
লিখতে গিয়ে হঠাৎ হাত ফসকে কলমটা পড়ে গেলো।
একটা বয়সে এসব ছোটখাট জিনিস মেঝে থেকে কুড়িয়ে নেয়া কত সহজই না ছিলো। আয়েশ করে একটু ঝোঁকো, কুড়োও আর উঠে দাঁড়াও। ব্যস, হয়ে গেলো।
আর এখন এই হুইল চেয়ারে বসে এই সামান্য কাজটাই কি অসীম পরিমাণ কঠিন মনে হয়। বয়স... এই বয়সটাই যত নষ্টের গোড়া।
খুব কি ক্ষতি হয়ে যেত বয়স না হলে?
জানালার বাইরে নিঝঝুম দুপুর। কয়েকটা স্কুলের বাচ্চা ভীড় করে আছে একটা আইসক্রীমের ভ্যানের সামনে।
আচ্ছা বাবলু কি আছে ওদের মধ্যে?
ছেলেটা আইসক্রীম খেতে খুব ভালোবাসে। আইসক্রীম পেলে তার আর আশেপাশের কিচ্ছু খেয়াল থাকে না।
কত বেলা হলো? এতক্ষণে তো বাবলুর ফিরে আসার কথা। খুব চঞ্চল হয়েছে আজকাল। আগে কেমন যেন গোমড়া হয়ে থাকতো সবসময়। আর এখন বাসায় ফিরেই ছুটে এসে স্কুলব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে--- “দাদু! দাদু!” তারপর সোজা দাদুর বিছানায় দে ঝাঁপ। কতবার বলা হয়েছে, দাদু অসুস্থ, দাদুর এখন বিশ্রাম দরকার, দাদুর বিছানায় ঝাঁপাঝাঁপি কোরো না, তোমারও অসুখ করবে... কে শোনে কার কথা!
বিছানায় উঠেই হামলে পড়ে-- "দাদু, দ্যাখো আমি আজ কি সুন্দর একটা ছবি এঁকেছি!" শুধু একটা ছবির খাতা বার করতে গিয়ে পুরো ব্যাগটাই ওলটপালট করে। কিংবা দাদুর চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে নিজের চোখে লাগিয়ে হিহিহি করে হেসে গড়াগড়ি যায়। তারপর টিফিনবক্স খুলে কিছু একটা খাবার বার করে সাধাসাধি করতে থাকে, "খাও দাদু! খাও না একটু প্লিজ!" কিংবা ছোট ছোট দু’হাতে একটা বালিশ আঁকড়ে ধরে এগিয়ে আসে "দাদু আসো আমরা বালিশ দিয়ে মারামারি খেলি। এই নাও তুমি একটা, এবার আমার বালিশটাকে মারো। আমিও তোমারটাকে মারি।"... ... ...
অবোধ শিশুটিকে বোঝানো যায় না যে দাদুর শরীরে আর বালিশ নিয়ে খেলার সেই সক্ষমতা নেই।
তবু, করুক ঝাঁপাঝাঁপি। করুক দুষ্টুমি পাগলামি। খুব ভালো লাগে বাবলুর সঙ্গে কাটানো সময়টুকু। ছোট্ট আদুরে নিষ্পাপ একটি অস্তিত্বের সাথে মিশে যেতে কে না চায়? এটাই তো ভালো। নিজের শৈশবের কাছাকাছি চলে যাওয়া যায় কিছু সময়ের জন্য।
মৃত্যুচিন্তা ভুলে থাকা যায় কিছুক্ষণের জন্য।
কেউ কি একটু কলমটা তুলে দিয়ে যাবে না? একলা এক ঘরে নিঃসঙ্গ সময় কাটতে চায় না। এই এক কলম আর একটা নোটবুকই তো সম্বল। বসে বসে পুরনো কিছু স্মৃতি টুকে রাখা, আপনমনে। সকালে চাকরটা খবরের কাগজ দিয়ে গেলে সেটা নিয়ে অনেকটা সময় কাটে। তারপর হয়তো ক্রসওয়ার্ড পাজল খেলা হয় কিছুক্ষণ। পড়ার মত তেমন কিছু থাকে না কাগজে, তবু, সময় তো কাটাতে হবে।
এককালে সময়ের বড় অভাব ছিলো। জীবনের সকল আয়োজন একসঙ্গে ছিলো তাই সময় ছিলো না। দমবন্ধ হাঁফ ধরে যাওয়া জীবনে আর সব ছিলো শুধু সময় ছিলো না। অসময় ছিলো তাই সময় ছিলো না।
এখন শুধু অখন্ড অবসর। সময় যেন বিশাল এক করাল থাবা বাড়িয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চোখের সামনে। চলন্ত ঘড়ির কাঁটা, কার্নিশে বসে গান গাওয়া নাম না জানা একরত্তি একটা পাখি, কিংবা পথের ধারের আইসক্রীমওয়ালা, কেউ পারে না সময়ের দৈর্ঘ্য কমাতে। সময়ের নিষ্ঠুরতার কাছে সব অসহায়।
এই তো জীবন। একটা সময় যেটা হীরের মত মূল্যবান, অন্য একটা সময় সেটাই জলের দরে বিকোয়।
সময় কাটানোর জন্য ছেলে-বৌমা একটা টিভি দিয়ে গেছে এ ঘরে। আসলে ওদেরও ঐ একই সঙ্কট। অসুস্থ বৃদ্ধ বাবার জন্য তারা খবরের কাগজ দিতে পারে, টিভি দিতে পারে, প্রয়োজনে কিছু সেবাও দিতে পারে কিন্তু সময় দিতে পারে না।
স্ক্রীনের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ খুব তীব্র একধরনের রাগ হতে থাকে।
টিভিতে সমুদ্রের ধারে অল্পবয়সী কিছু ছেলেমেয়ের উদ্দাম নৃত্য দেখাচ্ছে। হ্যাঁ, অনেক প্রাণপ্রাচুর্য ওদের। ফুসফুস ভরা অক্সিজেন, শরীরে অঢেল শক্তি, মুখে পৌষ-সকালের রৌদ্রের মত ঝকঝকে হাসি... তবু ওরা এত বোকা কেন? কেন ওরা বোঝে না যে সময় খুব প্রবঞ্চক, এখন তাদের সবটুকু সময় বরাদ্দ শুধু হাসি আনন্দ খেলা আর গানের জন্য, একটা সময় আসবে যখন শুধু সময় থাকবে কিন্তু আর কিচ্ছু থাকবে না, চাইলেও সেই সময়টুকু আর ব্যবহার করা যাবে না! চতুর্দিক ঘিরে থাকবে শুধু প্রগাঢ় নিঃসঙ্গতা। এখন আশেপাশে কত আত্মীয় কত বন্ধু কত প্রিয়মুখ, তখন কেউ আর ফিরেও তাকাবে না। কি লাভ... কি লাভ এখন এত ফুর্তি করে যখন জানাই আছে শেষের সময়টুকু এত ভয়াবহ!
আচ্ছা, চকলেট খেলনা ঝালমুড়ি লেস ফিতে--- কতকিছুই তো ফেরি করা যায়, সময় ফেরি করা যায় না কেন? আহা, একটু যদি সময় ফেরি করা যেত, তাহলে কতই না সহজ হতো সবকিছু। বিক্রি করতে হতো না, অমনিই বিনে পয়সায় দিয়ে দেয়া যেতো সবটা সময়। অনেকটা বিনিময়প্রথার মত! ধরা যাক, কারও অনেক সময় আছে আবার কারও একটুও নেই, তারা পরষ্পর সময় বিনিময় করতে পারতো। বয়সের ভারে নুব্জ্য একাকী অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধারা তাদের উদ্বৃত্ত সময়টুকু নির্দ্বিধায় দিয়ে দিতো ব্যস্তসমস্ত উচ্চাভিলাষী ব্যবসায়ীদেরকে। ব্যবসায়ীরও শান্তি হতো, বৃদ্ধও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচতো।
সময় নামের বোঝাটাকে এভাবে বয়ে বেড়াতে হতো না তাহলে।
কিন্তু কখনও হয় না এমন।
হয় না, কারণ সময়গুলো বড্ড বেশি অসময়ে আসে।
................
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ৮:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


