বৈচিত্র্যহীন একঘেয়ে জীবন যাপন নিয়ে কম-বেশী অনেকেই কথা বলে থাকি আমরা। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে আবার ঘুমোতে যাওয়ার মাঝখানটা প্রতিদিন প্রায় একই ছকে, একই নিয়মে চলতে থাকে। শুধু ক্ষেত্রটি আলাদা যার যার মতন। কারো কারো ক্ষেত্রে যে এর ব্যাতিক্রম নেই তা বলছি না। তবুও .......!
ক'দিন আগের এক সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে একটু বৈচিত্র্যতা পেতে আমরা বাইরে বেরুবো ঠিক করি। পরের দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন তাই ভাবলাম আশেপাশের কিছু বাচ্চাদের সাথে নিয়ে ওদের মত করেই আজ কিছুক্ষণ কাটাবো। বেরুতেই দেখি বিশাল খোলামেলা গ্যারেজটার ভেতরে ওরা খুব হৈচৈ করে খেলছে। ওরা তিনজন। ৬ থেকে ৮ বছর বয়সের এই তিনটি শিশুর আশেপাশেই রয়েছে আরও তিনজন যাদের বয়স ১০ থেকে ১২বছরের মধ্য; যারা সর্বক্ষণ দায়িত্বশীল নজর রাখছে ঐ তিনটি শিশুর ওপর!
বল্লাম, 'কে কে আমাদের সাথে এখন খেলতে চায় দেখিতো?( মাঝে মাঝেই আমরা এমন একসাথে খেলি, একসাথে কেক-কুকিজ বেক করি, পার্কে নিয়ে যাই)
আমি আমি আমি; তিনজনই প্রায় ছুটে এলো আমাদের দিকে। ওদের সাথে ছুটে এলো বাকী তিনটি শিশুও, যাদের দায়িত্ব অনেক! এদের মধ্যে একজন অস্ফুটে বলেই ফেল্লো, আমরাও আপনাগো লগে যামু?
আমি ভাবি, খুব ভাল হয় যদি ওরাও সঙ্গী হতে পারে, ওরাও একটুখানি অন্যরকম সময় পাবে। চেষ্টা করে দেখি না একবার! অনুমতি মিললো না ওদের! মায়েরা খুশী হয়ে বাচ্চাদের পাঠিয়ে দিলেন আমাদের সাথে। ওরা শুধু আমাদের বৈচিত্র্যময় জীবন-যাপনের দিকে চেয়ে রইলো। এক রকম অপরাধ বোধ আর বৈচিত্র্যতার কষ্ট আমায় ঘিরে রইলো।
এ,সব নতুন কিছু নয়; বরং আমাদের প্রতিদিনের হাজারো গল্পের একটির ছোট্ট একটি দৃশ্য মাত্র! তবু আমরা কি কখনও একটিবার ওদের কথা ভাবি না? কেউ কেউ তো ভাবেন নিশ্চয়!
প্রকৃতপক্ষে ওরা তো আমাদের পরিবারেরই একজন। আমরা ক'জন ভাবি ওদের প্রকৃত শ্রমের বিনিময় মূল্য ঠিকমত দিচ্ছি কিনা, একটুখানি ভালবাসা, স্নেহ-মমতা, নিদেনপক্ষে দু'টো মিষ্টিকথা আমরা কি ওদের দিয়ে থাকি? যে খাবার আমার জন্যে আর খাদ্য বিবেচনা করছিনা তা কি করে আরেকটি মানুষের হাতে তুলে দেই?
একটি মর্মান্তিক দৃশ্য আমি অনেকবার দেখেছি!
খাবারের দোকানে টেবিল ভরা খাবার নিয়ে খাওয়ায় আর গল্পে মেতে উঠেছে সুখী পরিবার; আর তাদের শিশুটিকে যে দেখাশানা করে (১০/১২ বছর বয়সী আরেকটি প্রায় শিশু) সে দঁাড়িয়ে রয়েছে খানিকটা দুরে। মাঝে মাঝে কর্তৃর হুকুম অনুযায়ী কাছে এসে নানান দায়িত্ব পালন করে আবার দুরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। কেউ একটিবারও ভাবলো না ওর খাওয়ার কথা...! ভোজনানন্দ নিয়ে মহাতৃপ্তিতে ফিরে যায় তারা...!
এক অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে ছঁিড়ে খঁুড়ে ফেলে। চোখ জ্ব্ালা করতে থাকে...ক্ষুদ্রতার দায়ভার নিজের ভেতরেই অনুভব করি, গড়ার চেয়ে ভাঙ্গার প্রবল ইচ্ছা আমাকে বিভ্রান্ত করে দেয় বারবার...।
আর একটু অন্যভাবে যদি ভেবে দখি? যারা আমাদের সাহায্য(প্রশ্নাতীত বিনিময়ে) করে জীবন ধারণ করে, তাদের সংখ্যা তো কম নয়; একটি বিশাল জনগোষ্ঠি এই পেশায় নির্ভরশীল বলতে পারি। ওদের জন্যে আমাদের ভাবনাটা কি হতে পারে? আমরা যদি 'কাজের লোক' বর্জন করে আত্ননির্ভরশীল হওয়ার কথা ভাবি সেতো ভাল কথা, কিন্তু ওরা কিভাবে বঁাচবে?
ওদের সম্মান-সম্মানি(!!!), নিরাপত্তা, ভালবাসা ও মমতার অধিকার সর্বোপরি সুস্থ বিনিময় নিয়ে আমাদের সচেতনতাই বা কতটুকু? উন্নয়নশীল/ কল্যানমূখী দেশ হলেও এ, দেশে হাতে গোনা দু'একজন ছাড়া, এমন কি যাদের সামান্যই সামর্থ তারা প্রায় সবাইতো ওদের উপর নির্ভরশীল এবং তা ক্রমশ: বেড়েই চলেছে দিন বদলের(সামাজিক প্রেক্ষাপট) প্রেক্ষিতে। আমরা কি প্রকৃতপক্ষে ওদের মুখাপেক্ষী নই? উভয় পক্ষেরই এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সহজ পথ খঁুজে পাওয়া বোধ করি অনিশ্চত সময়সাপেক্ষ।
অন্যদিকে ওদের নিরাপত্তার বিষয়টিও অহরহ ক্ষুন্ন হয় বাড়ির অসৎ পুরুষ সদস্যের কাছে এবং বাড়ির কর্তৃর কাছ থেকে পাওয়া লাঞ্ছনাও তাদের নিত্যপ্রাপ্য! আর এ,ভাবেই পরিবারের ছোটরা জানে, দেখে, শেখে এবং অনুকরণ করে।
আমাদের বোধ আর বিবেককে আমরা যদি জাগিয়ে রাখতে পারি, প্রতিটি পরিবার যদি এ, বিষয়টিতে আন্তরীক হই; সুফল আসবেই। এ,জন্যে পরিবারের দায়িত্বই সবার উপরে। ভাল আর মন্দের শিক্ষা আর চর্চ্চাতো পরিবার থেকেই শুরু হয়।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে আবার ঘুমোতে যাবার অনিশ্চিত সময় পর্যন্ত এরা শ্রম দিয়ে যায় আমাদের; রঙহীন, বৈচিত্র্যহীন প্রানহীন এই জীবন-যাপন নিয়ে বোধ করি আমাদের ভাবনা আর দায়িত্ববোধ কোথাও, কোন গভীরে চাপা পড়ে গেছে! তবু আমরাতো হতাশ হই আমাদের একঘেয়েমী এই জীবন-যাপনে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

