দু'দিন আগে 'প্রিয় চট্টগ্রাম' গ্রুপে সদস্য হলাম। অনেক কথা মনে পড়ে গেল। আমার স্বর্নালি সময় কেটেছে এই প্রিয় চট্টগ্রামে। অশ্টম থেকে দ্বাদশ। সাত বছর। হিসাবে খটকা লাগছে? দ্বাদশে দু'বার ডাব্বা মেরেছিলাম। মিলেছে? হাসছেন, "ব্যাটা তোমার বানানের যা ছিরি, তো তুমি ডাব্বা মারবা না তো কে মারবে!" ঐ ইতিহাসে যাব না, তাতে যা কাল বিড়াল আছে তা প্রকাশ করতে আরো হিম্মতের দরকার আছে।
আমার জীবনের যাবতীয় অনুভুতির অঙ্কুরোদগম হয়েছে এই চট্টগ্রামে। আমি যে আলাদা একজন ব্যক্তি, আলাদা একটা অস্তিত্ব - আমার 'আমি'কে চিনতে শুরু করি তখন থেকে। সেসময়কার কত অনাবিল প্রকৃত হাসি-আনন্দ, গোপন-গভীর দির্ঘশ্বাস, কাঁচা রগরগে সুখের শব্দ যে পতেঙ্গা'র ইথারে ভেসে বেড়াচ্ছে !! এখন এই উনচল্লিশের প্রাতিশ্ঠানিক হাসি, মেকি দুঃখবোধ, ভান করা চমকিত হওয়া, স্থান-কাল-পাত্র-অবস্থান ভেদে সুখিভাব-দুঃখিভাব বোঝানো নিজেকে প্রতারক ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় না।
পতেঙ্গা এয়ার ফোর্স ক্যাম্প ছিল সেসময় মুল শহর থেকে অনেক দুরে। এই দুর, দুরত্বের কারনে নয়। ১২ কিলো কোন দুরত্ব না। দুরত্ব এই জন্য যে তখন সল্ট গোলার পর শহরের ব্যস্ততা একদম শুন্য হয়ে যেত। ১৯৮২ সালে সন্ধ্যা পর সিমেন্ট [ইসা খাঁ নেভাল গেইট] ক্রসিং এর পর সাধারন মানুষের যাতায়াত যেত একদম কমে। শুধু শিপইয়ার্ডের কারনে জাহাজি মানুষের আনাগোনা থাকত। সল্ট গোলা ফ্লাই ওভার টার পর রাস্তার দু'পাশে খালি জায়গা, পুকুর নজরে আসত। এখন যেখানে সেইলর্স কলনি [দক্ষিনে] মেইন রোডে দাড়ালে দুরে সাগর পাড়ের ঝাউবন দেখা যেত। বারেক বিল্ডিং পার হলে হাপ ছেড়ে বাঁচতাম যে শহরের ব্যস্ততার বাহিরে চলে এসেছি।
বার্ষিক পরীক্ষা শেষে সকালের নাস্তার পর বেরিয়ে পড়া, সারাদিন টো টো.. .. ক্যাম্পের লিজ করা ক্ষেত থেকে কাঁচা টমেটো'র সাথে ক্ষেতেরই কাঁচা মরিচ খাওয়া অমৃত লাগত। এরপর বসিলা'র [ক্ষেতের মালিক] দাবড়ানি... .. তার ক্ষেত ছিল বিশাল। সে ছুড়ত তার ক্ষেতের মাটির ঢেলা আর আমরা মারতাম তার ক্ষেতেরই কাঁচা টমেটো। খারাপও লাগে, হাসিও পায়। বসিলা মাপ করে দিও।
পরীক্ষা পর প্রতি শুক্রবার পতেঙ্গা বিচে গোসল ছিল অবধারিত। কলনি থেকে, হেটে বিমানের রানওয়ের ধার ঘেসে মাইজপাড়া হয়ে সি-বিচ। নিয়ে আসা বাটার-বন আর কলাতে খিদা মিটত না। বিচের অদুরে ছিল বাধ তারপর ঝাউবন তারপরে বিস্তির্ন তরমুজ ক্ষেত। পতেঙ্গার বিখ্যাত তরমুজ। দু'জন থাকত বাঁধের উপর দাড়িয়ে ক্ষেতের লোকজন কোথায় আছে, বাকিরা যেত তরমুজ সংগ্রহে। কোনটা পাকা কোনটা কাঁচা বোঝা উপায় নেই, সাইজ দেখে নিয়ে আসা। পাথরে আঘাত করে ভাঙ্গা, ওভাবেই খাওয়া, খেতাম মুখে কিন্তু নাক, চোখের পাতা, ভুরু, থুতনি কিছুই বাদ পড়ত না।
দিন দিন পাকনা হতে লাগলাম। পিচ্চিদের পাথরের খাঁজে রাখা বিয়ারের ব্যবসা। ৮/১২ টাকায় বিয়ারের ক্যান দাম দেখে অবাক হচ্ছেন, অবাক হওয়ার কিছু নাই। সময় ১৯৮২ সাল। আর এটা ছিল টোকাইদের ব্যবসা। জাহাজীদের একদম পানির দরে জাহাজ পোর্টে ঢোকার আগে ওগুলো এই পিচ্চিদের কাছে চালান হয়ে যেত। ক্লাস নাইনে প্রথম বিয়ার পান !!! বিয়ারে কি হয়েছে কে জানে। সেটা অন্য। আমরা ক্যান হাতে নিয়ে খাওয়ার আগেই ঢুলে ঢুলে হাটতাম, জড়িয়ে কথা বলতাম। ভাবখানা এরকম বিয়ার শব্দটার ভেতরই মাতাল ভাব আছে। 'বিয়ার' শব্দ শুনলেও ঐরকম আচরন করতে হয়। আর এভাবেই কখন যে আড়াই-তিন মাইল চলে আসতাম টের পেতাম না। এর মাঝেই কখন যে হাতে সিগারেট চলে আসছে কেউ মনে রাখত না।
কলনিতে ঢোকার আগে বিপরিতমুখি দু'টি আচরন করতাম। এক, কলনির সমবয়সি মেয়েদের দেখাতে হবে নায়ক সাজে সিগারেট খাচ্ছি দুই, অফিস ফেরত বাপ-চাচারা যেন না দেখে এই সিগারেট খাওয়া।
নস্টালজিয়া - যত ভাবি তত ভাল লাগে, তত ডুব দিতে ইচ্ছা করে।
.......চলবে
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ১১:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



