চৌদ্দগেরাম বাজারের চিপায় চাপায় পলিথিন বেইচা দিন চলে আমার । এদ্দুরা জীবনেই বহুত প্যাঁচ-গোচ চিপাচাপা শিখলাম । আইনেও, মাইনষের জীবনেও , মাইয়াগের কতা না হয় নাই কৈলাম । পিচ্চি পুলা । মাইয়া মানুষ নিয়া গেয়ানী কতা বলা ঠিক হৈব না । আইনে আর বেআইনে জিনিসের কোন হেরফের হয় না তেমন, খালি চেন্জ হৈয়া যায় বেচাকিনির সময় আর কারা বেচে সেই লোকগুলা । পন্ডিত জ্যাঠাত ভাইডা থাকলে কৈত, পণ্যের দামের লগে ঝুঁকির দাম যোগ হৈয়া মুনাফা বাড়ে । হ, মুনাফা তো বাড়েই, আবার সেই মুনাফাই সময়ে সময়ে লাল সুতা হৈয়া হোগা দিরা বাইর অয় । অবশ্য সেইসব ঘটনায় দুইন্যাদারিতে কুন ভাটা পড়ে না । যাগো হোগা দিয়া সেইগুলা বাইরায় তাগো হোগা দিয়া এমনেও ভালা কিছু বাইরায় না । হেল্লাইগাই আইনে আর বেআইনে বেচাকিনার মাইনষের বদল অয় । দুইটা ঢাউস তরমুজের মত দুধালি আন্নির মার জামাই তাই এই ব্যবসা ছাইড়া ফলের ব্যবসায় নামে । রিস্ক জুগ কৈরা দুইদিন পরে রাস্তার ধারে পইড়া থাকলে ফুলের মত ফুটফুইট্যা আন্নিরে কুলে নিয়া টিভি দেখবো কিডা পরদিন । হেল্লাইগাই ফাঁসির বটগাছ রাস্তার মাথায় ভাজিবুট বেচনের ব্যবসা ছাইড়া আমি পলিথিনের লগে ঝুঁকির দাম নেওনের লাইগা নাচতে নাচতে এই ব্যবসায় চৈলা আসি । হাজার ট্যাকা নিয়া যাই আর লাল সূতা নিয়া যাই আমার রাইতে শুইতে হৈব সেই পুরির দোকানে মইত্যার লগে কাঠের বেঞ্চেই ।
দার্শনিক না হৈয়াও জীবনে দৌড়াইতে দৌড়াইতে শিখলাম অনেক কিছুই । সবচে বড় যেইটা শিখছি সেইটা হৈল দৌড় একবার শুরু হৈলে আর থামেনা । কারু কারু হয়ত থামে । যাগো দৌড় শখের দৌড় । মাগার পিছে পাগলা কুত্তার লুল নিয়া যারা দৌড়ায় তাগো দৌড়ানি থামেনা । অবশ্য দৌড়াইতে যে আমার হৈবই সেইটা বোধহয় জন্ম নেওনের আগ থাইকাই ঠিক হৈয়া আছিল আমার লাইগা । আধা-বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বাপ আর মামলা কৈরা ঘরের ভিটাডা বাকি রাইখা বাকি সব বেইচা দেয়া দাদার ঘরে জন্ম নিলে দৌড়ের উপ্রে যে থাকতে হৈব সেইটা বুঝার লাইগাতো আর গুণিন হওন লাগে না । তবু বাপ থাকতে থাকতে যে কয়দিন জীবনের, যেইগুলার কতা এখন আর মনেই নাই, এমনকি বাপের মুখও মনেই নাই , সেই দিনগুলানে ধৈরা নেওন যায় দৌড় তখনো শুরুই হয় নাই । শীতের একদিন সক্কালে দত্তসার দীঘিপাড়ে ঢাকা-চিটাগাং হাইওয়েতে টেরাকের বাইরে বাড়াইয়া থাকা লোহার পাইপের লগে বাড়ি খাইয়া আধা-বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বাপ কান দিয়া রক্ত ছাইড়া মইরা গেলেই শুরু হয় আমার দৌড় । অবশ্য দিনক্ষণের হিসাবে যারা একটু খুতখুইত্যা তারা হয়ত বাপের চল্লিশা পর্যন্ত দৌড় হিসাবে ধরতে চাইব না । চল্লিশার পরেই না চাইরপাশে নদী দিয়া ঘিরা আকদিয়ার জামেয়া উলুমিয়া ইসলামিয়া এতিমখানার হেফজখানায় আমার পিঠ দিয়া পাহাড় ঠেলনির চাকরি শুরু হয় ।
নদীর মাইঝখানে একটুখানি জঙ্গলের মত আকদিয়া গেরামখান । আমার নিজের গেরামে এত ঘন ছায়া , এতখানি শ্যামল পানি দেখি নাই । ভালাই হয়ত লাগে কয়েকদিন । কিন্তু প্যাচাইন্যা প্যাচাইন্যা আরবি হরফগুলা গুলাইয়া আসে কয়েকদিনেই । ঠিকমত লুঙি পরতে না পারইন্যা মকবুল মকছুদ যেমন তরতর কৈরা পারার পর পারা মুখস্ত কৈরা যায় , আমি তেমন পারি না । একটা রুকু শেষ করতেই আমার মাসের পর মাস পার হৈয়া যায় । বাপ থাকতে দুই বচ্চর ইশকুলেও গেছিলাম । তখনো মনারে মনা কুতায় যাস মনে আছে । আর বিশেষ কিছু অবশ্য মনে নাই । বিলের ধারে মনে হয় যায়, কিন্তু গিয়া কি করে সেইটা আর মনে নাই । নাম লেখতে গিয়া একদিন ভুল কৈরা অন্তস্থ্য য এর ফুটা না দেওনে ফুফাত বৈন আমারে চেতায় এযাছিন ডাইকা । অক্ষরে অক্ষরে এত প্যাঁচ, কয়টা মনে রাখমু আমি । পড়া আগায় না ।
ফুফার বাড়ি গেরামে হওনে খাওনের কষ্ট হয় না । গেরামের পুকুরর পানির চাইতেও পাতলা ডাইল দিয়া লোহার মত শক্ত রুটি খাওনের দরকার নাই । ফুফুর কাছে চৈলা যাই প্রতিবেলা । শুধু আরবি হরফের প্যাঁচ ছাড়া দিনগুলা হয়ত ভালাই চলতাছিল । অন্তত জামাইর তৃতীয় বা চতুর্থ বিয়ার বিরোধিতা কৈরা ধোলাই খাইয়া , বড় ফুফাত বইনের বাপের বাড়ি ফিরা আসনের আগ পর্যন্ত । সাথে আসে তার চ্যাঙড়া বড় পুলা আর কলমিলতার মত, ঘনকালা মুখের শারমিন তার দুই চাইরডা গ্যাদাগুদা । বয়সের হিসাব রাখনের মত বিলাসি আমার অবস্থা না । খালি মনে আছে তিনকোনা জায়গাডাতে কিছু পশম একটু বেশি কালা হৈয়া উঠতাছিল ।
কলমিলতার মত ঘনকালা মুখের শারমিন আমার ভাগনি । বান্দরডা তবু আমারে মামা না কৈয়া এযাছিন কৈয়াই ডাকে । আগে কুনদিন দেখি নাই ওরে । চিটাগাঙ থাইকা ওরা কখনো আইছে বৈলাও শুনি নাই । কিন্তু এখন ফুফাত বইনের মুখে এযাছিন ডাক শুনলে মিজাজ গরম হৈলেও শারমিনের মুখ থাইকা শুনতে ভালাই লাগে । চ্যতার ভাব ধরলেও , কিরে কালা বান্দর বৈলা জবাব দিলেও ভিতরে আমার ভালাই লাগে । মাঝে মইধ্যে টিভিতে দেখা দুই একখান সিনেমার মত কৈরা ছুডকালে খেলার সাথীর মত মনে হৈতে থাকে ওরে আমার কয়েকদিনেই । জলার দেশের কলমিলতার মতই ছিপছিপা লম্বা শারমিন । ওর মাথাডা আমার মাথার আধহাত উপ্রে হৈলেও চুরি কৈরা ঘর থাইকা পাঁচ ট্যাকার নুটটা আইনা আমারেই দেয় টিপ কিন্যা আইনা দেওনের লাইগা গুণবতি বাজার থাইকা । দুই ট্যাকা আমার খরচা সেইটাও বৈলা দেয় । নৌকায় কৈরা আনতা বসাইতে যাওনের সময় আমারে নিয়া যায় । জ্যাঠাত ভাইয়ের খালাত ভাইয়ের চাচাত বইন বিউটির শ্বশুর বাড়ির ঘাট দিয়া যাওনের সময় , কিরে এয়াছিন আনতা কয়ডা বসাইতাছস কৈয়া টিটকারি করলে , আমি নিজে কিছু না বুঝলেও শারমিনের ঘনকালা মুখেও হাল্কা লাল রঙ দেখা যায় ।
তার কয়দিন পর থাইকাই হেফজতে আমার অগ্রগতি নিয়া ফুফু হঠাৎ কৈরাই খুব চিন্তিত হৈয়া যান । খাইতে গেলে খাওন শেষ হওনের পরপরই খেদাইয়া দিতে থাকেন । যা যা, মাদরাছাত যা । পুলাপাইন সব হাফেজ হৈয়া গেলো তুই অহনো দুই পারাত পইড়া আছস, এইসব বৈলা আমারে পাঠাইয়া দেয়া হৈতে থাকে । শারমিনরেও আশেপাশে দেখা যায় না । ঘনশ্যাম আকদিয়ার ছায়া আমার আর ঠান্ডা লাগে না । গনগইন্যা রইদের মত জীবনে রইদ খালি বাড়তেই থাকে । হেফজখানার ঠান্ডা মাটিত ভিজা খেতার মত শুইয়া থাকতে থাকতে ঘোড়ায় চইড়া শারমিনরে পিছনে বসাইয়া নদি ধূলাউড়া মাঠ পাড়ি দেওনের স্বপ্ন দেখতে দেখতে খালি জীবন নিয়া বিতৃষ্ণাই বাড়ে আমার । নদীর অন্য পাড় থাইকা আসা দুস্ত একবালের বাড়িত গিয়া একদিন সকালে দুইদিনের লাইগা সাইকেলডা চাইয়া নিয়া আমি বাইর হৈয়া পড়ি । বইলা যাই মারে দেখতে যাইতাছি । তাত্তারি যাইতে হৈব তাই সাইকেল । নিজে জানি আর কুনদিন ফিরা আসবো না ।
সেই সাইকেল পরদিনই এগারশো ট্যাকায় সুলেমান মিস্ত্রির কাছে বেইচ্যা শুরু হয় আমার দৌড় । মাইঝখানে অনেক দৌড়াইয়া এখন আমি চৌদ্দগেরাম বাজারের চিপায় চাপায় দিনের বেলার আন্ধারে পলিথিনের ব্যাগ সাপ্লাই দেই । পলিথিনের দামের লগে ঝুঁকির দাম মিশাইয়া লাভ বেশি করি । কিন্তু সেই ঝুঁকির দামও মাঝে মইধ্যে দিতে হয় । আচমকা পুলিশ আসে কুনদিন । মাসভর্তি জমা হওয়া ঝুঁকির দাম একদিনে শোধ করতে কষ্ট লাগলেও , বুটের লাত্থির কষ্টের তুলনায় সেইডা কিছু লাগে না ।
পাইকারি কিনতে যাওনের লাইগা যেই চৌদ্দশ ট্যাকা নিয়া আইছিলাম সেইগুলা দিয়া লাত্থি থামাইলেও হাজতে যাওন থামানি যায় না । চাচা জ্যাঠা খালু ফুফা খালাত ভাই খালাত ভাইয়ের চাচাত ভাইগো নাম কৈয়া আরো লাঠির বাড় ঠেকানি যায় । নামগুলা বৈলা আমি ভালা পুলা বা আমার পরিচয় আছে এইটা বুঝানি না । বুঝানি হৈল আমি আরো ট্যাকা দিতে পারমু জোগাড় কৈরা এইটা বুঝানি । কচুরিফেনার মত যারা তারাই খালি এই ব্যবসায় আইলেও দুইএকখান শিকড় না থাইকলে ঝুকির দামের ট্যাকার লগে জানডাও যায় । যেমন এইবার যাইব বৈলা মনে হয় মাইনুদ্দিনের । হালার লগেও ট্যাকাও কম আইজকা , কারো নামও নিতে পারে নাই বৈল তারে আর হাজতে আইনা কষ্ট করে না পুলিশ । মাথায় ব্যাটনের বাড়ি পেটে বুটের লাত্থি মাইরা বাজারে শেষপাশে ডেরেনের লগে যেই কলঘরে হালায় রাইতে শুইত সেইখানেই ফালাইয়া যায় তারা ।
তিনদিন পরে জ্যাঠাত ভাইয়ের খালাত ভাইয়ের চাচা চিওড়ার গেরামের মেম্বার রফিক ছাব আমারে ছাড়াইয়া নিয়া গেলে যাওনের সময় দেখি মাছি ধরা মইনুদ্দিনের লাশ পইড়া আছে সেই কলঘরের লগেই । সেইটারে পুলিশের গাড়িতে কৈরা কুমিল্লা নিয়া যাওয়া হয় । তারও তিনমাস পরে জ্যাঠাত ভাইয়ের মামাত বৈন, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রি রুমা আফা সেই মাইনুদ্দিনের ফুলা ধনডা হাতে নিয়া টিচারের কাছে পেনিসের আইটেম পরীক্ষা দেন ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১০ দুপুর ১:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




