মাঝে মাঝে কিছু খবর পরে স্তব্ধ হয়ে যাই । ভাবতেও ভয় লাগে , কিভাবে পার করছি এই ভয়ংকর সময় । প্রথম আলোয় প্রকাশিত এই সংবাদটি পড়ে যতটা না বেশি মর্মাহত ,তার চেয়েও বেশি আতংকিত । অন্তত মানুষের সেবার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ কিছু মানুষ যখন মানুষকেই হত্যা করে , তখন কিছু বলার থাকে না ।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত খবরটি তুলে দিলাম নিচে -
১০ দিনের মাথায় গতকাল শুক্রবার আবারও এক ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত ব্যবসায়ীর নাম মাহাবুব আলম ওরফে রাসেল। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের দুই ছাত্র তাঁদের বন্ধু মাহাবুবকে ১৮ দিন আগে হত্যা করেন। লাশ মেডিকেল কলেজের একটি ক্যানটিনের পেছনে ড্রেনে পুঁতে সেখানে কচুগাছ লাগিয়ে দেন তাঁরা।
নিহত মাহাবুবের বাড়ি নাটোরের লালপুর উপজেলার উত্তর বাঁশবাড়িয়া গ্রামে। তিনি ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ব্যবসায়ী। লালপুরের আবদুলপুরে তাঁর দোকান রয়েছে।
গতকাল ভোরে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পঞ্চম ব্যাচের ছাত্র জ্যোতির্ময় সরকার ওরফে জয়কে গ্রেপ্তার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। পরে জ্যোতির্ময়ের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী লাশ উদ্ধার করা হয়।
র্যাবের রাজশাহী রেলওয়ে কলোনি ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর এইচ এম আনোয়ার আলী জানান, জ্যোতির্ময় র্যাবের কাছে হত্যাকাণ্ডের পুরো বর্ণনা দিয়েছেন। জ্যোতির্ময়ের বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার নন্দিকুজা গ্রামে। তিনি বাগাতিপাড়া উপজেলার সাপাহার কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করেছেন। ওই কলেজে পড়ার সময় সহপাঠী মাহাবুবের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর মাহাবুব রাজশাহী কলেজে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। জ্যোতির্ময় ভর্তি হন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। থাকেন কলেজের পিংকু ছাত্রাবাসের ১০৯ নম্বর কক্ষে। একই ছাত্রাবাসের পঞ্চম বর্ষের ছাত্র সাব্বির হোসেনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় জ্যোতির্ময়ের। সাব্বিরের বাড়ি গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে। জ্যোতির্ময়ের মাধ্যমে মাহাবুবের সঙ্গে সাব্বিরেরও বন্ধুত্ব হয়। এই সুবাদে জ্যোতির্ময় ও সাব্বির দুজনই মাহাবুবের বাড়িতে যাওয়া-আসা করতেন।
তিন বছর আগে মাহাবুব পড়াশোনা ছেড়ে লালপুরের আবদুলপুরে একটি ইলেকট্রনিক সামগ্রীর দোকান দেন। রাজশাহীতে যাওয়া-আসার পথে দুই বন্ধু জ্যোতির্ময় ও সাব্বির প্রায়ই মাহাবুবের দোকানে তাঁর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন।
জ্যোতির্ময় জানান, সাব্বির আর তিনি কঙ্কালের ব্যবসা করেন। এ ব্যবসার জন্য জ্যোতির্ময় মাহাবুবের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নেন। চুক্তি অনুযায়ী এই টাকার জন্য মাসিক ১৫ শতাংশ সুদ দেওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া ক্রিকেট খেলায় বাজি ধরার জন্য মাহাবুবের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নেন সাব্বির, কিন্তু বাজিতে হেরে তিনি টাকা খোয়ান। আর জ্যোতির্ময় অন্যভাবে টাকা খরচ করে ফেলেন। টাকা ফেরত না দেওয়ার জন্য তাঁরা দুজনে মিলে মাহাবুবকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এ জন্য তাঁরা চেতনানাশক ইনজেকশন, ঘুমের বড়ি ও সিমেন্ট কিনে রাখেন।
জ্যোতির্ময়ের স্বীকারোক্তি ও মাহাবুবের বাবা মকবুল হোসেনের বরাত দিয়ে র্যাব আরও জানায়, গত ৪ এপ্রিল সাব্বির আবদুলপুরে মাহাবুবের দোকানে যান। এ সময় মাহাবুবের বাবা মকবুল হোসেন দোকানে ছিলেন। সাব্বির মাহাবুবকে জানান, টাকা না দিতে পারলেও তাঁর সঙ্গে ঢাকায় গেলে তিনি পরিচিত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাহাবুবকে ইলেকট্রনিক সামগ্রী কিনে দিতে পারবেন। তাই ঢাকায় যাওয়ার জন্য মাহাবুব ও সাব্বির বিকেল পাঁচটার দিকে ঢাকাগামী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে ওঠেন।
মকবুল হোসেন ওই দিন সন্ধ্যায় ছেলের মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও তাঁকে পাননি। পরে সাব্বির ও জ্যোতির্ময়ের মুঠোফোনে ফোন করেন মকবুল হোসেন, কিন্তু তাঁদের ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। ৯ এপ্রিল মকবুল হোসেন রাজশাহী এসে জ্যোতির্ময়ের কাছে ছেলের কথা জানতে চান; কিন্তু জ্যোতির্ময় কিছু জানেন না বলে জানিয়ে দেন। ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে মকবুল গত ১৫ এপ্রিল জ্যোতির্ময় ও সাব্বিরকে আসামি করে লালপুর থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন।
জ্যোতির্ময় জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪ এপ্রিল সাব্বির মাহাবুবকে ট্রেনে তুলে নিয়ে পাবনার চাটমোহরে গিয়ে বলেন, ‘জ্যোতির্ময়ের কাছ থেকে টাকা নিতে হবে, চল আগে রাজশাহী যাই।’ এরপর চাটমোহর থেকে ফিরতি ট্রেনে সাব্বির ও মাহাবুব রাজশাহীতে পৌঁছান। পরে তাঁরা মেডিকেল কলেজে চলে যান। রাত নয়টার দিকে তাঁরা তিন বন্ধু কলেজের চারু মামার ক্যানটিনের পেছনে গিয়ে ফেনসিডিল ও গাঁজা সেবন করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগেই মাহাবুবের ফেনসিডিলের বোতলে ছয়টি ঘুমের বড়ি গুঁড়ো করে মিশিয়ে রাখা হয়। ফেনসিডিল সেবনের পরপর মাহাবুব ঘুমিয়ে পড়লে তাঁর ডান হাতে চেতনানাশক ইনজেকশন দেওয়া হয়। ঘুমের বড়ির সঙ্গে উচ্চমাত্রার চেতনানাশক দেওয়ায় কিছুক্ষণের মধ্যে মাহাবুব মারা যান। এরপর লাশ ক্যানটিনের পেছনের একটি বদ্ধ ড্রেনের মধ্যে ফেলে গায়ে সিমেন্ট ছিটিয়ে তার ওপর পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর মাটিচাপা দিয়ে তার ওপর কচুগাছ লাগানো হয়।
মেজর আনোয়ার জানান, মুঠোফোনের সূত্র ধরে কয়েক দিন চেষ্টার পর জ্যোতির্ময়কে আটক করা হয়। গতকাল দুপুরে তাঁকে মেডিকেল কলেজে নিয়ে আসা হয়। এ সময় মাহাবুবের বাবা মকবুল হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। এরপর জ্যোতির্ময়ের দেখিয়ে দেওয়া স্থানে ভরাট ড্রেনে সদ্য লাগানো কচুগাছ উপড়ে মাটি খুঁড়ে লাশ উদ্ধার করা হয়। সিমেন্ট দেওয়ার কারণে লাশের পচা গন্ধ বাইরে ছড়ায়নি।
মাহাবুবের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ‘ভাবতে পারিনি, ছেলেকে তার বন্ধুরা এ রকম নৃশংসভাবে খুন করবে।’
মাহাবুব মকবুল হোসেনের একমাত্র ছেলে। মাহাবুব বিয়ে করেছিলেন। তাঁর দুই বছর তিন মাস বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) লুৎফর রহমান বলেন, মাহাবুবের পরনে চেক শার্ট ও চেক লুঙ্গি ছিল। লাশ গলে বিকৃত হয়ে গেছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এর আগে গত ১২ এপ্রিল রাতে রাজশাহী নগরের আলুপট্টি এলাকা থেকে ব্যবসায়ী আমিনুল হকের নয় টুকরা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
(প্রতিবেদন তৈরিতে নাটোর ও লালপুর প্রতিনিধি তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন)
কোন দিকে ধাবমিত হচ্ছি আমরা ? বিবেক বিবেচনা আর আদর্শর কি আদৌ কোন অস্তিত্ব আছে এখনো ??

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



