যৌথবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও বিএনপি’র সাবেক এমপি আলী আজগর লবী। লবী ওয়ারিদ টেলিকমের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তথ্য দিয়েছেন নিজের বিপুল অবৈধ অর্থ-সম্পদের। জানিয়েছেন যে, আল আরাফাহ ব্যাংকে ২২ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে তার। এছাড়া দুবাইতে ছেলে সাকিব আজগরের নামে ৫ কোটি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে একটি বিলাসবহুল বাড়ি এবং লন্ডনের লয়েডস ব্যাংকে রাখা আছে আনুমনিক ৩/৪ হাজার পাউন্ড।
আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে গতকাল শনিবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গোয়েন্দাদের নানা প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যতগুলো ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল, তার প্রত্যেকটির ক্ষেত্রেই নগদ ৫ কোটি টাকা করে নেয়া হয়েছে। কাউকে বিশ্বাস করতেন না বলে নেত্রী সবকিছু নিজেই করতেন। প্রতি ব্যাংকে চেয়ারম্যান পদে দলীয় লোকজনকে বসানো হয়।
ওবায়দুল কাদের আরও জানান, কিছু কিছু ক্ষেত্রে নেত্রীর পক্ষে লেনদেনের দায়িত্ব পালন করেছেন শেখ হেলাল ও কাজী জাফরউল্লাহ। হামীম গ্রুপের এ কে আজাদসহ বেশ ক’জন বড় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নিয়ে আসতেন কাজী জাফরউল্লাহ। এ কারণে জাফরউল্লাহকে নেত্রী সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন।
ওবায়দুল কাদের আরও জানান, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে দেশে ও বিদেশে কোটি কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। এছাড়া ট্রাস্ট সরকার থেকে অনুদান বাবদ প্রতিমাসে ২৫ লাখ টাকা পায়। কিন্তু এই ট্রাস্টের তহবিল বর্তমানে অনেকটা শূন্য। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছাড়া অন্য কেউ ট্রাস্টের একাউন্ট থেকে টাকা তুলতে পারে না। সুতরাং কেবল তারা দু’জনই বলতে পারবেন এত টাকা কোথায় কিভাবে খরচ হয়েছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরও জানান, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের ১৩ জন সদস্যের সকলেই শেখ পরিবারের। এ কারণে এর তহবিল নিয়ে কখনো প্রশ্ন উঠে না।
যৌথ বাহিনীর সদস্যদের জিজ্ঞাসার জবাবে ওবায়দুল কাদের আরও জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৭৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাশিয়া থেকে ৭টি মিগ-২৯ যুদ্ধ বিমান কেনার প্রক্রিয়ায় আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছিল বলে তিনি শুনেছেন। বিষয়টি নিয়ে এখনো আদালতে মামলা চলছে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ী নূর আলী ও আবুল খায়ের লিটু প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন এবং দুর্নীতির ব্যাপারটিও তাদের মাধ্যমেই ঘটেছে। তারা নেত্রীকে মোটা অংকের টাকা দিয়েছেন বলে আমি শুনেছি।
ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার নামে লিখে নেয়ার নেপথ্যে পরামর্শদাতা ছিলেন তখনকার অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া ও এসএসএফের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল রফিক। তাদের বুদ্ধিতেই নেত্রী কাজটি করেছিলেন। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা ঠিক হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে অনেক কিছুই নিজের নামে করিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি কিছুই নেননি, ৩২ নম্বরের সেই বাড়িতে থেকেছেন।
ওবায়দুল কাদের জানান, আওয়ামী লীগের অন্য অনেক নেতার মতো তাকেও টাকা দিতে চেয়েছিল বসুন্ধরা গ্রুপ। তিনি বলেন, একবার ওয়াকিল চেয়ারম্যান ১৫ লাখ টাকা নিয়ে আমার কাছে এসে বললো, টাকাগুলো বসুন্ধরা গ্রুপ পাঠিয়েছে, আপনি রাখেন, নির্বাচনের সময় কাজে লাগবে। আরেকবার রহমতউল্লাহ আমার কাছে এসে বলেছিল যে, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহ আলম আমার সাথে দেখা করতে চান। তখন তাকে আমি বলেছিলাম, তার সাথে দেখা করে বা সম্পর্ক গড়ে ভবিষ্যতে বিপদে পড়তে চাই না। ওবায়দুল কাদের বলেন, আরও অনেক ব্যবসায়ী আমাদের কাছে টাকা নিয়ে আসতেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদান করা অথবা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নেয়া।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের গোয়েন্দাদের বলেন, ‘র’ কর্মকর্তা সি কে সিনহা ঢাকায় থাকতে আমাদের অনেক নেতার সঙ্গেই নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।
আলী আজগর লবী
জিজ্ঞাসাবাদে বিএনপির সাবেক এমপি আলী আজগর লবী যৌথবাহিনীর সদস্যদের জানান, ওয়ারিদ টেলিকমের কাছ থেকে নেয়া ঘুষের অংশ হিসাবে তিনি ৭ কোটি টাকা পেয়েছিলেন, সেই টাকা এখন প্রাইম ব্যাংক অথবা প্রিমিয়ার ব্যাংক বনানী শাখায় রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের মাধ্যমে আয় করা ১৪ কোটি টাকাসহ মোট ২২ কোটি টাকা বর্তমানে আল আরাফাহ ব্যাংকে এফডিআর করা আছে। টেলিটকের যন্ত্রপাতি আমদানীর ক্ষেত্রে মোর্শেদ খানের শ্যালক আজমত মঈনের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা নেয়ার কথাও স্বীকার করেন লবী। তিনি গোয়েন্দাদের জানান, ২০০০ সালে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সময় ১২ লাখ টাকা দিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে একটি পাজেরো জীপ কিনে দিয়েছিলেন। পরে সেটি তারেক রহমান ব্যবহার করেছেন। এছাড়া লন্ডন প্রবাসী সিলেটী ব্যবসায়ী আশিকের কাছ থেকে হাওয়া ভবন ভাড়া নিয়ে সেখানে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে অফিস করে দিয়েছেন। এই বাড়ির ভাড়া বাবদ লবী বিভিন্ন সময়ে সর্বমোট ২৫ লাখ টাকা নিজ তহবিল থেকে পরিশোধ করেন।
আলী আজগর লবী আরও জানান, বিএনপি’র মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়াকে ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় দু’দফায় তিনি দেড় লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তিনি গোয়েন্দাদের বলেন, দীর্ঘ-মেয়াদে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে ধাবী গ্রুপকে আমিই বাংলাদেশে নিয়ে আসি। কিন্তু পরে লুৎফুজ্জামান বাবর তাদের সাথে যুক্ত হয়ে গেলে আমি ছিটকে পড়ি। তবে বাবর সাহেব আমাকে একদিন জানান যে, ধাবী গ্রুপের পক্ষ থেকে আমি ১ মিলিয়ন ডলার পাচ্ছি। পরবর্তীতে প্রিমিয়ার ব্যাংক বনানী শাখায় ও অন্যান্য ব্যাংকে আমার একাউন্টে ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণের বাংলাদেশী টাকা জমা হয়। তখন আমি জানতে পারি যে, ধাবী গ্রুপ থেকে বাবর সাহেব মোট ৯ মিলিয়ন ডলার গ্রহণ করেছেন। তবে এই টাকার ভাগ কে কে পেয়েছেন তা আমি জানি না।
আলী আজগর লবী আরও জানান, তার ছেলে সাকিব আজগরের নামে ২০০৬ সালে দুবাইতে একটি বাড়ি কেনা হয়েছে। এই বাড়ি কেনার টাকা আরাফত রহমান কোকো নিজে দুবাই গিয়ে পরিশোধ করেছেন। বাড়ি কিনতে বাংলাদেশী মুদ্রার হিসাবে প্রায় ৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলেও তিনি জানান।
।। ইত্তেফাক : ১০.০৬.০৭ ।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


