সেদিন হঠাৎ একটা রেডিও চ্যানেলে কান সপে দিতেই বিচিত্র এক বাংলাভাষা সয়ে যেতে হল। স্ফূর্তির পরিবর্তে এক অজানা শংকায় মন ভরে উঠল। এ কেমন বাংলা! মুখের ভিতরে দু’টি মার্বেল রাখলে, লোল ও মার্বেলে মিলে যে একটা ‘কলকলা’ তৈরী হয় প্রতিটি শব্দ যেন সেই কলকলা মাখানো, স্পষ্ট উচ্চারণের পরিবর্তে একটা পাকামো-ন্যাকামো। সে ভাষার গতি অদ্ভুদ। ভাষায় আমি তা বুঝাতে অম। প্রতিটি বাক্যে অজস্র অনর্থক ইংরেজি শব্দ। ইংরেজির উচ্চারণও বিচিত্র। রবীন্দ্রনাথের সেই উক্তি মনে পড়লো- ‘বাংলাটাও ভুলে গেলে, ইংরেজিটাও শিখতে পারলে না’। কোন কোন বাক্য ‘ওয়েল’, ‘সো’, ‘এন্ড’, ‘বাট’ ইত্যাদি সংযুক্ততায় বাঁধা, যেমন- ‘ওয়েল, আমরা এখন গানটি শুনি’ অথবা ‘আপনি একজন সেলিব্রেটি সো আপনার পছন্দের গান অবশ্যই আমরা শুনাবো’। আবার কোন কোন বাক্যে সবটাই ইংরেজি কেবল সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে ‘এবং’, ‘তাই’ ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।
তখন রেডিওটিতে মহান একুশের বই মেলা উপলে অনুষ্ঠান চলছিল। উপস্থাপক বিচিত্র বাংলায় একুশের গুনগান ও গুরুত্ব বর্ণনা করছিলেন। প্রায় কিছুণ পরপরই তিনি ‘লিসনার্স’ বলছিলেন। প্রথমে বুঝিনি। আমার অনভিজ্ঞতাই এ জন্য দায়ী ছিল। পরে বুঝলাম এটা শ্রোতামন্ডলি’র ইংরেজি প্রতিশব্দ। শ্রোতামন্ডলিতে কি এমন দোষ পড়লো বুঝলাম না। হ্যাঁ, তাইতো, টেলিভিশনেও তো দর্শকমন্ডলীর পরিবর্তে আজকাল বলা হচ্ছে ‘ভিউয়ার্স’। নিশ্চয়ই তা হলে দোষ পড়েছে!
পরের ঘটনা আরো চমৎকার(!)। রেডিওটিতে তখন বিখ্যাত এক শিশু সাহিত্যিকের সাাতকার চলছিলো, তিনি ডগমগ করে কত মন-মুগ্ধকর কথাই না বলছিলেন। এক ফাঁকে হঠাৎ তিনি ‘উইশ’ চাইলেন- কাকে যেন হাসপাতালে দেখে এসেছেন তার জন্য আমরা যেন ‘উইশ’ করি। ভদ্রলোক দোয়া না চেয়ে চাইলেন ‘উইশ’, বোধ হয় তিনি দোয়ায় বিশ্বাসী নন। এটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু বাংলা ভাষায় সুপন্ডিত হওয়া সত্ত্বেও শুভকামনা, মঙ্গলকামনা, অরোগ্য কামনা ইত্যাদির মত বাংলা শব্দ থাকতে উইশকে তিনি আমদানী করলেন কেন? নাকি আধুনিক (!) হবার জন্য করেছেন? অথবা অনুকরণ কিংবা অসাবধানতা বশত:? তার মত একজন সুসাহিত্যিকের যেখানে বাংলাভাষার প্রতি দায় দায়িত্ব অনেক বেশী তিনিই কি না বিজাতীয় সংস্কৃতির এক ভিন্নরূপ দর্শনের প্রতিভূ শব্দ ‘উইশ’ কে এনে আমাদের পুত পবিত্র বাংলা ভাষায় মিশেল করছেন। তা হলে বিচার চাইবো কার কাছে? সরষের মধ্যেই ভূত। শামসুর রাহমানের কবিতাই যথার্থই মনে হল- ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’।
আমরা আজ ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লিখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। পাকিস্তান আমলে আমাদের মাতৃভাষাকে দুর্বল করার জন্য উর্দু কিংবা আরবী অক্ষরে বাংলা লেখার কথা ভাবা হয়েছিল। আমরা সেদিন তা হতে দেইনি, রক্ত দিয়ে রুখে দিয়েছি। এখন নিজেরাই তা করছি, ভেবে দেখেছি কি?
ব্যাপারটা না হয় বাধ্য হয়ে। কিন্তু এই যে শিশুর ‘রা’ ফুটবার সময়েই আমরা তার মুখে ‘টাটা’ তুলে দেই, এটাও কি বাধ্য হয়ে? সালাম, আদাব এ কোনো তি আমরা আবিস্কার করেছি কি? তা না হলে আমরা কি ধীরলয়ে ‘টাটা’র দিকেই এগিয়ে যাব বলে ঠিক করেছি?
চাচা, জ্যাঠাকে ঝেটিয়ে আংকেল, চাচী, জ্যাঠির বদলে ‘আন্টি’ এখন এমন সহনীয় হয়ে গেছে যে বাংলাটা বললেই কেমন কেমন যেন লাগে। বিজাতীয় টেলিভিশন দেখে ম্যাম, মম ইত্যাকার সম্ভাষনে আমরা অভ্যস্থ হচ্ছি নিত্যদিন। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো ‘মা’এর মত মোহনিয় ধ্বনি হারিয়ে যাবে, ‘বাবা’র মতো সৌম্য ধ্বনি বিদায় নেবে একদিন।
একুশের চেতনার মর্মমূলে বাংলাভাষার প্রতি যে মমত্ববোধ থাকার কথা, বাংলাভাষার উৎকর্ষ সাধনে যে প্রচেষ্টা ও প্রয়াস থাকার কথা, ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে যে বিশুদ্ধতা থাকার কথা তার পরিবর্তে বিপরীতমুখি এই যাত্রা একুশের চেতনার মুলে কুঠারাঘাত করে। একদিকে একুশ নিয়ে মাতামাতি অপরদিকে বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রতি মোহ ‘গাছ কেটে পানি ঢালা’র শামিল।
টেলিভিশনে, রেডিওতে অদ্ভুত সব কেরিকেচার ও বেশভুষা সমেত গান, অনুকরণপ্রবন অনুষ্ঠানমালা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে শাসন করে যখন কোন এক অচেনা বন্দরে নিয়ে যাচ্ছে তখন আবার দুই শ্রেনীতে সমাজ বিভক্ত হয়ে আছে- এমন দেখা যায় যে কেউ কেউ ‘আহলান-সাহলানে’ স্বস্তি পান বটে, ‘আংকেল’ এলেই বিরক্তি ঝড়ান, আবার কেউ টাটা ড্যাডিতে আপত্তি তোলেন না কিন্তু ‘আহলান- সাহলান’ একদম সহ্য করতে পারেন না। আমরা তাদের কারো দলে নই। আমরা বলতে চাই যখন বাংলা বলব লিখব চর্চা করব তখন তা শুদ্ধভাবেই করার চেষ্টা করবো, তদ্রুপ যখন ইংরাজী চর্চা করব তখন তা শুদ্ধভাবেই করব। আর ইংরাজী তো আমাদেরকে বাঁচার জন্যই জানতে হবে। অনর্থক অন্য দেশ থেকে কোন ভাষা আমদানী করাকে আধুনিকতা মনে হলেও একদিন হয়তো দেখবো আমাদের মাতৃভাষা কফিনে বন্দি হয়ে আছে মৃত ভাষার কাতারে।
অবশেষে হাসানের গল্প বলি। মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় আমাদের কাশে তিন জন হাসান ছিল। তাই কোনজন কোন্ হাসান এটা বুঝার জন্য পৃথক নামকরণের প্রয়োজন হল। একজন চশমা পড়তো বলে তার নাম হল ‘অপটিক হাসান’। একজন খুব বাড়িয়ে গালগল্প ছুড়তো, আমরা তাই অনায়াসে তার নাম দিলাম ‘গুল হাসান’। বাঁধ সাধলো তৃতীয় জনে এসে, তার নাম কি দেব। অবশেষে তার নামটাই যুৎসই হল এবং তা বসে গেল। তৃতীয় হাসান কথার মধ্যে ঘন ঘন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতো। এভাবে নিজেকে স্মার্ট হিসাবে তুলে ধরতে গিয়ে সে আমাদের কাছে বিষতুল্য হয়ে গেল। অবশেষে তার নাম পড়লো ‘পয়জন হাসান'’।
সামান্য একটা বাতিকের জন্য সেদিন হাসান আমাদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল অথচ আজ তার সর্বগ্রাসী দংশনে সমগ্র বাংলা ভাষা বিষে নীল হয়ে যাচ্ছে। আমরা তা সহ্য করব কি?
[ভুল বানানের জন্য ক্ষমা করুন]
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ রাত ১০:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




