somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জয়-পরাজয়ের কারণ

০৬ ই আগস্ট, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



জাহাঙ্গীর আলম আকাশ, রাজশাহী
রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে চারদলীয় জোট প্রার্থী যুবদল নেতা মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের ভরাডুবি ঘটেছে। বিপুল বিজয় হয়েছে আওয়ামী লীগ ১৪ দল সমর্থিত নাগরিক কমিটি মনোনীত প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের। এই জয়-পরাজয়ের পেছনে কাজ করেছে ব্যক্তি ইমেজ, ফ্লোটিং ভোট, বিএনপির ভেতরকার দ্ব›দ্ব-বিরোধ, জোট প্রার্থীর প্রতি অন্তিমুহূর্তে জামায়াতের সমর্থন প্রদান। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে ও অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে যে পনেরোজন প্রার্থী প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেছেন তাদের মধ্যে ব্যক্তি, পারিবারিক ও রাজনৈতিক ইমেজ তুলনামুলক বিচারে সবচেয়ে ভাল খায়রুজ্জামান লিটনেরই। লিটনের সমকক্ষ কেউ ছিল না। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব বুলবুল যুবদল নেতা। রাজনৈতিকভাবেও তিনি অতটা পরিপক্ক নন। চারদলীয় জোটের ঐক্যবদ্ধ শেভ নিতে বেশ বিলম্ব হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে কয়েক ঘন্টা আগে জামায়াত বুলবুলের প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানালেও সেই সমর্থন প্রদানের ক্ষেত্রে জামায়াত মহানগর আমির আতাউর রহমানের পূর্ণ সমর্থন ছিল কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বুলবুলের ঘনিষ্ঠজনেরা।
পরাজিত মেয়র প্রার্থী বুলবুল সমর্থকদের মতে, প্রবীণ বিএনপি নেতা কবির হোসেন, আশির দশকের ছাত্রদল নেতৃবৃন্দের বিরোধিতা আর জামায়াতের সমর্থন সত্তে¡ওতাদের ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে না যাওয়াই মূলত; বুলবুলের পরাজয়ের প্রধান কারণ।
জামায়াতের ৩০/৩৫ হাজার ভোটব্যাংকের দাবি রাজনৈতিকভাবে করা হলেও প্রকৃতপক্ষে মহানগরীতে জামায়াতের ভোটব্যাংক কুড়িহাজারের বেশি নয়। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী বিরোধী নেগেটিভ এটিচ্যুড তেমনভাবে কাজ করেনি। ফ্লোটিং ভোটের ৮০ শতাংশ পড়েছে খায়রুজ্জামান লিটনের বাক্সে। দলীয় বা জোটের ভোটের তুলনায় পোলাটিং ভোটই এবার জয়-পরাজয় নির্ধারণ করেছে। খায়রুজ্জামান লিটনের জন্য আরেকটি প্লাস পয়েন্ট ছিল শুরু থেকেই তার কর্মী-সমর্থক ও নীতি-নির্ধারকরা ছিলেন বেশ সংগঠিত ও গোছানো।
সূত্র জানায়, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে এবার ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনায় নেন পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ, ক্রিকেট টেস্ট ভ্যেনু, বেকার সমস্যা, দুর্নীতি, সিটি করপোরেশনে দলীয়করণসহ নানা বিষয়। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গ্যাস সরবরাহ ও টেস্ট ভ্যেনু নিয়ে যে প্রতারণা ও নাটক করেছে নগরবাসি ভোটের মাধ্যমে তার জবাব দিয়েছে।
মহানগরীর সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের দাবিটি রাজশাহীবাসীর কাছে প্রাণের দাবি। এনিয়ে মহানগরীর মানুষ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলনের চাপে বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তাদের পুরোটা সময় জুড়ে ‘রাজশাহীতে গ্যাস আসছে আসছে’ বলে মহানগরবাসির সাথে প্রতারণা করেছে। রাজশাহীর মেয়র বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান মিনু, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সরকার পরিচালনার সাথে জড়িত দায়িত্বশীল বক্তিরা বারবার প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন রাজশাহীতে গ্যাস সরবরাহ করার। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর করা হংয়নি। জোট সরকারের শেষ সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দিয়ে মহানগরীর খড়খড়িতে একটি জমিকে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাজশাহীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ প্রকল্প উদ্বোধন করানো হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেখানে গ্যাস প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়েছে সেই জমি এখনও অগ্রিহণই করা হয়নি। ক্রিকেট টেস্ট ভ্যেনু আরেকটি প্রধান দাবি রাজশাহীবাসীর। কিন্তু বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তাতো পূরণই করেনি বরং টেস্ট ভ্যেনুর জন্য রাজশাহী পর্যটন বর্ধিতকরণ প্রকল্পে বরাদ্দকৃত সরকারী অর্থ রাজশাহী থেকে বগুড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ রাজশাহীতেই প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সূচনা হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে এমসিসি ক্রিকেট একাডেমি দল রাজশাহীতে এসে তৎকালীন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাথে খেলে। অনেক ক্রিকেটার ঢাকার ক্লাবগুলোতে এবং জাতীয় দলেও খেলছে। আবাসন সমস্যার কারণ দেখিয়ে ক্রিকেট টেস্ট ভ্যেনু নিয়ে যাওয়া হয় বগুড়ায়। জোটের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবের হোসেন চৌধুরী বাংলাদেশ কিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে রাজশাহীর পর্যটন মোটেলকে আধুনিক ও বর্ধিত করার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়। কিন্তু সেই অর্থও রাজশাহী থেকে বগুড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ ব্যাপারে বিএনপি নেতারা সোচ্চার ছিলেন না। কারণ তারা কেউই তারেক জিয়ার বিরাগভাজন হতে চাননি। রাজশাহীর অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো বেকার সমস্যা। এই বেকার সমস্যা দূরীকরণে বিগত সরকারগুলো তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে ক্রমশ: এই সমস্যা বাড়ছে।
রাজশাহীর রেশম শিল্প দেশজুড়ে যার খ্যাতি। শুধু দেশজুড়েই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই রেশমের সুখ্যাতি রয়েছে। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে বারবার রাজশাহীতে রেশমপল্লী গড়ে তোলার প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই শত বছরের ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী রেশম কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়েন। রাজশাহী মহানগরীর প্রায় প্রত্যেকটি মানুষকেই যে সংকটটি ছুঁয়ে যায় তার নাম হলো জলাবদ্ধতা। এই জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজশাহী সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে ড্রেনেজ প্রকল্পের নামে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অনেকে মনে করেন, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মহানগরীর বেশির ভাগ মানুষের কাছে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করতে পারে না সিটি করপোরেশন। যে পানি সরবরাহ করা হয় তাতে থাকে আয়রন। বিশুদ্ধ খাবার পানির সমস্যাটিও এবার ভোটারদের বিবেচনার অন্যতম বিষয়ে পরিণত হয়।
নগরবাসীর কাছে আরেকটি বিষয় ইস্যু হয়েছে এবার তা হলো সিটি করপোরেশনে দলীয়করণ। মেয়র মিনুর আমলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও দলীয়করণ হয়েছে। ফলে সাধারণ নাগরিকরা বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মনে করেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুর্নীতি-দুঃশাসন, দলীয়করণ কিংবা জোটগত-দলীয় ভোটের চাইতে এবার মেয়র হিসেবে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ আর ফ্লোটিং ভোটই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করেছে।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×