জামাইর নামখান পর্যন্ত না জাইনা বিয়া হৈয়া গ্যালে এক বছরের মাথায় একটা মাইয়ারও মা হয় শুনির মা । মাইয়ার নাম রাখা হৈছিল আয়েশা । সেই আয়েশা আশেপাশের বৌঝি পুলাপাইনের মুখে মুখে হৈয়া গেলো আশুনি । আর কদরেরনেছার নাম হৈয়া গেলো আশুনির মা । এতবড় নাম ডাকার ধৈর্য্য কারো নাই বৈলা সেইটা হৈয়া গেলো শুনির মা । কলেরায় জামাই আর পুকুরে ডুইবা আশুনি মারা গেলেও, অন্য গেরামে বিয়া হৈয়া সেইখানে দুই মাইয়া জরিফা আর রহিমার মা হৈলেও , তার নাম সেই শুনির মা'ই রৈয়া গেলো । আইজ দ্বিতীয় জামাইর ঘরের জরিফার দ্বিতীয় বিয়ার পর প্রথম ঘরের মাইয়া আসমাও জানেনা তার আসল নাম কি । নিজের মাইয়ারা জানে কিনা সেইটা নিয়াও নিশ্চিত না সে ।
অদ্ভুত এক ঘরে দ্বিতীয় বিয়া হওয়া শুনির মা আরো অদ্ভুত এক বাড়িতে গিয়া তার শেষ আশ্রয় পায় । বাপের বাড়ি বা দুই দুইটা জামাইর কারো বাড়িতেই তার স্থায়ী আশ্রয় হয় নাই । দ্বিতীয় জামাইর তৃতীয় বউ হৈয়া সেই আঠারো উন্নিশেই জরিফা রহিমার মা হওয়া শুনির মা চতুর্থবারে ফুটফুইট্যা পুলারও মা হয় । তিনবছরের পুলা আর পুলার বাপ একদিন বৈশাখে হঠাৎই বাড়ির লগের ভিটায় ঠাডা পইড়া মারা গেলে, দ্বিতীয় জামাইর প্রথম আর দ্বিতীয় বউ আর তার পুলামাইয়ারা অপয়া , নেস্তি-নাফঅরা বৈলা মরা বাপের বাড়িত পাঠাইয়া দিলে , সেইখানে তার নিজের ভাইয়েরাও তারে জায়গা দেয় না । হাড়ভাঙা খাটনি আর বাড়ি বাড়ি ধানভানার কামের ছয়মাস শেষে , বাপের প্রথম ঘরের, সৎমায়ের অত্যাচারে ভিনগেরামে বাড়ি করা আঁটকুড়া সৎ ভাই তারে শেষ পর্যন্ত জায়গা দেয় , নিজের বাড়িতে । সৎ ভাইয়ের পালক ওয়ারিশ রজব মেস্তরি বাপের মরার পরে , আলাদা খ্যারের চালা তুইলা শুনির মা আর তার দুই মাইয়া জরিফা রহিমারে নিজ নিজ পেটের ধান্ধা নিজেরা করার লাইগা বইলা দেয় ।
জরিফা রহিমার বয়সের আউলা বাতাস তখন কানের কাছে নিঃশ্বাস ফালাইতাছে , এমন আকালের দিনে অকৃতজ্ঞ রজব মেস্তরি শুনির মারে আরো আকালের দিকে ঠেইলা দেয় । বাড়ি বাড়ি ধান ভাইনা খোন্দের দিনে চাইল, জরিফা রহিমার সারা হাঁতর জুইড়া ধানক্ষেতের মাছ ধৈরাও তিনপেটের খাওনের পিছেই সারাদিন চৈলা যাইতে থাকে । বছর দুয়েকের মাথায় জরিফার বয়সের আউলা বাতাস যখন চৈলাই আসছে তারই কোন এক দিনে হঠাৎ জ্বীনে ধরে তারে । রাইত নাই দিন নাই ভরদুফর নাই খেতে খেতে নারা টোকানি আর মাছ ধৈরা বেড়াইলে জ্বীনেতো ধরবোই এই কথা সবাই কৈলেও, তিন কুত্তার বয়সে দশ কুত্তার অভিজ্ঞতা নিয়া শুনির মা মাইয়ার চোখে মুখের দিকে দেইখাই বুঝছিলো ঘটনা কি । তাই পয়লা দিন মোল্লার ঝাঁড়ফুকের পরে রাইতের দিকে জ্বীনের আছর একটু কমলে রহিমারে অন্য ঘরে পাঠাইয়া দরজা বন্ধ ঘরে নিজ মাইয়ার গলায় নাইরকেল কাটনের বড় ছেনিটা ধৈরা সরাসরি তারে জিগায় শুনির মা, কার লগে কি করছস, বাপ কেডা । মায়ের চোখের দিকে তাকাইয়া জরিফা বুঝছিলো এইটা কোন মশকরা না । কিন্তু নাম শুইনা শুনির মার শক্ত কৈরা ধরা দায়ের হাতডা দুর্বল হৈয়া যায় । মইরবিত নাফঅরার জাত মইরবিই, তই বুলেও কোনদিন এই নাম মুখে লইছ না বৈলা মাইয়ারে ছাইড়া দেয় ।
দশ কুত্তার অভিজ্ঞতায় শুনির মা ঠিকই জানত ক্যাম্নে কৈরা সবদিক সামলানির চেষ্টা করন যায় । তাও সবকূল খাওইন্যা নিজের জাতের সর্বশেষ দুই অলক্ষীর ঘরের অলক্ষীর জীবন নিয়া ঝুঁকি নেয়ার মত পাত্থর তখনো হয় নাই । নিজ বাপের দেশ জাহানপুরে নিয়া মাইয়ার চিকিৎসা করাইয়া বিয়া দিয়া তারপর ফিরব বৈলা গেরামের সবাইরে জানাইয়া মা আর দুই মাইয়া উধাও হৈয়া যায় মাসখানিকের লাইগা । মাস পরে ফিরা মাইয়ার বিয়া দিয়া ফালাইছে এই কথা বইলা গেরামের কানা-ঘুষারে চাপ দেয় আপাতঃত । তারও বছরদেড় পরে সত্যি সত্যিই একদিন জরিফার বিয়ার ব্যবস্থা হৈলে , ছয়মাসের রোগা-পাতলা একদলা মাটির মত আসমারে নিয়া শুনির মা গেরামে ফিরে । জরিফার প্রথম জামাই বউ পুলাপান ছাইড়া পলাইছে, তারে দ্বিতীয় বিয়া দিয়া প্রথম ঘরের দুধের মাইয়ারে নিয়া সে গেরামে ফিরছে এই কথায় লোকের বিশ্বাস দুর্বল হৈলেও লোকমান মেম্বরের জোয়ান পোলা যখন অনেক উৎসাহ নিয়া সবাইরে কইয়া বেড়ায় যে, জাহানপুরে তার ইয়ারদুস্তগো ধৈরা নিজেই গা কৈরা জরিফার বিয়া দিয়া আসছে, তখন মাস যাইতে না যাইতে লোকে আর সেইসব কথা তুলে না ।
রহিমা আর শুনির মা মিল্যা মাটির দলার মত আসমারে নিয়া মহা ঝামেলায় পড়লেও এই দলার মইধ্য থাইকাও থাইকা থাইকা হাইসা উঠা একরত্তির মাইয়াডার ডাগর চোখে নানিখালার চেহারা দেখার মুহুর্তগুলাতে সব ভুইলা যাইতো দুইজনেই । দুইবছর বয়সে একদিন একবেলার লাইগা জরিফা নিজ পেটের মাইয়ারে দেখতে আসনের আগ পর্যন্ত শুনির মা যতবারই ঠিক কৈরা দিত, তাও মাইয়া তারেই মা বৈলা ডাকতো । কিন্তু একদিনের একবেলার সেই দেখার কি এমন মাজেজা ছিলো তা আইজও বুঝেনা শুনির মা অথবা রহিমা । সেই থাইকা আর কোনদিন নানিরে মা বৈলা ডাকে নাই আসমা ।
ঘরে একটা দুধের বাইচ্চা থাকনে রহিমা কি শুনির মার দুইজনের একজনরে সবসময় ঐটার পিছে লাইগা থাকতে হয় বৈলা অভাবের যন্ত্রণার মইধ্যে উটকা ঝামেলা তৈরী হৈলে, পেটের চিন্তায় দিগ্বিদ্বিক ভাইবা কোন কুল পায় না দুইজন। এমনি এক দিনে হঠাৎ শুনির মা স্বপ্নে সেই দরবেশের দেখা পায় । জাহানপুরেরও পশ্চিমে ইন্ডিয়ার বডারের লগে উঁচা টিলায় অত বেশি জৌলুস না থাকা গফরশাহের নাম অঞ্চলের লোকজন বিলক্ষন জানলেও অত বেশি পরিচয় কারোরই আছিলো না । সেই মহান অলি কি কৈরা জানি হঠাৎ শুনিরমার ভাঙা ঘরের চালের ফুটা দিয়া ঢুকলে , তার আচরণ , কথা সমস্ত কিছু পাল্টাইয়া যায় কয়েকদিনেই । দুধ নাই ভাত নাই, পেটের যন্ত্রণায় এক বছরের আসমার তীব্র চিক্কুরেও ঘরের কোনার নামাযের চকি থাইকা উঠে না শুনির মা । এমনকি রহিমারেও কয় না কারো কাছ থাইকা কিছু আইনা মাইয়াডার কান্দন থামাইতে । জরিফার জ্বীনে ধরার মত বয়সের রহিমা জরিফার তুলনায় কম চঞ্চল অনেক সাবধান, আর লোকজনের কাছে কিছু চাওয়াতে মারাত্নক শরমিন্দা হৈলেও আসমার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পাইরা শেষে আশেপাশের বৌঝিগো কাছ থাইকা একটু দুধ একটু সুজি একটু চাইল চাইয়া আইন্না কোনরকমে সপ্তাহডা কাটায় । স্বপ্নের দুইদিন পর থাইকা এমুখে সেমুখে ঘটনার কথা শুইনা গেরামের বৌঝিরা জড় হৈতে থাকলেও টানা সাতদিন কারো লগে কোন কথা কয়না , কিছু মুখে তুলে না শুনির মা । সাতদিন পরে ঘরের মইধ্যে জমা হওয়া মানতের অনেক কিছুর লগে আসা ডাবের পানি দিয়া রোজা ভাঙে ।
সেই খোন্দে আর কেউ শুনির মারে ধানভানেরে কামে ডাকে না । তবু তাতে রহিমা বা আসমার খাওনের কষ্ট হয় না । ভালো খোন্দের শুকরিয়ায় মোল্লা দাওয়াতের লগে শুনির মার দাওয়াত আর কোথাও বাদ যায়না । বাদ যায়না বিয়া মোসলমানি চাইরদিন্যা মোল্লা চল্লিশা এমনকি নিতান্ত খতম পড়ার আয়োজনও । বউঝিগো ছোটখাট বা বড় মাইয়ালোকের সমস্যা নিয়া দশ কুত্তার অভিজ্ঞতার অনেক কিছু এমনে এমনে জানলেও দরবেশের স্বপ্নের পর থাইকা যতজন তার কাছে আসে , আগে তার এক আনাও আসতো না । প্রজন্মের পর প্রজন্ম জন্মাইতে থাকে শুনির মার হাতে । কখনো কখনো জন্ম দিতে গিয়া মা অথবা জন্মাইতে গিয়া ছোট্ট বিলাইয়ের ছাওয়ের মত বাইচ্চাগুলাও মারা যায় । দুঃখে শুনির মার নিজেরও মন ধুম ধইরা থাকে কয়েকদিন । তাও চুলে পাকন ধরার বয়সের মধ্যেই গেরামে যেদিকে চায় সেইদিকে তার নিজের হাতে জন্ম নেয়া পুলাপাইন দেইখা ছোটখাট একটু আত্নতৃপ্তি নিয়াই ঘরে ফিরে প্রতিদিন । সতীনের সংসারে জ্বইলা পুইড়া খাক হওয়া হাবিয়ার বাপের দুই নম্বর বউরে শর্শদি থাইকা, কাউরে কোনদিন জান গেলেও না কওনের শর্তে তাবিজ আইনা দিয়া , আবার বড় বউরে কাউরে কোনদিন জান গেলেও না কওনের শর্ত দিয়া কোথায় তাবিজ পুতা আছে সেই সন্ধান দিয়া দুইজনেরই গোপন বিশ্বাসের জাগাটা ধৈরা রাইখা দিন চলে তার ।
রহিমারে মোটামুটি ভাতালা ঘরে বিয়া দিয়া সাইরা পেটের যন্ত্রণা ছাড়া নানি নাতনির দিন চললেও , চুলে পাক ধরণের লগে লগে মার মতই চাঁইয়া পাখির মত ফুরুত ফুরুত করা আসমারে নিয়া চিন্তায় পড়ে বুড়ি । সেই দুঃশ্চিন্তা পাগলামির মত হৈয়া পড়ে, যেইদিন চাঁনরাইতে খ্যাড়ের ঝুপড়ির পিছের আন্ধারে মুততে গিয়া বার বছর পর ঈদে গেরামে আসা কোব্যাতের পোলারে আন্জা কৈরা ধৈরা আছে আসমা বেগম , এই দৃশ্য দেখে সেইদিন থাইকা । পায়ের আওয়াজ পাইয়াই কোব্যাতের পোলা আছাড় টাছাড় খাইয়া ধানক্ষেতের দিকে হারাইয়া গেলেও চুপচাপ শুনির মা নাতনির চুল ধৈরা তারে ঘরে ঢুকাইয়া গালে একটা মুইড়া দিয়া খালি একটা কথাই কয়, 'হতিনের গরের হতিন , মার মত ঐচত কিল্লাই' । আর আওয়াজ না বাড়াইয়া পরদিন দুপুরেই পশ্চিমের টিলার উপরের মাজারের থাইকা বাড়ি ঘর না চিনা এক পোলারে ধৈরা আইনা বিয়া দিয়া দেয় আসমার । ঘরের মাইঝখানে বাঁশে চাটাই দিয়া আলাদা ঘর কৈরা দিলেও নাতনির মন নাই অথবা অন্য কি কারণে দুইমাস পর সেই পোলা একদিন বাইর হৈয়া আর ফিরা না আইলে, আবার অথৈ সাগের পড়ে বুড়ি ।
জাহানপুরের হাট থাইকা জাইল্যারে ধৈরা আইনা আসমা বেগমের সাথে কলমা পড়াইয়া দিয়া দুঃশ্চিন্তা মনে হয় শেষ হৈলো বৈলা ভাবলেও মাসে দুইদিনের বেশি বাড়িতে না আসা জাইল্যা নিয়া শুনির মা পুরাপুরি নিঃশ্চিন্ত হৈতে পারেনা । আসমার পেট হওনের পরেও সেই আসা বন্ধ না হৈলে একটু হাঁফ ছাইড়া বাঁচে । কিন্তু জাইল্যার ঘরের জাইল্যা শেষ মাসে আর কোন খবর না রাখলে আর নাতনির পানি ছুটলে এত বছরের অভিজ্ঞতার অবস্থা বেগতিক বুঝলে, হাসপাতালে নিতেই হৈব ঠিক করে শুনির মা । কিন্তু ট্যাকার ব্যবস্থা নিয়া কোন কুলকিনারা করতে পারেনা ।
মাগরিবের অক্তে ব্যথা উঠা আসমারে বাড়িতেই রজব মেস্তরীর বউর দায়িত্বে রাইখা দিয়া , মোহাম্মদালী বাজারের একটু আগের নিরালা দিঘীর পাড়ে চান্দের আলোয় মেম্বরের পোলার অপেক্ষা করে বুড়ী । হাটবারে সবার শেষে বাড়ী ফিরায় অভ্যস্ত মেম্বরের পোলা সাদা কাপড়ের বুড়ীরে দেইখা গলা শুকাইয়া গেলেও , কোনমতে বুড়ীর কথার অর্থ বুঝতে পারে । তোর মাইয়া তুই ছাড়া কনে বাঁচাইবো বৈলা কাইন্দা উঠা বুড়িরে কোঁছড় থাইকা দেড় হাজার ট্যাকা বাইর কৈরা দিলেও, বাড়ি ফিরা সবকিছু স্বপ্নের মত মনে হৈতে থাকে তার ।
তিনদিন পরে মাইয়া নিয়া আসমা আর শুনির মা ফিরা আইসা দেখে লোকমান মেম্বরের বাড়ি থাইকা খাটিয়া বাইর হৈতাছে ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১০ বিকাল ৪:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



