেম্বর পর্যন্ত উৎপাদন আরো ২ থেকে ৩ মিলিয়ন কেজি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, কয়েকটি বাগানের হিসাব ছাড়া এ পর্যন্ত উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৬১.৫০ মিলিয়ন কেজি।
অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্রোকারস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী এ বছর মোট উৎপাদন হয়েছে ৫৯.২ মিলিয়ন কেজি এবং গত বছর এদের হিসাব অনুযায়ী ছিল ৫৮.৭ মিলিয়ন কেজি। ন্যাশনাল ব্রোকারস ও ভ্যালিওয়ারি হিসাবে প্রতি বছরই কিছু ব্যবধান হয়। কারণ ছোট ছোট কিছু বাগান সঠিকভাবে ব্রোকারসে অংশ নেয় না।
খরা মোকাবেলায় চা বোর্ডের ভূমিকা
চা বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান যোগদানের শুরুতেই দেখা দেয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ফলে নতুন চেয়ারম্যানকে গত বছরের চা উৎপাদনকে নিতে হয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে। পাশাপাশি চেয়ারম্যানের খবরদারির কারণে বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র ও চা বোর্ডের প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিট তাদের তৎপরতা অনেক বাড়ায়। পুরো মৌসুম জুড়েই কড়া সর্তকাবস্থায় উৎপাদন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, আমি চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের কিছু দিন পরেই এ শিল্প বড় রকমের একটি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। প্রায় ৬ মাস কোনো উৎপাদন হয়নি। খরায় ও অনাবৃষ্টিতে ঝলসে যায় অনেক গাছ। ফলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবে ধীরে ধীরে তিনি এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন।
তিনি জানান, এ ব্যাপারে বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে সার ব্যাবহারের নিয়ম পরিবর্তন করেছেন। পাতা উত্তোলনের নিয়মও এবার সঠিকভাবে মানা হয়েছে। চা বিজ্ঞানী ও বাগান ব্যবস্থাপকদের নিয়ে একাধিক বৈঠক ও সেমিনারও করেছেন।
খরা মোকাবেলায় বাগানের ভূমিকা
খরা মোকাবেলায় প্রত্যেক বাগানই তাদের নিজস্ব উৎস থেকে পানি দিয়ে গাছগুলো বাঁচিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে চা বাগানগুলো প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের সুপারিশে আশাব্যঞ্জক সাড়া দেয়। অনেক বাগান এ বছর সম্প্রসারণ, ইনফিলিং, পুনঃরূপণ ও পুনঃজীবন কাজগুলো সঠিকভাবে করেছে। যা আগামীতেও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
০১৭১৫১৭১৯৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



