গত কয়েক দিন ধরেই ব্লগ উত্তপ্ত ছিল লালনের মূর্তি সরানো সংক্রান্ত ঘটনায়। কেউ এর পক্ষে বলছেন, কেউ বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সারাংশ যা বুঝলাম তা হলো, ব্লগারদের বেশীরভাগই লালনের মূর্তি স্থাপনার পক্ষে। সামহোয়ার কর্তৃপক্ষও একই অবস্থান থেকে একটি পোস্ট স্টিকি করেছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে সামহোয়ারে সরকার ও ভাংচুরকারীদের সমালোচনাও অনেক বেশী হয়েছে।
আমি লালনের মূর্তি সরানো বিষয়ক সংবাদ এই সামহোয়ারেই দেখতে পাই। পত্রপত্রিকায় এ সংবাদ তেমন কোন গুরুত্ব নিয়ে ছাপা হয়েছে কিনা কে জানে। অন্তত আমার চোখে পড়েনি। আমি অবশ্য ইত্তেফাকসহ গুটিকয়েক পত্রিকাই পড়ে থাকি। কয়েক নজর চোখ বুলানো মাত্র। না, সেখানে এই সংবাদটি তেমন গুরুত্ব পায় নি। গুরুত্ব সহকারে হেড লাইন হয়ে থাকলে নিশ্চয়ই চোখে পড়ত।
মূর্তি সরানোর বিষয় নিয়ে তো অনেকেই অনেক কথাবার্তা বলেছেন। আমি এখন আর নূতন করে কি বলব। আমার বক্তব্য, মন্তব্য এই ব্লগে খুব যে আদৃত হয়, তাও নয়। ব্লগীয় মানুষের একরাশ বিরক্তি উৎপাটন ছাড়া আর কোন ফল পাওয়া যাবে - এই বিশ্বাস নিজের উপর আমার নেই। আর তাছাড়া আমি দিন এনে দিন খাই টাইপের সাধারন ছা পোষা মধ্যবিত্ত এক মানুষ। আমার সময় কাটে সংসারের ভাবনায়,জীবনের ভাবনায়। কি করে সন্তানদের মানুষ করব, সে চিন্তায়। দেশে কোথায় কি হয়ে গেল - সেটা দিয়ে আমার মত মানুষের কিই বা এসে যায়। ক্ষমতাহীন ছা পোষারা শুধু সংবাদ পড়েই যায় - এর বাইরে তেমন কিছু করতে পারেনা। তার উপরে আবার আমি প্রবাসের হাজারো সমস্যায় জর্জরিত।
তাও কিছু বিষয় নিয়ে লেখার তীব্র বাসনা থেকেই আমার এই পোস্টের অবতারনা। প্রথমেই বলে রাখছি, আমার এ লেখা লালনের মূর্তি সরানো সম্পর্কিত নয়। লালনের মূর্তি থাকবে কি সরবে - সে নিয়ে আমার খুব উচ্চ বাচ্য নেই। আমি মূর্তি স্থাপনার বিরুদ্ধে, কিন্তু এও জানি যে পৃথিবীর সব কিছু আমার ভাল লাগার মত করে হবে না। সুতরাং এই মূর্তি থাকল কি সরে গেল - সেটা আমাকে খুব বেশী বিচলিত করে না। এই বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত দেবার ক্ষেত্রে নিজের সীমাবদ্ধতার বিষয়ে আমি পুরোপুরিই সচেতন। তাই কার মূর্তি কোথায় থাকবে বা না থাকবে - তার ব্যপারে নির্লিপ্ত ভূমিকা নেয়াটাই শ্রেয় ভাবছি। মধ্যবিত্তের স্বাভাবিক গা বাচানো মানসিকতা আর কি।
আরেকটু ব্যাখা করি। আমরা গনতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গনতন্ত্র মানেই সংখ্যা গরিষ্ঠের মতামতকে বেশী গুরুত্ব দেয়া। যার ফলে আমরা উন্নত বিশ্বে ক্রিসমাসে ছুটি পেলেও ঈদে পাই না। এটাই সত্য। এই বাস্তবতা অন্য সংখ্যা লঘুদের মেনে নেয়ার কোন বিকল্প নেই। তাই বাংলাদেশের বেশীর ভাগ মানুষ যদি মূর্তি স্থাপনার বিষয়টি মেনে নেয়, তবে আমি বাস্তবতার হাতে নিজেকে সমর্পন করা ছাড়া আর কোন বিকল্প দেখছি না।
এরও ব্যতিক্রম আছে। সংখ্যাগুরু হলেও যে সব সময় তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়, তা কিন্তু নয়। এই বিষয়টি আসলে অনেকটাই প্রভাব প্রতিপত্তির উপর নির্ভরশীল। যার জ্বলন্ত প্রমান তুরষ্ক। তুরষ্কে জাস্টিস এন্ড ওয়েলফেয়ার পার্টি হিজাব ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়। মানুষের কাছে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্কার্ফধারী নারীদের অফিসে, স্কুলে পুনর্বাসন করবে। কিন্তু না। তারা পারছে না হিজাবের অধিকার ফিরিয়ে দিতে। সেখানে বাধ সেধেছে সেনাবাহিনী। বিরোধীদের যুক্তি, নারীরা যারা হিজাব করে না, তাদের অধিকার অনুভূতি ব্যহত হবে যদি হিজাবিনীদের অফিস করার অনুমতি দেয়া হয়। তাদের অধিকার ও অনুভূতিকে সম্মান জানাতেই নাকি হিজাব বিরোধী এরকম সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এটাই হল বাস্তব। কে কখন প্রভাবশালী হবে তা আমাদের জানা নেই। আমার মত ছা পোষা মানুষেরা তা নির্ধারন করেনা। যার ফলে এইসব নিয়ে আলোচনায় এই মুহুর্তে যাবার কোন ইচ্ছে আমার নেই। আমার এই পোস্টের মূল প্রসংগ দুইটি। এই দুইটি বিষয়েই আমি আলোচনা করতে চাই। আপনারা মন্তব্যও করবেন এই দুইটি ইস্যুতে। প্রসংগ দুটি হল:
১। ইসলাম মূর্তির ব্যপারে কি বিধান দেয়?
২। নিয়ম তান্ত্রিক আন্দোলন না করে মোল্লাদের এই আস্ফালন কেন?
আমার ধারনা ছিল মূর্তির ব্যপারে সবাই একমত যে ইসলাম মূর্তিকে প্রচন্ড ভাবে নিরূৎসাহিত করে। কিন্তু তারপরেও দেখছি কেউ কেউ এ ব্যপারে এখনও সন্দিহান। তাদের জন্য আমার উচিত ছিল মূর্তি বিরোধী হাদীস গুলো সংকলন করা। কিন্তু এই মুহুর্তে হাতের কাছে সেসব নেই। হাদীসগুলো বেশ বিখ্যাত। "আমি মূর্তি ভাংগার জন্যে প্রেরিত হয়েছি" - এরকম বেশ অনেক হাদীস। ইসলাম অনলাইনের এই লিংকটি যারা ইন্টারেস্টেড তারা দেখতে পারেন। যাতে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্তিকে সম্মান দেখাতে মূর্তি তৈরীকে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। Click This Link
এতো গেল সম্মান দেখাতে মূর্তি বানানোর বিধান। পুরাকীর্তির বিষয়ে অবস্থান কিছুটা ব্যতিক্রম। ফেরাউনকে একটি নিদর্শন হিসেবে ভবিষ্যৎবানী দেয়া হয়েছে তাতে এটা স্পষ্ট অতীত কর্মকান্ডের এসব নিদর্শন সংরক্ষন ইসলাম শুধু অনুমতিই দেয় না, বরং ক্ষেত্র বিশেষে উৎসাহিত করে। যেটা বাধা দেয় তা হল ব্যক্তি বিশেষের মূর্তি নির্মান যা সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। আর সম্মানের উদ্দেশ্যে নির্মিত ব্যক্তি মূর্তি ব্যতীত শিশুতোষ খেলনার ক্ষেত্রে ইসলামের একই বিধান প্রযোজ্য নয়, বরং কিছুটা আলাদা। যার অনুমোদন বিভিন্ন হাদীসে এসেছে। সেসব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই পোস্ট জাম্বো সাইজের হয়ে যাবে। সারাংশ যা তা হল, পূর্ন শরীরের ব্যক্তি মূর্তির কোন অনুমোদন ইসলামে নেই।
লিংকে যেহেতু বিধান নিয়ে আলোচনা রয়েছে তাই আমি আর সে বিষয়ে এর চেয়ে বেশী বিস্তারিত কিছু বলছি না। আর আমি তো কোন ইসলামিক স্কলার নই। তাই আমার নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা খুব দ্রুতই প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে। সেজন্যে আপাতত ক্ষান্ত দিচ্ছি।
দ্বিতীয় যে ইস্যুটি নিয়ে সবার মাথা ব্যথা, তা হল, মোল্লারা কেন নৈরাজ্য তৈরী করে বার বার। মোল্লাদের প্রতিবাদ কেন এরকম সহিংস আর অসহিষ্ণু? কেন তারা বার বার একই আচরন করে থাকে।
বলা উচিত, আমিও যে কোন ধরনের সহিংস আন্দোলনের বিরুদ্ধে। সেটা মোল্লারাই করুক, কিংবা নন-মোল্লারা। কোন ভাংচুর বা নৈরাজ্য কোন অবস্থাতেই সমর্থনযোগ্য নয়। সেটা যেই করুক না কেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, মোল্লাদের এই ভায়োলেন্ট প্রতিবাদ কি তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ আর শিক্ষার সাথে কোন ভাবে জড়িত?
এই নিয়ে লিখতে গিয়ে প্রথমেই আমার স্মৃতিতে একটা ঘটনা চমকে গেল। অনেক আগের কথা। বুশের বিভিন্ন নীতি তখন বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রবল সমালোচনার ঝড় তুলেছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান তো বটেই - ইন্দোনেশিয়া সহ আরো অনেক দেশে বেশ বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছে। দেখা গেল সৌদি আরবে এরকম কোন কিছু হচ্ছে না। রাষ্ট্রদূত বন্দরকে জিজ্ঞাসা করা হল, কি ব্যপার? সৌদিরা যে প্রতিবাদ মিছিল বের করছে না? বন্দর উত্তর দিয়েছিলেন, "দেখুন। এরকম মিছিল মিটিং ঠিক সৌদি কালচার নয়। আমাদের মানুষেরা এরকম করে থাকে না। তবে আমরা তাদের চোখে অসীম ঘৃনা দেখতে পাচ্ছি। সেটা আমাদের অজানা নয়।"
এই ঘটনা এই জন্য উল্লেখ করা যে কখন কোথায় মানুষ কি ভাবে প্রতিবাদ করবে তা মূলত সংশ্লিষ্ট এলাকার সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে থাকে। বাংলাদেশে যেহেতু সহিংসতা একটি প্রচলিত কালচার, মোল্লারা তাই সেটাতে অভ্যস্ত। এদেশে সরকার বদলের সাথে সাথে চর দখলের কায়দায় চলে হল দখল, প্রকাশ্যে জুতা পেটা করা হয় বিরোধী মতাবলম্বনকারীদের, এমন কি শুধুমাত্র হরতাল সফল করার জন্য যাত্রীবাহী বাসে দেয়া হয় আগুন। এইসব ঘটনা যত না মোল্লারা ঘটিয়েছে, তার চেয়েও অনেক অনেক বেশী ঘটিয়েছে নন-মোল্লারা। সুতরাং মোল্লাদের এই সহিংস আস্ফালন তাদের বাংলাদেশী চরিত্রের স্বাভাবিক বহিপ্রকাশ মাত্র। মোল্লাদের গায়ে বাংলাদেশী গন্ধ রয়েছে বলেই কথায় কথায় তারা নৈরাজ্যের পথ বেছে নিয়েছে।
উপসংহার বেশী দ্রুত হয়ে গেল। তবে আর লেখার ইচ্ছে নেই। ব্যস্ততার কারনে ড্রাফটেও রাখলাম না। তাই আপাতত এইটুকুই রইল।
ধন্যবাদ সবাইকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

