তখনো আমার চোখ ছিল, কিন্তু আমি দেখতে শিখিনি। তখনো আমি ঘুরে ঘুরে দেখেছি অনেক। কিন্তু জানতাম না, নিজের চোখেও যে মানুষকে দেখানো যায়।
শেখালেন একজন, হুমায়ূন আহমেদ।
কোন কিছু দেখে সেটা কেমন করে গল্পের মতো বলা যায় তা হয়তো হুমায়ূন আহমেদ না পড়লে বোঝা যেত না। গল্পের মধ্যে তথ্যের যে মিশেল তিনি তার ভ্রমণ কাহিনীতে রাখেন তা এক কথায় অতুলনীয়। সেইসঙ্গে তার ভ্রমণ কাহিনীর মূল মজা হচ্ছে দেখার মতা। একই জিনিস আমরাও দেখি, তিনিও দেখেন। আমাদের বিষয়টা হয়ে যায় তাকিয়ে থাকা, তারটা হয় পর্যবক্ষণ। তার অনেক ভ্রমণ কাহিনীতে সেসব স্পষ্ট।
তিনি তার ত্রিপুরা ভ্রমণ কাহিনীতে এক জায়গায় লিখেছেন,
আমাদের এবারের ভ্রমণটা চখাচোখি ভ্রমণ। সবাই জোড়ায় জোড়ায় এসেছে। দেশের বাইরে পা দিলে চোখাচোখি ভাবের বৃদ্ধি ঘটে। আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। স্ত্রীরা স্বামীদের নিয়ে নানা আহলাদি করেছে। স্বামীরা প্রতিটি আহলাদকে গুরুত্ব দিচ্ছে। খুব চেষ্টা করছে প্রেমপূর্ণ নয়নে স্ত্রীর দিকে তাকাতে। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে। মাজাহার এবং কমল দুজনকেই দেখলাম, স্ত্রীর মুখে তুলে প্যারা খাওয়াচ্ছে। স্ত্রীরাও এমন ভাব করছে যেন সারাজীবন তারা এভাবেই মিষ্টি খেয়ে এসেছে। এটা নতুন কিছু না।
চখাচোখিদের মধ্যমণি অন্যদিন পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক নাসের এবং নাসের-পত্নী তামান্না। এটা তাদের হানিমুন ট্রিপ। কিছুদিন আগেই বিয়ে হয়েছে। তামান্নার হাতের মেহেদির দাগ তখনো ম্লান হয়নি।
আমরা কত না জায়গায় ঘুরলাম, কত কিছু দেখলাম। এই দুইজন কিছুই দেখল না। দু'জন দু'জনের দিকে তাকিয়ে রইল।
চখাচখি গ্র'প থেকে বাদ পড়েছে মিলন ও আলমগীর রহমান। তারা স্ত্রীদের দেশে ফেলে গেছে। সবাই জোড়া বেঁধে ঘুরছে। মিলন-আলমগীরও জোড়া বেঁধে ঘুরছে। দু'জনের মুখই গম্ভীর। দু'জনই দু'জনের উপর মহা বিরক্ত। ভদ্রতার খাতিরে কেউ বিরক্তি প্রকাশ করতে পারছে না। মজার ব্যাপার।
হুমায়ূন আহমেদের ভ্রমণ কাহিনীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক অনবদ্য বিষয় থাকে, যা পাঠককে জমিয়ে রাখে। পাঠকের নড়াচড়ার মতা নষ্ট করে দেয়। বিষয়টা এমন দাঁড়ায় শব্দ শকটে করে পাঠকও তার ভ্রমণসঙ্গী। এটা একটা বিরাট ক্ষমতা তার। এমন ক্ষমতা খুব বেশি জনের নেই। কিছু ভ্রমণ কাহিনীতে তো লেখককে রেখেই পাঠক পেছন দিয়ে পালিয়ে বাঁচে। কারণ বিরস ভ্রমণ কাহিনীতে পাঠকের মন থাকে না। লেখক তখন বিমানে উঠে গেলেও পাঠক সেখান থেকে লাফিয়ে পড়ে বাঁচে। এদিক দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি ভ্রমণের দিন তো পরে যদি ভ্রমণের আগের দিন থেকেও কাহিনী শুরু করেন পাঠক স্থির হয়ে লেগে থাকেন তার সঙ্গে। যেমন তার আমেরিকা ভ্রমণ
একটা ধাঁধা দিয়ে শুরু করি। চার অক্ষরের নাম এমন একটা দেশ, যে দেশের নাম শুনলেই বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের মানুষের চোখ চকচক করতে থাকে। হিন্টস দিচ্ছি-আ দিয়ে শুরু। শেষ অক্ষর কা।
হয়েছে- আমেরিকা।
এই দেশে যাবার জন্য জীবনের শেষ প্রান্তে উপস্থিত হওয়া মানুষদের আতঙ্কে অস্থির হয়ে আমেরিকান অ্যাম্বাসিতে বসে থাকতে দেখেছি। সঙ্গে দলিল দস্তাবেজ। বাড়ির দলিল, জমির দলিল, গাড়ীর ব্লু বুক, ব্যাংকের কাগজ। তারা প্রমাণ করবেন যে, দেশে তাদের যথেষ্ট বিষয় আশয় আছে। ভিজিট ভিসায় গেলেও তারা ফিরে আসবেন। আল্লাহর কসম ফিরে আসবেন।
ভিসা রিজেক্ট হওয়ায় ভিসা অফিসে জনৈক বৃদ্ধ শোকে হার্টফেল করে মারা গেছেন। এই খবর প্রথম আলো পত্রিকায় পড়েছি।
আমি একজনকে জানি যিনি দেশের সব মাজার যিয়ারত করে আজমির শরিফ যাচ্ছেন খাজা বাবার দোয়া নিতে। খাজা বাবার দোয়া পেলে ভিসা অফিসারের মন গলবে, তিনি স্বপ্নের দেশে যেতে পারবেন।
আমেরিকা নামক এই স্বপ্নের দেশে আমাকে দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী কাটাতে হয়েছে। ছয় বছরের বেশি। পিএইচডি করলাম। পিএইচডি শেষ করে পোষ্ট ডক্টরেট করলাম। দেশে ফেরার পরেও আরো চার পাঁচবার যেতে হলো। আমেরিকা নিয়ে বেশ কয়েকটা বইও লিখলাম। হোটেল গ্রেভার ইন, যশোহা বৃক্ষের দেশে, মে ফ্লাওয়ার। শেষবার আমেরিকা গেলাম নুহাশকে নিয়ে। পিতাপুত্রের যুগলবন্দি ভ্রমণ। ফেরার পথে দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়লাম। নুহাশ ক্রমাগত বমি করছে, গায়ে জ্বর। আমার বুকে ব্যথা। আমি আতঙ্কগ্রস্ত। বুকের এই ব্যথা মানে হার্ট বিষয়ক জটিলতা নয়তো? যদি সেরকম কিছু হয়, দুজনকেই প্লেন থেকে নামিয়ে দেবে। আমাকে ভর্তি করবে হাসপাতালে। নয় বছর বয়েসি নুহাশ তখন কী করবে?
দেশে গিয়ে ঠিক করলাম, আর না। অতি দূরের দেশে আর যাবো না। আমেরিকায় কখনো না।
তারপরেও ব্যাগ সুটকেস গোছাতে হলো। আবার আমেরিকা। তবে এবার অন্য একজনের তল্পিবাহক হিসেবে। সেই অন্য একজনের নাম মেহের আফরোজ শাওন। সে চন্দ্রকথা ছবিতে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছে।
আরেকটা বড় বিষয় কাজ করে হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে। তিনি কখনও বিদেশে গিয়ে দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেশকে লেখায় বড় করে তুলে ধরেন। তার সুইজারল্যান্ড ভ্রমণের এক জায়গায় তিনি লিখেছেন,
আমার নানান সমস্যার একটি হচ্ছে, নিজের দেশ ছাড়া অন্য কোন দেশই আমার ভালো লাগে না। পাঠকের কেউ কেউ হয়তো চোখ কপালে তোলার মতো করে বলবেন, বাপরে ব্যাটা দেশপ্রেম ফলাচ্ছে। আমি কিন্তু আমার কথার প্রমাণ দিতে পারি। আমেরিকায় পড়াশুনা শেষ করে সেই দেশেই বিরাট বেতনের চাকরি নিয়ে থেকে যাবার সুযোগ আমার ভালো মতোই ছিল। আমার প্রফেসর বারবারই বলেছেন তোমার পরিবারের সবার জন্যই আমি সিটিজেনশিপের ব্যবস্থা করছি, তুমি থেকে যাও। দেশে ফিরে কী করবে! আমেরিকা ল্যান্ড অব অপরচ্যুনিটি। আমি থাকিনি। দু’শ ডলার সঞ্চয় নিয়ে আমি দেশে ফিরে এসেছি।
আমার ঘনিষ্ঠজনরা জানে, আমাকে দেশের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে রাজি করানো কত কষ্টের। কেন দেশের বাইরে যেতে চাই না? দেশের বাইরের কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করে না। মনে লাগে না। বাইরে কম সময় কাটাইনি। আমেরিকায় এক নাগাড়ে ছয় বছর কাটালাম। কত বৈচিত্র্যের সুন্দর দেশ। কিন্তু আমার এক দিনের জন্যও মনে হয়নি এই দেশ আমার হতদরিদ্র দেশের চেয়ে সুন্দর। পৃথিবীর কোন দেশে পাব আমি আমার দেশের উথালপাতাল জোছনা? কোথায় পাব আকাশভাঙ্গা বৃষ্টি? আমেরিকা থেকে একবার আমি মাকে চিঠি লিখলাম অনেকদিন বর্ষায় ব্যাঙের ডাক শুনিনি। আপনি কি আমাকে ব্যাঙের ডাক রেকর্ড করে ক্যাসেট করে পাঠাতে পারবেন?
চিঠি পৌঁছানোর পর আমার সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা (আহসান হাবীব, সম্পাদক উন্মাদ) ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে ডোবা ও খানাখন্দে ঘুরে বেড়াতে লাগল যথাসময়ে আমার কাছে ব্যাঙের ডাকের ক্যাসেট চলে এলো। এক রাতে দেশের ছেলেমেয়েদের বাসায় দাওয়াত করেছি। সবাই খেতে বসেছে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যাঙের ডাকের ক্যাসেট ছেড়ে দিলাম। ভেবেছিলাম সবাই হাসাহাসি করবে। অবাক হয়ে দেখি, বেশির ভাগ ছেলেমেয়ের চোখে অশ্রু চকচক করতে লাগল।
এসব পড়ে পড়ে যখন একজন পাঠক মুগ্ধ হয় তখন আসলে সেই লেখকের ভ্রমণ কাহিনী পড়ার মাধ্যমে তার সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে দমিয়ে রাখতে পারে না। বারবার ফিরে যায় তার বইয়ের কাছে। তার ভ্রমণের কাছে।
সম্প্রতি এসব পাঠক মানে আমরা এক ধরনের বিষন্নতায় আছি। আমাদের এই প্রিয় লেখক কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। প্রিয় লেখকের এই অসুস্থতায় প্রত্যাশা একটাই, সব অসুখকে জয় করে তিনি সুস্থ হয়ে ফিরবেন।
সঙ্গে এও প্রত্যাশা, তার সঙ্গে আমাদের ভ্রমণ আরও দীর্ঘ হবে।
শুভ জন্মদিন হুমায়ূন আহমেদ...স্যার, আপনার সঙ্গে আমাদের ভ্রমণ আরও দীর্ঘ হোক
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই
আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।
তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।