জাহাঙ্গীর আলম আকাশ
জঙ্গিদের করাল গ্রাসে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ৩৮ বছরের মধ্যে ১৭ বছরই কেটেছে সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে। আর এই সুযোগে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। চিহ্নিত শত্র“ পুরনো কায়দায় আঘাত হানছে একের পর এক। আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে ওরা ‘আফগানিস্তান’ বানাতে চায়। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধী আর জঙ্গিবাদই এখন বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। দেশকে গভীর সংকটের দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের গণরায়ের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের যে নবযাত্রা তাকে থামিয়ে দিতে তৎপর আছে অশুভ শক্তি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা থেকে পিলখানার বিডিআর সদর দপ্তরের গণহত্যাযজ্ঞ আর উদীচী থেকে ছায়ানট ও ২০০৪ সালের ২১ আগষ্টের নবিরবিহীন গ্রেনেড হামলা, ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে জঙ্গিবাদ-যুদ্ধাপরাধ, জামায়াত-শিবির আর পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। এই ত্রি-শক্তি জঙ্গিদের এক অভয়ারণ্যে পরিণত করতে চায় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে।
উদীচী থেকে পিলখানা এই সময়ে দেশে সংঘটিত অসংখ্য গ্রেনেড-বোমা হামলার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন দেড় শতাধিক মানুষ, আহতের সংখ্যা অনেক। দেশের মানুষ আজ বোমা আর গ্রেনেড আতংকে। উদীচীর সম্মেলন, রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, সিপিবির মহাসমাবেশ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ জাতীয় নেতৃত্বকে একযোগে হত্যার উদ্দেশে ২০০৪ সালের ২১ আগষ্টে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ, সাবেক ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী, সাবেক অর্থমন্ত্রী জনাব শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, সিলেটের জনপ্রিয় মেয়র বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান, বানিয়ারচরে ক্যাথলিক চার্চের ওপর হামলাসহ দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে জঙ্গি বোমা হামলার লোমহর্ষক ঘটনাগুলো এখনও আমাদের স্মৃতিপটে ভয়াবহ দাগ কেটে রেখেছে। চট্রগ্রামে চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র এবং বগুড়ায় ট্রাক ভর্তি অস্ত্রের সাথে জড়িত রাঘব-বোয়ালরা ধরাছোয়ার বাইরে। পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত বিশ্বইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যাযজ্ঞের ঘটনার নেপথ্যের মদদদাতা, পরিকল্পনাকারী ও অর্থের যোগানদাতারাও চিহ্নিত হয়নি। তবে বর্তমান সরকার এই অশুভ শকিক্তকে চিহ্নিত করবার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
বাংলার মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ তথা মুক্তি সংগ্রামের মূল একটি চেতনা হলো অসা¤প্রদায়িকতা বা ধর্ম নিরপেতা। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ খ্রিষ্টান, ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালি স্বাধীনতা ভোগ করবে। কিন্তু আমরা ল্য করেছি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের হত্যাযজ্ঞ পরবর্তীকালে বাঙালির অসা¤প্রদায়িক চেতনা ধ্বংস বা দমনের ল্েয গায়ের জোরে নানামুখী ষড়যন্ত্রসহ সকল রকমের হীন অপকর্ম চলেছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে। মৌলবাদী ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী নানান কৌশলে জাতির কাঁধে চেপে বসার চেষ্টা করেছে। এখন সময় এসেছে এই অপশক্তিকে এই বাংলায় চিরতরে ধ্বংস করার।
বাংলাদেশে মূলত: আশির দশকের শুরু থেকে জঙ্গিরা ধীরে ধীরে তথাকথিত ইসলামী বিপ্লবের নামে তাদের কর্ম তৎপরতার সূচনা করে। ভারতের দেওবন্দ, পাকিস্তানের খটক এবং সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের ছাত্রদের অধিকাংশই ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে জড়িয়ে পড়ে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনী, আফগানিস্তান ও চেচনিয়ায় রাশিয়ান সেনাবাহিনী, প্যালেস্টাইন ও লেবাননে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় বাংলাদেশী ছাত্ররা (যারা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল)। যাদের অধিকাংশই কওমী মাদ্রাসার ছাত্র। এসব যোদ্ধাই দেশে ফিরে জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত হয়। প্রধান কবি শামসুর রাহমান এর ওপর ১৯৯৮ সালে হত্যাপ্রচেষ্টা চালানোর মধ্য দিয়ে জঙ্গিরা দেশবাসিকে একটা ম্যাসেজ দেয় যে, প্রগতিশীল-অসা¤প্রদায়িক, মুক্তচিন্তার ব্যক্তিরাই তাদের প্রধান টার্গেট। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা ‘বোমা সন্ত্রাস’ এর সূচনা করে।
এক নজরে জেনে নেয়া যাক জঙ্গি বোমা-গ্রেনেড হামলায় হতাহত’র সংখ্যা। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে জঙ্গি বোমা-গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছেন দেড় সহস্রাধিক আর নিহত হন বিচারক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ ১৭৬ জন মানুষ। ৬ মার্চ, ১৯৯৯ যশোরের টাউন হল ময়দানে উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত দেড় শতাধিক আহত, ৮ অক্টোবর, ১৯৯৯ খুলনায় আহমদিয়া মসজিদে হামলায় ৮ জন নিহত, ২০ জানুয়ারি, ২০০১ ঢাকার পল্টনের সিপিবির মহাসমাবেশ ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে বোমা হামলায় ৫ জন নিহত শতাধিক আহত, ১৪ এপ্রিল, ২০০১ রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত অর্ধশতাধিক আহত, ৩ জুন, ২০০১ গোপালগঞ্জের মকসুদপুরের বানিয়ারচর ক্যাথলিক চার্চে হামলায় ১০ জন নিহত ছাব্বিশ জন আহত, ১৬ জুন, ২০০১ নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলায় ২১ জন নিহত শতাধিক আহত, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০০১ বাগেরহাট কলেজ মাঠের সমাবেশে হামলায় ৮ জন নিহত শতাধিক আহত, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০১ সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনের জনসভায় হামলায় ৪জন নিহত দশ জন আহত, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০১ সাতীরায় রক্সি সিনেমা হল ও সার্কাস প্যান্ডেলে হামলায় ৩ জন নিহত শতাধিক আহত, ৭ ডিসেম্বর, ২০০২ ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হলে হামলায় ১৯ জন নিহত শতাধিক আহত, ১৭ জানুয়ারি, ২০০৩ টাঙ্গাইলের শফিপুরে পাগলার মেলায় হামলায় ৮ জন নিহত পনেরো জন আহত, ১২ জানুয়ারি, ২০০৪ সিলেট শাহজালাল (র.) মাজারের ওরসে হামলায় ৫ জন নিহত অর্ধশতাধিক আহত, ১৫ জানুয়ারি, ২০০৪ বোমা হামলায় সাংবাদিক মানিক সাহা নিহত, ২৭ জুন, ২০০৪ বোমা হামলায় সাংবাদিক হুমায়ুন কবির বালু নিহত ও তিন জন আহত, ২১ মে, ২০০৪ সিলেটে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর বোমা হামলায় ৩ জন নিহত প্রায় ১০০ আহত, ২১ জুন, ২০০৪ দিরাইয়ে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের জনসভায় হামলায় ১ জন নিহত অর্ধশত আহত, ৭ আগষ্ট, ২০০৪ সিলেটে মহানগর আওয়ামী লীগের কর্মীসভায় হামলায় ১ জন নিহত অর্ধশতাধিক আহত, ২১ আগষ্ট, ২০০৪ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী গণসমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন (নিহতের সংখ্যা এখনও পরিস্কার নয় ২২ অথবা ২৪ জন) প্রায় ৫০০ আহত, ২৪ ডিসেম্বর, ২০০৪ সিলেটের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুননেসা হক এর বাসভবনে সাত জন আহত, ১৬ জানুয়ারি, ২০০৫ বগুড়ায় যাত্রানুষ্ঠানে ২ জন নিহত প্রায় চল্লিশ জন আহত, ১৬ জানুয়ারি, ২০০৫ নাটোরে যাত্রা মঞ্চের ওপর হামলায় পঁয়ত্রিশ জন আহত, ২৭ জানুয়ারি, ২০০৫ হবিগঞ্জে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার জনসভায় হামলায় ৫ জন নিহত প্রায় ১০০ আহত, ১৭ আগষ্ট, ২০০৫ সারাদেশের ৬৩ জেলায় বোমা হামলায় ২ জন নিহত তিন শতাধিক আহত, ৩ অক্টোবর, ২০০৫ চট্রগ্রাম, চাঁদপুর ও ল²ীপুরের আদালতে হামলায় ২ জন নিহত দশ জন আহত, ১৪
নভেম্বর, ২০০৫ ঝালকাঠীতে হামলায় ২ বিচারক নিহত আট জন আহত, ২৯ নভেম্বর, ২০০৫ চট্রগ্রামে হামলায় ৩ জন নিহত কুড়িজন আহত, ২৯ নভেম্বর, ২০০৫ গাজীপুরে হামলায় ৯ জন নিহত পনেরো জন আহত, ১ ডিসেম্বর, ২০০৫ গাজীপুরে হামলায় ১ জন নিহত, ৮ ডিসেম্বর, ২০০৫ নেত্রকোণায় হামলায় ১০ জন নিহত পঁচিশ জন আহত, ২০ ফেব্র“য়ারি, ২০০৯ গাজীপুরে পুলিশ সুপারের সম্মেলন কে গ্রেনেড হামলায় (গ্রেনেড ছুঁড়ে মারার পর) বারো জন আহত হন। এছাড়া চলতি বছরের ২৫ ফেব্র“য়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে কথিত বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় পরিকল্পিতভাবে ৭৪ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সেনা কর্মকর্তাসহ শতাধিক নিহত হবার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।
২০০১ সালের শেষ দিকে রাঙ্গামাটির একটি হোটেলে বোমা তৈরীর সময় নিহত হয় জেএমবি নেতা নসরুল্লাহ। একই বছরে জামালপুরের সরিষাবাড়ির দিকপাইত ইউনিয়নে হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টান হওয়া এক ব্যক্তিকে এবং জামালপুরের হাজিপুরে মুসলমান ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টান হওয়া গনি গোমেজকে জবাই করে জেএমবির জঙ্গি সন্ত্রাসী দল। ২০০২ সালের মহান বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বরে বাগেরহাট জেলা শাখার হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতা তারাপদ পোর্দ্দারকে ছুরিকাঘাত করে জেএমবির সন্ত্রাসীরা।
২০০৩ সালের জানুয়ারি মাসে জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার আঞ্জুমানে চিশতিয়া দরবার শরিফের ৫ জন ভক্ত ও আশেকানকে জঙ্গিরা জবাই করে। একই বছরের ২৩ ফেব্র“য়ারি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে জেএমবির ঘাঁটিতে বোমা তৈরীর সময় বিস্ফোরণে নিহত হয় এক জঙ্গি। একই ঘটনায় জেএমবির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাও আহত হয়েছিল। ২০০৩ সালের ২৫ আগষ্ট খুলনায় সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় নিহত হন আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট মনজুরুল ইমাম। খুলনায় দৈনিক সংগ্রামের সাংবাদিক শেখ বেলালউদ্দিন বোমা হামলায় নিহত হন।
২০০৪ সালে জঙ্গিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন অধ্যাপককে হত্যা করে। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ূন আজাদকে হতার উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাত করে জঙ্গিরা। ওই বছরেরই ১২ আগষ্ট অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ জার্মানীতে মারা যান। একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর ভোরে জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বিনোদপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসকে খুন করা হয়। পরবর্তীতে জঙ্গিরা এই হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল হতে ২০০৫ সালের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত বৃহত্তর রাজশাহীতে জেএমবির জঙ্গিরা কথিত সর্বহারা দমনের নামে কমপে ২৫ জন মানুষকে হত্যা করে। জঙ্গি নির্যাতনে আহত হন তিন হাজারের অধিক মানুষ।
২০০৫ সালের ২৩ জানুয়ারি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার নৈয়ারবাড়ী গ্রামে বোমা বিস্ফোরণে একজন নিহত ও ২ জন আহত হন। আবদুল মজিদ হালদারের বাড়িতে বোমা বানানোর সময় এ বিস্ফোরণ ঘটে। একই বছরের ২১ জানুয়ারি জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার ভাটারা ইউনিয়নের গাবতলী বাজারে যাত্রামঞ্চে বোমা বিস্ফোরণে অন্তত: ৩০ জন আহত হন। জোট আমলেই খুলনায় আরেক সাংবাদিক শেখ বেলালউদ্দিন নিহত হয়েছেন বোমা হামলায়। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার মিরপুরে একটি বাটা সু স্টোরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় দুই জন নিহত হন। ছাতকের তৎকালীন সাংসদ মহিবুর রহমান মানিকের ১৯৯৯ সালের মার্চে বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণে ২ জন নিহত হয়।
বিগত সময়গুলোতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বোমা ও গ্রেনেড হামলার ঘটনার সঠিক তদন্ত হয়নি। ফলে প্রকৃত রহস্য উন্মোচন হয়নি আজও। সিপিবির সমাবেশ, খুলনায় আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা, সাতীরায় সিনেমা হল ও মেলায় বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দেয়া হয়। সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে পরিকল্পনাকারী, গডফাদার ও অর্থের যোগানদাতাদের বাদ দিয়ে। চাঞ্চল্যকর অন্যান্য বোমা-গ্রেনেড হামলার তদন্তেও প্রায় একই অবস্থা।
জঙ্গিরা ইসলামী জলসার নামে উপরে লটকিয়ে প্রকাশ্য জনসমাবেশে মানুষ হত্যা করে লাশ রাস্তার ধারের গাছে ঝুলিয়ে রাখতো। ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্র“য়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশ্ব ভালবাসা দিবসের অনুষ্ঠানেও জঙ্গিরা বোমা হামলা চালায়। ওই বছরেই গাজীপুরে কর্মরত মার্কিন উন্নয়ন সংগঠন পিস কোর সদস্য এবং দেশের ৫০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে হত্যার পরিকল্পনা করে জঙ্গিরা। দেশের উত্তরাঞ্চলীয় বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে জঙ্গিরা তাদের হত্যা-খুনের রাজনীতির প্রকাশ্য কর্মকান্ড চালাতে থাকে। পরের বছর ২০০৫ সালে জঙ্গিরা দেশে জিহাদ এর সূত্রপাত ঘটায়। এখনও জঙ্গিরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর আসছে। জঙ্গিদের প্রধান টার্গেট এখন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাই।
১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তয়ী মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক শান্তি স্থাপনের ল্েয জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু পরিকল্পিতভাবে এগুতে থাকেন। এজন্য তিনি বাকশাল কায়েম করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। এর মধ্য দিয়ে দেশের শান্তির পায়রা উড়ে যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে হত্যা-নির্যাতনের বিচার বন্ধ করে খুনিদের দায়মুক্তি দেয়া হয়। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানপন্থি ভাবধারায় নিয়ে যাওয়া হয় দেশটাকে। দেশের অসা¤প্রদায়িক সংবিধানে সা¤প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ঢুকিয়ে দেয়া হয়।
দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৯১ সালে দেশে গণতান্ত্রিক ধারার পুন:সুচনা ঘটে। ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রমতায় আসে। এরপর জঙ্গিরা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রত্য সহযোগিতায় ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ দিবাগত রাতে যশোরে উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে দেশে জঙ্গি বোমা-গ্রেনেড হামলার সুচনা ঘটে। এরপর সিপিবি, ছায়ানট, সতেরো আগষ্ট, একুশ আগষ্টের ভয়াবহ ঘটনাসহ একের পর এক ঘটতে থাকে গ্রেনেড-বোমা হামলা। ২০০১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট মতায় আসে। এরপর জঙ্গিরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেতে থাকে। ফলে দেশজুড়ে জঙ্গি হত্যা-নির্যাতন ও বোমা-গ্রেনেড হামলায় শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘিœত হয়।
২০০৬ সালের শেষ দিকে জোট তাদের রাজনৈতিক মতায়নকে পাকাপোক্ত করতে গিয়ে চরম এক অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে বাংলাদেশে। এই অবস্থায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পটপরিবর্তনের শুরুতে মানুষের জীবনে কিছুটা শান্তি ও স্বস্তি এনে দেয়। কিন্তু অল্পদিনেই মানুষের মোহ কেটে যায় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের প্রতি। সরকারের বিরাজনীতিকরণের অপচেষ্টার কারণে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ছাত্র, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ মানুষ চরম নির্যাতন-যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকেন। দেশের অধিকাংশ মানুষের মনোভাব বিবেচনা করে সরকার জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে। ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রের পথে নবযাত্রা করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই যাত্রার শুরুতেই একটা বড় হোচট খেল ২৫ ফেব্র“য়ারির বিডিআর সদর দপ্তরের ঘটনায়।
জঙ্গি পৃষ্ঠপোষক ও জঙ্গিদের অর্থের জোগানদাতা এবং ভোলায় জঙ্গি মাদ্রাসা পরিচালনাকারী বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত বৃটিশ নাগরিক ফয়সাল মোস্তফাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইসহ শীর্ষ ছয় জঙ্গি নেতার শাস্তি নশ্চিত করা গেছে। কিন্তু দেশ থেকে জঙ্গিবাদ নির্মুল হয়নি। এখনও চলছে জঙ্গি তৎপরতা। বিশেষ করে দেশের কওমী মাদ্রাসাগুলো জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে খোদ আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মন্তব্য করেছেন স¤প্রতি।
প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের পর থেকেই শান্তি খুঁজছেন। কিন্তু শান্তির পায়রা ধরা দিচ্ছে না। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যারা কাজ করছেন তারা নানাভাবে নিগৃহিত ও নির্যাতিত হচ্ছেন এই দেশে। এখনও শান্তির অন্বেষণে বাংলাদেশ। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়া ছাড়া শান্তি ধরা দেবে না বাংলাদেশের কাছে। তাই ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও ুদ্র স্বার্থ পরিহার করে রাষ্ট্র ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দলমত নির্বিশেষে সকলকে সমভাবে এগিয়ে আসতে হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সকল অশুভ অপশক্তি তথা জঙ্গিবাদ, যুদ্ধাপরাধ ও স্বাধীনতাবিরোধীদের শক্ত হাতে দমন জরুরি। একই সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্রই জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক-মানবাধিকারকর্মী
[email protected]
http://www.humanrightstoday.info
Cell: +8801720084944

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


