প্রিয়ভাষিনীর মৃত্যু এবং আমার এক সন্ধ্যা
২৫ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৪৪
চমৎকার একটা ঘুম দিয়ে উঠলাম। ফ্রেশ লাগছে। আয়েশে বসলাম ডেস্ক টপের সামনে। সামহোয়ার, প্যাচালী ভ্রমন শেষে চোখ বুলিয়ে নিলাম প্রথম আলোতে। গতানুগতিক ভাবে চোখ বুলিয়ে যাই খবরের শিরোনামে। হঠাৎ যেন ছন্দপতন। একি। একটি খবর কেড়ে নিল আমার সমস্ত মনোযোগ। রুদ্ধশ্বাসে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে রইল সে খবরের বর্ননায়। স্থানুর মত হয়ে রইলাম খবরটি পড়ে।
"জয়ন্তী হত্যা মামলায় আপিলের রায়ে আজম রেজার যাবজ্জীবন"
সময় যেন থমকে গেল।
আমি নিশ্চল হয়ে রইলাম। স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
এক মিনিট।
দুই মিনিট।
নাকি পাচ মিনিট?
কতক্ষন জানি না। জানা নেই উত্তর।
হতবিহ্বল। নস্টালজিক হয়ে রই।
সে বিহ্ববলতা আমাকে নিয়ে যেতে চাইল ষোল বছর আগের কোন অতীতে, এক আলো ঝলমল দিনে। এক উচ্ছলতার আবেগে ভরপুর স্মৃতিময় মুহুর্তে। ফেলে আসা সে মুহুর্ত বার বার আমাকে হাত ছানি দিয়ে বলছে, "তুমি অনেক তো চেয়েছ। পেরেছ কি আমাকে ভুলতে।"
আমি তো ভুলতে চাই। আমি তো মনে করতে চাইনা সেই ঝলমলে অতীতকে যা দুঃসহ বর্তমান হয়ে আমাকে করে ব্যকুল, করে অস্থির।
তবু তো পারি না। বার বার চোখের সামনে এসে দাড়ায় আমার কৈশোর আর তারুন্য।
আর একঝাক প্রিয় মুখ।
সেই কবেকার জীবন।
তখন বুয়েটে একেবারে নূতন আমি নই। সেকেন্ড ইয়ার পার হয়েছি। বুয়েটের কঠোর ব্যস্তবহুল দিন গুলোর সাথে কিছুটা হলেও অভ্যস্ত আমরা হয়েছি। বুয়েটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধু বান্ধবদের সাথে উপভোগ করি। স্টেজে "সন্নাসী উপগুপ্ত" এর নটীর ভূমিকায় ক্লাশমেট কাম বান্ধবী অভিনয় করছে।
"নগরীর দ্বীপ নিভেছে পবনে
দুয়ার রুদ্ধ পৌর ভবনে
নিশিথের তারা শ্রাবন গগনে
ঘন মেঘে অবলুপ্ত।"
স্টেজে বান্ধবীর নৃত্যনাত্যের পারফরম্যান্স দেখি আর সমালোচনা করি।
প্রায়ই এটা ওটা প্রোগ্রাম লেগেই থাকে। হয় বুয়েটে, নতুবা হলে। আমাদের বন্ধুদের বন্ধুত্ব আরো গাঢ় করে দেয়। এদিকে হাসি আনন্দে কাটানো সময়গুলোতে আরেকটি পালক যোগ হল। ক্লাশ থেকে হলে আসতেই ওয়ার্ডেন আপা বললেন, "তোমাদের রুমে নূতন একজন মেয়ে আসবে। প্রস্তুত থাকবে।"
তিনি আসলেন। রুমে ঢুকতেই দেখা হল।
আমার দিকে তাকিয়ে মিস্টি হেসে বললেন, "তুমি করে বলছি। দেখো আমি তোমাদের চেয়ে অনেক সিনিয়র। ৮৩ এর এইচ এস সি।"
আমি অবাক হয়ে তাকালাম। নীরব চোখের প্রশ্ন বুঝতে পেরে বললেন, "আমার পড়াশোনায় অনেক ব্রেক পড়েছে। কি ভূতে ধরেছিলো। বিয়ে করেছিলাম। আজ এই হাল। অনেক গ্যাপ পড়েছে।"
"আপা, আপনার নাম?"
"জয়ন্তী মুনশী। আর্কিটেকচার থার্ড ইয়ার।"
সেভাবে করেই হাস্যোজ্জ্বল জয়ন্তী আপার সাথে প্রথম পরিচয়। গুছিয়ে খুব সুন্দর করে কথা বলতেন। আমরা হা হয়ে উনার গল্প শুনতাম। উনি যে আমাদের সিনিয়র তা উনার আচরনে কখনই প্রকাশ পেত না। এমন কি উনার সাথে এডাল্ট জোকসও আমরা এনজয় করতাম। এমনিতে সিনিয়র আপারা আমাদের সাথে কিছুটা দূরত্ব রাখতেন। উনি কখনও তা করতেন না। উনার সাথে আমার মিল ছিল একটি জায়গায়। আমার মত তিনিও হলিক্রশ কলেজের ছাত্রী। গল্পের অনেকটা অংশ জুড়ে শুধু বুয়েটই থাকত না, থাকত কলেজের কথাও। কখন কি অভিজ্ঞতা - এইসব।
জম্পেস আড্ডা যাকে বলে। রাত হলেই আমার বান্ধবীরা চলে আসত আড্ডার লোভে। সে আড্ডার মূল আকর্ষন জয়ন্তী আপা। খুব সাধারন কথাও তিনি এত চমৎকার ভাবে বলেন যে আমরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। উনি বক্তা, আমরা শ্রোতা।
রাত বারটা বাজছে। পরের দিন ক্লাশ। নাহ, আমাদের কোন পরোয়া নেই।
এই আড্ডা খুব বেশী দিন টেকেনি। পরবর্তীতে জয়ন্তী আপা হলে অনিয়মিত হয়ে যান। ছোট ছেলে থাকায় তাকে বাড়ীতে থাকতে হত। আর এদিকে থার্ড ইয়ারের শেষে আমার হয় বিয়ে। সব মিলিয়ে ছত্রভংগ অবস্থা। সেই আড্ডা রয়ে যায় শুধু স্মৃতির উপকরন হিসেবে।
কতদিন কেটে গেছে। আফসানা মিমিকে পাওয়ার জন্য নাকি আজম রেজা খুন করে জয়ন্তী আপাকে। মিমির কথাও উকি দেয় মনের ভেতর। মিমির তখনকার স্বামী গাজী রাকায়েত বুয়েটে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে দাড়ায় সংসদ নির্বাচনে। তার প্রচারনা চালাতে মিমি একবার ছাত্রী হলে পা রেখেছিলেন। ঘটনা প্রবাহের কি অদ্ভূত মিল। হায়, মালার পুতিগুলো কি করে একই সূতায় গেথে যায়!
সেই আড্ডা আজ নেই। নেই জয়ন্তী আপা। শুধু আমি, দূর প্রবাসে আজ এক রাশ স্মৃতির সমুদ্রে হাবুডুবু অবস্থায় ভাবছি ফেলে আসা জীবনের কথা। এক দুরন্ত অতীতের কথা। এক প্রানোচ্ছল জয়ন্তী আপার কথা।
আল্লাহ উনাকে জান্নাত বাসিনী করুন। এই দোয়াটুকু রইল শুধু।
[দ্রষ্টব্য: লেখাটি নেটে প্রথম দেবার পরে অনেকেই এই মামলার রায় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন (Click This Link)। আমি তাদের সাথে একমত।]
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): প্রিয়জন ;
লেখক বলেছেন: আমিন।
উম্মু আবদুল্লাহ বলেছেন:
উইক এন্ডে কমেন্ট অপশন অন করলাম। তবে মডারেটেড।
ত্রিভুজ বলেছেন:
আপনি আবার লিখছেন জানতাম না.. ওয়েলকাম ব্যাক। লেখাটা সময় করে পড়তে হবে...
লেখক বলেছেন: হঠাৎ একদিন দেখি ব্যান উঠে গেছে। কি মনে করে লিখলাম। তবে আগের মত এতটা ইনভলভড থাকবো না।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।
আহসান হাবিব শিমুল বলেছেন:
ভালো লিখেছেন।এমননি যোগাযোগের হাজারো মাধ্যম স্বত্তেও অনেকের মৃত্যসংবাদ জানতে পারি পত্রিকার পাতায় কিংবা কম্প্যুটার মনিটরে।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
সুদীপ্ত সরকার বলেছেন:
জয়ন্তীর মা আমাদের স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন... সাদেকীন ম্যাডাম... হয়ত এখনও আছেন। উনার কোন খবর জানেন?
লেখক বলেছেন: স্যরি। আমি আসলে খুব একটা কারো খবর রাখতে পারি নি। সেই যে আসলাম দেশ থেকে। এরপর কারো সাথে যোগাযোগ নেই।
আপনি জানলে আমাকে জানাবেন, প্লীজ।
প্রচেত্য বলেছেন:
আমাদের দেশের কি কখনো প্রভাবমুক্ত হতে পারবেনা ? আইন কি শুধু তাদের জন্য যাদের কোন রেফারেন্স নেই, কিংবা শক্ত হাত নেইআজ আর এসব নিয়ে বলতে ভাল লাগেনা
বড্ড একঘেয়েমি হয়ে গিয়েছে
আপনাকে দেখা খুব ভাল লাগল, অনেক খুজেছি, সার্চ বক্সে নাম দিয়ে সার্চ দিয়েছে, মনে হয় বানান ভুলে সার্চ বেটা ঠিকমত খুজে পায়নি
শুভকামনা রইল
লেখক বলেছেন: হয়ত আপনার কথাই ঠিক।
এই তো চলে আসলাম আবার। আপনার মন্তব্য পেয়ে ভাল লাগল। ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
ফারজানা মাহবুবা বলেছেন:
এ ধরনের হত্যাকান্ডের বেশী না,তিন/চারটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলেই অনেক কমে যেত এমন ঘটনা।
লেখক বলেছেন: সম্পূর্ন একমত।


















