বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চতুর্থ সেমিস্টার একবার 'ড্রপ' দিয়েছেন রিক্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো বন্ধুদের অনেকেই তাঁকে এড়িয়ে চলেন। জুটেছে নতুন নতুন বন্ধু। এর পরই জানা যায় রিক্তার ইয়াবা আসক্তির কাহিনী। শেষে জোর করেই তাঁকে চিকিৎসা করিয়ে বিয়ে দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
জানা যায়, রিক্তা একা নন, এ রকম আরো অনেক তরুণী ইয়াবার চোরাবালির ফাঁদে পড়ছেন। তাঁদের মধ্যে ছাত্রী ছাড়াও আছেন কথিত মডেল, সংগীতশিল্পীসহ চেনাজানা অনেকেই।
ইয়াবা সেবন করতে গিয়ে একপর্যায়ে ইয়াবা ব্যবসায়ও তাঁদের বাধ্য করা হচ্ছে। গত এক বছরে র্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রায় ১০০ তরুণীকে শুধু ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে।
এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, কয়েক দিন আগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বনানীর একটি ফ্ল্যাটের সন্ধান দেন। ফ্ল্যাটটির মালিক জনৈক আর্সেনাল ও তাঁর ভাই আশিক। তাঁরা সাবেক এক সচিবের সন্তান। তরুণীটি জানান, প্রথমে তিনি গুলশান দুই নম্বরে একটি চায়ের দোকানে বসে বন্ধুদের আড্ডায় ইয়াবা নেন। পরে এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন এবং বনানীর ১৭ নম্বর সড়কের ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে ইয়াবা সেবন করেন। এরই মধ্যে একদিন তাঁকে গুলশানের এক জায়গায় ইয়াবা পেঁৗছে দিতে বলা হয়। রাজি না হওয়ায় দেখানো হয় গোপনে তোলা তরুণীটির অনেক ছবি। তরুণীটি ইয়াবা নিচ্ছেন, কিংবা ইয়াবা গ্রহণ শেষে এলোমেলোভাবে শুয়ে আছেন_এ রকম আরো অনেক ছবি। গুলশানের ওই ফ্ল্যাটে ইয়াবা সেবনকালে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে তাঁর এসব ছবি ধারণ করা হয়েছিল। তরণীটিকে বলা হয়, ইয়াবা পেঁৗছে না দিলে ছবিগুলো তাঁর বাসায় পাঠানো হবে, ছেড়ে দেওয়া হবে ইন্টারনেটে। অভিযোগ পেয়ে র্যাব ফ্ল্যাটটিতে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সত্যতা পায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, তরুণীদের মধ্যে ইয়াবা সেবনকারীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সেবনকারীদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং উঠতি মডেল বা অভিনেত্রী।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মেয়েরা ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। তিনি উদাহরণ টানতে গিয়ে বলেন, কয়েক দিন আগে গুলশানের একটি বারে ইয়াবা সেবনকালে অভিযান চালানো হলে এক সংগীতশিল্পী আটক হন। ওই শিল্পী বেসরকারি একটি টেলিভিশনের সংগীত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সম্প্রতি তারকা খ্যাতি পেয়েছেন। অবশ্য মুচলেকা রেখে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া 'বি' আদ্যক্ষরের এক মডেল ও অভিনেত্রী ব্যাপকভাবে ইয়াবা নিচ্ছেন বলে সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়।
গুলশান এলাকায় মাদক নিরাময় কেন্দ্র 'প্রত্যয়'-এর চেয়ারম্যান নাজমুল হক কালের কণ্ঠকে জানান, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের ব্যবহার বাড়ছে। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে তা 'অ্যালার্মিং' পর্যায়ে চলে গেছে। কেউ কেউ নিরাময়কেন্দ্রগুলোতে মেয়েদের নিয়ে আসছেন। এ ছাড়া অনেক বাবা-মা মাদকাসক্ত মেয়েদের নিয়ে চাপা কষ্টের মধ্যে আছেন। নাজমুল হক বলেন, এটা সামাজিক সমস্যা। ফলে কোনো কষ্ট না লুকিয়ে তা একটি রোগ হিসেবে বিবেচনা করে সন্তানের চিকিৎসা করানো উচিত। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, ইয়াবা সেবনের পর ঘুম কম হয় বলে অনেকে ঘুমানোর জন্য অন্যান্য মাদকদ্রব্যে আসক্ত হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালক ফজলুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, যেসব তরুণী ইয়াবা সেবন করছে, তাদের বেশির ভাগই বেসরকারি নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রী। সাধারণত বন্ধু-বান্ধবের প্ররোচনায় তারা ইয়াবা সেবনে জড়াচ্ছে।
সূত্র মতে, যেসব তরুণী ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত, তাদের অধিকাংশই পারিবারিকভাবে মানে বাবা-মায়ের সঙ্গে ব্যবসা করে। বেশ কিছু রোহিঙ্গা তরুণী আছে। তবে রাজধানীতে তাদের বিচরণ কম। আবার অনেক তরুণী নিজেরা ইয়াবা সেবন না করলেও এর বিক্রির সঙ্গে জড়িত। নিয়মিত বোরখা পরে তারা চলাফেরা করে। গত বছর শান্তিনগর এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয় তাজুল ইসলাম ও তাঁর স্কুলপড়ুয়া ১৪ বছরের মেয়ে তানিয়া। মেয়েকে দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ইয়াবা সরবরাহ করাতেন তাজুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কোনো কোনো তরুণী দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলের কক্ষ বা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে দেহ ব্যবসার অভিযোগ দেশে অনেক পুরনো। কিন্তু সম্প্রতি রাজধানীর বনশ্রী, উত্তরা, মোহাম্মদপুর ও শ্যামলী এলাকার বিভিন্ন ফ্ল্যাটে এমন কিছু যৌনকর্মী পাওয়া যায়, যারা ইয়াবা সেবন করে থাকে এবং খদ্দেরদেরও সেবনে উদ্বুদ্ধ করে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর এফডিসি এলাকায় তিনজন ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাঁদের মধ্যে দুজন পরিচালক, একজন অভিনেতা। তাঁরা কম বাজেটের অশ্লীল ছবি নির্মাণের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ওই অভিনেতা ও একজন পরিচালক বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যৌথ বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন অশ্লীল ছবি নির্মাণের অভিযোগে। তাঁরাই চলচ্চিত্রে নবাগত নায়িকা বা 'এঙ্ট্রা'দের ইয়াবা ব্যবসায় নিয়ে আসেন।
মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরে ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালক কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাপকভাবে ইয়াবা ছড়ানোর কারণ হচ্ছে অন্য নেশাদ্রব্য বিশেষ করে ফেনসিডিলের দাম বেড়ে যাওয়া। এ ছাড়া ফেনসিডিল এখন সহজে পাওয়াও যায় না।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়ার উপপরিচালক মেজর শাখাওয়াত জানান, এর আগে র্যাব ইয়াবার বড় বড় ডিলার গ্রেপ্তার করেছে। ওই সময় ইয়াবাবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের ব্যাপক চিত্র পাওয়া গিয়েছিল। ইয়াবা সেবনের মাধ্যমে অনেক তরুণী যে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়, তারও ভয়ানক কিছু চিত্র তখন পাওয়া যায় । কালের কন্ঠ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

