বিখ্যাত এক পঙতি আছে কবিতায়।
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়- যে পঙতিটি প্রয়োগ বিবেচনায় প্রায় ইর্ষণীয় পর্যায়ে চলে গেছে। মানুষকে জাগিয়ে তোলার আকুণ্ঠ নিয়ামক হিসেবে এই বিখ্যাত পঙতি ব্যবহৃত হচ্ছে বছরের পর বছর।
জানলাম, কবির নাম হেলাল হাফিজ।
খুঁজে বের করলাম কবির রচনা। অবাক হলাম বাজারে একটা কাব্যগ্রন্থ আর এক গুচ্ছ কবিতার কার্ড ছাড়া আর কিছু নেই। কাব্যগ্রন্থের নাম, যে জলে আগুন জ্বলে। পড়ে মুগ্ধতা ছাড়া আর কিছুই রইল না।
২.
একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ নিয়েই হেলাল হাফিজের এই আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তার কারন কী?
এর কারনটা হয়তো চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়। তার অকৃত্রিম সাবলীল কবিতা। বইতে প্রতিটি কবিতা অসাধারণ আবেদনসম্পন্ন। সেখান থেকে কবিতা উদ্বৃত করতে চাইলে একে একে সব কবিতাই তুলে ধরতে হবে। বিষয় বৈচিত্র, শব্দ শৈলী অথবা উপমা, কোনো হিসেবেই কোনো কবিতার আবেদন কম না। কবিতাকে বোঝার ক্ষেত্রে কবিতার নিচে সংযোজিত রচনাকাল পাঠককে আরো রোমাঞ্চিত করে। যেমন, ১৪.২.৭১-এর সেই উত্তাল সময়ে লেখা 'দুঃসময়ে আমার যৌবন' কবিতায় যখন পাওয়া যায়-
মানব জন্মের নামে কলঙ্ক হবে
এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই
উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুষের উপমা হবো
আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ
শুধু যদি নারীকে সাজাই।
কবিতার পরতে পরতে মায়াময় মোহ ছড়িয়ে দেয়া হেলাল হাফিজ, প্রতিনিয়তই ছিলেন সুন্দরের পুঁজারী। প্রেমের আচ্ছন্নতায় বিলীন। কোন সন্দেহ থাকেনা যখন তার অনেকগুলো কবিতার পঙতিই এভাবে একসাথে জানান দেয়-
জন্মাবধী আমার শীতল চোখ
তাপ নিবে তোমার দুচোখে
অথবা
তোমাকেই চাই তোমাকেই চাই পাবো
পাইবা না পাই একজীবনে তোমার কাছেই যাবো...
কিংবা বলেন,
একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতটা কাঙাল,
কতো হুলুস্থল অনটন আজন্ম ভেতরে আমার...।
কবিতায় হেলাল হাফিজ যেভাবে ছড়িয়েছেন প্রেমের আবাহন, তেমনি জাগিয়েছেন কষ্টের প্রলেপ। কখনো বেদনাকে নিজের ভেতরে দেখিয়েছেন, কখনো পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন নিজের বোন হিসেবে। কখনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য বানিয়েছেন কষ্টকে।
দুঃখ, কষ্ট, বেদনার আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা তার কবিতার পঙতিগুলো সেই সাক্ষ্য-ই দেয়। যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি দ্বিধাহীন বলেও দেন,
দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ
৩.
হেলাল হাফিজ ভেতরে বাইরে নিপাট কবি। যে কারনে নিজের অস্থি মজ্জায় যেভাবে কবিতাকে রাখেন, তেমনি কবিতার অস্থি মজ্জায়ও তার অবাধ বিচরন। কবি হেলাল হাফিজের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয়ও আমাকে সে উপলব্দিই দিয়েছে। ব্যক্তি হেলাল হাফিজ তার কবিতার মতই পরিছন্ন। হেলাল হাফিজ তার কবিতার মতই মানুষের হৃদয় জয় করা চরিত্র। কবিতার মতই কোমল, অর্ন্তমূখী আর অব্যক্ত অনুভূতিতে তীব্র। আবার কখনো জ্বলে ওঠেন, তার পঙতির মতই প্রবল বিদ্রোহে।
যে বৈশিষ্টগুলো তুলেও ধরেছেন তার কোন কোন কবিতায়।
যেমন তার 'কবুতর' কবিতায় তিনি তার সেসব জানিয়ে দেন সচেতন উন্নাসিকতায়-
জীবন যাপনে কতো মানবিক
কবিতায় কতোটা মানুষ,
পরিপাটি নির্দোষ সন্ত্রাস নিয়ে
আমি কতো বিনীত বিদ্রোহী
পাখিকে জিজ্ঞেস করো, সব জেনে যাবে
অবিকল আমার মতন করে কবুতর নির্ভূল জানাবে।
৪.
শখের বশে নয় কবিতা লিখতে হয় জীবন খরচ করে-কবিতার প্রতি আজন্ম প্রেম, আজন্ম গেরস্থালি না থাকলে হয়তো এমন উচ্চারন, এমন জানান দেয়া সম্ভব না। কবিতার জন্য জীবন খরচ করা হেলাল হাফিজ সংখ্যার আধিক্য নিয়ে কবিতার ফলন নয়, ব্যস্ত ছিলেন কবিতার নিরবিচ্ছিন্ন নার্সিং-এ।
কারন হেলাল হাফিজ যখন লিখে ফেলেন,
নিউট্রন বোমা বোঝ
মানুষ বোঝ না।
অথবা
কে আছেন আকাশকে বলুন
একটু উপরে উঠতে
আমি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিনা।
তখন বাংলা কবিতার বাঁকেও লেখা হয়ে যায় বাংলা কবিতায় হেলাল হাফিজের অনিবার্যতা।
৫.
প্রকাশ্য গোপনে প্রবল অভিমানি হেলাল হাফিজ বাংলা কবিতার এক অসামান্য সংযোজন। সহজ, সরল, প্রাঞ্জল আর সাধারণকে ছুয়ে যাওয়া ভাষায় লেখা একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থে তিনি যে ইর্ষণীয় উচ্চতায় চলে গেছেন তা সত্যিই বিরল।
প্রিয় কবিতার যে সাম্রাজ্য তৈরি করেছেন নিপুন দক্ষতায় সে কারনে বাংলা কবিতাকেও তার কাছে ঋনী থাকতে হবে যতদিন অস্তিত্ব থাকবে।
তাই প্রতিনিয়তই প্রত্যাশা, প্রিয় কবিতার এই কীর্তিমান বেঁচে থাকুক তার কবিতার মতই দীর্ঘদিন।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ২:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


