somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

থ্রি ইডিয়টের চিটাগাঙ ট্যুর (শেষ পর্ব)

৩০ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ১:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম অংশ : Click This Link
তবে একটা সময় সব কিছুরই যেমন শেষ আছে। আমাদের পথেরও শেষ হল। আমরা এসে দাঁড়ালাম বাঁশখালি ইকোপার্কের সামনে।
বাঁশখালি সম্পর্কে যতটুকু জানি এই ইকোপার্কে রয়েছে, ৮৫ প্রজাতির পাখি, ৪৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৭ প্রজাতির উভচর প্রাণী। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার বিষয় তাদের কারো সাথেই দেখা হল না। হয়তো আমরা যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিন তাদের বিশ্রামের দিন ছিল। ওইদিন হয়তো তারা মানুষের সাথে দেখা দেয়না।
কে জানে?
তবে জানা মতে, ৩১০ প্রজাতির উদ্ভিদ দেখলাম।। এর মধ্যে আছে ১৮ প্রজাতির দীর্ঘ বৃক্ষ, ১২ প্রজাতির মাঝারি বৃক্ষ, ১৬ প্রজাতির বেতসহ অসংখ্য অর্কিড, ইপিফাইট ও ঘাস জাতীয় গাছ। তবে এসব জানা তথ্য যেহেতু গুণে দেখা হয়নি তাই কমবেশি হতে পারে। তবে পুরো ইকোপার্কটি বিশাল এবং মানুষকে টানার মত।
যে টানের প্রত্য প্রমাণ পেলাম। অসংখ্য দর্শনার্থির ভিড় পার্কের বিভিন্ন স্পটে। বেশির ভাগই একটি ঝুলন্ত ব্রীজকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কেউ উচুতে উঠছে। কেউ নিচে নেমে ছবি তুলছে। এক ঝাঁক তরুণকে দেখা গেল সুরের প্রতি তোয়াক্কা না করে দল বেঁধে গান গাইছে। সংখ্যার আধিক্য দেখে মনে হল শিক্ষাসফর। হেটে হেটে ওঠলাম বাঁশখালি ইকোপার্কের ভেতরের সর্বোচ্চ উঁচু জায়গাটিতে। উঠতে ক্লান্তিরও সর্বোচ্চ চুড়ায়ও পৌছলাম। নিজেকে কেন জানি মূসা ইব্রাহীম মূসা, ইব্রাহীম মনে হচ্ছিল।
উঠে একটি ছাতার ছাউনিতে বসে পড়লাম। নিচে তাকলাম। সবুজ আর সবুজ। চোখ ঘুরিয়ে তাকালাম এবার ছাতার দিকে। ছাতার নিচেও মুগ্ধ হবার মত জিনিস। সকল ভ্রমণকারীই যেন নিজের নাম ঠিকানা এখানে লিখে গেছেন। কেউ লিখেছেন ঠিকানা। কেউ তাকে আবার চিঠি পাঠাতে অনুরোধ করেছে গেছেন। কেউ আবার তার প্রেমিকার সাথে নিজের নামটি এখানে রেখে গেছেন পরম মমতায়। একটা জায়গায় ব্যাতিক্রম দেখলাম। হয়তো এখানে এসেছিল কোনও দার্শনিক।

কারন তিনি তার ঠিকানা লিখেননি, তার স্বাক্ষরের মর্মার্থ বুঝতে না পারায় নামখানা প্রকাশ করা গেলনা। তিনি লিখে গেছেন স্মরণে রাখার মত বাণী। লিখেছেন, জীবনের বড় সঙ্গী সে-ই যে অন্তীম লগ্নেও আপনার পাশে থাকবে। অন্তীম লগ্নের কথা না ভেবে আপাতত পাশে থাকা দুই ভাইকে বললাম, চল। যেতে হবে।
যে পথে আসা সে পথেই ফিরে যাওয়া। যাওয়ার আগে বেশ কিছূ লজ্জাবতী গাছের মিছিল দেখলাম, যাদের ছোঁয়ার আগেই লজ্জায় নুইয়ে যেতে দেখলাম। অথচ শহরের লজ্জাবতী গাছদের দেখেছি তাদের যেন লজ্জা অনেক কমে গেছে। লজ্জা কমে গেছে। কয়েকবার হাত লাগানোর পরও লজ্জা পায়না। যেন দ্বায়িত্ব থেকে লজ্জা পাওয়ার অভিনয় করে।
তবে আসার সময় লজ্জাবতী গাছের মত নিজেরই লজ্জিত হবার দশা। বাঁশখালি ইকো পার্কের বিশ্রামাগারের আশেপাশে কয়েকজন তরুণীর উটকো সাঁজ আর লাস্যময় দৃষ্টি দেখে অবাক হলাম, এখানে কি তাহলে কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি নেই?
৪.

সেই আপত্তিকর দৃষ্টি থেকে আমরা এখন অনেক দুরে দাঁড়িয়ে। আমাদের দৃষ্টি জুড়ে এখন বিশাল সাগর এবং সারি সারি ঝাউগাছ। চলে এসেছি পারকীর চরে। পারকী বীচে।

তেমন পরিচিত না হওয়ার পরও এই 'অড টাইমে' এখানে দর্শনাথীর কমতি নেই। বাঁশখালি থেকে ফেরার পথে আনোয়ার নেমে একটা সিএনজি নিয়ে চলে এসেছি পারকী বিচে।

পতেঙ্গার মত আয়তন হলেও পতেঙ্গার মত নাগরিকতার আগ্রাসন নেই এখানে। শুধুই প্রাকৃতিক ঔপনিবেশ। মুহুর্তেই মন ভালো হয়ে যায়। প্রায় ঘন্টাখানেক মন ভালো করার পর আমরা বিদায় জানালাম সারি সারি ঝাউগাছ আর গর্জনশীল সাগরকে।
ক্লান্তির ষোলকলা পূর্ণ করে বিকাল নাগাদ ফিরে গেলাম চট্রগামে।
সন্ধ্যাটুকু চট্রগামের পথে পথে ঘুরে পার করলাম। আলো আধারির শহর খারাপ লাগেনি।
কারণ, তখন চলছিল ব্যাপক লোডশেডিং।
আর আমার হিসাব চলছে ঠিক কতবারের মত চট্রগাম এলাম?
৫.
পরদিন খুব ভোরে ওঠেই আমাদের মিশন কাপ্তাই লেক। ছবিতে দেখা অসম্ভব সুন্দর এক লেক।
সেখানেও যেতেও একই অবস্থা। জানা নাই, গন্তব্যে গমন কিভাবে? আবার সেই নানা মুনির নানা মত।
প্রথমে কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্রের সামনে গেলাম। সেখান থেকেই কাপ্তাইয়ের বাস। একদম কাপ্তাই লেকের সামনে নামাবে এমন শর্তে ওঠে বসলাম দুই ঘন্টার জার্নির বাসে।

এই জার্নিটা অসাধারণ। বিশেষ করে কাপ্তাইয়ের আশেপাশে পৌঁছার সময় পর থেকে দুপাশের সারি সারি নতজানু সবুজ গাছগুলো মুগ্ধ করবেই। আর যেহেতু এই জায়গাগুলো নাগরিক যানের আনাগোনা কম। কালো ধোয়ায় আগ্রাসন কম। তাই গাছের সবুজগুলো সবুজই আছে, বিবর্ণতায় হারায়নি।
নতজানু সবুজের পথ একটা সময় শেষ হতেই আমাদের নেমে যাবার সময়ও হয়ে এল। নেমে গেলাম।
কাপ্তাই লেক সম্পর্কে আমার ধারনা ছিল বিশাল দীর্ঘ সুন্দর এক লেক বিশেষ। আমার সঙ্গে থাকা ইডিয়ট দুটো আরো হতাশা ব্যাক্ত করল, এটা সুন্দর লেক নাকি?
এর চেয়ে তো আমাদের বাড়ীর সামনের খালও সুন্দর।

আমি মাঝারী মানের ধমক দিলাম, ইডিয়টের মত কথা বলবি না।
তারা আর কথা বলল না। কথা বলতে চলে গেলাম, মাঝিদের সাথে। ঘন্টা হিসেব করে ঘুরব। এক নৌকা'অলা আমাদের চমকে বললেন, দেড়শ টাকা ঘন্টা।
আমাদের জানা ছিল ঘন্টা প্রায় ৫০০ বা ৬০০ টাকা করে। কিন্তু মাঝি কম চাওয়াতে আমাদের ইডিয়ট স্বত্ত্বা প্রকাশিত হয়ে গেল। আমার এক ভাই বলেই ফেলল, এত কম!
শুনে মাঝিও চমকে ওঠল। যেন বড় সে বড় কোনও ভুল করায় অনুতপ্ত। নতুন কোনও রেট দেয়ার আগেই আমি আমার ভাইদের নিয়ে চলে এলাম।
কারণ, মনে হল নৌকা না, আমাদের প্রয়োজন ইঞ্জিনচালিত বোট।
অবশেষে সেখানে গিয়ে সন্ধান পেলাম আমাদের জানা তথ্যের। এক রেট বারোশ টাকা ঘন্টা। যাই হোক সেটা টেনেটুনে সাতশ টাকায় ঘন্টা নিয়ে এলাম। দুই ঘন্টা ঘুরবো।
আর বোটের মাঝি আমাদের টেনে নিয়ে চলল কাপ্তাই সৌন্দর্যের স্বরুপ সন্ধানে।

আমরা যত ভেতরে যাচ্ছি প্রকৃতি যেন ততই উদার হচ্ছে। আর আমাদের লজ্জা হচ্ছে নিজেদের ইডিয়টিক মন্তব্যের জন্য।
যত ভেতরে যাচ্ছি ততই যেন মধু। অসাধারণ নিঃসর্গের স্পর্শ যেন টের পাচ্ছিলাম। পুরোটাই স্বর্গীয় অনুভুতি। শুধু বোটের ভটভট শব্দ ছাড়া। এই শব্দই মনে করিয়ে দিচ্ছে মুগ্ধতার লিমিট আছে। আমাদের ফিরে যেতে হবে। দেখতে দেখতে আমাদের ফিরে যাবার সময় হল। এত দ্রুত যে দুই ঘন্টা চলে যেতে পারে তা ভাবারও সময় পেলাম না। তবে এখানকার প্রকৃতির মত মাঝিও কিছুটা উদার। সে অতিরিক্ত বিশ মিনিট আমাদের ঘুরিয়েছে।

দুই ঘন্টায় আসলে যা বুঝলাম, মাত্র দুই ঘন্টা সময় নিয়ে লেক দেখাটাও ইডিয়টদেরই কাজ। ভেতরে কত পথ পড়ে ছিল।
অতঃপর প্রকৃতির কাছেও ইডিয়ট সাবস্ত হয়ে আমাদের ফিরতে হল।
আবার সেই পুরোনো পথ, পুরোনো দৃশ্য। কিন্তু মুগ্ধতা পুরণো হয়না। যাই দেখি মুগ্ধ হই, ওরে বাপরে যাওয়ার সময় তো এটা দেখিনি। এত সুন্দর জায়গাটা মিস করে গেলাম কিভাবে?
তবে নিজেকে এই ভেবে নিজেকে স্বান্ত্বনা দিচ্ছিলাম, ইডিয়টরাই মিস করে। মিস করে যায়।
এই মিস করার পরিমান ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। অবশ্য মিসের অর্থও কিছুটা পাল্টে গেল।
আমরা চট্রগ্রাম ফিরেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। যতই ঢাকার দিকে যাচ্ছিলাম, তত মিস করছিলাম চট্রগামকে।



ছবি : প্রথমটিতে সেই অবিস্মরণীয় বাণী রয়েছে, পরের তিনটি পারকী বিচের এবং শেষ চারটির তিনটি কাপ্তাই লেকের।
আর আরেকটা ছবি বোধহয় দেখা যাচ্ছেনা। যেখানে তিনজন ইডিয়ট দাড়িয়ে আছে। সামু ইডিয়টদের হয়তো দেখাতে চাচ্ছেনা। তারা মডারেশনে পরে গেছে।
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×