
নাম কি আপনার?
আব্দুল গফুর।
কই থেকে এসেছেন বাবা?
নেত্রকোনা।
সিট পান নাই?
না বাজান, কইছে কাইল খালি হইলে দিবে।
তো আজ কি বারান্দাতেই থাকবেন?
কই আর যামু? এইখানেই থাকতে কইছে।
সমস্যা কি আপনার?
পেট ফুইল্যা গেছে বাজান, পায়ে পানি আইছে।
কোন ডাক্তার আসছিলো?
বড় স্যার আহেনাই কেউ,কইছে কাইল সকালে আইব। আর ঐযে ছোট স্যাররা দেখছে।
বারান্দায় আরও কমপক্ষে ৬-৭ জন রোগী আছেন। ওয়ার্ড এর প্রতিটা বেড এ তো রোগী আছেই,এমনকি মেঝেতেও আর কোন জায়গা খালি নেই। তাই বাধ্য হয়ে বৃদ্ধ এর রাত হাসপাতালের বারান্দাতেই কাটাতে হবে।
মেডিকেলের এই ওয়ার্ডে আজ এতো রোগীর ভিড় কারন আজ ছিল অ্যাডমিশন ডে।
এই হল আমাদের দেশের সরকারী হাসপাতালের প্রতিদিনকার চিত্র। এতোটুকুন এই দেশে জনসংখ্যার যে ঘনত্ব, তাতে সরকারী হাসপাতালের চিত্র এরকম হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ রোগীই দরিদ্র। যারা একটু সামর্থ্যবান তারা সরকারী হাসপাতাল শুনলে নাক সিটকান, অসুস্থ হলে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। হবেন নাই বা কেন? সরকারী চিকিৎসা এর উপর অনেকেরই ভরসা নাই। কেন নাই? অনেকেই এটার জন্য চিকিৎসকদের অবহেলাকে দায়ী করেন। হতে পারে। বাঙালি জাতি যে খুব সচেতন এবং কর্তব্যপরায়ণ জাতি তা দাবি করা যায়না। কিন্তু এটার মুল কারন কি শুধুই চিকিৎসকদের অবহেলা? মনে হয় না। বরং আমি এটাকে সাইকোলজিক্যাল সমস্যাই বলবো। আসল কথা হল, একজন সামর্থ্যবান লোক নিজেকে কখনোই একজন দরিদ্র লোকের পাশাপাশি চিকিৎসা পেতে দেখতে চান না। একটা অদৃশ্য তারতম্য কিন্তু সবসময়ই বিদ্যমান একজন ধনী এবং একজন গরীবের মাঝে। দুজনেই কিন্তু মানুষ। দুজনেরই রক্তের রঙ লাল। বিশ্বাস করেন,না করেন তবুও, এটাই একটা অন্যতম কারন সরকারী হাসপাতালে ভর্তি না হওয়ার।
অনেকেই একমত হতে পারলেন না নিশ্চয়ই। আচ্ছা ঠিক আছে, ধরে নিলাম সরকারী হাসপাতালে অনেক অবহেলা করা হয় একজন রোগীকে। ফ্রি জিনিস ভালো না, মেনে নিলাম। তাতে অবশ্য কিছুটা সুবিধাই হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে সামর্থ্যবানরা ভর্তি হলে চাপ কমে সরকারী হাসপাতালের উপর। তার পরেও, যে সংখ্যক রোগী প্রতিদিন একটা হাসপাতালে আসেন, তা সামলাতে প্রতিটা স্তরের চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হয়। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, দেশের দরিদ্র গোষ্ঠীর মানুষরা কিন্তু শুধুমাত্র সর্দি, কাশির জন্যে ডাক্তার এর কাছে আসেন না। অধিকাংশ দরিদ্র রোগীই ভর্তি হন এমন এমন সব রোগ নিয়ে, যা উচ্চবিত্তরা দেখলে কবরে আগে অর্ধেক পা দিয়ে রাখতেন। এবং এগুলিও হাসপাতালে আসে অনেক প্রগ্রেসিভ স্টেজে, যেখান থেকে চাইলেই একটা রোগীকে ভালো করা যায়না। একজন মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত যতটা স্বাস্থ্য সচেতন, একজন নিম্নবিত্ত কিন্তু তা নন। সেই হিসেবে নিম্নবিত্তদের রোগগুলিও হয় মারাত্মক। অনেকটা “গরিবের ঘোড়া রোগ” এর মতো।
তারপরেও যদি চিকিৎসা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে, সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসাকে বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা এর থেকে খুব খারাপ বলা যায়না। দুটোই খারাপ। বেসরকারি হাসপাতালকে খারাপ বলছি একারনে যে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা আহামরি কিছুই না। সেই তুলনায় এখানের চিকিৎসা অতিরিক্ত পরিমান ব্যায়বহুল।
এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো।
আমার এক বন্ধুর বাবা বাসে করে চিটাগাং থেকে ঢাকা আসছিলেন। পথের মধ্যে কেউ বা কারা তাকে ধুতুরা জাতীয় কিছু খাওয়ান। উনি চরম অসুস্থ হয়ে পড়েন, জ্ঞান প্রায় ছিলনা বললেই চলে। রোড পয়জনিং বুঝতে পেরেই আমার বন্ধুটা তারা বাবাকে নিয়ে গেলো পপুলার হসপিটালে । সেখানে তাকে বলা হল, রোগীর অবস্থা অনেক ভয়াবহ। আই সি ইউ তে রাখতে হবে। প্রতিদিন ৬০০০০ টাকা করে।
বিমর্ষ মুখে বন্ধুটা তার আরেক বন্ধুর সাথে কথা বলে উনাকে ডিএমসিএইচ এ নিয়ে এলো। এখানে এসে স্টোমাক ওয়াশ দেওয়া হল। একটা স্যালাইন দেওয়া হল। পরদিন সকালে উনি হেটেই বাড়ি চলে গেলেন।
আশা করি বুঝতে পারছেন কেন বেসরকারি হাসপাতালকে ভালো বলতে পারছি না। হতে পারে অভিজ্ঞ ডাক্তার কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতিতে তারা এগিয়ে, কিন্তু অনেক সময় পর্যাপ্ত চিকিৎসা খুব অল্পতেও দেওয়া যায়। স্কয়ার ,পপুলার ,ল্যাব এইড সহ নামি দামী হাসপাতালে থাকা রোগীদের কাছ থেকে অনেক অভিযোগই শোনা যায়। এসব হাসপাতালের কিছু কিছু ব্যাপারে বিরোধিতা না করে পারছি না। যতদূর জানি, এসব হাসপাতালের মধ্যে কয়েকটিতে ভর্তি হলে এসব হাসপাতালের অধীনেই টেস্ট গুলো করাতে হয়। বাইরের ডায়াগনস্টিক টেস্ট রিপোর্ট তারা গ্রহন করেন না। আমার প্রশ্ন হল– যে আগে থেকেই টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছে, তার সাথে এরকম স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা ব্যবসা করার মানে কি?
বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবার মান নিম্নপর্যায়ের। বিশ্ব এর ৫১ টি গুরুতর চিকিৎসা সংকটে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এটার জন্যে আসলে দায়ী জনসংখ্যা অনুযায়ী চিকিৎসক এর অপ্রতুলতা। জালের মতো বিস্তার করে রেখেছে সমস্যা পুরো স্বাস্থ্য ব্যাবস্থাকে। তারপরেও চাইলেই এই সমস্যা থেকে কিছুটা হলেও মাথা তুলে দাঁড়ানো যায়। কিন্তু আগে তো সমস্যার উৎস খুজতে হবে। সমস্যার প্রতি সবার অভিযোগ , কিন্তু সমস্যার উৎস খুজে না কেউ।
গতকাল প্রথম আলোতে একটা লেখা পড়লাম, হেডলাইনটা ছিল– সরকারী চাকরি ছাড়ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। পড়ে যতটা না অবাক হয়েছি , তার চেয়ে বেশি লেগেছে রাগ।
লোভ খুব খারাপ একটা জিনিস। লোভের কাছে মানবতা পরাজিত হচ্ছে , সত্যই দুঃখজনক।
তবে এই লোভ তো হঠাৎ করে উদয় হওয়ার জিনিস না। নিশ্চয়ই সরকারী চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পিছনে চিকিৎসকদের অভিযোগ রয়েছে।
কি তাদের অভিযোগ? কেন তারা ছাড়ছেন সরকারী চাকরি?
তাদের অভিযোগ পরিষ্কার। সরকারী হাসপাতালে বেতন কম, চাপ বেশি, গালি ফ্রি। বেসরকারি হাসপাতালে বেতন বেশি, চাপ কম, গালি কম। ডাক্তারের জায়গায় অন্য পেশার কাউকে চিন্তা করুন। একজন ইঞ্জিনিয়ার কি বেশি বেতনের চাকরি রেখে গালি শুনে অন্য কোন জায়গায় গাধার মতো খাটুনি খাটতে চাইবে? কিংবা একজন ব্যাংকার? একজন দারোয়ান চাইবে কম বেতনে চাকরি করতে যেখানে তার কাছে বেশি বেতনে চাকরির সুযোগ থাকবে?
হ্যা, চাইতেও পারে। ডাক্তাররাও অনেকেই চেয়েছেন, না হলে সরকারী হাসপাতালে বর্তমানে একজন অধ্যাপকও খুজে পাওয়া যেতো না। মানবতার স্বার্থে অনেকেই সরকারী জায়গা ছেড়ে যাননি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করতে। এতদিন ধরে রেখেছেন নিজেদের। কিন্তু সেই মানবতার গায়েও ছাই মাখাল কারা?
আমাদের প্রিয় সরকার তাদের ইচ্ছামতো দলীয় চিকিৎসকদের সুযোগ করে দিয়ে যোগ্যদের ঠেলে দিচ্ছেন অন্ধকারে। এখন রাজধানীতে থাকার জন্য দরকার একটা রাজনৈতিক পরিচিতি। পড়ালেখা আর চিকিৎসাবিদ্যা তো কবেই কবরে গেছে।
একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রাজধানীতে থাকতে চাইবেন ,এটাই স্বাভাবিক। শুধু বিশেষজ্ঞ না, যে কেউই থাকতে চাইবেন। কারন কি?
কারন হচ্ছে, আমাদের দেশের মফস্বলে কিংবা গ্রামে সুযোগ সুবিধার অপ্রতুলতা। অস্ট্রেলিয়াতে শহরে বসে চিকিৎসা করার চেয়ে শহরের বাইরে চিকিৎসা করলে বেশি টাকা মেলে। এদেশে মেলে না। এদেশের সরকার সেরকম কোন সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সুবিধা সমান সমান হলেও কথা ছিল। সুবিধা অনেক কম।
ঠিক একারনেই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারী হাসপাতালের পোস্টগুলিতে এসেছে অযোগ্য দলীয় লোক। চিকিৎসা ব্যবস্থার মান ভালো হবে কোন দিক থেকে? যারা রাজনৈতিক বা দলীয় প্রচেষ্টায় এরকম ভাবে নিজেদের জায়গা করে নেন ,তারা কিরকম চিকিৎসা দিতে পারেন? কেন এতো লাথি গুঁতো, অন্যায় বদলি সহ্য করে নির্দলীয় অথচ যোগ্য অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপকরা সরকারী পদে থাকবেন?
পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম মেডিকেলে বর্তমানে ১৮৩ টি পদের বিপরীতে আছেন ৫৪ জন। ৫৪ জন এর মধ্যে কতজন দলীয় আর কতজন নির্দলীয়, নিজেরাই অনুমান করে নিন। এই যদি হয় শিক্ষকদের অবস্থা, তবে আজ যে শিক্ষার্থী ওখানে শিক্ষা লাভ করছে, তার অবস্থা একবার ভেবে দেখেছেন কি? উন্নতি কিভাবে বাধাগ্রস্ত হয় তার উদাহরন খুজলে এটার চেয়ে সহজ উদাহরন আর পাবেন না।
এখন আসি বেসরকারি নামি দামি হাসপাতালের কথায়। একটা দেশে কিভাবে সরকারী এবং বেসরকারি চিকিৎসা এর খরচে এতো তারতম্য হয়? এক হতে পারে সরকারী এর খরচ মাত্রাতিরিক্ত কম, অথবা বেসরকারি এর খরচ মাত্রাতিরিক্ত বেশি। সরকারী এর খরচ মাত্রাতিরিক্ত কম অবশ্যই না, কারন সরকার কখনো তার নিজের পায়ে কুড়োল মারে না। তার মানে বেসরকারি হাসপাতালে খরচ মাত্রার তুলনায় বেশি। যেখানে চিকিৎসা এর ব্যায়ভার এতো বেশি, সেখানে চিকিৎসকের বেতনও বেশি। মিষ্টির গন্ধ পেলে মাছি কি বসে থাকবে নাকি? চিকিৎসকরাও তাই আকৃষ্ট হয়ে বেসরকারিতে যোগদান করছে। এটার জন্য আসলে দায়ী কে? খেয়াল করে দেখুন। এটার জন্যে আসলে কিন্তু দায়ী সেই বেসরকারি হাসপাতালটি যে তার চিকিৎসা এর খরচকে বাড়িয়ে আকাশচুম্বী করেছে। এটাকে বিশুদ্ধ ব্যাবসা বলে। চিকিৎসা এর খরচ যদি এতো বেশি না হত, চিকিৎসকের বেতনও বেশি হত না, এবং চিকিৎসকরা বেশি টাকার আশায় কখনোই সরকারী চাকরি ছাড়তে চাইতেন না।
ডাক্তাররা যদি হন খেলার গুটি, বেসরকারি হাসপাতাল তাহলে এখন খেলোয়াড় যে গুটি নিয়ে খেলছে। আর খেলার বোর্ড হল আমাদের প্রানপ্রিয় সরকার যে তার দেশে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও এরকম ব্যবসা করতে দিচ্ছে। সরকার যখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে এতোই চিন্তা করে, তাহলে সরকারী সুযোগ সুবিধার কেন উন্নতি করে না বেসরকারির মতো? আর সেটাই যদি সে করতে অপারগ হয়, তাহলে সে কেন বেসরকারি হাসপাতালের আকাশচুম্বী টাকার খেলাকে নিয়ন্ত্রন করতে কোন নীতিমালা বেধে দেয় না? কেন?
সময় এসেছে এখন এসব নিয়ে কিছু ভাবার। আর কতকাল বাংলার মানুষ অনিয়ম সহ্য করে যাবে? আর কতো দুর্ভোগ, আর কতো মৃত্যু, সরকারের টনক নাড়াবে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




