somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জার্মানি থেকে বলছি: অন্ধকার সময়ের এক করুণ কাহিনী

১০ ই জুলাই, ২০০৯ রাত ২:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ:
মাতৃভূমির মাটি, পানি, হাওয়া, প্রকৃতি আর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এক সংবাদকর্মী আমি। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ লড়াই করছেন প্রাকৃতিক বিপর্যয় বন্যার সাথে। আমার দেশের গরীব, নিরন্ন খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জন্য মন কেঁদে ওঠে। প্রিয় পাঠক, দেশবাসি দূর প্রবাস জার্মানি থেকে বলছি। আজ আপনাদের এক গল্প শোনাতে চাই। না, এ কোন কল্পকাহিনী নয়। আমার জীবনের এক কঠিন বাস্তব সত্য কাহিনী। এক করুণ বেদনাজাগানো এই গল্প আমার জীবনের অন্ধকার সময়। যা আমার প্রতিটি মুহুর্তকে পীড়িত করে। দেশের আর একটি মানুষও যেন এমন যন্ত্রণাকাতর না হন তার প্রত্যাশা নিয়েই আমার এই লেখা।
‘লুব্ধক’ এটি একটি বাসার নাম। রাজশাহী মহানগরীর উপশহরের ২ নম্বর সেক্টরের ৫৫ নম্বর বাড়ি এটি। আমি, আমার সহধর্মিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী ফারহানা শারমিন এবং আমাদের ২ বছর বয়সী সন্তান (গ্রেফতারের সময় বয়স ছিল মাত্র ৪ মাস) ফিমান ফারনাদ এই তিনজন বসবাস করতাম এই বাসার নিচতলার বাম অংশে। সিএসবি নিউজ এর প্রচার বন্ধ। তাই সিএসবি নিউজ এর রাজশাহী ব্যুরো অফিস (মহানগরীর কাদিরগঞ্জে) খোলা হয় না আগের মত। ২৪ ঘন্টার নিউজ চ্যানেলে কাজ করতে গিয়ে পরিবার এবং সহকর্মী কাউকেই তেমন সময় দিতে পারতাম না। সিএসবির স¤প্রচার বন্ধ হয়ে গিয়ে সময় কাটানোর মত কোন কাজ ছিল না হাতে। তাই প্রেসক্লাবে মাঝে-মধ্যে আড্ডা দিতাম অনেক রাত পর্যন্ত। তবে রাত ১০টার অঅগেই বাড়িতে আসবে হবে এমন স্ট্যান্ডিং নির্দেশ ছিল আমার সহধর্মিনী ফারহানা শারমিন এর। সেই নির্দেশ অনেক সময় লঙ্ঘিত হতো। বাসায় ফিরতে একটু দেরী হলে (রাত ১০টা অতিক্রম হলে) মোবাইলে রিং আসতো বাসা থেকে। এরপর ফারহানা আমাদের একমাত্র সন্তান ফিমানের কণ্ঠ শুনাতো আমাকে। আমিও দ্রুত চলে যেতাম বাসায়।
২০০৭ সালের গত ২৩ অক্টোবর রাত ১১টা পর্যন্ত ছিলাম রাজশাহী প্রেসক্লাবে। এরই মধ্যে অন্তত: দুইবার ফোন পেয়েছি ফারহানার। রাত তখন ১১টা কি সাড়ে ১১টা ক্লাব থেকে চলে আসি বাসায়। ফিমান সেদিন ঘুমাতে বেশ বিলম্ব করছিল। তাই তার সাথে আমরা খেলছিলাম দুজনে (স্বামী-স্ত্রী)। তখন পর্যন্ত আমরা রাতের খাওয়া সম্পন্ন করিনি। টিভিটা ছেড়ে দেয়া ছিল। বাবুকে (আমাদের সন্তান) ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছি উভয়ে। এক পর্যায়ে ফিমান ঘুমিয়ে পড়ে। আমরাও খাওয়া-দাওয়া সেরে নিই। আমরাও ঘুমিয়ে যাই। রাত অনুমান দেড়টা আকস্মিক বিকট শব্দে বেজে ওঠে আমাদের বাসার কলিংবেল।
বিরামহীনভাবে কলিংবেল বাজতে থাকে। ফলশ্র“তিতে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি ও আমার স্ত্রী ঘরের দরজা খুলে বেলকুনীতে বেরিয়ে আসি। এসময় আমার কোলেই ছিল আমাদের সন্তান ফিমান ফারনাদ। বুঝতে পারলাম একদল সশস্ত্র মানুষ পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। অপরিচিত লোকদের সবার হাতে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু কেন? পরক্ষণেই মনে হলো আমার নামে যে মামলা রয়েছে তারজন্য হয়ত ধরতে এসেছে। ওই মামলায়তো হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছি আমি। আর পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমার মত একজন নগন্য সাংবাদিককে ধরার জন্য গোটা বাড়ি ঘিরতে হবে কেন? আমি কি চোর না ডাকাত নাকি দাগী অপরাধী? আর পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হলেতো পোশাক পরা থাকবে। সিভিল পোশাকে সবার হাতে অস্ত্র। এরা কি তবে সন্ত্রাসী নাকি ডাকাত দল? তাহলে কি ওরা ডাকাতি করতে এসেছে এই বাড়িতে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন বাজতে থাকে নিজের মনের মধ্যে।
অপরিচিত লোকেরা ইতোমধ্যে গোটা বাড়ির সবক’টি কলিংবেল বাজিয়েছে। শুধুএই বাড়িরই নয় আশপাশের বাড়ির সব মানুষের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। এরই মধ্যে তিনতলা বাড়ির একেবারে তিনতলা থেকে বাড়ির মালিক জনাব আবুল কাশেম ও তার পুত্র লিখন নীচে নেমে আসেন। সিভিল পোশাকধারী ১০/১২ জন সশস্ত্র লোক বাড়ির যে অংশে আমরা থাকি সেই অংশের বেলকুনীর দরজার কাছে আসেন। তারা নিজেদেরকে প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে আমার বাসা তল্লাশী করবেন বলে দরজা খুলতে বলেন। এসময় আমি এবং আমার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করি যে, আপনারা কারা? আমি উনাদের উদ্দেশে বলি, আপনাদের পরিচয় নিশ্চিত না হলে আমি দরজা খুলবো না। তখন তারা বলেন, ‘তাড়াতাড়ি দরজা খুল, নইলে তোর খুব অসুবিধা হবে।’ আমি বলি কি ধরনের অসুবিধা হবে, এতো রাতে একজন নাগরিকের বাড়িতে এসে আপনারা ডিসটার্ব করছেন কেন, কিসের কি অসুবিধা হবে? তারা আমাকে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ বলে গালমন্দ করতে থাকেন।
সত্যি সত্যি প্রশাসনের লোক নাকি সন্ত্রাসী-ডাকাতদল হানা দিয়েছে আমার বাসায় তা জানার জন্য আমি বোয়ালিয়া মডেল থানায় মোবাইল করি। থানার ডিউটি অফিসার আমাকে জানান, ‘থানা থেকে আমাদের কোন লোক যায়নি আপনার বাসায়। কে বা কোন বাহিনী গেছে তা আমাদের জানা নেই।’ এক পর্যায়ে সশস্ত্র লোকেরা বেলকুনীর গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আমার কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন। তখন স্পষ্ট মনে হচ্ছিল যে এরা তাহলে ডাকাতদল! কিছুক্ষণ পর তারা (সশস্ত্র লোকেরা) নিজেদেরকে র‌্যাবের লোক বলে পরিচয় দেন।
আমি বলি যে, আপনারা র‌্যাবের লোক কিন্তু দেখেতো মনে হচ্ছে না। তাছাড়া আমার বাসা সার্চ করবেন আপনাদের হাতে কি সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। আমি এবং আমার পতœী সমস্বরে একথা বলি। এ পর্যায়ে তারা রেগে যায়। এক পর্যায়ে বাড়ির মালিকের ছেলে লিখন সশস্ত্র লোকদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা তাকে প্রহার করতে থাকেন। আমি মনে মনে ভাবি যে, সত্যিই যদি র‌্যাবের লোক হয় তাহলে কেন তারা মারধোর করছে বাড়ির মালিকের ছেলেকে। তখন আমি তাদের কাছে হাতজোড় করে অনুনয় করে বলতে থাকি, আপনারা উনাকে মারছেন কেন ? আপনারা কোন অন্যায় আচরণ করবেন না। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। আপনারা বাসা তল্ল¬াশী করুন। কিন্তু আমার প্রতি কোন অবিচার করবেন না। আমার ঘরে আপনাদের হাতের অস্ত্র রেখে আমাকে অস্ত্রসহ ধরে নিয়ে যাবেন না, প্লি¬জ।
এরপর আমার শিশুপুত্র ফিমানকে তার মায়ের কোলে দেই। আমি বেলকুনীর গ্রিলের দরজা খুলি। দরজা খোলামাত্র র‌্যাব সদস্যরা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে দরজার বাইরে নেন। তারা আমার দু’ হাতে হ্যান্ডকাপ পরান। আমার দু’ চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে দেন। শুধু তাই নয়, আমার মাথা থেকে গলা পর্যন্ত কালো কাপড়ের টুপি পরিয়ে দেয়া হয়। আমার শিশুপুত্র, স্ত্রী ও বাড়িওয়ালার সম্মুখে র‌্যাব সদস্যরা আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ী কিল-ঘুসি ও লাথি মারতে থাকেন। একটি সভ্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এমন অসভ্য-বর্বর আচরণ করতে পারে তা আমার জীবনের এটাই প্রথম বাস্তব অভিজ্ঞতা।
‘সন্ত্রাসী এর ন্যায় র‌্যাবের লোকেরা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে একটি মাইক্রোবাসে ওঠায়। মাইক্রোর মধ্যে আমার সামনে দুজন, আমার পেছনে দুজন, আমার ডানে দুজন এবং আমার বাম পাশে দুজন সশস্ত্র লোক বসে শক্তভাবে ধরে থাকলো আমাকে। এদের একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করে বললো যে, ‘এই ব্যাটা এবার বল তোকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি’? আমি বলি তা কি করে আমি জানবো। তখন ওরা বলে আমরা র‌্যাব তুই জানিস না র‌্যাব কোথায় নিয়ে যায় মানুষকে। তখন আমি বলি তাহলে কি আমাকে আপনারা ক্রসফায়ারে হত্যা করার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন? এসময় তারা আমাকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। মাইক্রো চলতে শুরু করলো। রাস্তার বাঁক আর রাস্তার মাঝে স্পিড ব্রেকার অনুমান করে বুঝতে পারি যে, গাড়ি যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর গেট ক্রস করার পর স্পিড ব্রেকার ও তারপর মাইক্রোটি ডানে মোড় নিলে নিশ্চিত হই যে, আমাকে র‌্যাব-৫ রাজশাহীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পথিমধ্যে গাড়ির ভেতরে আমাকে মারধোর করা হয়। আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করে তারা। তারা আমাকে অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া ও ‘ক্রসফায়ার’ করার হুমকি দেয়। গাড়ির ভেতওে একজন বলে যে, ‘আল্লাহর নাম, দোয়া-কালাম পড়, তোকে ক্রসফাার করা হবে’। তখন মনে মনে ভাবছি যে, আমিতো কোন অপরাধ করিনি, আমি খুনি নই। তারপরও আমাকে ক্রসফায়ার দেয়া হবে। এটা কি হয়? পরক্ষণেই আবার ভাবি সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ এ বিনা বিচারে মানুষ হত্যা নতুন কিছু নয়। এখানে শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুনদের মত মানবতাবাদী মানুষদেরকে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন সইতে হয়। কিন্তু খুনি, যুদ্ধাপরাধী নিজামীরা গাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এসব ভাবতে ভাবতে একসময় নিশ্চিত হলাম যে, সত্যি সত্যি আমাকে র‌্যাব-৫ রাজশাহীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
র‌্যাব কার্যালয়ে নেয়ার পর আমার দু’হাত বেঁধে আমাকে উপরে সিলিংয়ের সাথে টাঙ্গিয়ে রাখা হলো। এর আগে আমাকে এই ঘর ও ঘর সিঁড়ি দিয়ে ওঠানো নামানো করা হলো বেশ কিছু সময় ধরে। রাতে আমার আশপাশে বুটের খট খট শব্দ করে ৪/৫ জন লোক আসতো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আবার একই শব্দ করে হেঁটে চলে যেতো তারা। চোখ বাঁধা ও কালো টুপি পরিয়ে এবং আমাকে ঝুলিয়ে রাখা হয় সারারাত। এভাবে রাতভর আমার ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। সকাল আনুমানিক আটটার দিকে আমার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে আমাকে নিচে নামানো হলো। একটি ছোট রুটি পাতলা ডাল দিয়ে খেতে দেয় তারা। রুটির সাইজ আর পানির ন্যায় ডাল অনুভব করে আবার ভাবি, তাহলে কি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবেক ভিসি সাইদুর রহমান খান, আবদুস সোবহান ও মলয় ভৌমিক এর ওপরও এমন আচরণ করেছে র‌্যাব সদস্যরা। এই তিন গুণি শিক্ষককেও র‌্যাব-৫ এর সদস্যরাই গ্রেফতার করেছিল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের ওপর কি অমানবিক-বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে ‘পশুর দল’।
যাহোক, রাতভর উপরে ঝুলে থাকার সময় মনে হচ্ছিল আমার শরীর থেকে বোধহয় হাত দু’টো আলাদা হয়ে গেছে। একটি গামছা দিয়ে আমার চোখ দু’টি শক্ত করে বেঁধে দেয়ার পর আবার মোটা কালো কাপড়ের একটি টুপি পরিয়ে দেয়ায় আমার যেন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বারবার অনুরোধ করেছি কিন্তু টুপি খুলে দেয়নি অমানবিক ওই ‘জানোয়ারের দল’। আমাকে যে টুপি পরানো হয়েছিল সেই টুপি নাকি একমাত্র ফাঁসির আসামিদের যখন ফাঁসির মঞ্চে নেয়া হতো তখন তাদেরকে পরানো হতো। সকালে নাস্তা হিসেবে যে পাতলা রুটি আমাকে খেতে দেয়া হয় তা থেকে সামান্য একটু ছিঁড়ে মুখে দিয়েছি। এরপর পানি পান করে তৃষ্ণা মিটাই। এরপর আমাকে আবারও উপরে লটকানো হয় একইভাবে। আমাকে খেতে দেয়ার সময়ও টুপিটি খোলা হয়নি। শুধুমাত্র গোঁফ পর্যন্ত টুপিটি উঠিয়ে দেয়া হয়। আমার কাছে এসে আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করে র‌্যাব সদস্যরা।
সকাল অনুমান ১০টার দিকে দুই ব্যক্তি এসে আমার নাম জানতে চান। ওই দুইজনের কথোপকোথনেই বুঝতে পারি এরা আমার পরিচিত। গ্রেফতার হওয়ার আগে আগে পেশাগত কারণে এই দু’জনের সঙ্গে আমার পরিচয় এবং উনাদের সঙ্গে আমার একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। আরা এরা হলেন র‌্যাব-৫ এর ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানী (সিপিসি) মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ ও রাব-৫ এর সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর হুমায়ুন কবির। এরা এখন রাজশাহীতে নেই। মেজর রাশীদকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একজন সদস্য করে পাঠানো হয়েছে আইভরিকোষ্টে। অপরজন মেজর কবিরকে বান্দরবানে বদলী করা হয়েছে বলে শুনেছি। কথিত অপহরনের অভিযোগে ওয়ার্কাস পার্টির নেতা কামরুল ইসলাম ওরফে মজনু শেখকে যখন র‌্যাব সদস্যরা পিটিয়ে হত্যা করে ২০০৭ সালের ১৮ মে তখন পরিচয় হয়েছিল মেজর কবির এর সঙ্গে। আর সিএসবি নিউজ বন্ধ হবার এক সপ্তাহ আগেও মেজর রাশীদের সাথে তারই কার্যালয়ে কথা বলি পেশাগত কারণে।
পূর্ব পরিচিতি এই দু’জনের মধ্যে মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ এক পর্যায়ে নির্যাতন শুরু করলেন। নির্যাতনের শুরুতেই মেজর রাশীদ আমাকে বলেন, “এই ফকিরনির বাচ্চা, তোর এতো প্রেসটিজ কিসের? শালা চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী। তোর ‘পাছার ভেতর’ ঢুকিয়ে দেবো সাংবাদিকতা। এই শুয়োরের বাচ্চা তুই আর রিপোর্ট করবি না সিএসবি নিউজ-এ। লিচু বাগানের রিপোর্ট, বেনজিরের বউয়ের কথা, খায়রুজ্জামান লিটন সাহেবের (জনাব লিটন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য পদ হতে পদত্যাগকারী এবং রাজশাহীর মেয়র, আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা চাঁদাবাজি মামলার বাদী জনাব লোটনের ভাইপো) পারিবারিক ওয়াকফ্ এস্টেট নিয়ে রিপোর্ট করবি না ? হারামজাদা তুই র‌্যাব দেখেছিস, কিন্তু র‌্যাবের কাম দেখিসনি।”
আবার ভাবতে থাকি যে, র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আমাদের জাতীয় নেতার সন্তান জনাব লিটন সাহেবের নাম বলছেন কেন? তাহলে কি র‌্যাব সদস্যরা জনাব লিটনের প্ররোচনাতে আমাকে ধরে এনে আমার ওপর নির্যাতন করছে? কিন্তু আমিতো লিটন সাহেবের কোন ক্ষতি করিনি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রিপোর্ট করেছি। এই রিপোর্ট করতে গিয়ে যদি লিটন সাহেব আহত-মর্মাহতও হয়ে থাকেন তাহলেওতো তিনি আমার ওপর এমন প্রতিহিংসা পরায়ন হতে পারেন না। তবে কি র‌্যাবের এই মেজর লিটন সাহেবের নাম ব্যবহার করে পুরো দোষটি তার (মেয়র সাহেবের) ঘাড়ে ফেলতে চাইছেন? পরবর্তীতে জানতে পারি, আমার বিরুদ্ধে যৌথ ষড়যন্ত্রের অন্যতম রুপকার মাননীয় মেয়র মহোদয় নিজেও।
নির্যাতনের প্রেক্ষিতে আমি মেজর রাশীদকে বলি, আপনি রাষ্ট্রের একজন কর্মচারী। আপনি আপনার দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে যাচ্ছেন। আপনি কিভাবে একজন নাগরিকের সাথে এমন অসভ্য আচরণ করছেন? রাষ্ট্র, সংবিধানতো আপনাকে কোন ব্যক্তিকে নির্যাতন করার অধিকার দেয়নি। এক পর্যায়ে তিনি (মেজর রাশীদ) আমার বাম গালে থাপ্পড় মারলে আমার ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরোতে থাকে। কিছুক্ষণ পর তিনি আমার বাম হিপে ইলেকট্রিক শক দেন। ওটা যে ইলেকট্রিক শক তা আমার জানা ছিল না। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে এই ইলেকট্রিক শক বিষয়ে জানতে পারি। নির্যাতন চাললানোর সময় এক পর্যায়ে মেজর রাশীদ আমার বাম হিপে একটা বলের ন্যায় বস্তু দিয়ে দ্রুতগতিতে একাধিকবার আঘাত করেন। এটাই ইলেকট্রিক শক। এই শক যখন দিচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল যেন আমার গোটা শরীরে আগুন ধরেছে। ইলেকট্রিক শক দেয়ার পর আমার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তখন অনুমান সকাল সাড়ে ১০টা। এসময় আমার হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হয়। আমাকে বসানো হয় ইলেকট্রিক চেয়ারে। এর প্রায় আধাঘন্টা পর টর্চার সেলের ফ্লোরে শুইয়ে দেয়া হয়। এরপর দুই মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ ও হুমায়ুন কবির একযোগে আমার ওপর হামলে পড়েন। এসময় আমার মনে হচ্ছিল, যেন এই দুই সেনা কর্মকর্তা তাদের ব্যক্তিগত জিঘাংসা মিটাতেই আমাকে নির্যাতন করছেন। আমার শরীরে লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকেন মেজর রাশীদ ও হুমায়ুন কবির। একই সঙ্গে বুটের লাথি ও কিল-ঘুসি চলে সমানতালে।
প্রায় এক ঘন্টা ধরে আমাদের অহংকার সেনাবাহিনীর দুই সদস্য আমার ওপর নির্যাতন চালান। তারা উভয়ে একটা মোটা বাঁশের লাঠি (গোলাকৃতির) দিয়ে আমার দুই পায়ের তালুতে বেধড়ক পিটিয়েছেন। নির্যাতন চালানোর সময় সেনা কর্মকর্তাদের উভয়ই ছিলেন উল্লসিত। এক পর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার জ্ঞান ফিরলে আমি বুঝতে পারি যে, একটি পরিত্যক্ত রান্না ঘরে আমি খড়ের ওপর পড়ে আছি। যেখানে পোকা-মাকড় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাকে ওরা গরু-ছাগলের ন্যায় আমার চোখ-মুখ ও হাত বেঁধে ফেলে রাখে সেই ঘরের মধ্যে। দুপুর অনুমান দেড়টার দিকে আমাকে উঠে দাঁড়াতে বললো র‌্যাবের দুই সদস্য। কিন্তু নির্যাতনের ফলে আমি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না। এসময় ‘অভিনয় করছে শালা’ এই মন্তব্য করে মেজর রাশীদ আমার দু’পায়ের উপরে তার পায়ের বুট দিয়ে খিচতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাটার মার হয়নি। শালা অভিনয় করছে। কুত্তার বাচ্চা উঠে দাঁড়িয়ে নিজে নিজে হাঁট। নইলে আরও মারবো। শালা তোকে ক্রসফায়ার দিলে ঠিক হবি।’ আমি বলি যে, আমি কোন অভিনয় করছি না প্রকৃতপক্ষে আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে এবং হাঁটতে পারছি না। কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস করতে নারাজ মেজর রাশীদ। মেজর রাশীদ বলছেন যে, তুই যতক্ষণ হাঁটতে পারবি না ততক্ষণ মারতে থাকবো। এরপর আমি কষ্ট করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ানোর ও হাঁটার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।
মেজর রাশীদ তার বুট পরা পা দিয়ে আমার দু’পায়ে পায়ে খিচতে খিচতে আমাকে একটি রুমে নিয়ে যান। বেলা অনুমান দু’টায় আমার মাথা থেকে কালো কাপড়ের টুপি সরিয়ে চোখ থেকে গামছা খুলে দেয়া হয়। মনে হলো আমি যেন কবরের অন্ধকার থেকে আলোতে এলাম। শান্তিমত শ্বাস-প্রশ্বাস নিলাম। র‌্যাব সদস্যরা একটি ফরমে আমার দুই হাত ও দুই হাতের সব আঙুলের ছাপ নিল। আমার বুকে আমার নাম লিখে তা সেঁটে দেয়া হলো। এরপর ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়। ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি তোলার মহড়া শেষে পুনরায় গামছা দিয়ে আমার চোখ বেঁধে আমার মাথায় কালো কাপড়ের টুপি পরিয়ে দেয়া হলো।
আমাকে উঠানো হলো একটি মাইক্রোতে। বেলা আনুমানিক তিনটায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় বোয়ালিয়া মডেল থানায়। র‌্যাব আওয়ামী লীগ নেতা জনাব লোটনের করা চাঁদাবাজি মামলায় আমাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দিতে চেয়েছিল বোয়ারিযা মডেল থানার মাধ্যমে। কিন্তু বোয়ালিয়া থানার পুলিশ র‌্যাবকে জানায় যে, এই মামলা সে (আকাশ) জামিনে আছে তাকে গ্রহণ করা যাবে না। থানায় নেয়ার সময় র‌্যাব সদস্যরা আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘থানায় গিয়ে পুলিশের সামনে সোজা হয়ে হাঁটবি। নইলে তোকে আবার ফিরিয়ে আনবো এবং ক্রসফায়ার-এ মারবো। পুলিশ জিজ্ঞাসা করলে বলবি আমাকে মারধোর করা হয়নি।’ মনে মনে ভাবি আমাকে মেরে ফেললেও কখনও আমি মিথ্যার আশ্রয় নেবো না। কিন্তু পরক্ষণেই আমার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে আমাদের সন্তান ফিমান ফারনাদের মুখখানি। মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে সন্তানের কথা ভেবে। দুই চোখ গড়িয়ে ঝরতে লাগলো পানি। চোখের জলে ভিজে গেল সেই ফাঁসির আসামিকে পরানোর কালো টুপির অংশ বিশেষ। আওয়ামী লীগ নেতার মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিনে থাকার কারণে থানার পুলিশ আমাকে গ্রহণ করতে অসম্মতি জানালে থানা থেকে র‌্যাব কার্যালয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসে র‌্যাব। এরপর র‌্যাব সদস্যরা বলাবলি করছে যে, আমাকে বাগমারায় নেয়া হবে সেখানে আমাকে একটি অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া হবে। আরও শুনি যে, আমার নামে পুঠিয়াতে আরও একটি চাঁদাবাজির মামলা করানো হয়েছে, সেখানেও নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিকেল অনুমান পাঁচটার দিকে র‌্যাব আমাকে বোয়ালিয়া মডেল থানায় ৫৪ ধারায় হস্তান্তর করে। এরপর আমার মাথার টুপি সরিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হয়।
আমাকে থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব সদস্যরা থানা কম্পাউন্ড অতিক্রম করার পরপরই আমাকে বোয়ালিয়া মডেল থানা হাজতে নেয়া হলো। হাজতখানার ভেতরে বিড়ি-সিগারেটের মোথা, থু-থু, কফ, কলার ছালসহ নানান অস্বাস্থ্যকর দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ। এই পরিবেশে আমার বমি বমি ভাব হতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই থানার এসআই নূরুজ্জ্মান আসলেন আমার পাশে। তিনি রাজশাহীর বর্তমান মেয়র জনাব লিটনের চাচা ও আওয়ামী লীগ নেতা জনাব লোটনের করা মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা। পুলিশের এই সদস্য আমার পূর্ব পরিচিত। আমি যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র এবং জিয়াউর রহমান হলে থাকি তখন তিনিও (নূরুজ্জামান) রাবিতে পড়ালেখা করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছাত্রদলের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার আরও একটি পরিচয় আছে। তা হলো এই নূরুজ্জামান রাজশাহীর সাবেক ছাত্রদল নেতা শাহীন শওকত এর ভাইপো। আমার ধারণা করতে আর বাকি রইল না যে, তিনি পুলিশের চাকরীতে কিভাবে এসেছেন। সে যাহোক, এসআই নরুজ্জামান আমাকে অশোভন ভাষায় গালমন্দ করতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘শালা তুই আওয়ামী-ঘাদানিক, হাসিনা লীগ করিস। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে তুই ছাত্রদল আর শিবিরের বিরুদ্ধে মিথ্যা খবর লিখেছিস। এইবার আমি তোকে রিমান্ডে নিয়ে আবার মারবো।’
বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ ২৪ অক্টোবর, ২০০৭ এর সন্ধ্যায় আমাকে জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা ২০০৭ এর ১৬ (২) ধারায় রাজশাহীর মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চালান দেয়। এসআই নূরুজ্জআমান পুলিশ পিকআপ এর সাইরেন বাজাতে বাজাতে আমাকে আদালত চত্বরে নিয়ে গেলেন। উদ্দেশ্য বোধহয় এই যে ‘এতবড় এবকজন দাগী অপরাধী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী’ কে গোটা রাজশাহী শহরের মানুষ (বোয়ালিয়া থানা হতে কোর্ট যাবার পথে) কে দেখানো! আমাকে যখন আদালতে নেয়া হয় তখন আদালতে কোন ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন না। আমাকে পুলিশ ভ্যান থেকে দুইজন পুলিশ ধরে নামালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হলো।
কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতালের ইমার্জেন্সী ও সার্জিক্যাল ওয়ার্ড-৪ এ ভর্তি করে। পরদিন অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর, ২০০৭ খুব সকালে আমাকে দুইজন বন্দী দুই পাশে ধরে নিয়ে এলেন কেস টেবিলের (কারা বিচারাচালয়) সামনে। সেখানে আমার শরীরের বস্থা অবলোকন এবং আমার কাছ থেকে নির্যাতনের কাহিনী শোনার পরও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আমাকে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখার নির্দেশ দিলেন। আমাকে নেয়া হলো আমদানি ওয়ার্ড (একজন মানুষ প্রথম জেলে আসার পর এই ওয়ার্ডেই তাকে নেয়া হয়) এ।
আমদানি ওয়ার্ডের বন্দিরা আমার শারীরীক অবস্থা দেখে আমাকে কারা হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য কারা সুবেদারকে অনুরোধ করেন। এরপর কারা সুবেদার আমাকে কারা হাসপাতালে স্থানান্তর করে দেন। কারা হাসপাতালে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত আমি চিকিৎসা গ্রহণ করি। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে সুস্থ্য হয়ে ওঠার আগেই কারা হাসপাতালের সার্জনকে ঘুষ না দেযার কারণে আমার ফাইল কেটে দেন (সুস্থ্য বলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া)। এরপর আমাকে সিভিল ৬ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই ২৮ দিনের অন্ধকার কারা জীবনের বাকি দিনগুলো কেটেছে আমার।
পুলিশ প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৮ নভেম্বর আমি জরুরি ক্ষমতা বিধিমালার ১৬ (২) ধারা হতে অব্যাহতি পাই। ওইদিনই আমাকে (গ্রেফতারের মাত্র চার ঘন্টা আগে দায়ের করা) দ্বিতীয় চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিসকেস দায়ের করার মধ্য দিয়ে আমি ২০০৭ সালের ১৮ নভেম্বর এই মামলা থেকে জামিন লাভ করি। এরই প্রেক্ষিতে গত ২৪ অক্টোবর, ২০০৭ থেকে ১৯ নভেম্বর, ২০০৭ পর্যন্ত রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকার পর গত ১৯ নভেম্বর, ২০০৭ রাত আটটায় কারাগার থেকে মুক্তি পাই। মুক্তি পাবার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমার কাছে খবর আসে যে, আমাকে র‌্যাব আবার গ্রেফতার করবে এবং এবার ‘ক্রসফায়ার’ এ হত্যা করবে। এমন এক চরম হুমকির মুখে পরিবারের সদস্যদেরকে উদ্বিগ-উৎকণ্ঠা আর আতংকের মধ্যে রেখে আমি রাজশাহী ছেড়ে পালিয়ে আসি ঢাকায়। এরপর আমি বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ফর ট্রমা ভিক্টিমস এ ভর্তি হয়ে আমি মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসার গ্রহণ করি। আমার জীবনের এই অনাকাঙ্খিত ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ, বোমা-গ্রেনেড হামলা নিয়ে চারটি বই লিখেছি। এগুলো হলো অন্ধকারে ১৫ ঘন্টা, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং প্রতিহিংসা, জঙ্গি গডফাদার এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ এবং উদীচী থেকে পিলখানা। সংখ্যালঘু নির্যাতন ও রাজনীতি এবং স্ট্র্যাগলিং ফর পিচ নামে আরও দু’টি বই প্রকাশের অপেক্ষায়। এখনও আমি র‌্যাব, র‌্যাবের গাড়ি দেখলে আঁতকে উঠি। আমার প্রতিটি মুহুর্ত কাটছে আতংকের মধ্য দিয়ে। অব্যাহত আছে হত্যার হুমকি। ষড়যন্ত্রকারী-প্রভাবশালী চক্র ও জঙ্গিরা আমাকে হত্যার হুমকি দিয়েই যাচ্ছে। দুঃসহ যন্ত্রণা আর কষ্টের স্মৃতিগুলো এখনও আমাকে তাড়া করে ফেরে। শারীরিক, মানসিক, আর্থিক এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আমি বলতে গেলে একবারেই পঙ্গু এখন। আমার এই অবস্থার জন্য অবশ্যই রাষ্ট্র্ই দায়ি। অব্যাহত হুমকি ও আতংকের মুখে স¤প্রতি আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।
আমার কী দুর্ভাগ্য দেখুন, শুধু আমার কর্মকান্ডের (রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নির্যাতন, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ আর দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী খবর পরিবেশন) কারণে আমার শ্বশুরকে বিগত ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেলেন না। শুধু কী তাই, তিনি যাতে স্বতস্ত্রভাবে নির্বাচন করতে না পারেন তার পথটিও বন্ধ করা হয়েছিল। একজন কোটিপতি ব্যবসায়িকে নমিনেশন দিলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনে নামেন এবং আন্দোলনের মুখে তাঁকে নমিনেশন দেয়া হয়। কিন্তু ওটা যে ছিল একটা কৌশল তা বোষা যায় তাঁকে চূড়ান্ত নমিনেশন না দেবার মধ্য দিয়ে। অথচ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে রাজশাহী জেলা শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক বিগত ৪২ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রগণ করে আসছেন। তিনি তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক এবং খুলনা জেলা আওয়ামী লীগ নেতা হারুনর অর রশিদ বহুল আলোচিত মাগুড়ার উপনির্বাচনে কারচুপি জালিয়াতির প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন এবং রাজনৈতিক মামলায় হয়রাণির শিকার হন। আমার শ্বশুরই রাজশাহীতে প্রথম জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। একারণে তাঁকে এবং তাঁরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওয়ার্কাস পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাসহ রাজশাহীর চারজন সাংবাদিককে বাংলা ভাই ও তার বাহিনী প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু লোভনীয় অফার পেলেও কখনও আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাননি অন্য কোন দলে। যদিও যারা ফেরদৌস আহম্মেদ কোরেশীর সঙ্গে এবং ডিজিফআইয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সংস্কারপন্থি হবার পরও রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের নমিনেশন পেয়েছেন এমন নজির আছে। শোনা যাচ্ছে, র‌্যাব, ডিজিএফআই, আর্মি এবং রাজশাহীর মাননীয় মেয়র মহোদয়ের চাপেই নাকি আমার শ্বশুরকে নমিনেশন দেয়া হয়নি। আমরা জানি না এটা সত্য কিনা। কিন্তু যদি সত্য হয় তবে এটা রাজনীতির জন্য শুভ নয়। যা ভবিষ্যতে আরও পরিস্কার হবে বলে আমার বিশ্বাস।
যাহোক, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকার মানবাধিকার সংরক্ষণের জন্য জনগণের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই আমাদের প্রত্যাশা নতুন এই সরকার বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করবে। দেশের মানুষ আরও প্রত্যাশা করে, অতীতে র‌্যাবের হাতে সংঘটিত বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডগুলোর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে এই সরকার। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার সরকারের কাছে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে অবিলম্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন, জেলহত্যা মামলার পুন:বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকর এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডহ সকল হত্যা-নির্যাতন বন্ধ এবং এর সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। ৬.৭.২০০৯
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুলাই, ২০০৯ রাত ৩:০৩
১৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৩১

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×