আমার অভিজ্ঞতায় জন হপকিন্সের ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রামের কথা
১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:৩০
কে কবে প্রথম বলেছিল জন হপকিন্সের ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রামের কথা, তা সম্পূর্ন ভুলে গিয়েছি। কিন্তু আমার মাথায় গেথে গিয়েছিলো এই ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রামের কথা। শোনার সাথে সাথে একটি অসম্ভব ভাবনা মনে উকি দিয়ে যায়। আহা! যদি আমার ছেলেটা ট্যালেন্ট হতে পারত। আনমনে আবার নিজেই হাসি। সে তো আর ততটা ভাল স্টুডেন্ট নয়। অন্তত ট্যালেন্ট হবার মত আহামরি ভাল নয়। ক্লাশে মোটামুটি ভাল করলেও একদম প্রথমে নেই। তাও মনে করলাম, চেষ্টা করে দেখি। চেষ্টাতে কি না হয়। সে লক্ষ্যেই তার বাবাকে বললাম টেস্ট দেয়া যায় কিনা সেটা দেখতে। আমাদের জন্য একটু দূরে হয়ে যায় জন হপকিন্স। কিন্তু মানুষ সেই কতদূর থেকে এসে এই পরীক্ষা দিয়ে যায়। আমরা তবে কেন পারব না? পারতেই হবে।
টেস্ট দেয়াটাও ছিল বহু ঝক্কির। এই টেস্ট দিতে হলে চাই অন্য টেস্টে ৯৮% স্কোর। ভাগ্য ভাল ছিল। ক্যাট, অর্থ্যাৎ ক্যালিফোর্নিয়া এচিভমেন্ট টেস্টে আমার ছেলে আবদুল্লাহ ম্যাথ পার্টে ৯৮% স্কোর করেছিল। সেটা দিয়ে চেষ্টা করলাম। ভাগ্য ছিল প্রসন্ন। রেজিস্ট্রেশন করা গেল। সাত্ত্বনা পেলাম। যাক, অন্তত টেস্ট দিতে পারবে। সেটাই বা কম কি? একটা বাধা তো সামনে থেকে গেল।
পরীক্ষার ঠিক আগে আগে একটা স্যাম্পল প্রশ্ন পেলাম হপকিন্স থেকে। প্রশ্ন থাকে এদের দুই ক্লাশ উপরের স্ট্যান্ডার্ডের। প্রশ্ন দেখে প্রাকটিস করানোর কথা ভাবলাম। কিন্তু সে গুড়ে পড়ল বালি। এক ভাবী, যার ছেলে এই পরীক্ষা দিয়েছিল, তার কাছ থেকে জানলাম এই পরীক্ষার জন্য আর কোন প্র্যাকটিস ম্যাটেরিয়াল নেই। হপকিন্স থেকে যা পাঠিয়েছে ততটুকু ছাড়া আর কিছু কোথাও পাওয়া যায় না। এই পরীক্ষার জন্য আলাদা করে প্রিপারেশনের কোন ব্যাপার নেই।
পরীক্ষার সময় এল। পরীক্ষা দিল। ফলাফল অপ্রত্যাশিত ছিল না। ম্যাথ পার্টে ৯০ এর উপরে স্কোর করেছে। অর্থ্যাৎ শতকরা ৯০ ভাগ ছেলে তার নীচে। আমেরিকানদের ম্যাথের জ্ঞান একটু নীচের দিকে। তাই সেটাতে এশিয়ানরা এগিয়ে থাকে স্বাভাবিক ভাবেই। কিন্তু ল্যাংগুয়েজ আর্টস এ আমার ছেলে তেমন সুবিধা করতে পারে নি। সেটাতে আবার আমেরিকানদের জয় জয়কার।
সে বছর ট্যালেন্ট হতে পারল না। কি আর করা। পরের বছরের জন্য প্রস্তুতি নিলাম। এর মধ্যে আমার চেষ্টা চলল ল্যাংগুয়েজ আর্টস নিয়ে। বিভিন্ন বই দিয়ে প্র্যাকটিস তাকে করালাম। কিন্তু সেবারও একই অবস্থা। ম্যাথে কোয়ালিফাই করলেও, ল্যাংগুয়েজ আর্টসে নয়।
নাহ, এবার পেতেই হবে। জেদ চেপে গেল। চলল প্রস্তুতি। ইতিমধ্যে স্কুলে স্পেলিং বি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়ে সেও কিছুটা আত্মবিশ্বাসী। সবমিলিয়ে আমার মনে হচ্ছিল সে এবার অবশ্য অবশ্য দুটোতেই নির্বাচিত হয়ে ট্যালেন্ট হবে। তৃতীয় বারের মত সে ট্যালেন্ট সার্চের পরীক্ষা দিল।
শেষ পর্যন্ত আনন্দময় সংবাদটি আমার জীবনে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিল। সে ট্যালেন্ট হল। যদিও ল্যাংগুয়েজ আর্টস এ ন্যুনতম নম্বর পেয়ে কোয়ালিফাই করেছে। তাতে কি। ট্যালেন্ট তো হয়েছে। যার বর্ননা রয়েছে এই পোস্টে (Click This Link)
তবুও ভাগ্যের বিড়ম্বনা যেন লেগেই থাকে। ট্যালেন্ট অনুষ্ঠানের দিনে জন হপকিন্সে আমরা পৌছালাম বেশ দেরী করে। বাল্টিমোরের রাস্তায় আমরা হারিয়ে প্রায় আধা ঘন্টা দেরীতে পৌছি। ততক্ষনে তার নাম ডাকা শেষ। এত খারাপ লাগল আমার। পরে অবশ্য কর্তৃপক্ষকে ধরে আমরা তার নাম আবার ঘোষনা করাই। সে স্টেজে যায়। কিন্তু ভাগ্য এবারও বিড়ম্বিত। দেখলাম ক্যামেরা আনতে ভুলে গেছি। ট্যালেন্টের ছবি আর তোলা হল না।
ট্যালেন্ট হবার সুবাদে সামারে এবার একটা রাইটিং কোর্স নিতে দিল। অসম্ভব বেশী টিউশন। অনলাইন কোর্স অথচ টিউশন প্রায় ৮০০ ডলার। আমার সামর্থ্য সীমিত হলেও এই টাকাটা জোগাড় করলাম। না, কোর্সটা বিফলে যায় নি। খুবই চমৎকার। অনেক কিছুই সে শিখেছে। সেই কোর্সের অংশ হিসেবে সে কয়েকটি লেখা লিখে। যার একটি কবিতা রয়েছে এখানে। Click This Link
যা হোক, অবশেষে শেষ হল তার প্রোগ্রাম। সেদিন তার শেষ এসাইনমেন্টটায় চোখ বুলালাম। একটি গল্প লিখেছে। পারিবারিক আবহে রচিত। এত চমৎকার হয়েছে। পড়ে খুব ভাল লাগল। ছেলের এই একটি কোর্সের অভিজ্ঞতায় এতটুকু বলতে পারি জন হপকিন্সের ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রাম একটি অতুলনীয় প্রোগ্রাম, মেধার বিকাশে যা অসম্ভব সহায়ক। আমার মত মধ্যবিত্তের হাত দিয়ে এতগুলো টাকা চলে গেলেও কোর্সের কার্যকারিতায় আমি সন্তুষ্ট ।
লেখাটি প্যাচালীতে একটু অন্যভাবে প্রকাশিত (Click This Link)
আজ এ পর্যন্তই। সবাইকে ধন্যবাদ পোস্ট পড়ার জন্য।
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): শিক্ষা ;
ফেরারী পাখি বলেছেন:
বিষয় টা সম্পর্কে জানা ছিল না। অবগত হলাম। ভালোই কবিতা লিখেছে আপনার শিশু ট্যালেন্ট।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে। ভাল লাগল আপনার মন্তব্য। আর দোয়া রাখবেন।
পারভেজ বলেছেন:
"জন হপকিন্সের ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রাম " এর মুল উপকারিতাটা কোথায়? সবই তো করতে হলো টিউশন ফি দিয়েই? এটা কি একটা স্বীকৃতির মতো? পরে কি অন্য কোথাও অগ্রাধিকার পায়? কবিতাটা ভাল হয়েছে। গল্পটা পড়ার আগ্রহ ছিল। ধন্যবাদ।
লেখক বলেছেন: পুরো ব্যাপারটা আমি নিজেও ভালমত জানি না। পরে আইভী লীগ স্কুলে ভর্তি হতে গেলে হয়ত সহায়ক হবে।
পুজিবাদের এই দেশে টাকা ছাড়া কি কিছু হয়? টিউশন সব কিছুতেই লাগে।
গল্পটা একেবারেই পারিবারিক আবহে বলে আর দিলাম না। আমার ব্লগস্পটে শুরুর দিকের একটা গল্প আছে। ক্লাশ শুরুর দিকের বলে ওটা ততটা ভাল নয়।
আপনাকেও ধন্যবাদ পোস্ট পড়ার জন্যে।
ত্রিভুজ বলেছেন:
পুজিবাদের এই দেশে টাকা ছাড়া কি কিছু হয়? টিউশন সব কিছুতেই লাগে। .... খুব খাঁটি কথা... টাকাই বিধাতা!
পারিবারিক আবহে রচিত গল্পটাও পোস্ট করে ফেলুন... ভাল লাগলো...
লেখক বলেছেন: একদম। এমন কি হাসপাতালে মরনাপন্ন রুগী আসলেও প্রথমেই জেনে নেয়া হয় ইনসুরেন্স ইনফো। কেমন যেন খট করে চোখে লাগে। আমাদের দেশে তো স্বাস্থ্য সুবিধা ফ্রী। ন্যুনতম স্বাস্থ্য সেবা সবাই পায়।
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
উম্মু আবদুল্লাহ বলেছেন:
গল্পটা এত বেশী পরিবার কেন্দ্রিক যে একটু অস্বস্তি লাগে সবার মাঝে দিতে। খুব ভাল লাগল আপনাদের এই উৎসাহ প্রদানমূলক কথা।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ। আমি আজকেই নেটে একটা সার্চ দেব।
লেখক বলেছেন: সেন্টার ফর ট্যালেন্টেড ইয়ুথ এর সাইট হল এটা:
http://cty.jhu.edu/index.html
বিবেক সত্যি বলেছেন:
ব্লগস্পটে আবদুল্লাহর কবিতা-গল্প যখন পেয়েছিলাম, তখন জানতাম না ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রামটার কথা... এত প্রতিযোগিতার মধ্য থেকে এমন স্বীকৃতি, সত্যিই অনেক আনন্দের ব্যাপার... আপনার নিবিড় ত্বত্ত্বাবধান নিশ্চয়ই অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে... ভালো লাগলো এমন একটা সুন্দর সংবাদ শুনে... আবদুল্লাহর জন্য অনেক অনেক শুভকামনা... :-)
লেখক বলেছেন: আপাতত ধন্যবাদ জানাই শুভ কামনার জন্য। পরে আবার তোমার সুন্দর মন্তব্যের একটি যুৎসই জবাব লেখার চেষ্টা করব।
লেখক বলেছেন: নাহ পারলাম না কোন জুৎসই জবাব লিখতে। হার মেনে নিলাম।
হলদে ডানা বলেছেন:
ছেলেটার উপর খুব ধকল গিয়েছে ! ! ! কি আর করা, সব মায়েরাই চান- সন্তান অনেক বড় হোক।ভর্তি পরীক্ষার গল্পটা অসম্ভব উচুঁ মানের হয়েছে। আমার দেশের বহু মাস্টার্স পাস স্টুডেন্টও অমন মানের লিখতে অক্ষম- আমি নিশ্চিত। জ্ঞানের রাজত্বে আলোর মশাল হাতে মানবতার কল্যাণে আবির্ভূত হোক সে 'আল্লাহর দাস'- এই কামনা।
লেখক বলেছেন: ছেলেও সেরকম অভিযোগ করে। আমি বেশী চাপ দেই, এইসব।
আপনি ব্লগস্পটে গিয়ে গল্প পড়েছেন? খুব ভাল লাগল শুনে।
ধন্যবাদ আপনাকে। দোয়া রাখবেন।
উম্মু আবদুল্লাহ বলেছেন:
গ্রেড পেলাম। সাকসেসফুল। তবে কিছু কিন্তু রয়ে গেছে। তার বাক্য বিন্যাস দুর্বল।
সাঈফ শেরিফ বলেছেন:
ঠিক ২০ মিনিট আগেও জন হপকিন্সের ওয়েব পেজ দেখছিলাম মুগ্ধতা আর হতাশার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। অনেকটা কাকতালীয়ভাবে আপনার এই লেখাটি চোখে পড়ল। যদি সুস্থ আশাবাদী প্রাণবন্ত মানুষ হতাম হয়ত এ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ছুয়ে দেখার প্রচন্ড একটা উন্মাদনা থাকত । আশা করি আপনি জানেন জন হপকিন্স কিসের জন্য এম আইটি, বার্কেলে, হার্ভাডের অনেক উপরে।বাংলাদেশের কতজন সেখানে পিএইচ ডি করেছেন বা করছেন গত ৪ বছরে জানালে খুশি হতাম।বাংলার মানুষ এম আইটি, বার্কেলে, হার্ভাডের ডক্টরেট নিয়েছে, নিচ্ছে। জন হপকিন্সেরটা শোনা হয়নি এখনও।
লেখক বলেছেন: চমৎকার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। চেষ্টা করব জানতে। বাংগালীরা এগিয়ে গিয়েছে অনেক। আমার পরিচিত অনেকেই ওখানে ফেলো ইত্যাদি রয়েছে। ওখানে প্রচুর বাংগালী পোস্ট ডক করছে।
ভাল থাকুন। আর চাইলে এখানে এডমিশন নিয়ে চলে আসুন। মোটেই কঠিন কিছু হবে না। ক্রেডিট কার্ডের উপর দিয়ে এক সেমিস্টার চালিয়ে দিলে আর অসুবিধা হবে না পরে।


















