সকালে ঘুম ভাঙতেই মাজেদা খালার চেহারা চোখের সামনে।
অ্যাই হারামজাদা ওঠ।
আমি আবার চোখ বন্ধ করে ফেললাম। এমন একটা দিনেও মাজেদা খালার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল? নিশ্চয় খালু সাহেব আবার কোন অঘটন ঘটিয়েছেন।
আমি ধুপ করে উঠে বসলাম। খালার দিকে তাকালাম, খালা তোমার কোন কথাই আমি শুনব না। আগে পাঁচ হাজার টাকা বের কর। তারপর বৃত্তান্ত বল।
খালা ব্যাগে হাত দিলেন, এক গাদা টাকা বের করে আমার মুখের উপর মেরে বললেন, নে ভিক্ষুকের জাত। এখানে আট হাজার টাকা আছে। ভ্যাটসহ দিলাম।
আমি নিজের চেহারা যথাসম্ভব ভিক্ষুকের মতো সহানুভূতি প্রত্যাশী ভাব এনে বললাম, এইবার বলেন খালাম্মা। কি করতে হইবে?
খালা রেগে আগুন হয়ে বললেন, ওই বুড়ো মানে তোর খালু তো প্রেমে পড়েছে।
আমি চিৎকার করে ওঠলাম। মহা খুশির খবর। তা মেয়েটা দেখতে কেমন গো খালা? নিশ্চয় তোমার চেয়ে সুন্দরীই হবে।
খালা ধমকে উঠলেন, দ্যাখ হিমু ফাজলেমি মারাবি না। আমি কিন্তু সিরিয়াস। তুই জানলে অবাক হবি সে প্রায়ই ডেটিং-এ যায়।
আমি এবার আঁতকে উঠলাম, ওহ! খালা তুমি গ্রেট। ভালো কথা মনে করেছ। আজ তো আমারও ডেটিং আছে। এই নিয়ে পঞ্চমবারের মতো ডেট পড়েছে। এর আগের চারবার মিস করেছি। আজ না গেলে প্রেম শেষ হয়ে যাবে খালা। তুমি বাসায় যাও আমি রাতে বাসায় আসছি।
আজ খালু সাহেবকে এমন এক ঝাটকা দেব।
উনি তোমার নাম পর্যন্ত ভুলে যাবেন।
ওই বলিস কী?
ওহ সরি। তোমার না, তার নতুন প্রেমিকার নাম ভুলে যাবে।
২.
রূপার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মোবাইল নামক বস্তুটা এখনও হস্তগত হয়নি বলে এই মুহূর্তে রূপার সঙ্গে কথা বলা হল না।
থাক সমস্যা নেই। বাবার সঙ্গে কথা বলি। কিছু উপদেশ শুনি। বাবা সামনে এসে দাঁড়ালেন। কিন্তু কোন ভূমিকা ছাড়াই শুরু করলেন, তুই এভাবে ঘুমাচ্ছিস ক্যান? ঘুম নিয়ে তোকে না আমি কি বলেছি মনে নেই।
আমি চোখ কচলাতে কচলাতে বললাম, না বাবা, মনে নেই।
বাবা রেগে গেলেন। তুই তো অধঃপতনে চলে যাচ্ছিসরে হিমু। আমার এখন ভুলে যাবার বয়স। তোর না।
বাবা বয়সের কথা পরে বল। আগে বল ঘুম নিয়ে যেন কি বলেছিলে।
বাবা রেগে বললেন, আমার মনে নেই। তুই বিছানা ছেড়ে ওঠ।
ওই সেলফের কাছে যা। গিয়ে সেখান থেকে ২০০৯ সালে একুশে বইমেলায় প্রকাশিত 'হিমুর বাবার কথামালা' বইটা নে। ওইটা খুঁজে দেখ আমি ঘুম নিয়ে কী বলেছি।
আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেলফের কাছে গেলাম। বইটা হাতে নিয়ে বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, বাবা কত পৃষ্ঠায়? বাবা রেগে নির্বাক হয়ে গেলেন। আমি বললাম, ওকে। খুঁজে দেখছি, আমি খুঁজতে খুঁজতে পেলাম। বাবাকে বললাম, বাবা ২৮ পৃষ্ঠায় যে কটা লাইন আছে সেটাই মনে হয়। সেখানে আছে, তোর ঘুমুলে চলবে না। মহা পুরুষদের সবকিছু জয় করতে হয়। ক্ষুধা তৃষ্ণা ঘুম। ঘুম হচ্ছে দ্বিতীয় মৃত্যু। সাধারণ মানুষ ঘুমায়, অসাধারণরা জেগে থাকে।
আমি বাবার দিকে তাকালাম। জিজ্ঞাসা করলাম, এইটাই তো?
বাবা মাথা নাড়লেন। বললেন, এই হিমু আমি তো অনেক ভালো কথা বলেছিলাম রে।
আমি বললাম, বাবা ডেটিং নিয়ে তোমার কি কোন উপদেশ ছিল কিনা?
মনে পড়ছে না।
বাবা রাগে গরগর করে চলে গেলেন।
৩.
অনেকদিন পর রূপাকে দেখলাম। এই পার্কে এই প্রকৃতির মাঝে রূপাকে দেখলে একটা সমস্যা হয়। প্রকৃতির সৌন্দর্য ¤¬ান লাগে। রূপাকে মায়াবতী মায়াবতী লাগছে। আমি রূপার দিকে তাকালাম, কি বলব বুঝতে পারছি না। রূপা জিজ্ঞাসা করল, কি বলবে বল। আমি বললাম, বাদাম খাবে? রূপা মাথা নাড়ার আগেই আমি বাদামওয়ালাকে ডাকলাম, অ্যাই পাঁচ হাজার টাকার বাদাম দে। বাদামওয়ালা এবং রূপা একই সঙ্গে আমার দিকে তাকাল, বাদামওয়ালার চোখে বিস্ময়। রূপার চোখে রাগ।
আমি বাদামওয়ালাকে কড়কড়ে পাঁচশ’ টাকা দিয়ে বললাম, যা ভাগ।
রূপাকে বললাম, সরি। পকেটে অনেক টাকা তো। রাখতে ভালো লাগছিল না। তাই দেবার অজুহাত খুঁজছিলাম।
ঠিক আছে, শোন, কাল তোমাকে একটা চাইনিজে নিয়ে যাব। রূপা কিছু বলল না, চোখ ছোট ছোট করে আমার দিকে রাগীভাবে তাকিয়ে রইল। তাকে চাইনিজদের মতো লাগছিল। বলার সাহস পেলাম না।
৪.
ধনী লোকদের বাড়িতে এলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। ধনী লোকদের বাসায় যদি এসব গরিব কাজের লোকেরা না থাকত, তাদের না দেখতাম, তাদের সঙ্গে কথা না বলতে পারতাম তাহলে নির্ঘাত মারাই যেতাম।
আমাকে দেখে মাজেদা খালা ছুটে এলো।
তোর খালু বদমাইশটার অবস্থা তো খুবই খারাপরে হিমু। সে এখন ওই মেয়েটার সঙ্গে কথা বলছে। আমি বললাম, সমস্যা কী? প্রেম করবে কথা বলবে না?
খালা আমাকে ধমকের সুরে বললেন, বাজে কথা বলবি না হিমু।
আমি বললাম, চল খালুর ঘরে যাই। খালু আমাকে দেখেই খুশি হয়ে গেলেন। যদিও তার খুশি হওয়ার কথা নয়।
আমি বললাম, খালুজান কেমন আছেন? কার সঙ্গে কথা বলছিলেন? খালুজানের খুশি ভাব চলে গেল। তিনি বললেন, পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে। কাল তাকে তেঁতুলের শরবতের একটা দাওয়াত দিলাম। খালুকে জিজ্ঞাসা করলাম আমরা কি আমন্ত্রিত? খালু বললেন, নিজেকে কি মনে করিস? খালু এহেন আচরণে আমার কিছু না হলেও খালা রেখে গেলেন, অ্যাই তুমি ওর সঙ্গে বাজেভাবে কথা বলছ কেন? দাওয়াত না দিলে না করবা। দাঁড়াও তোমাকে টাইট দেয়ার ব্যবস্থা করছি। তেঁতুলের শবরত নয় পুরো তেঁতুল গাছই বেটে খাওয়াব। বুড়ো বয়সে ভিমরতি! সব ঠিক করে দেব।
৫.
আমি রূপাকে নিয়ে চাইনিজে যাচ্ছি। প্রচলিত অর্থে এই আমাদের ডেটিং। অন্য সময় শুধু দেখা হয়েছিল। ডেটিং মনে হয়নি। আজ চাইনিজে যাচ্ছি বলেই বোধহয় ডেটিং মনে হচ্ছে।
চাইনিজের ভেতরটা কবরের অন্ধকার, আমি হাতড়ে একটা চেয়ারে বসলাম। পাশে রূপা। রূপাকে অর্ডার দিতে বলে আমি চারপাশ দেখতে লাগলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল খালু। মাজেদা খালার স্বামী। আমার চোখ চড়কগাছ।
আমি উঠে গিয়ে খালুর পাশে বসলাম।
খালুকে বিব্রত করতে বললাম, খালুজান ডেটিং-এ নাকি? আমিও এলাম। চলেন একই টেবিলে বসি।
খালু কটমট করে আমার দিকে তাকালেন। খালুর পাশের মেয়েটি তাকাল বিস্ময় আর বিরক্তি নিয়ে, হোয়াট ননসেন্স। এটা কে?
আমার নাম হিমালয়। হিমু।
ও অ্যাই তাহলে বদটা? এর কথাই বলেছ? দেখতেই তো ইতরের মতো লাগছে। আর কী বাজে রুচি। হলুদ কালারের পাঞ্জাবি। ওফ! ডিসকাস্টিং। আমি খালুর কাছ থেকে মোবাইলটা নিলাম। বললাম, দেন খালাকে একটা ফোন দেই।
খালা।
অ্যাই কি ব্যাপার, তোমার কী হয়েছে আমাকে খালা বলছ কেন?
আরে আমি খালু না। হিমু। ও হিমু বল। তুই কোথায়? আমি ধানমন্ডির একটা রেস্টুরেন্টে। আমিও তো একটা রেস্টুরেন্টে। তোর খালুকে ধরতে এসেছি। ও নাকি ডেটিং করতে এসেছে। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার আমাকে ফোন দিয়েছে। ওহ! তাই নাকি? জলদি আসো আমি তাদের পাকড়াও করেছি।
বলিস কি?
হ্যাঁ সত্যি।
৬.
খালা খালু মুখোমুখি। মাঝখানে খালুজানের প্রেমিকা। খালা খালুর কলার চেপে ধরলেন। এই তোমার অবস্থা! আজ তোমার ডেটিংয়ের স্বাদ মেটাচ্ছি চল। আমি পাশের টেবিল থেকে দেখছিলাম। আমার পাশে রূপা। রূপা আমার ওপর মহাবিরক্ত। তার মতে, খালাকে জানানো উচিত হয়নি আমার।
আমি রূপাকে কনভিন্সড করতে নানা ধরনের রোমান্টিক কথা বলছিলাম। শুনেছিলাম ডেটিংয়ে এলে এসব কথাই বলতে হয়।
আমি রূপাকে বললাম, তোমার চোখ হরিণীর মতো রূপা।
ওপাশ থেকে, শুনলাম, তোমার চোখ দেখলেই বোঝা যায় তুমি কতবড় ইতর হয়েছ।
খালা-খালুকে বলছে,
আমি রূপাকে বললাম, তোমার কালো চুলে চাঁদও হারিয়ে যায়।
ওপাশ থেকে, মাথায় পাঁচটা চুলও নেই আবার এই চাঁদমুখ নিয়ে উনি ডেটিং করতে এসেছেন।
আমি রূপাকে বললাম, তোমার কথার শব্দ শুনলেই আমার হƒদয় ভরে যায়।
এবার ওপাশ থেকে, কোন কথার শব্দ এলো না, সরাসরি গ¬াস-পে¬ট ভাঙার শব্দ পেলাম।
রূপা বোধহয় ভয় পেয়েছে। আমাকে বলল, চলো চলে যাই।
আমি রূপাকে অভয় দিলাম, রূপা খালার এই রূপকে গ্রহণ না করে সামনের বাটির স্যুপকে গ্রহণ কর, খালা এখুনি বেরিয়ে যাবে।
আমরা স্যুপ গ্রহণে মন দিলাম। হঠাৎ খালা ডাক দিল হিমু যাই রে। দোয়া করিস তোর খালুকে যাতে একটা ভালো থ্যারাপি দিতে পারি।
আমি খালাকে বললাম, ওকে, যাও। একটু স্যুপ থেরাপি দিও। ডেটিংতো স্যুপ খেতে পারল না। খালা একটা রহস্যময় হাসি দিলেন, যার অর্থ তাতো অবশ্যই।
আমি রূপার দিকে তাকালাম। মেয়েটা জীবনে প্রথম ডেটিংয়ে এসেছে। মনোযোগ দিয়ে স্যুপ খাচ্ছে।
হঠাৎ রূপার পাশে আবিষ্কার করলাম বাবা বসে আছে। নিশ্চয়ই উপদেশমালা নিয়ে হাজির। বাবাকে বললাম, বাবা আজ আমার প্রথম ডেটিং। আজ নো উপদেশ। বরং স্যুপ খাও।
বাবার কী হল বুঝলাম না। এটা করার কথা নয়। আমি চাক্ষুস দেখলাম তিনি তার অনিবার্য উপদেশমালাকে দূরে ঠেলে দিয়ে স্যুপের বাটি কাছে টেনে নিলেন। আমার খুব মায়া হল। আমি রূপাকে বললাম, আর খেও না। বাকিটা বাবার জন্য রেখে দাও। লোকটা এই প্রথম উপদেশের চেয়েও অন্য কিছুতে মজা পেলেন। আমাদের ডেটিংটাকে সার্থক মন হল। স্যুপের বাটিতে ডুবে গেছে আমাদের ডেটিং, খালুর প্রেম আর আমার বাবার উপদেশমালা।
ঈদে হ ুমায়ূন আহমেদ ব্লগে উপন্যাস লেখেন না তো কী হয়েছে, এইটা পড়তে পারেন : আজ হিমুর ডেটিং
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২১টি মন্তব্য ২১টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার
বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?
কর্মসংস্থান? না।
বিনিয়োগ? না।
ডলার সংকট? না।
গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।
ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
পণ্ডশ্রম

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।