বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাবিতে দুইজন বিশিষ্ট অধ্যাপক খুন হন। কিন্তু প্রকৃত খুনিরা ধরাছোয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় ভীত-সন্ত্রস্ত পুরো ক্যাম্পাস। অধ্যাপক তাহের হত্যাকান্ডের অন্যতম আসামি ছাত্রশিবিরের রাবি শাখার সাবেক সভাপতি মাহবুব আলম সালেহী ‘রহস্যজনকভাবে’ খালাস পাবার পর রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এখানকার প্রগতিশীল শিক্ষকরা।
শিক্ষকরা জানান, শিবির নেতা সালেহী ছাড়া পাওয়াতে প্রগতিশীল যে কারো জীবন যেকোনো সময় বিপন্ন হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। একজন অপরাধি যখন বেকসুর খালাস পায় তখন সে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন যেমন আনন্দের, শিক্ষক হত্যা ও মুক্তবুদ্ধিচর্চার পথকে রুদ্ধ করার ইতিহাসও ঠিক তেমনই কষ্টের। প্রশাসনের সরাসরি মদদ পেয়ে এখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চা, মুক্তিযুদ্ধের গান, কবিতা, নাটক, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চার পথও রুদ্ধ করে রেখেছে জামায়াত-শিবির চক্র।
জামাত-বিএনপি জোট সরকারের বিগত পাঁচ বছরে নিয়োগ বাণিজ্য, দলীয়করণ, নোংরা ছাত্ররাজনীতি আর কতিপয় শিক্ষকের নৈতিক স্খলেনের কারণে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি অনেকাংশেই ক্ষুন্ন হয়েছে। বর্তমানে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় না থাকলেও তাদের সময়কার অপকর্ম, বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট লঙ্ঘনসহ ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার হয়নি। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জামায়াত-শিবির তোষণ আর হত্যা-খুন-দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মের ভারে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি আজ কঠিন প্রশ্নের সম্মুখিন।
রাজশাহী অঞ্চলের শিক্ষাদীক্ষা উন্নয়নের জন্য ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী কলেজ। কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজের পরই রাজশাহী কলেজের স্থান ধরা হতো। সে সময়ে এই কলেজে আইন বিভাগসহ পোস্ট গ্রাজুয়েট ক্লাশ চালু করা হয়েছে। কিন্ত এর কিছুদিন পরেই বন্ধ হয়ে যায় এসব কার্যক্রম। সে সময়েই রাজশাহীতে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সরকার দেশের সব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। রাজশাহীতে এ সময় স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়। আর এ আন্দোলনে শক্ত হাতে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন এমএলএ ও প্রখ্যাত আইনজীবী জননেতা মাদার বখ্শ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরে শোরে উঠতে শুরু করে ভাষা আন্দোলনের কিছুদিন আগ থেকেই। ১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে ৬৪সদস্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
১৯৫৩ সালের ৬ ফেব্র“য়ারী রাজশাহীর ঈদগাহ ময়দানে আরও একটি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তৎকালীন এমএলএ ও প্রখ্যাত আইনজীবী মাদার বখশ রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন না করা হলে উত্তরবঙ্গকে স্বতন্ত্র প্রদেশ দাবি করার হুমকি দিলে টনক নড়ে সরকারেরও। আন্দোলন সংগ্রামের পর প্রাদেশিক আইনসভায় মাদার বখ্শ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিল উত্থাপন করেন। অবশেষে ১৯৫৩ সালের ৩১মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় সেটি পাশ হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৫৪ সাল থেকে। ভবন ও অবকাঠামো না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ হতো রাজশাহী কলেজে। পরে ১৯৬১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয় বর্তমান ক্যাম্পাসে। বর্তমানে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭টি বিভাগে পড়াশোনা করছে। এখানে রয়েছে দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর (শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা)। রয়েছে ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থ্যানে শহীদ ড. শামসুজ্জোহার মাজার। পদ্মা নদীর প্রায় কোল ঘেষে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই ক্যাম্পাসটি গড়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়ান স্থপতি ড. সোয়ানি টমাসের স্থাপত্য পরিকল্পনায়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মতিহারের এই সবুজ ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিত্বের পদচারণামূখর। এখানে শিক্ষকতা করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক,তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান, খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ডেভিড কফ, নৃবিজ্ঞানী পিটার বাউচি, ক্লারেন্স ম্যালেনি, জোহানা কর্ক প্যাট্রিক, বিশিষ্ট ঐতিহাসিক অধ্যাপক আবদুল করিম, রমিলা থামার, প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক প্রমূখ। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থ্যানসহ মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী -কর্মকর্তা-কর্মচারী। কিন্তু অত্যন্ত পীড়াদায়ক হলেও নির্মম সত্য এই ক্যাম্পাসটি এখন জামায়াত-শিবির চক্রের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বলতে গেলে প্রশাসনসহ সর্বস্তরে জামায়াতীদের একক কর্তৃত্ব বিরাজমান।
বর্তমান তত্ত¡াবধায়ক সরকার গত ১৬ মে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আলতাফ হোসেনকে তার পদ থেকে অপসারণ করে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামনুনুল কেরামতকে উপাচার্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করে। অধ্যাপক আলতাফ ও অধ্যাপক মামনুনুল কেরামত উভয়ই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নিযুক্ত। বিগত ১৯৯৯ সালের পর থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে মনোনীত উপাচার্য দিয়েই চলছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। শোনা যাচ্ছে, জামায়াত-শিবির চক্র উপাচার্য পদটি দখলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জামায়াতের একজন রোকন পর্যায়ের অধ্যাপক বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এক ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে তিনি উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী বাহিনী ১৯৯৬ সালের দিকে শিল্পী নিতুন কুন্ডুর অমর কীর্তি মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ এর নামফলক ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। কিন্তু আজও তা প্রতিস্থাপন করা হয়নি। প্রগতিশীল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে জামায়াত-শিবির চক্রের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০০৮ দুপুর ১২:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




