somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রতারণার কোয়ান্টাম মেথড

৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১১ সকাল ৮:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কয়েক মাস আগে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি মিলনায়তনের একটি অনুষ্ঠানের খবর আমরা জানতে পারি পরদিন প্রকাশিত দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের পরিবেশিত সংবাদ থেকে। এর শিরোনাম ছিল ‘আচ্ছন্ন তন্দ্রায় নাকডাকা প্রশান্তি’। খবরের অংশ বিশেষ- ‘ভার্সিটির ছাত্র, শিক্ষক সরকারী অফিসার ও উৎসুক তরুনেরা মহাজাতকের প্রশান্তিকরণ ক্যাসেটের সুরময় অনুনাদে দুই দুইবার আচ্ছন্ন তন্দ্রায় নাকও ডাকিতে শুরু করেন। ... জাতীয় অধ্যাপক প্রফেসর নুরুল ইসলাম এটিকে কেবল উৎকণ্ঠা নয়, ৪০ ভাগ শারীরিক জরামুক্তির সংগ্রাম হিসেবেও মূল্য দিয়াছেন। উক্ত সভার প্রধান বক্তা শহীদ আল বোখারী (মহাজাতক) যেসব জ্ঞানগর্ভ উপদেশ খয়রাত করেন তার মূল কথা হলো- একমাত্র আহাম্মকের ভবিষ্যৎ ভাগ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।’ ঐ দিনের ঐ দৈনিকেরই প্রথম পাতায় একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে। বিজ্ঞাপনটির অংশবিশেষ- ‘নিজেই নিজের ভাগ্য নিয়ন্তা হোন। মাত্র ২৮ ঘণ্টায় ব্যর্থতা থেকে সাফল্যের পথে যাত্রা শুরু করুন। মন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এখন বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজের ভাগ্যকে পরিবর্তন করছে। বরেণ্য ভবিষৎদ্রষ্টা ও যোগ-গুরু মহাজাতক এখন শেখাচ্ছেন মন নিয়ন্ত্রণের সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কোয়ান্টাম মেথড...।’

বিজ্ঞাপনের ভাষ্য অনুযায়ী এর মাধ্যমে ছোট বড় নারী-পুরুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন থেকে শুরু করে অর্থ-বিত্ত, ব্যবসা, পদোন্নতি, খ্যাতি ইত্যাদি সবই পাওয়া যাবে। কোর্সটি হবে ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে। বিজ্ঞাপনে অবশ্য কোর্স ফি উল্লেখ করা হয়নি। তাহলে জানা যেত, আহাম্মকদের ঘাড়ে মহাজাতক কত টাকার কাঁঠাল ভেঙ্গে খাচ্ছেন। মন নিয়ন্ত্রণের ‘বৈজ্ঞানিক’ পদ্ধতি বলে আসলে কিছু নেই। তদুপরি- সেটা ‘কোয়ান্টাম’ হবার কোনো কারণও নেই। পদার্থবিজ্ঞানের যে শাখাটি কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা বা কোয়ান্টাম মেকানিক্স নামে পরিচিত, তার সঙ্গে এই কোর্সের কোন সম্পর্ক নেই। আছে প্রতারণার সম্পর্ক। কোয়ান্টাম বিজ্ঞান সম্পর্কে জনসাধারণের অজ্ঞতা এবং উক্ত শব্দটির আলাদা একটি ব্যঞ্জনা ব্যবহার করে প্রতারণা করার পুরোনো কৌশল।

চটকদার বুলি আউড়ে মানুষকে প্রতারণা করার এই কৌশল নতুন নয়। মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে যেসব প্রতারক তাদের প্রাসাদ তৈরি করছে, এগুলো তাদের নিত্যদিনকার ব্যাপার। আমাদের মতো দেশে, যেখানে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বেড়া অনেক বড়; ভক্তি ও শক্তির যেখানে রাজকীয় যোগাযোগ, সেখানে হরহামেশা এসব ঘটনা ঘটবে এ আর নতুন কি! প্রতারকদের এসব অনুষ্ঠানে সমাজের জ্ঞানী গুণীরাও থাকবেন, এ তো আমরা হর-হামেশা দেখছিও।

মানুষকে ঠকানোর জন্য আজতক যেসব পদ্ধতি মানুষ উদ্ভাবন করেছে, সম্ভবত জ্যোতিষশাস্ত্র তার শীর্ষ স্থানটি দখলে রাখতে পারে। সেই অনেককাল আগে থেকে জ্যোতিষচর্চার নামে, ভাগ্য গণনার নামে মানুষকে প্রতারিত করে আসছে একদল সুযোগসন্ধানী মানুষ। হাল আমলে এই ধরনের ব্যবসায় নতুন মাত্রা যোগ করার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার। বিশ শতকের শেষ দশকে বিজ্ঞানের বিজয় রথ পূর্ণ বেগে ছুটে চলেছে। এ সময় তাই যে কোনো বিষয়ে বিজ্ঞানের কোন ব্যাপার জুড়ে দিতে পারলে তা হয় আরো জোরালো।

মানুষের চাঁদে যাওয়ার বিষয়টি যে সত্য নয়, বরং তা করো কারো ধর্মীয় বিশ্বাসের বারোটা বাজানোর জন্য বিধর্মীদের ষড়যন্ত্র-এমন ধারা ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী লোকের সংখ্যাও কম নয় এদেশে। যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনাকে কোন বিশেষ ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে নিজেদের ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় রত অনেক লোক। এচক্রটি বেশ শক্তিশালী। চানখারপুলের এলেম দ্বারা তদবির করে যে লোক, উট জবেহ করে জন্ম উৎসব পালনকারী কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মন্ত্রী যে কিনা আধ্যাত্মিক পাউডারের বিজ্ঞাপনে মডেল হয়, তারা সকলেই এক সূত্রে গ্রথিত। এদের সবারই উদ্দেশ্য এক, জনগণকে সত্যের স্বরূপ জানা থেকে বিরত রাখা।

বিজ্ঞানের চলতি উন্নয়নের সঙ্গে নিজেদের প্রতারণা ব্যবসাকে আত্মীকরণের জন্য বিভিন্ন অপকৌশল ব্যবহৃত হয়ে আসছে অনেক দিন ধরে। আলোচ্য কোয়ান্টাম মেথড-এর একটি উদাহরণ মাত্র। নিয়মিত যারা হাটখোলার মোড়ের বিজ্ঞাপন নির্ভর দৈনিকটি পড়েন, তারা নিশ্চয়ই এই জাতীয় আরো প্রচারণা লক্ষ্য করে থাকবেন। এ মুহূর্তে আমার আর একটি বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ছে, যার ভাষ্য ছিল অনেকটা এরূপ ‘বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনষ্টাইন বলেছেন, পদার্থ ও শক্তি এক। কাজেই, আপনার শরীর আসলে শক্তিই, অর্থাৎ কিনা আলো। বিভিন্ন ধরনের পাথরের রয়েছে আলোকে প্রতিফলিত, প্রতিসরিত করার ক্ষমতা। কাজেই পাথর আলোর মাধ্যমে আপনার শরীরকে প্রভাবিত করে কারণ আপনি নিজে আলোচ। অতএব সঠিক পাথর ব্যবহার করে নিজের ভাগ্য গড়ে তুলুন।’ বাক্য বিন্যাস হুবহু এমত না হলেও বক্তব্য ছিলো এমনই। সাধারণভাবে, বিজ্ঞান না জানা এবং অল্প বিজ্ঞান জানা ব্যক্তিদের জন্য এটি বেশ কনভিনসিং। বিজ্ঞাপনটির বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্যণীয়। ব্যবহৃত হয়েছে এমন একজন বিজ্ঞানীর নাম, যার পরিচিতি খুব ব্যাপক। এখানে বিজ্ঞানের একটি তথ্য (শক্তি ও পদার্থ আসলে এক) পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু এ থেকে যে সিদ্ধান্ত টানা হচ্ছে (আপনার শরীর আলো দ্বারা গঠিত) তা মোটেই সত্য নয়। এভাবে সত্য থেকে মিথ্যায় উপনীত হবার যে টেকনিক উক্ত প্রতারক উদ্ভাবন করেছে তার কোন তুলনা হয় না। শক্তি ও পদার্থের অভিন্নতার তথ্যটিকে কাজে লাগিয়ে প্রতারক তার কাঙ্খিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন।

হয়তো কিছু দিনের মধ্যে কম্পিউটারে ভাগ্য গণনাও শুরু হয়ে যাবে এদেশে। ‘ফরচুন টেলার’ নামে এই ধরনের সফটওয়্যার এখন রয়েছেও। এতে প্রথমে কোন ব্যক্তির জন্ম তারিখ (সঠিক দিন-ক্ষণ) ইনপুট হিসেবে দেয়া হয়, এর পর সফটওয়্যার উক্ত ব্যক্তির ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে তথ্য দিতে থাকে- এর মধ্যে থাকে ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক অবস্থা, অর্থকরী, সঠিক পেশা ইত্যাদি। সঠিক দিনক্ষণ দিতে না পারলেও আপত্তি নেই। ব্যক্তির কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বাড়তি ইনপুট হিসাবে দেয়া হয়। এরপর বের হয়ে আসে ভবিষ্যতের পঞ্জিকা।

এই ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করে অজ্ঞ ও মূখ্য লোককে প্রতারিত করাটা সহজ। এমনকি চমকে দেয়া যায় অনেক শিক্ষিত লোককেও অথচ একটু ভাবলেই বোঝা যায়, কম্পিউটার প্রোগ্রাম কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু বলতে পারে না। এ ধরনের সফটওয়্যার সম্পর্কে প্রিয় পাঠকদের যদি কোনো সংশয় থাকে, তাহলে ইনপুট হিসেবে কোন মৃত ব্যক্তির জন্মক্ষণ দিয়ে দেখতে পারেন। ‘ফরচুন টেলার’ উক্ত ব্যক্তির চমৎকার ‘ভবিষ্যৎ’ বর্ণনা করতে থাকবে।

বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান উন্নতি ও জ্ঞানকে নিজেদের সংকীর্ণ পরিমন্ডলে ব্যবহার করার আর একটি প্রবণতার উল্লেখ সম্ভবতঃ অপ্রাসঙ্গিক হবে না। দ্বিতীয় এ দলটি, প্রথম ও সাধারণ প্রতারক দলের চেয়ে ভিন্নতর, উদ্দেশ্যে ও কাজের ধারায়। সাধারণ প্রতারকদের মূল লক্ষ্য হল, নিজেদের আর্থিক ও বৈষয়িক উন্নতি। আর এই দলটির পরোক্ষ উদ্দেশ্য অর্থ ও ক্ষমতা লোভ হলেও বাহ্যতঃ এরা নিজেদেরকে অন্যভাবে উপস্থাপন করে। তাদের ভাব হল, মানব জাতিকে উন্নতির পথ দেখানোর কাজে তারা নিয়োজিত।

এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কতিপয় জ্ঞানপাপী। নিজের আওতা বহির্ভূত ক্ষেত্রে জ্ঞান ফলানোতে আগ্রহী এসব জ্ঞানপাপীরা প্রবলভাবে দেশকে অন্ধকার ও মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিতে চায়। সাধারণভাবে, জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিজ্ঞান চেতনার ব্যাপক প্রসারই কেবল এসব প্রগতি বিরোধিতার উপযুক্ত জবাব হতে পারে। কিন্তু কে তা করবে?


(collected)
১৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×