somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হেলাল হাফিজ: প্রিয় কবিতার আজন্ম গুরু

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তখনও লেখালেখির পথঘাট চিনি না। দাঁড়াইনি গিয়ে সাহিত্যের বিশাল সম্মুখ সমুদ্রে। নেইনি এ সমুদ্রের জল-স্বাদ। কি মিঠা? কি লবনাক্ত? সেই সময়ের একটা গল্প এটা। অনেকদিন ধরেই একটা কবিতাকে চিনতাম। চিনতাম না কবিকে। জানতাম না কবির নাম। কবিতার নাম, নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়। বহুজনকে জিজ্ঞাসা করেছি এই কবিতার কবি কে? যতবার যতজনকেই জিজ্ঞাসা করেছি, পেয়েছি সব বিভ্রান্তিমুলক তথ্য। কেউ বলেন, নজরুল, কেউ শামসুর রাহমান। কেউবা অন্য কোন নাম। হতে পারে তেমন সচেতন কাউকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয়নি বলেই এ উত্তর।
বিখ্যাত এক পঙতি আছে কবিতায়।
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়- যে পঙতিটি প্রয়োগ বিবেচনায় প্রায় ইর্ষণীয় পর্যায়ে চলে গেছে। মানুষকে জাগিয়ে তোলার আকুণ্ঠ নিয়ামক হিসেবে এই বিখ্যাত পঙতি ব্যবহৃত হচ্ছে বছরের পর বছর।
জানলাম, কবির নাম হেলাল হাফিজ।
খুঁজে বের করলাম কবির রচনা। অবাক হলাম বাজারে একটা কাব্যগ্রন্থ আর এক গুচ্ছ কবিতার কার্ড ছাড়া আর কিছু নেই। কাব্যগ্রন্থের নাম, যে জলে আগুন জ্বলে। পড়ে মুগ্ধতা ছাড়া আর কিছুই রইল না।
২.
একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ নিয়েই হেলাল হাফিজের এই আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তার কারন কী?
এর কারনটা হয়তো চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়। তার অকৃত্রিম সাবলীল কবিতা। বইতে প্রতিটি কবিতা অসাধারণ আবেদনসম্পন্ন। সেখান থেকে কবিতা উদ্বৃত করতে চাইলে একে একে সব কবিতাই তুলে ধরতে হবে। বিষয় বৈচিত্র, শব্দ শৈলী অথবা উপমা, কোনো হিসেবেই কোনো কবিতার আবেদন কম না। কবিতাকে বোঝার ক্ষেত্রে কবিতার নিচে সংযোজিত রচনাকাল পাঠককে আরো রোমাঞ্চিত করে। যেমন, ১৪.২.৭১-এর সেই উত্তাল সময়ে লেখা 'দুঃসময়ে আমার যৌবন' কবিতায় যখন পাওয়া যায়-
মানব জন্মের নামে কলঙ্ক হবে
এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই
উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুষের উপমা হবো
আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ
শুধু যদি নারীকে সাজাই।

কবিতার পরতে পরতে মায়াময় মোহ ছড়িয়ে দেয়া হেলাল হাফিজ, প্রতিনিয়তই ছিলেন সুন্দরের পুঁজারী। প্রেমের আচ্ছন্নতায় বিলীন। কোন সন্দেহ থাকেনা যখন তার অনেকগুলো কবিতার পঙতিই এভাবে একসাথে জানান দেয়-
জন্মাবধী আমার শীতল চোখ
তাপ নিবে তোমার দুচোখে

অথবা
তোমাকেই চাই তোমাকেই চাই পাবো
পাইবা না পাই একজীবনে তোমার কাছেই যাবো...

কিংবা বলেন,
একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতটা কাঙাল,
কতো হুলুস্থল অনটন আজন্ম ভেতরে আমার...।

কবিতায় হেলাল হাফিজ যেভাবে ছড়িয়েছেন প্রেমের আবাহন, তেমনি জাগিয়েছেন কষ্টের প্রলেপ। কখনো বেদনাকে নিজের ভেতরে দেখিয়েছেন, কখনো পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন নিজের বোন হিসেবে। কখনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য বানিয়েছেন কষ্টকে।
দুঃখ, কষ্ট, বেদনার আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা তার কবিতার পঙতিগুলো সেই সাক্ষ্য-ই দেয়। যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি দ্বিধাহীন বলেও দেন,
দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ
৩.
হেলাল হাফিজ ভেতরে বাইরে নিপাট কবি। যে কারনে নিজের অস্থি মজ্জায় যেভাবে কবিতাকে রাখেন, তেমনি কবিতার অস্থি মজ্জায়ও তার অবাধ বিচরন। কবি হেলাল হাফিজের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয়ও আমাকে সে উপলব্দিই দিয়েছে। ব্যক্তি হেলাল হাফিজ তার কবিতার মতই পরিছন্ন। হেলাল হাফিজ তার কবিতার মতই মানুষের হৃদয় জয় করা চরিত্র। কবিতার মতই কোমল, অর্ন্তমূখী আর অব্যক্ত অনুভূতিতে তীব্র। আবার কখনো জ্বলে ওঠেন, তার পঙতির মতই প্রবল বিদ্রোহে।
যে বৈশিষ্টগুলো তুলেও ধরেছেন তার কোন কোন কবিতায়।
যেমন তার 'কবুতর' কবিতায় তিনি তার সেসব জানিয়ে দেন সচেতন উন্নাসিকতায়-
জীবন যাপনে কতো মানবিক
কবিতায় কতোটা মানুষ,
পরিপাটি নির্দোষ সন্ত্রাস নিয়ে
আমি কতো বিনীত বিদ্রোহী
পাখিকে জিজ্ঞেস করো, সব জেনে যাবে
অবিকল আমার মতন করে কবুতর নির্ভূল জানাবে।

৪.
শখের বশে নয় কবিতা লিখতে হয় জীবন খরচ করে-কবিতার প্রতি আজন্ম প্রেম, আজন্ম গেরস্থালি না থাকলে হয়তো এমন উচ্চারন, এমন জানান দেয়া সম্ভব না। কবিতার জন্য জীবন খরচ করা হেলাল হাফিজ সংখ্যার আধিক্য নিয়ে কবিতার ফলন নয়, ব্যস্ত ছিলেন কবিতার নিরবিচ্ছিন্ন নার্সিং-এ।
কারন হেলাল হাফিজ যখন লিখে ফেলেন,
নিউট্রন বোমা বোঝ
মানুষ বোঝ না।

অথবা
কে আছেন আকাশকে বলুন
একটু উপরে উঠতে
আমি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিনা।

তখন বাংলা কবিতার বাঁকেও লেখা হয়ে যায় বাংলা কবিতায় হেলাল হাফিজের অনিবার্যতা।
৫.
প্রকাশ্য গোপনে প্রবল অভিমানি হেলাল হাফিজ বাংলা কবিতার এক অসামান্য সংযোজন। সহজ, সরল, প্রাঞ্জল আর সাধারণকে ছুয়ে যাওয়া ভাষায় লেখা একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থে তিনি যে ইর্ষণীয় উচ্চতায় চলে গেছেন তা সত্যিই বিরল।
প্রিয় কবিতার যে সাম্রাজ্য তৈরি করেছেন নিপুন দক্ষতায় সে কারনে বাংলা কবিতাকেও তার কাছে ঋনী থাকতে হবে যতদিন অস্তিত্ব থাকবে।
তাই প্রতিনিয়তই প্রত্যাশা, প্রিয় কবিতার এই কীর্তিমান বেঁচে থাকুক তার কবিতার মতই দীর্ঘদিন।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ২:৪৮
২৪টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×