১.
মেঘের মত কুয়াশা দেখছিলো যুথি ।
তার ঠোঁটগুলো ছিলো বেতফলের মত সজল , ফেটে গিয়েছিলো পরিচর্যার অভাবে , কালো রক্ত জমে ছিলো ঠোঁটের কোণায় ... প্রচন্ড শীত , কিন্তু শীতে নয় ; যুথি কাঁপছিলো জ্বরে , প্রচন্ড জ্বরে ।
মাহবুব বস্তা থেকে আর একটা পুরোন সংবাদপত্র মেলে ধরে , একটু আগুনের আশায় জ্বলজ্বল করে ওঠে যুথির কালো চোখজোড়া ।
কায়দা করে ম্যাচ ধরায় মাহবুব , পার্কে এক লোককে এভাবে ধরাতে দেখেছিলো সে , অনেক অনুশীলনে রপ্ত হয়েছে কায়দাটা ; হাত পেয়ালার মত গোল বানিয়ে একসময় সে ধরিয়ে ফেলে দেয়াশলাইয়ের কাঠিটা ।
ছোট্ট হাতজোড়া আগুনের দিকে বাড়িয়ে দেয় যুথি , আঙ্গুলগুলো এখন্ও অল্প অল্প কাঁপছে তার । জ্বরটা ভীষন বেড়েছে ।
বোনের কপালে হাত দিয়ে জ্বর মাপে মাহবুব । ভ্রু কুঁচকে যায় তার । আড়চোখে বস্তার দিকে তাকায় সে ,
" কিসু খাবি ? "
এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ে যুথি , মুখ তেতো হয়ে আছে ; ক্ষুধা আছে , কিন্তু খেতে ইচ্ছে করছে না ।
আর একটা দমকা বাতাসে লাল চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যায় যুথির । কেঁপে ওঠে ছোট্ট শরীরটা । একমাত্র চাদরটা আরো কাছে টেনে নেয় যুথি , মাহবুব প্রথমে অভ্যাসবসে আপত্তি জানায় , পরে নিজেই বোনের মাথা ঢেকে দেয় চাদর দিয়ে ।
" ভাই , আইজ কি ঈদ ? "
চারপাশের আলোকোজ্জ্বল দালানগুলোর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে মাহবুব , ' দূর বেডি , একমাস আগেই তো কুরবানির গোস্ত খাইলি , ভুল্যা গেছস ? "
" তালে , আইজ কি ? এত আলো ক্যান ? "
" আইজ বচ্ছরের শ্যাষ দিন । হের লাইগা হগ্গলে বাত্তি দিয়া বাড়ি সাজাইসে । " সবজান্তার মত হাসে মাহবুব ।
মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে লাল-নীল আলোকমালা দেখে যুথি । তার ইচ্ছে হয় , অনেক দিন পরে । যখন তাদের অনেক টাকা হবে , অনেক টাকা , যখন তাদের একটা বড় সাদা বাড়ি থাকবে , লাল রংয়ের একটা গাড়ি থাকবে আর পকেটে অনেকগুলো একশো টাকার নোট থাকবে ... সেই সময়ে সেও তার বাড়ি এভাবে আলো দিয়ে সাজাবে ; সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকবে ।
প্রায় মাঝরাত হয়ে এসেছে , হঠাৎ কোথাও হুল্লোড়ের শব্দ শোনা যায় ... কালো আকাশের বুক চিরে আঁকাবাঁকা আলোর একটা রেখা উঠে যায় ... মাঝ আকাশে দু'জনের বিস্মিত চোখের সামনে সহস্র নক্ষত্র হয়ে বিস্ফোরিত হয় , আর একটা , আর একটা , লাল , সাদা , সবুজ ...... আকাশ জ্বলতে থাকে দুজনের চোখের তারায় ।
মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে যুথি , মুখে কথা আসে না তার , ঠোঁট শুকিয়ে গেছে । একসময় ফিসফিস করে ভাইকে বলে ,
" ভাই , আমারে এমুন পটকা কিন্যা দিবা ? "
মাথা নাড়ে মাহবুব । তখনো তার চোখ আলোকিত আকাশের দিকে ।
একসময় আতশবাজি থেমে যায় , সবগুলো আলো কেড়ে নেয় কেউ আকাশ থেকে । চাদরের প্রান্ত মুখে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে যুথি , একদৃষ্টিতে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মাহবুব , জ্বর মাপে ... ছোট্ট মুখে চিন্তার রেখা খেলা করে তার ।
২.
মাসুদ খুব টেনেছে আজ রাতে ।
মদ সে কখনোই খায় না , কিন্তু আজ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে খেতেই হল । প্রথমে বিস্বাদ লেগেছিলো , এরপর একসময় মাথাটা হালকা হয়ে যায় .... রাত দুটোর সময় যখন বেসিনে বমি করতে থাকে , ততক্ষণে সে বদ্ধ মাতাল ।
আসিফের কন্ঠ কানে বাজছে এখনও " মদ খা , অসুবিধা নেই । যতক্ষণ পর্যন্ত না মদ তোকে খাচ্ছে "
কিন্তু আজ রাতে মদ তাকে খেয়েছে , ভালোমতোই খেয়েছে । মাথাটা এখনও ঘুরতে জুন মাসের মৌচাকের মত , অবশ লাগছে হাতগুলো ।
আজ অনেক বছর পরে তারা পাঁচ বন্ধু একসাথে হলো , তিনজনই বাইরে ছিলো এতোদিন । দেশে ফিরে একসাথে থার্টি ফাস্ট , এরচেয়ে ভালো হতে পারতোনা কিছুই ।
ইমন বলছিলো দূরে কোথাও থার্র্টিফাস্টট্ সেলিব্রেট করতে , এক পুরোন ঢাকা আর ভালোলাগে না । তখনই আইডিয়া ইমরুল দিলো , ওর চেনা একটা রেস্টহাইস আছে সাভারে .... সেখানেই ওরা এখন ।
দশ পেগ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিলো , তাসের সাথে মৃদু পিঙ্ক ফ্লয়েড , ভালোই লাগছিলো সবকিছু । কিন্তু রাত বাড়তে লাগলো , আর বাচাল হতে থাকলো সবাই । একসময় নিজেই লক্ষ্য করলো মাসু; , সে ক্রমাগত কথা বলছে ।
অবশ্য খারাপ লাগছেনা তার , বরং বেশ ভালো লাগছে সবকিছু ছেড়ে এভাবে বন্ধুদের সাথে রাত কাটাতে ।
মাথার মাঝে অবশ্য নীলার জন্য একটা সূক্ষ্ণ অপরাধবোধ কাজ করছে .... বেচারি খুব আশা করেছিলো এবার থার্টিফাস্টটা তারা একসাথে কক্সবাজারে সেলিব্রেট করবে ... ঘাম ছুটে গেছে রাজি করাতে । এক শর্তে , মাসুদ মদ খাবে না ।
" নিয়মের জন্ম হয় নিয়ম ভাঙার জন্য " - বিড়বিড় করলো মাসুদ । মোবাইলটা বের করে দেখে নিলো নীলার মেসেজটা একবার । একটু হাসল ।
বমি করার পর শরীরটা বেশ ফুরফুরে লাগছে এখন । শরীর সমস্ত অগ্রহনীয় পদার্থ বের করে দিয়েছে - মনে হল তার । এখন আবার তাসে মন দেয়া যাবে । মুখ মুছে আবার গ্লাসে কিছুটা জ্বলন্ত তরল ঢালল সে ।
হঠাৎ বিরক্তিকর মুঠোফোনটা বেজে উঠল ... কিছুটা বিরক্তি দেখা গেল বন্ধুদের খেলায় ব্যাঘাত ঘটায় । ঘড়ি দেখে মাসুদ , রাত তিনটা ... । এখন ? ... নীলার তো এখন ফোন করার কথা না ।
" হ্যালো " কন্ঠ যতাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে মাসুদ ।
" মদ খেয়েছ ? "
" আরে নাহ্ । " গলা খাঁকাড়ি দেয় মাসুদ । যদিও জানে খুব বেশিক্ষণ চাপা দিওত পারবেনা .. " খাইনি তো "
" এই তুমি একটু বাসায় আসবে । আমার শরীরটা ভালো না । "
" কেন ? কি হয়েছে ? "
" জ্বর এসছে হঠাৎ করেই । ভাবছিলাম সেরে যাবে , কিন্তু টেমপারেচার বেড়েই চলেছে .. কি যে করি ... "
" তোমাকে বলেছিলাম স্টিমবাথ না নিতে .... তবুও ....." রাগ দেখায় একটু মাসুদ । " আচ্ছা , আমি আসছি .... একটু দেরি হবে ... কিন্তু আসছি .... "
বন্ধুদের কাছে থেকে বিদায় নেয় মাসুদ ।
" সিরিয়াস কিছু নাকি দোস্ত? " মেহেদী জিজ্ঞেস করে ।
"আরে না , সমস্যা নেই কোন " মাসুদ হাসে । " আসি দোস্ত , কাল রাতে আমার বাসায় খাবি কিন্তু সবাই । "
" ঠিক আছে দোস্ত , চিন্তা করিসনা । চলে আসব সময়মত "
কুয়াশার দিকে ফিরে মাসুদ । চাবিটা কোথায় গেল ?
৩.
ঘুমের মাঝে কে যেন ডাকে মাহবুবকে ।
আস্তে আস্তে চোখ খুলে মাহবুব । শীতের এমন রাতে উঠতে ইচ্ছে করে না তার । তারপর মনে হয় যুথির জ্বরের কথা । এবার পুরোপুরি তাকায় মাহবুব ।
ঘুমের ঘোরে তাকে ডাকছে যুথি ..... " বাই , ও বাই ... " । অল্প অল্প নড়ছে ঠোঁট জোড়া ।
মাথায় হাত দিয়ে চমকে ওঠে মাহবুব । জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে , প্রচন্ড জ্বর । একমূহুর্তের জন্য মাথা কাজ করে না মাহবুবের । কি করবে ঠিক করতে পারে না সে ।
এখন তো মনে হয় ওষুধের কোন দোকান খোলা পাওয়া যাবে না । ভোর হতে বেশি দেরি নেই , কিন্তু এরমধ্যেই যদি একটা কিছু হয়ে যায় বোনের ?
ভাবতেও ভয় লাগে মাহবুবের ।
পকেট থেকে সযত্ন সঞ্চিত একশো টাকার নোটটা বের করে মাহবুব ।তার মাথায় আসে , কিছু কিছু ওষুধের দোকান সারারাত খোলা থাকে । মাহবুব মনে করার চেষ্টা করে সেগুলো কোথায় । অনেক দূরে যেতে হবে । মনস্থির করে ফেলে মাহবুব ।
চাদরের নিচ থেকে সাবধানে বেরিয়ে আসে মাহবুব , আলতো করে - যাতে শীত না ঢুকতে পারে । তারপর বোনের গায়ে পরিয়ে দেয় পুরনো চাদরটা । আবার জ্বর মাপে ।
বোনের কানের কাছে মাথা এগিয়ে দেয় মাহবুব " আমি ওষুধ আনতে যাইতাসি । তুই থাক । কোনহানে যাইস না । "
লক্ষী মেয়ের মত মাথা নাড়ে যুথি ।
লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে থাকে মাহবুব । অনেক দূর যেতে হবে । অনেক দূর ।
৪.
মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে । এতরাতে ড্রাইভ করে অভ্যাস নেই মাসুদের ।
তবে ভালো লাগছে , ভালো লাগচে এজন্য যে পুরো রাস্তায় তেমন কোন ট্রাফিক নেই । রাতের ঢাকা চেনাই যায় না । কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ । মেঘের মত , স্রোতের মত বয়ে চলেছে ।
কুয়াশার জন্যই অপরপ্রান্ত থেকে আসা গাড়িটা দেখতে দেরি হল মাসুদের । যখন দেখতে পেল তখনও হয়তো সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব ছিলো , কিন্তু অ্যালকোহলের প্রভাবে রিফ্লেক্স ঠিকমতো কাজ করলোনা মাসুদের ।
তীব্র একটা লেফট টার্ণ নিল মাসুদ , টায়ার খামচে ধরল মাটি সশব্দে , গাড়ি কিছু সময়ের জন্য উঠে পড়ল ফুটপাথে ।
সামান্য একটা টোকা লাগল গাড়ির গায়ে । বিপরীতমুখি গাড়িটা একটা জিপ , একগাদা ছেলেমেয়ে হুল্লোড় আর গালাগালি করতে করতে চলে গেল , ভ্রক্ষেপই নেই অন্যকারো দিকে - থার্টি ফাস্ট ।
গাড়ি থামিয়ে ক্ষতি পরীক্ষা করতে লাগলো মাসুদ , নতুন গাড়ি - মাত্র দুমাস হল কিনেছে । হঠাৎ চোখ আটকে গেল টায়ারে লেগে থাকা একটা দাগের ওপর , দাগটা শুরু হয়েছে ফুট দশেক আগে ফুটপাথে পড়ে থাকা একটা সবুজ চাদর থেকে । সরু একটা রক্তের ধারা নামছে রাস্তার বুকে ।
চাদর থেকে বেরিয়ে আছে একটা হাত ।
অস্ফুট একটা শব্দ করল মাসুদ , দুটো হাত আপনাআপনি উঠে এল মুখ পর্যন্ত । চোখ দুটো বিস্ফোরিত ।
" হায় আল্লাহ ! এ আমি কি করলাম !!! "
একমূহুর্তে মাথা এলোমেলো হয়ে যায় মাসুদের ... রাস্তার এদিকে ওদিকে তাকায় সে কোথাও কেউ নেই । তারপর ধীরে ধীরে মাথা পরিষ্কার হতে থাকে মাসুদের , দ্রত গাড়িতে উঠে স্টার্ট দেয় গাড়ি ।
নতুন , শক্তিশালী ইন্জিন ... কোন ঝামেলা ছাড়াই একরাশ ধোঁয়া উড়িয়ে যাত্রা করে সামনে .... পেছনে একগুচ্ছ কালো পাপ রেখে ।
৫.
অনেক কষ্টে চোখ মেলে যুথি । কি অসহ্য যন্ত্রণা তার দেহে ।
তার সামনে মাহবুব বসে । মাহবুবের পাশে একটা ওষুধের প্যাকেট , একটা আধখাওয়া আপেল , ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে এনেছে বোনের জন্য ।
ভাইকে কখনো কাঁদতে দেখেনি যুথি , অনেক কষ্টে , ক্ষুধায় - কখনো না , তার ভাই বিশাল বীরপুরুষ ; কখনো কাঁদে না । হার না মানা এক কিশোর যার বুকে অনেক দুঃসাহসিক স্বপ্ন থাকে ।
অথচ তার ভাই কাঁদছে , অঝোড় ধারায় কাঁদছে । কান্নার জন্য কিছু বলতে পারছে না , শুধু তার হাত ধরে কাঁদছে ।
যুথির বুকে অনেক ব্যথা হচ্ছে , সে কিছু বলতে যায় ভাইকে , পারে না । দূরে দালানের মাথার উপর দিয়ে সূর্যরশ্মি মাথা তুলছে , কাল রাতের আতশবাজির মত । আলতো একটা হাসি আসে যুথির ঠোঁটে ।
নতুন বছরের নতুন সূর্য় ।
শুভ নববর্ষ , ২০১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




