কিছুদিন (রমজান মাসে) আগে এক সেলুনে চুল কাটাতে গেলাম। এই সেলুনে এর আগে যাইনি। আমি সাধারণত সেলুনে ঢুকে যে কাজটা আগে করি সেটা হচ্ছে রেট লিস্ট দেখি। সেলুন থেকে বের হয়ে কি করব তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে রেট লিস্ট দেখা ভুলেই গেছি। এবং এর খেসারত সরূপ পরে 'ব্যাম্বু' ঈটিং করতে হয়েছে।
আসি এবার মূল কথায়।
ছেলেটা খুব মনযোগ দিয়ে আস্তে ধীরে চুল কাটছে, আমিও আরাম বোধ করছি এবং অন্য সেলুনের তুলনায় এখানে কমফোর্ট ফিল করছি। পেছনে একটা লোক ছিনতাই বিষয়ক কথা বলছে। সেদিকে মনযোগ দিলাম। আসলে ঐ লোকটাই ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে। সে এই সেলুনেই কাজ করে।
ঘটনা গত রাতের। রাত তখন ১০ টা সাড়ে ১০ টা হবে। এক ভদ্রলোক এসে বলল তার বাসায় যেতে হবে। টাকার জন্য চিন্তা করতে হবে না। ৫০০/১০০০ যা লাগে দিয়ে দিবে। সেলুনের লোকটা (লতিফ) বলল কোথায় যেতে হবে? ভদ্রলোক বললেন ধানমন্ডি। ভদ্রলোক আরো বললেন আমি ট্যাক্সি ক্যাব দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি। কে যাবেন একটু তাড়াতাড়ি করুন। লতিফ ভাবল যাক ইনকামতো খারাপ না। ৫০০/৬০০ এলে খারাপ কি!
কেচি খুর নিয়ে লতিফ বের হল ভদ্রলোকের সাথে। একটু সামনে হেটে ভদ্রলোক হটাৎ থেমে গিয়ে বললেন আরে এখানেইতো ট্যাক্সিটা দাড়িয়ে ছিল, গেল কোথায়!? যাহ! বদমাশ ড্রাইভারটাকে বললাম ১০টা মিনিট দাড়াতে। সে দাড়ালোনা। যাক কি আর করা যাবে! এই বলে একটা রিক্সা নিলেন সিএনজি ধরবেন বলে। লতিফকে বললেন দেখেনতো আশেপাশে কোন সিএনজি দেখা যায় কিনা। সামনে এসেই সিএনজি পেয়ে গেলেন। সিএনজি ওয়ালাকে বললেন ধানমন্ডি যাব কত নেবে? রিপ্লাই এল ২০০। এই কথার ওপর দুজনে সিএনজিতে উঠলেন। দৈনিক বাংলা থেকে প্রেসক্লাবের কাছাকাছি আসার পর লোকটার ফোন বেজে উঠল। তিনি ফোন রিসিভ করলেন। ফোনের ডায়ালগগুলো এরকম (লতিফের বলার ধরন থেকে আমি আমার মত করে লিখলাম) :-
-হ্যাঁ বলো
-.......
-হ্যাঁ নিয়ে আসতেছি, হ্যাঁ আমার সাথেই আছে সেলুনের লোক
-........
-হ্যাঁ তোমরা রেডি থেকো
-......
-রাত হয়েছে এখন কি করব? ঐদিকের কাজ শেষ করতেই আমার দেরি হয়ে গেছে, আর তাছাড়া কালকেইতো তোমাদের ফ্লাইট, আরতো সময় পাবানা চুল কাটানোর।
-.....
-কি? কি বললে? কে অসুস্থ... কি ওষুধ বললে? হ্যালো.... হ্যালো....
এই যাহ! ফোনটাই অফ হয়ে গেল! চার্জ শেষ হওয়ার আর সময় পেলনা! কি করি এখন? দ্যাখেনতো ভাই কি অবস্থা! বাসায় কে অসুস্থ, ওষুধের কথা বলছিল, অথচ ফোনটাই অফ হয়ে গেল!
এক্ষেত্রে যে কেউ হলে বলবে তাহলে ভাই নিন আমার ফোনটা দিয়ে কথা বলুন, আপনার জরুরী দরকার সারুন। লতিফেরও এর ব্যাতিক্রম হয়নি। সেও তাই বলল। তখন ভদ্রলোক বললেন ঠিকাছে তাহলে এক কাজ করুন আমার সিমটা আপনার ফোনে ঢুকান, কেননা নাম্বারটা আমার সিমে সেভ করা তো। স্বাভাবিক ভাবেই লতিফ রাজি হলেন। ভদ্রলোক এবার লতিফের ফোন দিয়ে বাসায় ফোন দিলেন এবং ওষুধের নাম জেনে নিলেন।
[[[[এর মধ্যে আমার চুল কাটা শেষ। ছেলেটা এবার দেখি চুল ফাক করে করে চিরুনী দিয়ে আমার মাথাটা আচড়ে দিচ্ছে আলতো ভাবে। আমি একটু একটু আরাম পাচ্ছি। জিজ্ঞের করলাম এমন করছেন কেন? সে বলল বস আপনার মাথায় খুসকি আছে। সাদা সাদা হয়ে রইছে। হারবাল ক্রিম লাগিয়ে দেই আর কখনো হবেনা। আমি বললাম আমিতো দু তিন দিন পরপরই শ্যাম্পু ইউজ করি। এটা হওয়ার কথা না। সে বলল আপনি দ্যাখেন এই বলে আয়নার দিকে আমার মাথাটা একটু ঘুরিয়ে দেখাল। দেখলাম হ্যাঁ হালকা সাদা কিছু দেখা যাচ্ছে। তারপরও বললাম না থাক লাগবেনা ক্রিম দেয়া। এটা কিছুনা ভালো করে শ্যাম্পু দিলে ঠিক হয়ে যাবে। ছেলেটা বলল বস একবার দিয়ে দ্যাখেন। এটা ইউজ করলে এই সাদা খুসকিগুলোও উঠে যাবে আর চুলে একটা সিল্কি ভাব আসবে। আমি বললাম আমার চুল এমনিতেই সিল্কি, আচ্ছা আজ সময় নেই অন্য দিন দেব, আজ একেবারেই সময় নেই। সে বলল মাত্র ৫ মিনিট লাগবে। একটু বসুন!
যদিও আমি এই ছেলেটার সাথে কথা বলছি কিন্তু আমার মন ওদিকে। তাই এর সাথে বাড়াবাড়ি না করে ওই লোকটার কথায় কান দিলাম।]]]]
প্রেসক্লাব পার হওয়ার সময় ভদ্রলোক সিএনজিওয়ালাকে বললেন ভাই ওষুধ কিনতে হবে। আপনি একটু ঢাকা মেডিকেল হয়ে যান। আমি বাড়তি ভাড়া দিয়ে দিব। সিএনজিওয়ালা যথারীতি ঢাকা মেডিকেল সংলগ্ন ফার্মেসীগুলোর সামনে দাড়ালো। লোকটি সিএনজি থেকে নামার সময় ভদ্রতা করে লতিফকে বলল সেটটা আমার সাথে থাকলে কোন সমস্যা নেই তো?(!!!) লোকটির ভদ্রতার জবাবে লতিফও ভদ্রতা দেখাল, বলল না না ঠিকাছে, আপনি যান ওষুধ নিয়ে আসুন।
লতিফ আর সিএনজিওয়ালা অপেক্ষা করছে...... ভদ্রলোক আসবেন.... তারা ধানমন্ডি যাবে.....
লতিফদের অপেক্ষা বিরক্তিতে রূপ নিচ্ছে কিন্তু ভদ্রলোক আর আসেন না। লতিফের মনে সন্দেহের বালুকনারা জমাট হচ্ছে..... সাধের ফোনটা বুঝি হারালাম!!
অবশেষে সিএনজিওয়ালাকে ১০০ দিয়ে বাসায় ফিরতে হল লতিফকে।
গতরাতে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা সহকর্মীদের কাছে এভাবেই বর্ণনা করছিল লতিফ। (বলার সুবিধার্থে লতিফ নামটা আমিই দিয়েছি, মূলত আমি তার নাম জানি না)
এদিকে আমার চুল কাটা ছেলেটা একের পর এক আইটেম দিয়ে চুল ধুয়ে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে তার কাজ শেষ হল। সবশেষে বোধহয় কন্ডিশনার লাগিয়েছিল। যাহোক জিজ্ঞেস করলাম বিল কত?
বলল ৩৫০/- (তিনশত পঞ্চাশ টাকা)!!!
এ্যাঁ! বলে কি???
বললাম কিভাবে?
বলল-চুল কাটা ৫০, আর হারবাল ৩০০!
অবশেষে রেট লিস্টের দিকে চোখ পড়ল।
চুল কাটা=৫০/-
ফোম সেভ=৪০/-
ফেসিয়াল=১৮০/-
হারবাল=৩০০/- ইত্যাদি ইত্যাদি......
চরম অবাক হয়েও একটুও অবাক না হওয়ার ভান করে ৩৫০ টাকা দিয়ে বের হয়ে এলাম। আসার সময় বলল ঈদের ২/৩ দিন আগে আইসেন, ফেসিয়ালটা করিয়ে দেব।
এতক্ষণ লতিফের জন্য করুনা হলেও তা শেষ। বরং প্রতিক্রিয়া উল্টে দিকে যাচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ৯:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



