somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প

০৪ ঠা মার্চ, ২০১৩ রাত ১১:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২য় পর্বের লিঙ্ক - Click This Link


“ কিন্তু আমার সেই নির্লজ্জ নিরাবরণ নিরাভরণ চিরবৃদ্ধ কঙ্কাল তোমার কাছে আমার নামে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়াছে । আমি তখন নিরুপায় নিরুত্তর ছিলাম । এইজন্য পৃথিবীর সব চেয়ে তোমার উপর আমার বেশি রাগ । ইচ্ছা করে , আমার সেই ষোলো বৎসরের জীবন্ত, যৌবনতাপে উত্তপ্ত আরক্তিম রূপখানি একবার তোমার চোখের সামনে দাঁড় করাই , বহুকালের মতো তোমার দুই চক্ষে নিদ্রা ছুটাইয়া দিক , তোমার অস্থিবিদ্যাকে অস্থির করিয়া দেশছাড়া করি । ”

আমি বলিলাম , “ তোমার গা যদি থাকিত তো গা ছুঁইয়া বলিতাম , সে বিদ্যার লেশমাত্র আমার মাথায় নাই । আর তোমার সেই ভুবনমোহন পূর্ণযৌবনের রূপ রজনীর অন্ধকারপটের উপরে জাজ্বল্যমান হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে । আর অধিক বলিতে হইবে না । ”

“ আমার কেহ সঙ্গিনী ছিল না । দাদা প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন , বিবাহ করিবেন না । অন্তঃপুরে আমি একা । বাগানের গাছতলায় আমি একা বসিয়া ভাবিতাম , সমস্ত পৃথিবী আমাকেই ভালোবাসিতেছে , সমস্ত তারা আমাকে নিরীক্ষণ করিতেছে , বাতাস ছল করিয়া বার বার দীর্ঘনিশ্বাসে পাশ দিয়া চলিয়া যাইতেছে এবং যে তৃণাসনে পা দুটি মেলিয়া বসিয়া আছি তাহার যদি চেতনা থাকিত তবে সে পুনর্বার অচেতন হইয়া যাইত । পৃথিবীর সমস্ত যুবাপুরুষ ঐ তৃণপুঞ্জরূপে দল বাঁধিয়া নিস্তব্ধে আমার চরণবর্তী হইয়া দাঁড়াইয়াছে এইরূপ আমি কল্পনা করিতাম ; হৃদয়ে অকারণে কেমন বেদনা অনুভব হইত । ”

“ দাদার বন্ধু শশিশেখর যখন মেডিকেল কালেজ হইতে পাস হইয়া আসিলেন তখন তিনিই আমাদের বাড়ির ডাক্তার হইলেন। আমি তাঁহাকে পূর্বে আড়াল হইতে অনেকবার দেখিয়াছি । দাদা অত্যন্ত অদ্ভূত লোক ছিলেন — পৃথিবীটাকে যেন ভালো করিয়া চোখ মেলিয়া দেখিতেন না । সংসারটা যেন তাঁহার পক্ষে যথেষ্ট ফাঁকা নয় — এইজন্য সরিয়া সরিয়া একেবারে প্রান্তে গিয়া আশ্রয় লইয়াছেন । ”

“ তাঁহার বন্ধুর মধ্যে এক শশিশেখর । এইজন্য বাহিরের যুবকদের মধ্যে আমি এই শশিশেখরকেই সর্বদা দেখিতাম। এবং যখন আমি সন্ধ্যাকালে পুষ্পতরুতলে সম্রাজ্ঞীর আসন গ্রহণ করিতাম তখন পৃথিবীর সমস্ত পুরুষজাতি শশিশেখরের মূর্তি ধরিয়া আমার চরণাগত হইত । — শুনিতেছ ? কী মনে হইতেছে । ”

আমি সনিশ্বাসে বলিলাম , “ মনে হইতেছে , শশিশেখর হইয়া জন্মিলে বেশ হইত । ”

“ আগে সবটা শোনো । ”

একদিন বাদলার দিনে আমার জ্বর হইয়াছে । ডাক্তার দেখিতে আসিয়াছেন । সেই প্রথম দেখা ।

“ আমি জানলার দিকে মুখ করিয়া ছিলাম , সন্ধ্যার লাল আভাটা পড়িয়া রুগ্‌ণ মুখের বিবর্ণতা যাহাতে দূর হয় । ডাক্তার যখন ঘরে ঢুকিয়াই আমার মুখের দিকে একবার চাহিলেন তখন আমি মনে মনে ডাক্তার হইয়া কল্পনায় নিজের মুখের দিকে চাহিলাম । সেই সন্ধ্যালোকে কোমল বালিশের উপরে একটি ঈষৎক্লিষ্ট কুসুমপেলব মুখ ; অসংযমিত চূর্ণকুন্তল ললাটের উপর আসিয়া পড়িয়াছে এবং লজ্জায় আনমিত বড়ো বড়ো চোখের পল্লব কপোলের উপর ছায়া বিস্তার করিয়াছে । ”

ডাক্তার নম্র মৃদুস্বরে দাদাকে বলিলেন , ‘ একবার হাতটা দেখিতে হইবে । '

“ আমি গাত্রাবরণের ভিতর হইতে ক্লান্ত সুগোল হাতখানি বাহির করিয়া দিলাম । একবার হাতের দিকে চাহিয়া দেখিলাম , যদি নীলবর্ণ কাঁচের চুড়ি পরিতে পারিতাম তো আরো বেশ মানাইত । রোগীর হাত লইয়া নাড়ী দেখিতে ডাক্তারের এমন ইতস্তত ইতিপূর্বে কখনো দেখি নাই । অত্যন্ত অসংলগ্নভাবে কম্পিত অঙ্গুলিতে নাড়ী দেখিলেন। তিনি আমার জ্বরের উত্তাপ বুঝিলেন , আমিও তাঁহার অন্তরের নাড়ী কিরূপ চলিতেছে কতকটা আভাস পাইলাম । বিশ্বাস হইতেছে না ? ”

আমি বলিলাম , “ অবিশ্বাসের কোনো কারণ দেখিতেছি না — মানুষের নাড়ী সকল অবস্থায় সমান চলে না । ”

(চলবে)“ কিন্তু আমার সেই নির্লজ্জ নিরাবরণ নিরাভরণ চিরবৃদ্ধ কঙ্কাল তোমার কাছে আমার নামে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়াছে । আমি তখন নিরুপায় নিরুত্তর ছিলাম । এইজন্য পৃথিবীর সব চেয়ে তোমার উপর আমার বেশি রাগ । ইচ্ছা করে , আমার সেই ষোলো বৎসরের জীবন্ত, যৌবনতাপে উত্তপ্ত আরক্তিম রূপখানি একবার তোমার চোখের সামনে দাঁড় করাই , বহুকালের মতো তোমার দুই চক্ষে নিদ্রা ছুটাইয়া দিক , তোমার অস্থিবিদ্যাকে অস্থির করিয়া দেশছাড়া করি । ”

আমি বলিলাম , “ তোমার গা যদি থাকিত তো গা ছুঁইয়া বলিতাম , সে বিদ্যার লেশমাত্র আমার মাথায় নাই । আর তোমার সেই ভুবনমোহন পূর্ণযৌবনের রূপ রজনীর অন্ধকারপটের উপরে জাজ্বল্যমান হইয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে । আর অধিক বলিতে হইবে না । ”

“ আমার কেহ সঙ্গিনী ছিল না । দাদা প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন , বিবাহ করিবেন না । অন্তঃপুরে আমি একা । বাগানের গাছতলায় আমি একা বসিয়া ভাবিতাম , সমস্ত পৃথিবী আমাকেই ভালোবাসিতেছে , সমস্ত তারা আমাকে নিরীক্ষণ করিতেছে , বাতাস ছল করিয়া বার বার দীর্ঘনিশ্বাসে পাশ দিয়া চলিয়া যাইতেছে এবং যে তৃণাসনে পা দুটি মেলিয়া বসিয়া আছি তাহার যদি চেতনা থাকিত তবে সে পুনর্বার অচেতন হইয়া যাইত । পৃথিবীর সমস্ত যুবাপুরুষ ঐ তৃণপুঞ্জরূপে দল বাঁধিয়া নিস্তব্ধে আমার চরণবর্তী হইয়া দাঁড়াইয়াছে এইরূপ আমি কল্পনা করিতাম ; হৃদয়ে অকারণে কেমন বেদনা অনুভব হইত । ”

“ দাদার বন্ধু শশিশেখর যখন মেডিকেল কালেজ হইতে পাস হইয়া আসিলেন তখন তিনিই আমাদের বাড়ির ডাক্তার হইলেন। আমি তাঁহাকে পূর্বে আড়াল হইতে অনেকবার দেখিয়াছি । দাদা অত্যন্ত অদ্ভূত লোক ছিলেন — পৃথিবীটাকে যেন ভালো করিয়া চোখ মেলিয়া দেখিতেন না । সংসারটা যেন তাঁহার পক্ষে যথেষ্ট ফাঁকা নয় — এইজন্য সরিয়া সরিয়া একেবারে প্রান্তে গিয়া আশ্রয় লইয়াছেন । ”

“ তাঁহার বন্ধুর মধ্যে এক শশিশেখর । এইজন্য বাহিরের যুবকদের মধ্যে আমি এই শশিশেখরকেই সর্বদা দেখিতাম। এবং যখন আমি সন্ধ্যাকালে পুষ্পতরুতলে সম্রাজ্ঞীর আসন গ্রহণ করিতাম তখন পৃথিবীর সমস্ত পুরুষজাতি শশিশেখরের মূর্তি ধরিয়া আমার চরণাগত হইত । — শুনিতেছ ? কী মনে হইতেছে । ”

আমি সনিশ্বাসে বলিলাম , “ মনে হইতেছে , শশিশেখর হইয়া জন্মিলে বেশ হইত । ”

“ আগে সবটা শোনো । ”

একদিন বাদলার দিনে আমার জ্বর হইয়াছে । ডাক্তার দেখিতে আসিয়াছেন । সেই প্রথম দেখা ।

“ আমি জানলার দিকে মুখ করিয়া ছিলাম , সন্ধ্যার লাল আভাটা পড়িয়া রুগ্‌ণ মুখের বিবর্ণতা যাহাতে দূর হয় । ডাক্তার যখন ঘরে ঢুকিয়াই আমার মুখের দিকে একবার চাহিলেন তখন আমি মনে মনে ডাক্তার হইয়া কল্পনায় নিজের মুখের দিকে চাহিলাম । সেই সন্ধ্যালোকে কোমল বালিশের উপরে একটি ঈষৎক্লিষ্ট কুসুমপেলব মুখ ; অসংযমিত চূর্ণকুন্তল ললাটের উপর আসিয়া পড়িয়াছে এবং লজ্জায় আনমিত বড়ো বড়ো চোখের পল্লব কপোলের উপর ছায়া বিস্তার করিয়াছে । ”

ডাক্তার নম্র মৃদুস্বরে দাদাকে বলিলেন , ‘ একবার হাতটা দেখিতে হইবে । '

“ আমি গাত্রাবরণের ভিতর হইতে ক্লান্ত সুগোল হাতখানি বাহির করিয়া দিলাম । একবার হাতের দিকে চাহিয়া দেখিলাম , যদি নীলবর্ণ কাঁচের চুড়ি পরিতে পারিতাম তো আরো বেশ মানাইত । রোগীর হাত লইয়া নাড়ী দেখিতে ডাক্তারের এমন ইতস্তত ইতিপূর্বে কখনো দেখি নাই । অত্যন্ত অসংলগ্নভাবে কম্পিত অঙ্গুলিতে নাড়ী দেখিলেন। তিনি আমার জ্বরের উত্তাপ বুঝিলেন , আমিও তাঁহার অন্তরের নাড়ী কিরূপ চলিতেছে কতকটা আভাস পাইলাম । বিশ্বাস হইতেছে না ? ”

আমি বলিলাম , “ অবিশ্বাসের কোনো কারণ দেখিতেছি না — মানুষের নাড়ী সকল অবস্থায় সমান চলে না । ”

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০১৩ রাত ৩:০২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×