আমার প্রিয় পোস্ট

ইরতেজা আলী এর আন্তর্জাল খেরোখাতা http://www.petitiononline.com/1971war/petition.html

ভাষার জন্য ভালোবাসা ( মুহম্মদ জাফর ইকবাল )

২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১০:৫৫

শেয়ার করুন:                   Facebook

মনটা বেশি ভালো নেই, এই একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমি প্রভাতফেরি দেখতে পাব না। যখন দেশের বাইরে যাওয়ার আমন্ত্রণটি গ্রহণ করেছিলাম, তখন যদি জানতাম তারা মিটিংটা ফেলবে একুশে ফেব্রুয়ারি, তাহলে কি আমি যেতে রাজি হই? অন্যদের কথা জানি না, এই একুশে ফেব্রুয়ারি দিয়ে প্রতিবছর আমার ভেতরকার ব্যাটারি আমি চার্জ করে রাখি! ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে হাতে কিছু ফুল নিয়ে বের হই, পথঘাট সব ওলটপালট করে দেওয়া থাকে বলে কোন দিক দিয়ে যেতে হবে বুঝতে পারি না! মানুষের ঢলের সঙ্গে যেতে থাকি এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে কীভাবে জানি শহীদ মিনারে পৌঁছে যাই! কোনো বছরেই নিজে গিয়ে ফুলটা দিতে পারি না, কিন্তু সেটা নিয়ে আমার কখনো কোনো আফসোস হয় না। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো একটা বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করি, ‘তুমি আমার এই ফুলগুলি শহীদ মিনারে দিতে পারবে?’ বাচ্চাটি সব সময় তার সব দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে ফুলগুলো হাতে নেয়! ফুল দেওয়া থেকে বাচ্চার হাসিটি দেখা আমার জন্য অনেক বেশি আনন্দের। আমি একুশে ফেব্রুয়ারিতে সকালবেলা শহীদ মিনারে তো আসলে ফুল দিতে যাই না−আমি যাই মানুষ দেখতে। চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ, ছেলে-বুড়ো-শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণী−কে নেই? আমি যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই মানুষগুলোকে দেখি, তখন টের পাই আমার বুকের ভেতরের অদৃশ্য ব্যাটারিটা চার্জ হতে শুরু করেছে। সারা বছর কত রকম অঘটন ঘটে, দেখে-শুনে মনটা খারাপ হয়ে যায়। বিজ্ঞজনেরা সেসব ঘটনা বিশ্লেষণ করেন; জঙ্গিবাহিনী চলে আসছে, সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান হচ্ছে, ধর্মান্ধতার প্রসার হচ্ছে−এ রকম কত কিছু নিয়ে দুর্ভাবনা। বড় বড় জ্ঞানী মানুষের কথা নিয়ে আমাদের কত রকম দুশ্চিন্তা, কত রকম আশঙ্কা, কত রকম হতাশা−কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে মানুষের সেই ঢল দেখে আমার সব দুশ্চিন্তা, সব আশঙ্কা, সব হতাশা কেটে যায়। আমি বুঝতে পারি পৃথিবীর সব মৌলবাদী, সব ধর্মান্ধ জঙ্গি এলেও তারা আমাদের এই দেশটিকে আমাদের হাত থেকে নিতে পারবে না। শহীদ মিনার ঘিরে এই যে লাখ লাখ মানুষ, তারাই এই দেশের শক্তি−একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যাওয়া এই প্রভাতফেরিটি হচ্ছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের রক্তপ্রবাহ। উনিশ শ একাত্তর সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাই সবার আগে এই শহীদ মিনারটি গুঁড়ো করে দিয়েছিল! কত বড় নির্বোধ হলে এ রকম একটা কান্ড করা যায়? তারা কী জানত না গুঁড়ো করে দেওয়া শহীদ মিনার দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ মিনার থেকেও এক শ গুণ বেশি ভয়ঙ্কর?

২.
এবার একুশে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ডাকটিকেট বের করছে−খবরের কাগজে তার ছবি দেখেছি! ডাকটিকেটের মাঝখানে আমাদের শহীদ মিনারের ছবি−দেখেই মনটা ভালো হয়ে যায়! (আমার পরিচিত যারা আমেরিকায় আছে, তাদের সবাইকে বলে রেখেছি বেশি করে সেই ডাকটিকেট কিনে বেশি করে সবাইকে চিঠি লিখতে।) আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি স্বদেশের সীমানা পার হয়ে একটা আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছে−কী চমৎকার একটা ব্যাপার। কিছুদিন আগে জাপান গিয়েছিলাম, সেখানে গিয়ে দেখি টোকিও শহরের মাঝখানে একটা পার্কে আমাদের শহীদ মিনার; আকারে একটু ছোট, কিন্তু একেবারে একশ ভাগ বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার শহীদ মিনার। যখনই একুশে ফেব্রুয়ারি আসে, তখনই আমার বাংলাদেশের সেই তরুণদের কথা মনে পড়ে, যাদের আন্তরিক চেষ্টায় এটা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তাদের জন্য আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমি যত দুর জানি একুশে ফেব্রুয়ারি যেভাবে সারা পৃথিবীর জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হয়ে গেছে, ঠিক সেভাবে পঁচিশে মার্চ আন্তর্জাতিক গণহত্যা প্রতিরোধ দিবস হওয়ার একটা প্রক্রিয়া অনেক দুর এগিয়ে গিয়েছিল। জোট সরকারের আমলে সেই প্রক্রিয়াটা এগিয়ে নেওয়া যায়নি। কারণ, এসব ব্যাপারে সরকারের একটু সাহায্যের দরকার হয়। যারা গণহত্যায় সক্রিয় সহযোগিতা করেছিল, সেই জামায়াতে ইসলামীই জোট সরকারের অংশ ছিল, কাজেই পঁচিশে মার্চকে একটা আন্তর্জাতিক দিবস করার চেষ্টা করাটাই তখন নিশ্চয়ই একটা বড় অপরাধ ছিল। সেই মানুষগুলো এখন ক্ষমতায় নেই; এখন কি আবার প্রক্রিয়াটা শুরু করা যায় না? আওয়ামী লীগ-বিএনপির অনেক লোকজনই জেলে আছেন; জামায়াতে ইসলামীর প্রেতাত্মা এখনো এই সরকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে কি না−তাহলে মনে হয় আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।


৩.
একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ায় আমাদের সবার নতুন এক ধরনের আত্মোপলব্ধি হয়েছে, যার খুব দরকার ছিল। আগে আমরা ধরেই নিতাম একুশে ফেব্রুয়ারি মানেই বাংলা ভাষার জন্য ভালোবাসা, এখন আমরা আমাদের ভাবনাটাকে আরও একটু বড় করেছি। এখন বলছি এবং ভাবছি একুশে ফেব্রুয়ারি মানে শুধু বাংলা ভাষা নয়, যার যার মাতৃভাষার জন্য ভালোবাসা। আমরা যারা বাংলায় কথা বলি তাদের জন্য কোনো পরিবর্তন হয়নি, এখনো আমরা বাংলার জন্যই মমতাটুকু ঢেলে দিই। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা স্বীকার করে নিই, এই দেশে সবাই বাংলায় কথা বলে না, অনেকেরই নিজের আলাদা মাতৃভাষা আছে এবং এখন অনেকটা আমাদের ওপর দায়িত্ব পড়ে গেছে তাদের মাতৃভাষাটিকে তারা যেন ভালোবাসতে পারে, তার একটা সুযোগ করে দেওয়া। আমার ধারণা, আমরা অনেকেই চিন্তা করিনি যে আমাদের ছোট ছেলেমেয়েরা যখন প্রথম স্কুলে যায়, সেখানে অ আ ক খ শেখে, সেটা শিখে নিজের ভাষায়। কিন্তু যখন একজন চাকমা, মারমা, গারো কিংবা সাঁওতাল শিশু প্রথম স্কুলে যায়, সেখানে তার বর্ণপরিচয়টা মোটেও মাতৃভাষায় হয় না−সে একটা ভিন্ন অপরিচিত ভাষায় তার লেখাপড়া শুরু করে। সারা দেশের সব মানুষের জন্য এক ধরনের প্রমিত ভাষার দরকার আছে (এবং সেটা যেন গেসি, খাইসি, করসি টাইপের প্রমিত ভাষা না হয়), কিন্তু যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয়, তারাও যেন নিজের ভাষায় অন্তত লেখাপড়া শুরু করতে পারে, তার একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া দরকার। তাদের সেই অধিকার আছে, রাষ্ট্রকে প্রথমে সেই অধিকার স্বীকার করে নিতে হবে, তারপর প্রয়োজনীয় কাজকর্ম শুরু করা যেতে পারে। ব্যাপারটার গুরুত্ব বোঝা কঠিন নয়, আমাদের ছোট বাচ্চারা পাংশু মুখে স্কুলে যাচ্ছে, সেই স্কুলে লেখাপড়া হয় হিব্রু ভাষায়−ব্যাপারটা অনেকটা সে রকম। আমরা কি সেটা সহজভাবে নিতে পারতাম? তাহলে কেমন করে আমাদের চাকমা, মারমা, গারো আর সাঁওতাল শিশুদের তাদের মাতৃভাষা থেকে ভিন্ন একটা ভাষায় লেখাপড়া শুরু করার জন্য পাঠাচ্ছি?

৪.
শুধু যে চাকমা, মারমা, গারো আর সাঁওতাল শিশুরা তাদের মাতৃভাষার বাইরে ভিন্ন একটা ভাষায় লেখাপড়া করে, সেটা কিন্তু সত্যি নয়; এই দেশের আরও অনেক শিশুকে কিন্তু মাতৃভাষার বাইরে ভিন্ন একটা ভাষায় লেখাপড়া করতে হয় এবং সেই ভাষাটার নাম ইংরেজি।
যে কারণেই হোক আমাদের দেশের অনেক মানুষের ধারণা হয়েছে, ইংরেজিতে লেখাপড়া না করলে এই দেশে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এখন অনেক মধ্যবিত্ত পর্যন্ত খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের ইংরেজি মিডিয়ামে লেখাপড়া করাচ্ছেন। ইংরেজির গুরুত্বটা মানুষের কাছে কত বেশি, সেটা বোঝা যায় কিছু কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে। সেখানে কেউ বাংলায় কথা পর্যন্ত বলে না। এর এক ধরনের ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশেই একটা প্রজন্ন তৈরি হয়েছে, যারা আসলে এই দেশের ঐতিহ্য ইতিহাস সংস্কৃতি বা ভাষা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
বিত্তশালীদের জন্য যে রকম লেখাপড়াটা হয়েছে ইংরেজি মাধ্যমে, ঠিক সে রকম এই দেশের গরিব মানুষের লেখাপড়াটা হচ্ছে মাদ্রাসায়। (অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম আছে, পরকালে সুবিধা পাওয়ার জন্য অনেক পরিবারই তাদের সব ছেলেমেয়েকে আধুনিক স্কুল-কলেজে পড়ান, একজনকে রেখে দেন মাদ্রাসায়।) আমাদের দেশের লেখাপড়ার মোট বিভাজন গুনে শেষ করা যাবে না, কিন্তু মূল বাংলা মাধ্যমের পাশাপাশি এই ইংরেজি মাধ্যম আর মাদ্রাসা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যত দিন পর্যন্ত আমরা এই তিনটা অংশের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় করতে না পারব, তত দিন আসলে এই দেশের লেখাপড়ার বিষয়টা নিয়ে আমরা কেউ স্বস্তি পাব না।
এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে এই আধুনিক পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার একটা গুরুত্ব আছে। আমাদের দেশের সফটওয়্যার শিল্পের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তাদের প্রধান অভিযোগ−বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হওয়া ছেলেমেয়েদের ইংরেজির জ্ঞান খুব কম। তারা নিজেদের ঠিক করে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, ই-মেইল পাঠাতে পারে না, সেমিনারে বক্তব্য দিতে পারে না, রিপোর্ট লিখতে পারে না। তাদের অভিযোগের সত্যতা আছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের যথাসাধ্য ইংরেজিতে পড়ানোর চেষ্টা করি, কিন্তু তারা যখন স্কুল-কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, তখন তাদের ইংরেজির জ্ঞান থাকে খুব কম থাকে। প্রথম কয়েকটি সেমিস্টারে তাদের চোখের জল আর নাকের জল এক হয়ে যায় ইংরেজি টেক্সট বই পড়ে তার মর্মোদ্ধার করতে।
অথচ মোটেও এ রকমটি হওয়ার কথা ছিল না। তারা স্কুল ও কলেজে সব মিলিয়ে ১২ বছর ইংরেজি পড়ে। যে ছেলে কিংবা মেয়ে ১২ বছর ইংরেজি পড়ে এসেছে, তার আর যেকোনো সমস্যাই থাকুক না কেন, ইংরেজিতে তো সমস্যা থাকার কথা নয়। ১২ বছরে এ ভাষাটিতে তো তার একটা ভালো দখল হয়ে যাওয়ার কথা।
কিন্তু আমরা জানি তার ভালো দখল দুরে থাকুক, কোনো দখলই হয় না। শুধু ইংরেজি নয়, অন্য বিষয়গুলোতেও তার দখল হয় না। ভালো গ্রেড পাওয়ার জন্য ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানো হয়, শেখার জন্য নয়। মুখস্থ করে, প্রাইভেটে পড়ে, কোচিংয়ে পড়ে ছেলেমেয়েরা ভয়ঙ্কর একটা নিরানন্দ জীবন শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ালেখা করতে আসে, তাদের গড়েপিটে মানুষ করা কী সোজা কথা?
লেখাপড়া করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শেখা। একজন ছাত্র বা ছাত্রী সত্যিকার অর্থে ঠিকভাবে শিখতে পারবে তার মাতৃভাষায়। এটা বুঝতে তো কারও আইনস্টাইন হওয়ার দরকার নেই যে, বাংলাদেশে আমরা যদি ঠিকভাবে লেখাপড়াটা করাতে চাই, এই দেশের ছেলেমেয়েকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো শেখাতে হবে তার মাতৃভাষায়। যদি অন্য কোনো ভাষায় শেখাতে চাই−গোড়াতেই আমরা খুব বড় একটা ভুল করে বসে থাকি।
যেহেতু লেখাপড়া নিয়ে কথাটা উঠেই গেছে, অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা ভিন্ন জিনিস সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া যায়। কিছুদিন আগে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবিষ্ককার করেছেন, মনে রাখার প্রতিযোগিতায় শিম্পাঞ্জিরা মানুষকে হারিয়ে দিয়েছে, যার অর্থ খুব সহজ: মানুষের মস্তিষ্কক মনে রাখার জন্য তৈরি হয়নি−মানুষের মস্তিষ্কক তৈরি হয়েছে সৃজনশীল কাজের জন্য। কাজেই আমরা যখন আমাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করার কথা বলে মুখস্থ করার একটি প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিই, আমরা তখন আসলে তাদের শিম্পাঞ্জিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিই। আমরা চাই না আমাদের ছেলেমেয়েরা শিম্পাঞ্জির একটা বৈশিষ্ট্য অর্জন করার জন্য পরিশ্রম করুক, আমরা চাই তাদের পরিশ্রমটুকু ব্যয় করা হোক মানুষের একটা বৈশিষ্ট্য অর্জন করার জন্য। একটি ছেলে বা মেয়ে যখন পরেরবার কিছু একটা মুখস্থ করতে বসবে, সে যেন কথাটা মনে রাখে।

৫.
বাংলা ভাষায় কথা বলে এ রকম মানুষ বাংলাদেশে যে রকম আছে, ঠিক সে রকম পশ্চিম বাংলাতেও আছে। মানুষগুলো দুটো ভিন্ন দেশে থাকার কারণে তাদের ভাষার বিবর্তন হচ্ছে একটু ভিন্নভাবে−কিন্তু এখনো ভাষাটি এক। বানানের নিয়ম নিয়ে ছোটখাটো পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু এক বাংলার মানুষের ভাষা ও অন্য বাংলার মানুষের ভাষার মধ্যে গুরুতর কোনো পার্থক্য নেই। তবে আমি কিছুদিন আগে পশ্চিম বাংলায় গিয়ে একটি সম্পুর্ণ ভিন্ন জিনিস দেখেছি। বাংলা ভাষাটি বাংলাদেশ নামে একটি রাষ্ট্রের ভাষা। এ ভাষাটি এখানে অনেক গৌরব আর অহংকার নিয়ে বিকশিত হচ্ছে। পশ্চিম বাংলায় বাংলা ভাষায় সেই গৌরব নেই, সেই অহংকারও নেই। সেই বায়ান্ন সালে ভাষাটিকে আমরা একটা মর্যাদার আসনে বসিয়ে ফেলেছি, ব্যাপারটা আমাদের জন্য এখন এত স্বাভাবিক যে আমরা এখন সেটা নিয়ে মাথা ঘামাই না। পশ্চিম বাংলার বাংলা ভাষাভাষী মানুষ এখনো সেই পর্যায়ে যেতে পারেনি। তাদের ভেতরে ভাষা নিয়ে এক ধরনের অপূর্ণতা, এর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। অনেক বেশি টাকা-পয়সা আছে যেসব মানুষের, তাদের ভাষা এসে সেখানে বাংলা ভাষাকে কোণঠাসা করে ফেলছে। আমাদের খুব সৌভাগ্য, বাংলা ভাষাটি এখন বাংলাদেশ নামের একটা দেশের ভাষা−এই ভাষাটিকে কেউ এখানে কোণঠাসা করে ফেলতে পারবে না।
সাধারণত বাংলা ভাষার কথা বললেই আমরা বাংলাদেশ আর পশ্চিম বাংলার কথা বলি। কিন্তু সেদিন একজন আমাকে বাংলা ভাষায় কথা বলে সে রকম তৃতীয় একটি জনগোষ্ঠীর কথা স্নরণ করিয়ে দিলেন−সেটা হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশি। আমি কিছুদিন থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঠিক সংখ্যাটি বের করার চেষ্টা করছিলাম; কোনো একটি কারণে সেটা বের করতে পারিনি। অনুমান করা যায়, সংখ্যাটি ৬০ লাখ থেকে প্রায় ৮০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে। সেটা শুনে আমার মাথা ঘুরে গেছে। বাংলা ভাষায় কথা বলে এমন যত মানুষ বিদেশে আছে, পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে তত মানুষ নেই। আমার মনে হয়, প্রবাসীদের কথা মনে রেখে আমাদের সম্পুর্ণ নতুনভাবে চিন্তা করা উচিত। আমাদের মনে করা উচিত বাংলাদেশটিই এখন তার নিজের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে আরও বড় হয়ে গেছে। যেখানে বাংলাদেশের মানুষ আছে, যেখানকার মানুষ বাংলায় কথা বলছে, সেটাই হচ্ছে খানিকটা বাংলাদেশ!
সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এইসব ‘খানিকটা করে বাংলাদেশ’ আর আমাদের এই ভৌগোলিক বাংলাদেশের সব মানুষকে যে-জিনিসটা একটা পারিবারিক বন্ধন হিসেবে এক করে রেখেছে, সেটা হচ্ছে আমাদের বাংলা ভাষা। যে-দিনটিতে এই বাংলা ভাষার প্রতি গভীর মমতা দেখিয়ে এই দেশের মানুষ পৃথিবীর মানুষকে মাতৃভাষার মর্যাদা শিখিয়েছে, সেই দিনটিতে সবার জন্য রইল মাতৃভাষার ভালোবাসা!
ভাষার জন্য ভালোবাসা থেকে সুন্দর ভালোবাসা আর কী হতে পারে?


লিখেছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আজকের প্রথম আলো থেকে সংগৃহীত।

লিঙ্ক

 

প্রকাশ করা হয়েছে: মুক্তিযুদ্ধ  বিভাগে ।

 

  • ২২ টি মন্তব্য
  • ৩৩৪ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ১১ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:০৩
comment by: কুম্ভকর্ণ বলেছেন: ধন্যবাদ।
২. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:০৫
comment by: ফারহান দাউদ বলেছেন: "স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার?
ভয় কি বন্ধু,আমরা এখনো চার কোটি পরিবার।"
আমার খুব বড় সৌভাগ্য,এমন একটা জায়গায় ৫টা বছর পড়াশোনা করেছি,যেখানে ক্লাস করতে গেলে প্রতিদিনই অন্তত ২ বার শহীদমিনারের পাশ দিয়ে যাওয়া লাগতো আর আলাউদ্দীন আল-আজাদের লেখা এই অসাধারণ ২টি পংক্তি চোখে পড়তো,কখনোই আমাকে ভুলে থাকতে দেয়নি যে "গুঁড়ো করে দেওয়া শহীদ মিনার দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ মিনার থেকেও এক শ গুণ বেশি ভয়ঙ্কর।"
চমৎকার লেখাটা এখানে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।
৩. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:১১
comment by: ভুতের আড্ডা বলেছেন: ধন্যবাদ ইরেতজা শেয়ার করার জন্য।
৪. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:২১
comment by: রাগিব বলেছেন: লেখাটা ভালো লেগেছে, তবে স্ট্যাম্পের ব্যাপারটা ঠিক না। জিতু ওসমানীর জোচ্চুরির শিকার হয়ে জাফর ইকবাল সার সহ বহু বাংলাদেশী বিভ্রান্ত হয়েছেন।

বিস্তারিত লিখেছি এইখানে
৫. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:৩৬
comment by: ইরতেজা বলেছেন: স্যার লিখেছেন,
"এবার একুশে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ডাকটিকেট বের করছে−খবরের কাগজে তার ছবি দেখেছি! ডাকটিকেটের মাঝখানে আমাদের শহীদ মিনারের ছবি−দেখেই মনটা ভালো হয়ে যায়! (আমার পরিচিত যারা আমেরিকায় আছে, তাদের সবাইকে বলে রেখেছি বেশি করে সেই ডাকটিকেট কিনে বেশি করে সবাইকে চিঠি লিখতে।) "...


আমি কথাটা শুনে খুবি খুশি হয়েছিলাম।মার্কিন প্রবাসী সাইফুর রহমান ওসমানী জিতু এরকম প্রতারনার কথা রাগিব ভাই আমরা আনুমান করা খুবি কষ্টের । আপনি আমেরিকায় আছেন বলে আপনি ধরতে পেরেছেন। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমআদের এখানেও চাইলে নিজের ছবি দিয়ে স্টাম্প কেন, টি সার্ট, কলম, মাউস প্যাড সবই বানানো জায়। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি মত এমন একটি অমর স্পর্শকাতর বিশয় নিয়ে এমন ধান্দাবাজি গ্রহন করা জায় না। আমরা এর তিব্র প্রতিবাদ জানাই। সাইফুর রহমান ওসমানী জিতু হচ্ছে সেই বাঙ্গালি যে ইত্যাদিতে আসত। অনেক আগে আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না। উনি ইত্যাদিতে আমেরিয়ার বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা দেখাত ৯০ দশকে।
৬. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:৪০
comment by: রাগিব বলেছেন: মনে আছে। ইনি এখন ৭%%% পার্সেন্ট কমিশন পাওয়ার ধান্ধায় এই স্ট্যাম্পের ব্যবসা ধরেছেন। জাফর ইকবাল সারকে ইমেইল করে জানিয়েছি বিস্তারিত।
৭. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:৫১
comment by: সামিয়া বলেছেন: ভালো লাগলো ।
৮. ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১১:৫৮
comment by: জল রঙ বলেছেন: ধন্যবাদ ইরতেজা ভাই ।
৯. ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১২:০৬
comment by: রাগ ইমন বলেছেন: ধন্যবাদ , পড়ে ভালো লাগলো ।
১০. ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ ভোর ৬:২২
comment by: রাশেদ বলেছেন: থ্যাঙ্কস শেয়ারের জন্য।
১১. ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ ভোর ৬:২৮
comment by: বিষাক্ত মানুষ বলেছেন: ধন্যবাদ
১২. ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ১:২৮
comment by: েজবীন বলেছেন: ধন্যবাদ ইরেতজা শেয়ার করার জন্য। পেপারে লেখাটা পড়েছি .... আপনি শেয়ার করায় রাগিবের লেখার লিংকটা পেলাম ....:)


ধন্যবাদ রাগিব আপনার লেখার লিংকটা দেবার জন্য।

১৩. ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১০:৩৯
comment by: জনৈক-৩৬০ বলেছেন: চমতকার শেয়ার,ইরতেজা ভাই! :)

ভাল আছো তো?
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১২:২৭

লেখক বলেছেন: আরাফাত নাকি? কিরে তুই এখানেও? আমি ভালো। তুই কেমন আছিস

১৪. ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ রাত ১২:২৩
comment by: ত্রিভুজ বলেছেন:
চমৎকার লেখা ইরতেজা... পড়েছিলাম আগেই.. মন্তব্য করা হয়নি তখন।
প্লাস!
১৫. ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ১২:১৯
comment by: জনৈক-৩৬০ বলেছেন: হ্যা, আমি আরাফাত ই.. তুমি আসোনা কেন ৩৬০ তে? তোমাকে খুব মিস করছি ওখানে! আর আমি ঐখানে করা blog গুলোই এইখানে রিপোসট করি। তোমাকে বেশ কয়েকবার নক দিছি, তুমি জবার দাওনা কেন? এইবার না দিলে আর নক দেবোনা! :( চলে আসো আর ভালো থেকো..
১৬. ১২ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১২:৫১
comment by: ইরতেজা বলেছেন: আমরা স্যারের কাছ থেকে দেশকে একটু ভালবাসতে শিখতে পারি না।
১৭. ১২ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১২:৫৬
comment by: রাশেদ বলেছেন: নমুনা দেখেন ব্লগে। কেরম আজাইরা পোস্ট দিয়া বসে আছে তাঁর নামে!!
১৮. ১২ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ২:৪৪
comment by: ইরতেজা বলেছেন: কিছু রাজাকারের নতুন প্রজন্ম আবার ঘেউ ঘেউ করতাছে
১৯. ১২ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ৩:১৫
comment by: কানুপা বলেছেন: আমার সর্বশেষ পোষ্টে একটা ভুল ছিলো ওইটা ঠিক করছি
২০. ১৫ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১১:০১
comment by: মিরাজ বলেছেন: শুভ জন্মদিন ইরতেজা ।

চমৎকার একটি দিন কাটুক ।
২১. ০৬ ই মে, ২০০৮ ভোর ৫:০৪
comment by: শফিউল আলম ইমন বলেছেন: অনেকদিন পরে পড়ে ভালো লাগল।
তিনি আমার প্রিয় লেখক তাই কোন লেখায় আমার জন্য পুরোনো নই।
ধন্যবাদ আপনাকে।

 

 


ছেঁড়া ছেঁড়া ভালবাসা, দুই চোখ ভরা সীমাহিন স্বপ্ন, অদ্ভুত সব স্মতি, একরাশ বেদনা, কঠিন বাস্তবতা, নিদারুণ অলসতা, আড্ডাবাজি, সত থাকার...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ৩১১৫৭