somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভারতবর্ষে মুসলমানদের চেপে রাখা ইতিহাস !! - ১০ (ব্রাক্ষণদের অনাচার)

২৮ শে মে, ২০০৯ সকাল ১১:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আসলে আমাদের প্রাচীন ভারতীয় অশুদ্ধ পৌরহিত্য যেমনই উৎকট, আসামাজিক ও অশ্লীল হোক না কেন তার বিরূদ্ধে টুঁ শব্দ করার উপায় ছিল না হয়তো । রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন - " শারদীয় দুর্গাপূজায় বিজয়া দশমীর দিন শাবরোৎসব নামে এক প্রকার নৃত্যগীতের অনুষ্ঠান হইত । শবর জাতির ন্যায় কেবলমাত্র বৃক্ষপত্র পরিধান করিয়া এবং সারা গায়ে কাদা মাখিয়া ঢাকের বাদ্যের সঙ্গে লোকেরা অশ্লীল গান গাহিত এবং তদনুরূপ কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করিত । জীমূতবাহন 'কাল-বিবেক গ্রন্হে' যে ভাষায় এই নৃত্যগীতের বর্ণনা করিয়াছেন বর্তমান কালের রুচি অনুসারে তাহার উল্লেখ বা ইঙ্গিত করাও অসম্ভব । অথচ তিনি-ই লিখিয়াছেন, যে ইহা না করিবে ভগবতী ক্রদ্ধ হইয়া তাহাকে নিদারূণ শাপ দিবেন । বৃহদ্ধর্মপুরাণে কতিপয় অশ্লীল শব্দ সম্ধন্ধে উক্ত হ্ইয়াছে যে ইহা অপরের সম্মুখে উচ্চারণ করা কর্তব্য নহে, কিন্তু আশ্বিন মাসে মহাপূজার দিনে ইহা উচ্চারণ করিবে- তবে মাতা, ভগিনী এবং শক্তিমন্ত্রে অদীক্ষিতা শিষ্যার সম্মুখে নহে । ইহার সপক্ষে এই পুরাণে যে যুক্তি দেওয়া হইয়াছে, শ্লীলতা বজায় রাখিয়া তাহার উল্লেখ করা যায় না ।" [রমেশ চন্দ্র মজুমদারের বাংলাদেশের ইতিহাস, ১৮৯ পৃষ্ঠা]

শ্রী মজুমদার আরো লেখেন - "সে যুগের স্মার্ত পন্ডিতগণ প্রামাণিক গ্রন্হে অকুন্ঠিত চিত্তে লিখিয়াছেন শুদ্রাকে বিবাহ করা অসঙ্গত কিন্তু তাহার সহিত অবৈধ সহবাস করা তাদৃশ নিন্দনীয় নয় । " [পৃষ্ঠা-১৯৩]

তিনি আরো লিখেছেন, "কঠোর জাতিভেদ প্রথা তখন ব্রাক্ষণ ও অন্যান্য জাতির মধ্যে একটি সুদৃঢ় ব্যবধানের সৃষ্টি করিয়াছিল । " [ঐ পৃষ্ঠা-২৩৮]

নিজেদের দোষ ঢাকার জন্য অপরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ভ্রান্তি । ভারতের মুসলিম অন্চলগুলোর মধ্যে কেরালায় আজ এত মুসলমান কেন ? সেখানে অস্ত্র দিয়ে বলপূর্বক ধর্মান্তর ঘটানো হয়েছে - এটা যে নিছক বাজে কথা তা আগের আলোচনায় দেখানো হয়েছে । তবুও কেরালা ও রাজস্হানের সামাজিক আলেখ্য আরো দু একটি নিয়ে আসছি ।

"কেরালার নিম্নবর্ণের প্রতি উচ্চবর্ণের অমানুষিক ব্যবহার অকল্পনীয় । রাজস্হানে এই বর্ণভেদ প্রথা যে বাংলার চাইতে কত সহস্র গুণ ভয়াবহ তা আমার স্বচক্ষে দেখা- সাধারণত নিম্নবর্ণের লোকদের বর্ণ অনুসারে পৃথক পৃথক পোশাক ও গহনা আছে এবং নিম্নবর্ণ লোকের পক্ষে এমন সাজ পোশাক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ যা উচ্চবর্ণের লোকের উপযুক্ত সাজপোশাক - ১৯৭৪ এর ডিসেম্বরে লক্ষ্য করেছি যে, শহরান্চলে কিংবা যোধপুর জেলার অর্ন্তগত বোরুন্দার মতো গ্রামে এসব বিধি বিচার শিথিল হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ১৯৬৫তে ঐসব নিয়ম অনেক কঠোর দেখেছিলাম । ১৯৭২-এর ২৭ নভেঃ আনন্দবাজার পত্রিকাতে ব্রাক্ষণদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য উত্তর প্রদেশের এক হাজার হরিজনের বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের খবর প্রকাশিত হয় , এর কিছুদিন পরে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে উত্তর প্রদেশের বান্দাতে ধনবান ব্রাক্ষণদের সশস্ত্র আক্রমণে গ্রামসুদ্ধ হরিজনরা ঘরবাড়ি ছেড়ে শহরে এসে জেলা সমাহর্তার কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করে - সেই সময় দিল্লি যাওয়ার পথে এলাহাবাদ থেকে যাত্রীদের মুখে শুনি । রাঁচি-চক্রধরপুর রোডে অবস্হিত বাগধাঁওয়ের মিশনারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইকেল ভোদ্রা আমায় বলেছিলেন, তাঁর বাবা একবার উচ্চবর্ণের লোকদের মতো করে হাটুর নিচে ধুতি পরেছিলেন এবং তাঁর ঐ স্পর্ধার জন্য তাঁকে জমিদার বাড়িতে ডেকে প্রচন্ড প্রহার করা হয় এবং তারপরে তিনি খ্রিষ্টান হয়ে যান ।" [পৃষ্ঠা-৯৪-৯৫]

এসব অত্যাচারিত , উপেক্ষিত ও লান্হিত মানুষেরা যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতেন তখন তাঁদের আচার-ব্যবহার পোশাক পরিচ্ছদ এবং নাম পর্যন্ত পাল্টে যেত অর্থাৎ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেত ।

"আগেই বলা হয়েছে যে, নিম্নবর্ণের লোকদের ঊর্ধাঙ্গ অনাবৃত রাখতে হতো । এককালে কেরালাতে অমুকের স্ত্রী বা মেয়ে ইসলাম নিয়েছে বলার দরকারই হতো না, তার বদলে শুধু 'কুপপায়ামিডুক' শব্দটি ব্যবহার করা হতো - যার অর্থ হলো 'গায়ে জামা চড়িয়েছে ' । অপমানসূচক বা হীনতাদ্যোতক এ রকম বহু আচার প্রথা ইসলামের প্রভাবে কেরালায় সমাজ থেকে দূরীভূত হয় । নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ইসলাম গ্রহনের ফলে দাস প্রথাও বহূল পরিমানে নিয়ন্ত্রিত হয় । " [দ্রঃ এ পুস্তকের ১৩০,১৩১ পৃষ্ঠা]

'কুলীন' ব্রাক্ষণ নামে যে গোষ্ঠী সেন আমল হতে শক্তিশালী হয়েছিল তাদের আচার-ব্যবহার জানা থাকলে এ যুগের মানুষের অবাক হওয়ার অবকাশ আছে ।

মূল্যবান উদ্ধৃতি দিয়ে বলা যায় - "কুলীন ব্রাক্ষণ হিসাবও রাখতেন না তাঁরা ক'টি মেয়েকে বিবাহ করছেন । তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য একটি ছোট খাতায় বিয়ের ও বিয়ের পাওয়া যৌতুকের তালিকা লিখে নিজেদের কাছে রেখে দিতেন । পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শ্বশুরালয়ে গেলে শ্বশুররা তাদের কি কি জিনিস দিতেন তারও একটা তালিকা রাখতেন ।" [অধ্যাপক শ্রীবিনয় ঘোষের 'ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১২০ পৃষ্ঠা , ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ছাপা]

ঐতিহাসিক অধ্যাপক শ্রীবিনয় ঘোষ লিখেছেন - "কুলীন জামাতারা যখনই শ্বশুরালয়ে যান তখনই তাদের সম্মানার্থে শ্বশুরকে কিছু অর্থ বা কোন উপহার দিতে হয় । এই প্রথার ফলে বিবাহ বেশ লাভজনক পেশা হয়ে উঠেছে ।

একটি ব্রাক্ষণের যদি ত্রিশটি স্ত্রী থাকে তবে প্রতি মাসে কয়েক দিনের জন্য শ্বশুরালয়ে গিয়ে থাকলেই ভালো খেয়ে ও উপহার পেয়ে এবং জীবিকা অর্জনের কোন চেষ্টা না করে তার সারা বছর কেটে যেতে পারে । বহুবিবাহ প্রথার ফলে কুলীন ব্রাক্ষণেরা এক নিষ্কর্মা, পরাভৃত শ্রেনী হয়ে উঠেছে এবং বিবাহের মতো একটি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে নীতিহীনতার উৎস করে তুলেছে ।"

শ্রী-ঘোষ আরো লিখেছেন, "অতএব কুলীন ব্রাক্ষণের জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন বহুবিবাহ করা । কুলীনরা বৃদ্ধ বয়সেও বিবাহ করে । অনেক সময় স্ত্রীদের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎই হয় না বা অথবা বড়জোর ৩/৪ বছর পরে একবারের জন্য দেখা হয় । এমন কথা শোনা যায় যে একজন কুলীন ব্রাক্ষণ একদিনে ৩/৪ টি বিবাহ করেছেন । কোন কোন সময় একজনের সব কয়টি কন্যার ও অবিবাহিতা ভগিণীদের একই ব্যাক্তির সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হয় । কুলীন কন্যাদের জন্য পাত্র পাওয়ার খুব অসুবিধা থাকায় বহু কুলীন কন্যাকে অবিবাহিত থাকতে হতো । কুলীনদের বহু বিবাহের ফলে - ব্যভিচার, গর্ভপাত, শিশুহত্যা ও বেশ্যাবৃত্তির মতো জঘন্য সব অপরাধ সংঘটিত হয় । ৮০,৭২,৬৫,৬০ ও ৪২টি করে স্ত্রী আছে এমন ব্যাক্তিদের কথা জানা গেছে তাদের ১৮,৩২,৪১,২৫ ও ৩২ টি পুত্র সন্তান ও ২৬,২৭,২৫,১৫,১৬ টি কন্যা সন্তান আছে । বর্ধমান ও হুগলী জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এক এক ব্যাক্তির এতগুলো করে স্ত্রীর অস্তিত্ব জানা গেছে । " [ এই উদ্ধৃতি গুলো 'ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর' পুস্তকের ১১৬ এবং ১১৭ পাতা থেকে নেওয়া হয়েছে ]

কেউ যেন মনে না করেন এসব কাহিনী শুধু আদিম যুগের , বরং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবদ্দশাতেই এসব ঘটনা ঘটেছিল বলে ১৮৬৭ সালে দেশের লেফটেন্যান্ট গভর্ণরকে দরখাস্ত করা হয় যাতে আইন করে বহুবিবাহ তুলে দেওয়া যায় । সেই দরখাস্তে ঐ রকম সব তথ্যের প্রমান ছিল সেই সঙ্গে একথাও লেখা ছিল যে এইসব রীতি নীতি হিন্দুধর্মে লেখা নাই বরং এগুলো মনগড়া আইন ।

[চলবে]

সূত্রঃ চেপে রাখা ইতিহাস, গোলাম আহমদ মোর্তজা , মদীনা পাবলিকেশন্স ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০০৯ সকাল ১১:৪৮
১৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×