
সূর্যের আলো জিনিসটা বরাবরই খুব ভালো লাগে। অনেক ছোটবেলা থেকেই। একটা সময় ছিলো যখন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আকাশে সূর্য দেখতে না পেলে মনটাই খারাপ হয়ে যেতো। স্কুলে যেতে ইচ্ছে করতো না। মেঘলা আকাশ একটুও ভালো লাগতো না। বৃষ্টিও না। বাবা বৃষ্টি দেখতে খুব ভালোবাসতেন, বৃষ্টি হলেই খুব আগ্রহ নিয়ে বৃষ্টি দেখতেন আর আমাকেও দেখতে বলতেন। আমি ভাবতাম ধুর, আকাশ থেকে পানি পড়ছে এটা আবার এত শখ করে দেখার কি আছে!
বৃষ্টি জিনিসটা যে আসলেই খুব স্বর্গীয় একটা জিনিস এটা বুঝতে আমার দীর্ঘ সময় লেগেছে। বৃষ্টির সৌন্দর্য আমার চোখে পড়ছে সাকুল্যে হয়তো বছর দশেক হবে, তার আগে বৃষ্টি নিয়ে আমার মনে হয় না কোনো পাগলামি ছিলো। কিংবা হয়তো ছিলো কিন্তু আমি নিজেই সেটা বুঝতে পারতাম না। তখন শুধু রাতের বৃষ্টি ভালো লাগতো, রাতের বৃষ্টির মধ্যে আমি অদ্ভুত একটা রহস্যময়তা খুঁজে পেতাম। আমার সব ভালোলাগা ছিলো ঝকঝকে নীল আকাশ আর রোদের আলোর প্রতি। সেই কুটিকাল থেকেই দু'টো কুসংস্কার (নিজের তৈরী শখের কুসংস্কার আর কি!) মাথায় ঘুরতো, তার মধ্যে একটা হচ্ছে এরকম যে, আকাশ মেঘলা হয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় দোষী হলো মেঘগুলো, এবং শুধু তাই নয় এদের মধ্যে খুবই 'আঁতাত' আছে! অর্থাৎ মেঘগুলো যদি চায় তাহলে নিজেরা নিজেরা ষড়যন্ত্র করে পুরো আকাশটা ঢেকে ফেলতে পারে। কাজেই আকাশ যদি রোদেলা রাখতে হয় তাহলে আকাশে এক টুকরোও মেঘ থাকা যাবে না, যদি আকাশে এক টুকরো মেঘ থাকে তাহলে ঐ মেঘটা গিয়ে আরও অন্য অনেকগুলো মেঘকে ডেকে নিয়ে আসবে, তারপর ওরা সবাই মিলে পুরো আকাশটা অন্ধকার করে ফেলবে!
২য় শখের কুসংস্কারটা ছিলো আরও অদ্ভুত। সেটা হলো, রোদকে আকাশে ধরে রাখতে হলে তার কদর করা চাই, কদর না করলে সে চলে যায়। কিরকম? তা হলো, আকাশে রোদ থাকা অবস্থায় ঘরের দরজা জানালা খুলে রাখতে হবে, ঘরের ভেতর যাতে রোদের আলোটা ঢুকতে পারে। কোনও অবস্থাতেই দিনের বেলায় কৃত্রিম আলো জ্বালানো যাবে না। অর্থাৎ আমি যদি দিনে দুপুরে ঘরের পর্দা টেনে দিয়ে ইলেক্ট্রিক বাতি জ্বালাই, তাহলে কিন্তু রোদ চলে যাবে আর আকাশে অনেক মেঘ করবে। ছোটবেলায় কেন যেন এই ব্যাপারটা আমার খুব চোখে পড়তো, তাই বিশ্বাসটাও দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো এরকম।
ছোট্ট দুষ্টু শিশুদের মাথায় কতই না অদ্ভুত চিন্তাধারা বাস করে, তাই না?
একটু বড় হবার পর সর্বপ্রথম যে ঋতুর সৌন্দর্যটা আমার চোখে পড়ে তা হলো বসন্ত। একটু বিকেল হলেই, রোদের রংটা একটু মরে এলেই যে অদ্ভুত শিহরণ ধরানো বাতাসটা বয় সেটার আসলেই কোনও তুলনা হয় না। অবশ্য এই বাতাসটা মোটামুটি সারাদিন ধরেই পাওয়া যায়, আর ভালোলাগার অনেক বড় একটা কারণ হলো এই সময় (শেষের দিকটা অর্থাৎ চৈত্র মাস বাদ দিলে) তেমন গরম থাকে না, আবহাওয়াটা খুব আরামদায়ক থাকে, আর বাতাসটাও শীতের মত হাড়কাঁপানো থাকে না। সত্যিকারের বসন্ত অনুভব করার পর, সত্যিকারভাবে ১৮ বছর বয়সের বসন্তে কারো প্রেমে পড়ার পর আমি ফিল করেছিলাম কবি কেন লিখেছিলেন, "প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস, তোমার চোখে দেখেছিলেম..." থাক, বাকিটা আর না বলি, সবাই তো জানেনই।
অনেক বছর ধরে অনেক জ্ঞানগর্ভ (!) চিন্তাভাবনা করে আমি দেখেছি যে, আমাদের দেশে যে ৬টি ঋতু আছে তার মধ্যে খুব প্রবলভাবে আমাদের কাছে আসে তিনজন (গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত), আর বাকি তিনজন এত প্রবল নয়, অনেক মৃদু কিন্তু চাইলেই, একটু হাত বাড়িয়ে দিলেই তারা সানন্দে ধরা দেয়... আসলে কিন্তু এরাই সবচেয়ে সুন্দর। শরতের সোনারঙা রোদ আর ঝঝকে আকাশ আর তার সাথে মাঝেমাঝে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি-বাতাস, হেমন্তের হিম হিম ঘ্রাণ আর আর অল্প অল্প শীতের আমেজ (সত্যিকারের হেমন্তের রঙ রূপ রস গন্ধ পেতে গেলে গ্রামে যেতে হবে) আর বসন্তের মাতাল বাতাস, এগুলোর স্বাদ সত্যিই অন্যরকম। গ্রীষ্মকালটায় যদিও অনেক মজার মজার ফল খেতে পাওয়া যায়, কিন্তু গরমের ভোগান্তিটা খুবই কষ্টের। বর্ষাকালটা অসম্ভব সুন্দর কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শহুরে জীবনে এর আনন্দটা সেই মাত্রায় উপভোগ করা অনেক কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। বাকী থাকলো শীত। এই সময়টা আমাদের দেশে আসলেই অনেক সুন্দর কিন্তু আমি নিজে চরম শীতকাতুরে (একই সাথে গরমকাতুরেও) বলে কখনোই শীতকালটা উপভোগ করতে পারি না, মাঝখান থেকে হাত পা ঠোঁটের চামড়া ফেটে ফুটে একেবারে কাঁদতে বসার জোগাড় হয়।
শীতে চরম কষ্টে পড়লেও প্রতিবারই বোধহয় একটু একটু শীতের অপেক্ষায় থাকি, যদিও তা থাকা উচিত নয় কারণ শীত আমাদের জন্য আশীর্বাদ হলেও বস্ত্রহীন হতদরিদ্র মানুষগুলোর জন্য চরমভাবে অভিশাপ। এবার বর্ষাকালটা খুব অদ্ভুত গেলো, গোটা আষাঢ় শ্রাবণ মাস জুড়ে কোনও বৃষ্টি নেই আর শরৎ শুরু হওয়ামাত্র প্রতিদিন বৃষ্টি। এই পোস্ট লিখতে লিখতেই কিন্তু মুষলাধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মধ্যরাতের বৃষ্টি। আমার ছোট্টবেলার ভালোলাগা।
***************************************
পোস্টের দ্বিতীয় ছবিটি রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার তোলা, ওর ফেসবুক অ্যালবাম থেকে নেয়া। তাড়াহুড়োর কারণে অনুমতি নিতে পারিনি। রক্তিম কৃষ্ণচূড়া আপত্তি জানানোমাত্র ছবিটি মুছে ফেলা হবে (যেহেতু রক্তিম আপত্তি করেনি কাজেই এযাত্রা ছবিটি প্রাণে বেঁচে গেলো)।
অনেক চেষ্টা করেও পোস্টের শিরোনামের সাথে কন্টেন্টের মিল রাখতে ব্যর্থ হলাম। আফসুস!
এরকম পোস্টে গান দেয়ার লোভ সামলানো বড় কঠিন ব্যাপার। খুব পরিচিত গান, কিন্তু মনে হলো দিয়েই দিই, কি আছে জীবনে!
কেউ বলে ফাল্গুন কেউ বলে পলাশের মাস
চলো বৃষ্টিতে ভিজি
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০১০ সকাল ১০:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


