আজব এক নেশায় পাইয়া যায় আমারে । ঠিক কোনদিন কোনক্ষণ থাইকা শুরু মনে নাই । এই শহরের আশি ভাগেরও বেশি মানুষ থাকে এই শহরতলিগুলাতে । পিপড়ার দলের মত গিজগিজ কৈরা । ছোটকাল থাইকা চিনা মোড়ও হঠাৎ কৈরা একসময় অচেনা লাগা শুরু করে । রাস্তায় মানুষের স্রোতের আকার বাড়ে, গতি বাড়ে আর বাড়ে বৈচিত্র । একসময় সাতসকালের পথচারীগুলা সব চিনাজানা ছিল । হয় লেকতের বুড়া বাপ নাইলে রানার দাদা নাইলে হানিফের দাদা । আর কোনকোনদিন নেহাত সূর্য পশ্চিম দিকে উঠলে মিথিলার বাপরেও দেখা যাইত আধোয়া গোলটুপি মাথায় দিয়া মসজিদ থাইকা ঘরে ফিরতাছে । হলুদ ফ্রক পইরা ইশকুলে যাওয়া পিচ্চিগো ভিতরে নোয়াখাইল্যা সুমইন্যার দুই বইন নাইলে ভোটকা হাসানের বান্দর বইনডা, নীল ফ্রকে ।
এখন সাতসকাল আসে কম । তাও যে কয়দিন আসে, সেইগুলাও অচেনা লাগে । হলুদ ফ্রক নীল ফ্রকের মিছিল যায় , তাও একটা না , কয়েকটা । বেশিরভাগই অচেনা । মিছিলে আরেকটা নতুন দল যোগ হৈছে । গ্রিলের দোকানদার কালাম ইন্জিনিয়ার বাড়ি বেইচ্যা যাওনের পর সেই বিশাল জলায় এখন একটা ছোটখাট গেরাম চৈলা আসছে । সাতসকালে সেইখান থাইকা বাইর হয় ময়লা ছিঁড়া শাড়ি পরা একটা দল । বাসায় বাসায় যাইয়া আটা বেলা আর ঘর ঝাড়ু দেওনের কামে যায় মাতারিরা । তাগো মধ্য থাইকা এই বিশেষ মাইয়ার উপর কোন কারনে হঠাৎ আমার চোখ যায় এখন ভুইলা গেছি । হইতে পারে মাথায় গুনগুন কৈরা সুরা আল শামস ভাজতেছি এমন সময় তার কোলের পিচ্চির বিতিকিচ্ছিরি চিক্কুরে মনোযোগ ছুইটা যাওনে, অথবা খোলা রাস্তায় আঁচলের তলে লুকাইয়া পিচ্চিরে দুধ খাওয়াইতে খাওয়াইতে উধ্বর্শাসে ছুটতাছে একটা অল্পবয়স্কা মাইয়া এই দৃশ্য সচরাচর দেখা যায়না বৈলা । না খাওনের লাঙলচষা মুখের মধ্যেও অল্পবয়সের ছাপ এখনও যায় নাই । ইশকুলে পড়া আমার ছোট বইনের সমবয়সীই হৈব বৈলা মনে হওয়াতে নজর গেছে তা না, কিন্তু সেইকারনে পরের সাতসকালেও তারে খেয়াল কৈরা থাকতে পারি ।
একবার চোখে পড়ার পর অনেক জায়গায় অনেক সময় মাইয়াটারে, মাতারিটারে আমি দেখতে পাই । কালামের প্রাক্তনবাড়ির পাশে বিকালে ছোট পোলাপান বড় পোলাপান মিল্যা ফুটবল খেলনের সময় দেখি তার নিত্য সংসারের বিভিন্ন ছোটখাট ঘটনা । কি কারনে রাগ কৈরা ওর মুখে এলুমিনিয়ামের বদনা ছুইড়া মারে ওর স্বামী, এমন নিত্যনৈমিত্তিকও যেমন দেখা যায় আবার জামাই বউ বড় পোলা কোলের পোলা মিল্যা মুরগি জবাই করনের বার চান্দে একবার ঘটা ঘটনাও দেখা যায় । কোন প্রাইভেসি নাই । খেলায় মনোযোগ ছুইটা যাওনে, খালি ঠ্যাঙটা লাগাইলেই যেই গোল সেই গোল মিস করায় ইলিয়াসের ঝারি খাইতে হৈলেও থাইকা থাইকা আমার মনোযোগ ছুইটা যায় কল চাপা মাইয়ার দিকে । ছোটখাট মাইয়া পুরা শইল্যের ভার দিয়া ভালোমত পানি বাইর করতে পারেনা । একদিন চাপকলের ডান্ডাটা স্প্রিং এর মত ছুইটা থুতনিতে , ঠোঁটে বাড়ি খাইলে তার পরের কয়েকদিন সাতসকালে তারে দেখি ঘা নিয়াই পুলার মুখে চুমা দিতে দিতে কামের বাড়ির দিকে দৌড়াইতে ।
রাইতে খাওনের পরে বিড়ি টাননের অভ্যাস নিয়া সমস্যায় পড়ছিলাম । ঘরে বৈসাতো আর টানন যায় না । এদ্দিন টাননের যায়গা আছিল চুন্নুর দোকানের লগের আন্ধার গল্লিতে । এখন এই নতুন আগ্রহ নিয়া চুলকানি বাড়লে সেই জায়গা ট্রান্সফার হয় কালামের বস্তির পাশে । কালাম ব্যাটা জমি বেইচাও মইরা যায় না । এই বস্তির নামই হৈয়া গ্যাছে এখন কালামের বস্তি । কোন এক স্বর্গীয় কোয়েনসিডেন্সে এই মাইয়ার ঘরটা রাস্তার লাগোয়া । বিকালে বা সাতসকালে যেইখানে চোখের দেখায় আমি টুকরা টুকরা ঘটনা দেখতাম এখন সেইগুলা আমি নিজের মাথায় বানাই টুকরা টুকরা শব্দে । সর মাগি বৈলা ওর জামাই খ্যাকাইয়া উঠলে আমি বুঝি বিছনার জায়গা তাগো পর্যাপ্ত না । অথবা তারস্বরে চিল্লাইয়া উঠা পিচ্চির কান্দন হঠাৎ কৈরা থাইমা গেলে বুঝি বদমেজাজি জামাইর মাইর থাইকা বাঁচানির লাইগা পোলার মুখ চাইপা ধরছে সে । তারপর কয়েক রাইত কোনরকমের বড় আওয়াজ বা মাগি ডাক না শুনায় বুঝি জামাই তার ঘরে নাই । এরপর আরো কয়েক সপ্তায় বুঝি ঘরের বাসিন্দা পাল্টাইছে । দিনে আমি এইখানে থাকি না বৈলা কিভাবে কি হৈল দেখি নাই । কিন্তু এই মাতারির বিষয় নিয়া ইলিয়াস কিংবা নোয়াখাইল্যা সুমনরে জিগাইতেও পারি না । এই জিনিস নিয়া জিগাইয়া নিজেরে বিকৃত দেখানির মানে হয় না ।
কয়েকদিন নিজের মাথার মইধ্যেই ভাবতে থাকি । কি হৈল মাইয়াটার । তার জামাই কই গেলো । মাইয়া নিজেই বা কই গেলো । বড় পুলাডা গেলো কই । ঢাউস পেটের পিচ্চিই বা গেলো কই । সাতসকালের মাতারিগো মিছিলেও তারে আর দেখা যায় না । সকাল আর বিকাল ছাড়া আমার এলাকায় থাকা হয় না । সপ্তাখানেকের মধ্যেই আবার দেখি তারে। খালপাড়ে পিচ্চি পুলা আর একখান প্লেট নিয়া বৈসা আছে ভিক্ষার অপেক্ষায় । পাঁচ ট্যাকার একটা কয়েন দিয়া দুই ট্যাকা ফিরত দিতে কওনের ফাঁকে বারবার মনে হৈতাছিল জিগাই , কি হৈছে তোমার, বাসা থাইকা খেদাইয়া দিছে নাকি ? যেই বাড়িতে কাম করতা ঐখানে কি হৈছিল ? জিগানি হয় না । নোয়াখাইল্যা সুমন অধৈর্য্য হৈয়া পড়ছে । ভিক্ষা দেওনে এত সময় লাগাটা যৌক্তিক না । নিজের মনে মনে এইজন্য প্রশ্নোত্তর পর্ব বানাই । কি হৈছে তোমার ? জামাই পিটানি দিয়া চৈলা গ্যাছে, কোন খবর নাই । বাসা থাইকা খেদাইয়া দিছে নাকি ? দুইমাসের ভাড়া দেয়া হয় নাই বৈলা হান্ডিপাতিল রাইখা বাইর কৈরা দিছে । গা হাতপা ময়লা বৈলা বাসার পুলাপানের অভিযোগের লাইগা মাতারির কামেও যাইতে মানা কৈরা দিছে তারা । জানিনা এইগুলাই কি আসলে তার উত্তর হৈত কিনা । কিন্তু সন্ধ্যার দিকে খালের পানিতে বিয়াবাড়ির আলো দেখতে দেখতে আমার ক্যান জানি মনে হয় , প্রশ্নগুলা জিগাইতে পারলে ঠিক এইরকমই হৈত উত্তরগুলা ।
জীবন একটু কঠিন হৈয়া পড়লে চাইরপাশে ঘটনা ডাগর চোখ মেইলা দেখার সময়ে ঘাটতি পড়ে আমার । দুই সপ্তার বেশি চৈলা যায় নিত্য বিকালে পাঁচ ট্যাকা দিয়া দুই ট্যাকা ফেরত নেয়া , এবং তার ফাঁকে ফাঁকে মাইয়াটার হাল্কা ময়লা শরীরের আর ঘাওয়ালা মুখের ক্রমাবনতি দেখা ছাড়াই । সতের দিন পরে বিকালে খালপাড়ে যাইয়া দেখি সেইখানে সে নাই । দৃশ্যত উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হাঁটা শুরু কৈরা, সতর্ক চোখে রাস্তা, খালের এই মাথা থাইকা অন্য মাথায় খুইজাও পাই না আমি তারে কোথাও । কালামের বস্তির শেষ মাথায় খালের এক্কেবারে লাগোয়া ভাঙা টং দোকানের লগে তার নীল পলিথিনের খুপড়িটাতেও প্রাণের স্পর্শ নাই বেশ কয়েকদিন । দেইখা এমনই মনে হৈল । বিকালে হাঁটায় মনোযোগ নাই আমার । পায়ের উপর দিয়া রিকশাও চৈলা যায় একবার । তাও বিভিন্ন মোড়ে সতর্ক চোখ দিয়া আমি তারে খুঁজি ।
বিশ্বরোডের পাশে তারে দেখি আমি পরনে আধা শাড়ি আর মাথার চাইরপাশে খড়ের মত্ চুল নিয়া পা ছড়াইয়া বসা অবস্থায় । কোলে পিচ্চিডা নাই । এখন তারে গিয়া কিছু জিজ্ঞাস করা যায় । লোকের চোখের ভয় নাই এখন । তাও সেদিন না জিগাইয়া তার পরদিন ইলিয়াস বা নোয়াখাইল্যা সুমন কাউরে না নিয়াই সন্ধ্যার দিকে একটা পাউরুটি আর এক হালি কলা নিয়া আমি তার সামনে যাই । খাওয়া শুরু করার আগেই জিগাই তোমার পুলা কৈ । মুখভর্তি খাওন নিয়াই হাউমাউ কৈরা উঠে পাগলি । যদ্দুর বুঝি পোলা তার খালের পানিতে পইড়া মরছে । আর কোন কিছুর জবাব উদ্ধার করা যায় না । আয়েসি ট্রাজেডি দেইখা ভারাক্রান্ত মন নিয়া ফিরি আমি । লালাভ আকাশ দেইখাও ভাব জাগে । ইশকুলের একমাত্র বট গাছে বাতাস দেইখাও ভাব জাগে । হেমিংওয়ের উপন্যাসে রবার্ট পেন ওয়ারেনের ভূমিকাতে, যে পৃথিবীতে মানুষের অবস্থা ক্যাম্পফায়ারের জলন্ত কাঠের গুড়িতে এদিক-ওদিক ছুটে মরা পিপড়ার মত , এই কথাও মনে আসে । কি কারনে জানি না রবার্টরে খানকির পোলা বইলা গালিও দিই মনে মনে ।
সবার মোটামুটি অজান্তে মাসখানেক তারে আমি অনেকটা চোখে চোখে রাখি । প্রতি বিকালে ইলিয়াস আর নোয়াখাইল্যা সুমনরে না জানাইয়া একবার বিশ্বরোডের পাশ থাইকা ঘুইরা আসি । জিগাই , খাবি নাকি । খাওন কিন্যা দিই । সকালে বাসে উঠার সময় দেইখা যাই । পরনের শাড়িতে তার ছিদ্র বাড়ে । মুখের ঘা বড় হয় । মাথার চুলের রঙ বদলায় । আর হয়ত অন্য কেউ খেয়াল করেনা যেইটা, হয়ত আমিই কেবল খেয়াল করি যেইটা, চোখের নীচে কালি বাড়ে তার । সপ্তায় একদিন দুইদিন কলা পাউরুটি কিন্যা দেওয়াতে কারো চোখে না পড়লেও একখান শাড়ি কিন্যা আইনা দেওনের মত সাহস জোগাড় করা হয় না আমার । নিজেরে বুঝাই আধল্যাঙটা হৈয়াও, আমার মত এই উল্টাপাল্টা বয়সের পোলার মধ্যেও যে কখনো দুঃস্বপ্নেও যৌনানুভুতি উদ্রেক করতে পারেনা তার হয়ত ভয় নাই ।
একদিন শুক্রবার সাতসকালে বাসস্ট্যান্ডে দুর থাইকা একটা ভীড় দেখা যায় ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১০ দুপুর ১:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


