আমার স্কুল টিচারদের নিয়ে বলার আগে আমার স্কুল সম্পর্কে কিছু বলে নেয়া ভালো ...
এস ও এস হারম্যান মেইনার স্কুল , বগুড়া ( এর মইদ্যে আবার মেইনার বানান শুরু হয় G দিয়ে ) এ আমার ভর্তি হওয়ার পেছনে একটিমাত্র কারণই বিদ্যমান ছিলো ..... আমার মহান জ্ঞানতাপস ভ্রাতা বলেছিলেন ," যেহেতু নতুন স্কুল ... টিচার শর্ট থাকবে ... পড়াশোনা কি আর ঠিকমতো হবে ?"
জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্নটি গ্রহীত না হোক , আমার শিশুহৃদয়ে তা বিয়াফক আনন্দ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিলো ..... আর এই একটিমাত্র কারণেই একসময় আমাকে দেখা গেল বাবার হাত ধরে স্কুলের গেট অতিক্রম করতে ... । এবং ভর্তি হবার পর আমি আমার জীবনে প্রথম 'ধরা" খাইলাম । '
ইতিপূর্বে আমি আমার পিতার অকস্মাৎ পোস্টিংজনিত কারণে " ঝোপগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়" এ দুই বছর অধ্যয়ন করেছি যেখানে গ্রামের কোমলমতি শিশুগণ অংক পরীক্ষার আগের রাতে স্কুলের জানালা ভেঙে হাগু করে রেখে যেত ... যাতে পরদিন পরিক্ষা না হয় ... ক্লাসের মাঝে মফু স্যারের বিড়ি কিনতে গিয়ে একচক্কর ঘুরে আসা যেত । স্কুলে না গেলে কেউ কিছু মনে করত না , আমরা তাও পকেটে মার্বেল নিয়ে স্কুলে যেতাম এবং নার্গিস ম্যাডাম এ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মুরগির মতো ক্লাসে ঢোকামাত্র ঘুমিয়ে পড়তেন ।
সুতরাং , ঐ বিদ্যাগৃহফেরত বিদ্বানের নিকট সস ( এস ও এস ) ছিলো একটি খাঁচাস্বরূপ ... যে সে খাঁচা নয় , সেখানে তিন সিজনের তিন প্রকার পোশাক আছে , হাজারখানেক রুল ( নিয়ম ও ডান্ডা উভয় অর্থে ) আছে , কিছুদিন পর পর ফাংশানের নামে জোর করে ভাঁড়ামি করানোর অপচেষ্টা আছে .... চার প্রকার খাতা , তিন প্রকার পরিক্ষা এবং কোন প্রকারেই প্রকারায়িত করা যায় না এমন কিছু শিক্ষক আছে । তাদের নিয়েই আমার আজ লিখব ......
তামিল মুভির নাম বললেই যেমন একটি নাম মাথায় আসে ... রজনীকান্ত .... তেমনি আমার স্কুল টিচারদের কথা বলতে গেলেই সবার প্রথমে নাম মনে আসে আব্দুর রহমান স্যারের । আমি যতদূর জানি , রহমান আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম এবং যার অর্থ দয়ালু ..... আমি বুঝতে পেরেছিলাম তাহার জন্মের পর স্যারের মাতা-পিতা তাদের সন্তানের কোন নমুনা দেখে টের পেয়েছিলেন এর মাঝে দয়ামায়া পদার্থটা বড়ই কম আছে , তাই প্রভুর নিকট হতে যদি নামের উসিলায় কিছু পাওয়া যায় , এই ভেবে এহেন নামকরণ ...
স্যার আমাদের ম্যাথ পড়াতেন । অংক ও আতংক আমার কাছে আজ অবধি সমার্থক শব্দ ... আমি একসময় সভয়ে আবিষ্কার করলাম ... রহমান স্যারের নেকনজরে আমি পড়ে গেছি ... রাস্তায় বের হলেই তার সাথে আমার দেখা হত ... ( কেমনে কেমনে জানি ) .... সিগ্রেটে আগুন লাগানোমাত্র তার সেমি-টাকের অংশবিশেষ দেখা যেত .... আমার মাছুম জীবন তিনি অঙ্গার করিয়া দিলেন ....
"শরীফ সাহেব , সারাদিন তো ফিল্ডিং মারেন ... "
ঈশ্বর জানেন , আমি কোনকালেই ভালো ফিল্ডার ছিলাম না । তার কল্যাণে ক্লাসব্যাপী আমি কিংবদন্তীর জন্টি রোডসের চেয়েও বেশি খ্যাতি লাভ করলাম । খ্যাতি ভীতির পর্যায়ে পৌছালো যথন আমি প্রি টেস্টে অংকে ১০০ তে ১৬ পেলাম ।
ইয়া...... ঠাস্ ...... ঠাস্ ......... ঠাস্ ..........
এতোদিন তো ওয়ানডে ছিলো , এখন টেস্ট ম্যাচে আমাকে তুলোধূনো করে , আমার সুকোমল পশ্চাদ্দেশ ক্যারাব্যারা করে আমাকে দি স্ম্যাক ডাউন স্টাইলে আছাড় দেবার উপক্রম করলেন স্যার ....
কিছু একটা তো না করলেই না ......
উল্লেখ্য যে , বগুড়ায় টাকমাথা লোকদিগকে আদর করিয়া 'চাইন্দা' বলে ডাকা হয় .....
ক্যারোলাস লিনিয়াস তো বোগাস , আমি হয়ে গেলাম নামকরণের জনক ( ঘোষকও ) .... বাজারে তখন RC Cola চলছে তুমুল ... যেদিকে যাই , ডায়ালগ শুনি ...নির্বাচনের গরমে RC খান আরামে .... আমিও চামে চামে RC র ইলাবোরেশন করে দিলাম ....
রহমান চাইন্দা ............
পরবর্তিকালে উক্ত নাম নামকরণের জনকেরও অধিক জনপ্রিয়তা লাভে সক্ষম হয় ... এরও কিছুদিন পরে রহমান স্যার বিবাহ করেন এবং একটি লাল মোটরসাইকেল করায়ত্ব করতে সক্ষম হন ...সেই দ্বিচক্রযানে কোন সুচতুর মর্কট ঘ্যাচ টানে এক দাগ দেবার পর পুনরায় রজনীকান্ত লুক ..... তাহার বিচার এবং শত আশীর্বাদ প্রাপ্ত ভাবীর কল্যাণে এরপর থেকেই তার রকিং চান্দিতে একটি কুলিং ফ্যান বসে যাহা অদ্যাবধি চলিতেছে ।
আমাদের বাংলা পড়াতেন এনামুল হক স্যার .... স্যার ছিলেন সিটি করপোরেশনের ট্রাকের মত । ট্রাকগুলো যেমন জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সব ময়লা নিয়ে একটি বা দুটি জায়গায় ফেলত , স্যারও তেমনি দুনিয়ার তামাম গল্প , প্রবন্ধ , পদ্য বা গদ্য এনে তার প্রিয় তিনটি গর্তে ফেলতেন ।
রবিঠাকুরের পোস্টমাস্টার , ছুটি আর কামিনী রায়ের কবিতা 'সুখ' ...
জীবনে তিনি পড়েছেন আমি জানি না , কিন্তু এই তিন আইটেমের প্রতি তার আসক্তি ছিলো বিয়াফক ... যেখানের যত আলোচনা হোক .... যে প্রেম , যে বিরহ বা বিষাদ হোক ,,, পতিত হত ম্যানহোলে ...
"এই আবেগটা অনেকটা ছুটি গল্পের ফটিকের মত ফুটে উঠেছে " ...
মাঝে মাঝে আবার তিনি "সুখ" কবিতা আবৃত্তির চেষ্টা করতেন ......
"নাই কিরে সুখ , নাই কিরে সুখ ... এ ধরা কি শুধু বিষাদময় ???????? "
এপর্যন্ত বলে তিনি আমাদের দিকে এমন একখান প্রশ্ন ছেড়ে দিতেন যে আমরা কনফিউজ হয়ে যেতাম ... আসলেই কি এই ধরা শুধু বিষাদময় ?
যণ্ত্রণা এখানে শেষ হলে ভালো ছিলো ... মাঝে মাঝে তিনি আবার জুলফি ধরে টান মারতেন .... অতি ভয়ানক চিকিৎসা ( আমি নিশ্চিত এখনি অনেকের জুলফি ব্যাথা করছে ) .... লাইফ ফানা ফানা হয়ে গেল আমাদের।
একটা সন্ধি বোঝাতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেললেন একদিন স্যার ..
কচু + আদা + আলু = কচ্চাদালু না কচ্চালাদা ???
যে ঘোড়ার আন্ডাই হোক , পরদিন শ্রীমাণ আতিক নামকরণ করল স্যারের " কচ্চাদালু ".. আলু আলু চিল্লায়া আমরা আলুর দামই দিলাম বাড়ায়া ।
হায় এনামুল স্যার , কত আদায় কত আলু ?
আমাদের আরেক ম্যাথ স্যার ছিলেন , গোলাম মর্তুজা স্যার । নিপাট ভদ্রলোক , ঘোর কৃষ্ণবর্ণ , ইনি আফ্রিদির মতো ঝড়ো ব্যাটসম্যান না হলেও লারার মত যেদিন ব্যাট হাতে নিতেন , ট্রিপল সেঞ্চুরি না করে ফিরতেন না । সকল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার ওপর দায়িত্ব ছিলো রবিঠাকুরের কোন নাটিকা রিমিক্স করে দর্শকদের কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর চেষ্টা করা , দুভার্গ্যবশত কয়েকবার একাজে আমাকে তার সহকারী হিসেবে তিনি পেয়ে ছিলেন । তার বর্ণের কারণে তার ওপেনিং ম্যাচেই নামকরণ হয় "কল্লুমামা" ও পরবর্তীকালে প্রখর যুক্তিবিদ্যা দ্বারা তিনি "যুক্তিবিদ" টাইটেলটি করায়ত্ব করতে সক্ষম হন ।
এবার বলা যাক শ্রীমতি টি কে ওরফে টিকটিকি ওরফে তানজিদা খানমের কথা ....
উক্ত মহিলা আমাদের জুলজি ক্লাস নিতেন , জুলজির মত এত ইন্টারেস্টিং একটা বিষয় কতটা বিরক্তিকরভাবে পড়ানো যায় ... তিনি প্রতি ক্লাসে নিজেকেই কমপিট করতেন । ম্যাডামের কন্ঠ ও গড়ন উভয় ছিলো ঢাকার মিশুকের মত , পুরা ২ স্ট্রোক হাইড্রোলিক .... যে ব্যক্তি একবার শ্রবণ করেছে , তার পক্ষে ইহজীবনে ভোলা অসম্ভব । কানে এখনও বাজে ...
" ... কাল তোমরা ১৫৪ পৃষ্ঠা থেকে ১৬০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত মুখস্ত পড়ে আসবা ... "
আমাদের বোটানি নিতেন ফৌজিয়া ম্যাডাম ... গোলগাল মহিলা , মুখভরা হাসি সারাক্ষণ লেগে থাকত ... বুঝতেই পারছেন ম্যাডাম আমাদের ফেভারিট ছিলো , তবে সেটা ক্লাসের সময় আমাদের ডিসটার্ব না করার কারণে । ম্যাডাম তার মত পড়াতেন , আমরা আমাদের মত ঘুমাতাম ।
এমনি ছিলেন আগা হোসনে আরা ম্যাডাম , বাংলা পড়াতেন । কি পড়াতেন কোনদিন শুনি নাই , মাঝে মাঝে শুনতাম আবছা ঘুমের ঘোরে কে যেন টেবিল চাপড়ে কিছু বলার চেষ্টা্ করছে ...... পাত্তা দিতাম না ।
কেমিষ্ট্রি নিতেন আমিনুল ইসলাম স্যার ... ছোটখাট মানুষ , স্যারের একটা রিমার্কেবল দিক ছিলো ... রেগে গেলে স্যারের তোতলামি শুরু হয়ে যেত কোন এক পরিক্ষায় ডাব্বা মারার পর ......তু...তু...তু....তুই একটা হনুমান .......বলে আমার কান ধরার জন্য স্যারের ব্যর্থ প্রয়াস ছিলো ক্লাসের বিশুদ্ধ বিনোদনের খোরাক ।
লেখায় মনে হয় রোমান্টিসিজম কম পড়েছে , সাপ্লাই দিচ্ছি ....
আমাদের ইংরেজি পড়াতে ফাহমিদা রোজানা ম্যাডাম যখন প্রথমবারে ক্লাসে আসেন আমি অনুভব করছিলাম আমার চারপাশে ভায়োলিন না , পুরো সানাই বাজছে .... আমার ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছিলো ... মনে হচ্ছিল আমি আর ম্যাডাম ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই ...........
কি? সিম্পটমগুলো পরিচিত লাগছে ????
হায় প্রেম , মাঝে মাঝে এখনো আফসোস হয়, যদি আমেরিকায় জন্মতাম !!
ম্যাডামের সাথে দেখা হয়েছিল অনেক পরে , তখন ইন্টারমিডিয়েট শেষ .... একটুও বদলাননি ... সেই চোখ , সেই হাসি ................................[ দীর্ঘশ্বাস]...
আমাদের পদার্থ নিতেন অমরেশ চন্দ্র মুখার্জি , আমরা বানরজি বলেই চালাতাম । স্যারের প্রিয় কাজ ছিলো , জাদুঘর যুগের কতিপয় কম্পিউটারে রবিঠাকুরের গান তন্ময় হয়ে শোনা ..... আমার কাজ ছিল , চুপিসারে সেগুলোতে ভাইরাস সাপ্লাই দেয়া ।
প্রিন্সিপাল স্যারের নাম দেয়া হয়েছিলো 'ভুলোন্ডার' ..... ক্যালেন্ডার জানি , সিলিন্ডার জানি ..... ভুলোন্ডার শব্দের মানে এখনো জানা হয়ে উঠলো না ....
দেখি কখনো স্যারের সাথে দেখা হলে জিজ্ঞেস করতে হবে ।
সমাজ নিতেন তাহমিনা ম্যাডাম .... দ্য গ্রেট বম্বিক্স বুড়ি ..... সেই ক্লাসেই ঘটেছিলো মজার এক ঘটনা ... পামেলা একটি খাল খ্যাত সে গল্প বলেছি আমার এক ব্লগে ...
মনে আছে জিয়াউল হক ওরফে রন্জু স্যারের কথা .... স্যার এসএসসিতে জয় ডিকশনারি মুখস্ত করেছিলেন , আর এইচএসসিতে পড়ার সময় অক্সফোর্ড ... মাথায় এত হাই প্রোফাইল পোডাক্ট চালান করতে করতে মাথা থেকে দুই তিনটা স্ত্রু খুলে পড়ে গিয়েছিল .... তাই মাঝে মাঝে আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাতেন আর বলতেন ... " তুমি সুষমো .. না সুষম ".....
পাঠক ভাবতে পারেন একসব নমুনাবাজির মধ্যে পড়াশোনা হত কখন , জ্বি ঠিকই ধরেছেন , আমার স্কুল জীবনে আমি পড়াশোনা মোটেও করি নাই ।
যদিও আমার শিক্ষকেরা আমার মত কিছু স্বঘোষিত মর্কট কে পড়ানোর চেষ্টা আজও চালিয়ে যাচ্ছেন , তবুও মনে হয় না তেমন বিশেষ পরিবর্তন এসেছে ...
আপনাদের কি মনে হয় ?
[ আমার সকল শিক্ষকের প্রতি ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক ]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


