somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

থ্রি ইডিয়টের চিটাগাঙ ট্যুর

২৭ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ৮:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার পাশের সিটে বসে আছেন একজন। এদেশি না। ইন্ডিয়ান। ভূস্বর্গ কাশ্মীরের ছেলে। নাম মোজাম্মেল মাসুদী। ভীষণ বিনম্র টাইপ ছেলে। চিটাগাঙে ডাক্তারী পড়তে এসেছেন। পড়া শেষ, এখন চলছে দেশে ফেরার আয়োজন। বাংলাদেশে কাটালেন আট বছরের মতো। বিদেশি পেলে বা দেশের বাইরে কোথাও গেলে সে দেশের মানুষ আমার দেশ সম্পর্কে কি ভাবে তা জানার? এখানেও ব্যতিক্রম হল না। কথা যখন বাড়ছিল, এক ফাঁকে জিজ্ঞাসা করে বসলাম, কেমন লাগল বাংলাদেশ? বাংলাদেশের মানুষেরা কেমন?
সে আমাকে চরম হতাশ করে দিয়ে বলল, দেশটা সুন্দর। কিন্তু মানুষ নিয়ে অভিজ্ঞতা আমার ভাল না।
কেন?
অনেক ঝামেলা হয়েছে। প্রথমদিন থেকেই সমস্যায় পড়েছি। একজনের সাথে ঝামেলা হয়েছিল।
কারণ?
কারন নেই। আমি একটা দেশে নতুন। তার ব্যবহারে আমি বেশ হতবাক হয়ে পড়েছিলাম। তুচ্ছ একটা বিষয় নিয়ে প্রথমদিনেই আমার শার্টের কলার চেপে ধরল। এরপর থেকে আমার আর ওইভাবে বাংলাদেশী কোনও বন্ধু হয়নি।
কথাগুলো শুনে আমি নিজে চরম অপরাধী বোধ করলাম।
তারপর আরও কিছুক্ষণ চেষ্টা করলাম বাংলাদেশ সম্পর্কে তার কোনও ভালো ধারনা বের করা যায় কিনা?
কিন্তু তা আর হলনা। উল্টো আমার হতাশা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হল।
আমি চুপ করে গেলাম। গাড়ি চলছে চট্রগ্রামের দিকে।
এই মুহুর্তে কিছু করার নাই। তাই চুপ করে না থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে বরং ভ্রমণকাহিনীর শুরু থেকে আসা যাক।
হঠাৎ করেই ঠিক করলাম চট্রগ্রাম যাবো। আমার সাথে দুই কমরেড। আমার দুই মামাতো ভাই। খুবই ইডিয়ট টাইপের। কোথাও যাওয়ার আগে আমাকে দেবতাতূল্য হিসেবে মানে। যখন নিশ্চিত হয়ে যায় তাদের যাওয়া হচ্ছে, তখন থেকে আমাকে খুব একটা পাত্তা দেয় না। ভাব নেয় তারাই আমাকে ঘোরাতে নিয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে তাদের সাথে টিকে থাকতে আমাকেও যথেষ্ট ইডিয়ট হতে হয়।
প্রথম অবস্থা ছিল, একজন যাবে। ট্রেনের টিকেট কেনা হয়েছিল দুটো। পরে আরেকজন যুক্ত হওয়ায় তাকে আমাদের সঙ্গে নেয়ার কোনও উপায় পাওয়া গেল না। তাকে কাটতে হল বাসের টিকেট।
কিন্তু পরেরদিন আমারই সমস্যা থাকায় তাদের পাঠিয়ে দিলাম ট্রেনে আর আমাকে যেতে হল বাসে। রাত সাড়ে ১২টায় বাস। মালিবাগ থেকে ছাড়বে।
আমার এলাকা থেকে বাস ছাড়বে সাড়ে ১০টায়। সেখান থেকে মালিবাগ। তারপর চট্রগ্রাম। এই সময়সূচি দেখে আতকে ওঠলাম। কারণ আমাকে বাসের কাউন্টারে যে সময়টুকু বসে থাকতে হবে, সে সময়ে ঢাকা থেকে কুমিল্লা চলে যাওয়া যাবে।
২.
কাউন্টারে পৌছলাম সোয়া ১১টায়। চিরকালই গন্তব্যে পৌছানোতে আনন্দ থাকে আজ ছেয়ে গেল বিষাদ। কারণ আরও সোয়া ১ঘন্টা কাউন্টারে বসে থাকতে হবে। বড় বড় বাস কাউন্টারগুলোতে আমাদের বয়সীদের অবশ্য সেরকম অস্বস্তি থাকেনা। কারণ, এসব বাসে সুন্দরীদের যাতায়াত ব্যাপকহারে পরিলক্ষিত হয়। ফলে অপেক্ষাজনিত অস্বস্তি তারাই অনেকটা ধুয়ে দেয়। আজও ব্যাতিক্রম হলনা। সোহাগের বিশাল কাউন্টারে বিশাল জমায়েত। ব্যাগ লাগেজের ভার বহনকারী নারী পুরুষের পদভারে মুখরিত কাউন্টার।
মানুষ দেখতে চিরকালই ভালোলাগে আমার। সামনের সোফায় কোনওভাবে কোমর গোজার ব্যাবস্থা করে বসলাম। বসে আর কোনও কাজ নাই তাই একমনে তাকিয়ে আছি গেটের দিকে। কিছুকক্ষণ পরপরই খুলে যায় এই গেটখানা। নানান ধরণের মানষ ঢুকেন কাউন্টারে। যদিও দেয়ালটা স্বচ্ছ কাঁচের হওয়ায় গেটের ওপাশ থেকেই দেখা যাচ্ছিল কারা আসছেন? আমি বসে বসে দেখছি। গেটের দিকে দেখছি। আর গেট দিয়ে কোনও সুন্দরী ডুকলে দেখছি কাউন্টারের ভেতরের মানুষের চেহারা। অনেকে নড়েচড়ে বসেন। কেউ চুলটুল ঠিক করতে ব্যাস্ত হন। দেখে মজাই লাগে। তবে এসবের সব কিছুর বাইরে একজন যিনি আমার পাশে বসে নাক ঢাকছেন, বড় জার্নির আসল যাত্রী। এখনই নাক ঢাকছেন। বাসে ওঠে তো পাশের যাত্রীর খবর করে দেবেন, কোনও সন্দেহ নাই।
আমি সে সন্দেহে আর গেলাম না। কারণ আমার সামনে একদল সুন্দরী ললনা। সন্দেহ হচ্ছে, নিশ্চয় তারা আমার সহযাত্রী হবে। সন্দেহ ক্রমশই চাওয়াতে পরিনত হয়ে গেল।
যে চাওয়া অবশ্য পুরণ হলও। তবে আমাদের আসন বিন্যাসজনিত জটিলতায় আমরা পড়ে গেলাম দুই মেরুর কাছাকাছি। তাই প্রাথমিক ভালোলাগা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হল।
৩.
নিজের শহরে সকালে ঘুম না ভাঙ্গায় আমি সবসময়ই ভোরের গন্ধ অন্য শহরে পাই। তা আরেক দফা বেড়ে গেল। আবার অনেকদিন পর সকালের গন্ধ পেলাম চট্রগ্রামে। আনুমানিক ৬টার দিকে পৌছলাম। আমার আগেই এসেছে আমার দুই ভাই। এসেই তাদের কাছে গেলাম। সকালবেলাই ডেকে তুললাম। নিজের ঘুম সকালে ভাঙ্গালে রাগ হলেও সকালবেলা অন্য কারো ঘুম ভাঙ্গানোতে আলাদা মজা।
আমি সেই মজাটা শতভাগ নিয়ে ডাকলাম। রেডি হতে বললাম, বেরুতে হবে। সিডিউল জানালাম। আজকের স্পট দুটো, বাশঁখালি ইকোপার্ক। আসার পথে আনোয়ারার সম্ভাব্য নতুন ভ্রমণ তীর্থ পারকী বিচ। সাবেক পারকীর চর।
বাইরে বেরিয়েই মানুষকে প্রশ্ন করা শুরু, ভাই বাঁশখালি যেতে চাই। কীভাবে যাব? নানা মুনির নানা মতের উপর ভর করে প্রথমে টেম্পুতে ষেখান থেকে বাস কাউন্টারে যেতে হবে। মস্তিস্কে ‌'খালি' ধারণা নিয়ে চললাম বাঁশখালির দিকে।

হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে মনটা হুহ করে উঠল। সামনে একটা টেম্পুতে এক বাবা তার দু্ ছেলেকে বিদায় দিচ্ছে। ছেলেরা সম্ভবত মাদ্রায় যাচ্ছে। বড়টা শান্ত থাকলেও ছোটটা পিতৃবিরহে কান্নায় অস্থির। একটা সময় বাবাকে ছেড়ে চলে গেল। আমরা চলে গেলাম বাসের দিকে।
বাসে প্রায় ঘন্টা দেড়েক আমার দুই ভাই আর বিশাল পরিমান মুগ্ধতাকে সঙ্গী করে বাঁশখালির পথে। পথের দৃশ্যর সৌন্দর্যই মাথা খারাপ করে দেয়ার মত। কিছুক্ষণ এপাশ কিছুক্ষন ওপাশ করে করে দেখে একটা সময় এসে পৌছালাম বাঁশখালিতে।
অপেক্ষার প্রহরের মত অপেক্ষার পথের শেষ নাই। এখানেও শেষ হল না। নেমেই ভেবেছিলাম, এসে গেছি। কিন্তু না। তখনও আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে আরো ৪৫ মিনিটের রিকশার জার্নি।

(চলবে)


ছবি : ১.চিটাগাঙ রেল ষ্টেশনে থ্রি ইডিয়টের মত চেয়ারের সরবরাহ ছিলনা বটে। কিন্তু আশিংক সে সদৃশ চেয়ার ছিল তবে সেটা ইডিয়টদের জন্যই না সকলের বসার জন্য।
২.পিতৃবিরহে কাতর ছোট্ট হুজুর।
৩.বাঁশখালি যাওয়ার পথে।
৪.বাঁশখালির ঝুলন্ত ব্রিজ
৫.বাঁশখালির সর্বোচ্চ শৃঙ্গে ওঠার সিড়ি।
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×