খুব সুন্দর কোন মেয়ের সাথে সাধারণত বাজে চেহারার কোন ছেলে দেখলে এখন আর তেমন আক্ষেপ হয়না আমার। আগে হতো। সবার মতো সহজেই বলে দিতে পারি না এতো সুন্দর মেয়ের সাথে এ কেমন ছেলে? আমি মেয়েকে রেখে ঐ ছেলের দিকেই তাকিয়ে থাকি। আমি জানি কি অসামান্য গুন আছে তার। তার মানে যে আমি খুবই মহান মানুষ তাও না। কারণ সব সময় এ গুন ধরেও রাখতে পারিনা। মাঝে মাঝে গালিও দেই। হতাশায় ডুবি। তাহলে এ পৃথিবীতে আমার আসার কি প্রয়োজন ছিল? নিজের উপর মহাবিরক্ত হই। সঙ্গে সঙ্গে হারানো সম্বিতও ফিরে পাই। সামান্যও কোন কাজ না থাকার কারণে এই সব অদ্ভুত চিন্তাগুলো কুঁড়ে কুঁড়ে খায় প্রতিদিন। ঘড়িতে তাকাই। এখন সাতটা দশ। তাই সকালের এই ঘুম আরেক বার দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষে মাথার উপর বালিশ চাপা দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে থাকি। হঠাৎ বুঝতে পারি একটা ভুল নিয়ে চলছি। ঘটনা কি? পৃথিবী কি আজ থেমে আছে নাকি। আমিতো আধঘণ্টা আগেও দেখলাম সাতটা দশ। চিন্তা করে প্রায় অনেকন কেটে গেল অথচ একবারও মনে হলো না যে ঘড়িতে ব্যাটারী শেষ হওয়ারও একটা ব্যাপার আছে। এখন যেটা মনে হলো। একটা বড় ভার মুক্ত হলাম বলে মনে হচ্ছে। বেশ সতেজও লাগছে। কঠিন ঘুম দেবার সাথে এক মগ চা খেলে যেমন লাগে ঠিক তেমন মনে হচ্ছে।
২.
বিছানা থেকে সোজা চেয়ারে বসতে পারি বলে সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসি। কিছুন পর বারান্দায় চলে যাই। গিয়ে সোজা আকাশের দিকে মুখটা তুলি। সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা চালাই। তাকে বড় প্রয়োজন আমার। আমি বলে যাই, তিনি শোনেন। প্রশ্ন করে কখনোই কোন উত্তর পাইনা। এই একতরফা যোগাযোগ আর কতকাল ভালো লাগে? কমতো হলো না। এখন শুধু তার কাছে একটাই প্রশ্নের জবাব জানা বড়ো প্রয়োজন, এই পৃথিবীতে আমার আসার আসলেই কি কোন উদ্দেশ্য আছে? এটা কেউ-ই জানতে পারেনি। তারপরও আশ্বস্ত হই। তিনি বিনা কারণে কিছুই সৃষ্টি করেননি। তিনি যা করেন সবই নাকি ভালোর জন্যই। আমিও সেই ভালোর অপেক্ষায় আছি। দেখা যাক। হয়তো কোথাও কিছু আছে।
৩.
আমি সাধারণত কোন কাজেই লাগিনা। এখনও বাজারটা বাবা-ই করেন। অবশ্য বাজার-টাজার আমার কাজ না। আমার একটাই কাজ। কোন এক ভালোর জন্য অপো করা। আমি জানি একটু পরেই মা আসবে ঘরে। বেশ শান্ত মুখে খাবার দিয়ে যাবে। মাকে এভাবে দেখতে ভালো লাগেনা। অল্প অল্প কথা বলবে। ঠিক ছোট বেলায় পরীক্ষার আগের রাতের মতো। যখন প্রয়োজনে ভাতও খাইয়ে দিতো। খারাপ লাগতো সে সময়। বুক ফেঁটে কান্না আসতো। নিজেকে অসহায় লাগতো। মনে হতো যেন কোন বিপদে পড়েছি। মা সব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতো। এখনো করছে। খারাপটা এখনও লাগে। তবে কম। কষ্ট, আগুন কিছুটা দূরেই চলে গেছে। তাই তাপটা কম। আর এ দূরত্বের আগুনে পাশে বসে আছি বহু দিন হয়ে গেল। তাই মনে হয় এই তাপটাই স্বাভাবিক।
আমার খারাপ লাগে ছোট ভাই বোনটার জন্য। যে বয়সে যে কারোরই বড়ো ভাইয়ের কাছে দাবী করার কথা। তাদের একজনও সেটা করেনা। হয়তো আর কখনো করবেও না। আমি শুয়ে থাকলে ছোট ভাইটা পাশে এসে শোয়। মুখের দিকে বারবার তাকিয়ে থাকে। জ্বলজ্বল করে তার চোখ। যেন অনেক প্রশ্ন তার। কিন্তু হঠাৎ-ই নিভে যায় সব। চুপ করে পাশে শুয়ে থাকে, আমাকে জড়িয়ে ধরে। একটা সময় ঘুমিয়েও যায়। তার নিষ্পাপ চেহারাও মাঝে মাঝে খুঁজি আমার বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য। পাই না। বরং আরো এক অজানা বিষাদে ছেয়ে যায় বুক।
৪.
আপাতত কোন কাজ খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। চিন্তা করার মতো ও কোন বিষয় পাচ্ছি না। তাই জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। নিচে ছোট একটা জায়গায় ছেলেগুলো চিৎকার করে ফুটবল খেলছে। আমারও খুব ফুটবল খেলতে ইচ্ছে করে। একটা সময় ফুটবল খেলতাম। ফুটবল খেলতে গিয়ে একবার পায়ে ভয়াবহ আঘাত পেলাম। টানা দু'মাস খুঁড়িয়ে হাটতে হয়েছে। খারাপের পাশাপাশি অল্প ভালোও লেগেছে। যে ব্যস্ত সময়ে কারো দিকে কারো তাকানোর সময় ছিল না। সেই সময়েও আমার খুঁড়িয়ে হাটা দেখে যে কেউ জিজ্ঞাসা করত, কি হয়েছে পায়ে?
তেমন কিছু হয়নি। জবাবে যেন তারাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচতো। তখন ইচ্ছে হতো সব সময়ই খুড়িয়ে হাটি। একটু করে হলেও তো সকলের ভালোবাসা পাওয়া যাবে। এখন বুঝি ওসব ভালোবাসা না, সহানুভুতি।
৫.
আমি ঘুরে তাকালাম। যেখানে বসে আছি সেখান থেকে বড় রাস্তাটা বেশ স্পষ্ট। হঠাৎ চোখ পড়লো রাস্তায়। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুন্দর লাগছে। কেন দাঁড়িয়ে আছে কিছুক্ষণ পর বোঝা গেল। একটা ছেলে আসলো। ছেলেটা আসতেই মেয়েটির একটা হাসি ছড়িয়ে দিল তার উদ্দেশ্যে। হাসিটা বড় অদ্ভুত কারণে আমাকেও ছাপিয়ে গেল। কারণ আমি জানি এ রকম হাসি কখনোই আমার জন্যে কেউ হাসবে না। মেয়েটা ছেলেটার হাতটা চেপে ধরল। এবার একটু যেন বুকটা কেঁপে উঠল। হতাশায়। প্রচন্ড হতাশায়।
এ রকম হাত কখনো আমার হাতে পড়বে না। কারণটা আমি জানি। আমি কাজ করি না। পারিও না কাজ করতে। যার হাতে মেয়েটা হাত রেখেছে, সে হাত আমার হাত থেকে বহুগুন শক্ত। কারণ সে ছেলেটা স্বাবলম্বী। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার তো আর সে ক্ষমতা নেই। কারণ আমি স্বাবলম্বী না। নিজের পায়ে দাঁড়াতেও পারিনি।
পরনির্ভরশীল।
হুইল চেয়ারেই চলছি বছরের পর বছর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


