মুম্বাই এর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ভারতের ক্রিকেটের ভবিষ্যতকে অনেকটাই অনিশ্চয়তার কালো চাদরে ঢেকে দেয়। ভারতের ক্রিকেটের রাজধানী বলা হয় এই মুম্বাইকে, আর এবারের সন্ত্রাসী আক্রমনের কেন্দ্রবিন্দু যে তাজমহল হোটেল- ভারতীয় ক্রিকেটের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে তা । কয়েক সপ্তাহ আগেই পিটারসেনের ইংল্যান্ড টিম এই হোটেলের আথিতেয়তা নিয়েছে, এমন কি বিস্ফোরনের সময়ও হোটেলের লকারে জমা ছিল-তার টিমের টেস্ট ব্লেজার থেকে শুরু করে যাবতীয় কিটস।
মুম্বাইএর বিষ্ফোরনের প্রতিক্রিয়ায় ইংল্যান্ডএর সাথে চলমান একদিনের সিরিজ মাঝপথে পরিত্যক্ত ঘোষনা করতে হয়। ইংল্যান্ড দেশে ফিরে যায়, অনিশ্চয়তায় ঢেকে যায় টেষ্ট সিরিজ সহ পুরা সফর। ফ্লিন্টফ, হার্মিশন সহ আনেক প্লেয়ারই জানিয়ে দেয় তারা টেস্ট সফরে আসছেন না, ECB ও জানায় তারা কোন প্লেয়ারকেই চাপ দিবে না, বা শাস্তিমুলক কোন ব্যাবস্থা নেবে না। ভারতে আসে ECB র সিকিউরিটি এ্যাডভাইজর রেগ ডিক্সন- সফরের নিরাপত্তা ব্যাবস্থা খুটিয়ে দেখার জন্য।
ক্রিকেটের উপর সন্ত্রাসীদের আছরের ঘটনার শুরু ৯৬ এর বিশ্বকাপ ক্রিকেট থেকে, যখন নিরাপত্তার অজুহাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর অষ্ট্রেলিয়া তাদের গ্রুপ ম্যাচ খেলতে শ্রীলঙ্কায় যেতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর লাগাতার সন্ত্রাসের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাকিস্তান ক্রিকেট। ২০০২ তে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পাকিস্তানে নিউজিল্যান্ডের সফর বাতিল হয়ে যায়, বাতিল হয়ে যায় একই বছর অষ্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ এর সফরও। অবশ্য এই খেলাগুলো পরে হয় নিরপেক্ষ ভেন্যু আবুধাবীতে। এরপর ২০০৬এ সাউথ আফ্রিকা তাদের শ্রীলঙ্কা সফর মাঝপথে মুলতুবি রেখে দেশে ফিরে যায় তামিল টাইগারদের কথিত হুমকির কারনে। আর এবার হলো ভারতে, যখন ৭ ম্যাচের সিরিজকে পাঁচ ম্যাচের মাথায় সমাপ্ত করতে হলো মুম্বাইএর বিষ্ফোরনের প্রতিক্রিয়ায়।
সন্ত্রাস-- বিশ্ব-ক্রিকেটের জন্য এ এক নতুন মাথাব্যাথার নাম।
তবে ভারতের ক্ষেত্রে সব হিসাব নিকাশ বোধহয় আলাদা। পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার তুলনায় ভারতীয় ক্রিকেট নিজকে সৌভাগ্যবান ভাবতেই পারে। এত কিছুর পরেও ভারত-ইংল্যান্ড টেষ্ট সিরিজ আবার শুরু হতে যাচ্ছে- সর্বশেষ খবর ইংল্যান্ড টিম ভারতে পৌছে গেছে তাদের অপরিবর্তিত টিম নিয়ে। আর কয়েক ঘন্টা বাদেই চেন্নাইতে ইংল্যান্ড তাদের দুই টেস্টের ক্রিকেট সিরিজ শুরু করতে যাচ্ছে ভারতের বিরুদ্ধে। এই মুহুর্তে ইংল্যান্ড দল তাদের টিম নিয়ে চেন্নাই অবস্থান করছে, ফ্লিন্টফ, হার্মিশন সহ যাদের উপস্থিতি নিয়ে সন্দেহ ছিল তারা প্রত্যেকেই টিমে আছে। সম্ভবত এখন আর তাদের ভারতকে যুদ্ধ উপদ্রুত দেশ মনে হচ্ছে না।
মনে না হওয়ারই কথা, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অর্থ বিত্তের খ্যাতির সুগন্ধ সারা ক্রিকেট বিশ্বেই ম ম করে, আর সবাই তা জানে। ICC পর্যন্ত অনেক বিষয়ে ভারতকে সমঝে চলে, ভারতীয় প্লেয়ারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দু বার ভাবে, ভারত চাইলে অনেক বিষয়ে তাদের শির ঝুকাতে হয়--এ ধরনের অভিযোগ গুলো ক্রিকেট আসরে হামেশাই শুনা যায়।
হিন্দুস্তান টাইমসের ২৪ সেপ্টেম্বর'০৮ তারিখের প্রকাশিত রিপোর্টে মোতাবেক বিশ্ব জুড়ে এই মন্দার মধ্যেও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) এর এ বছরের আয় এক হাজার কোটি রুপি (প্রায় ২৪৫ মিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ভারতীয় ক্রিকেটকে উপেক্ষা কেই বা করতে পারে?
ভারতীয় বোর্ড নিজেও যেমন ধনী--তাদের নব উদ্ভাবিত I P L (Indian Premier League) হচ্ছে তেমনি ক্রিকেটারদের সীমাহীন অর্থ উপার্জনের নতুন এক পন্থা, যেখানে আকাশ হলো শেষ সীমানা। এযাবত অনুষ্ঠিত I P L নীলামে ইংলিশ ক্রিকেটাররা ব্রাত্য হয়েই ছিলেন, দূর থেকে টাকার গন্ধ শুকেই তাদের আশ মেটাতে হয়েছিলো। এবারের ভারত সফর শুরু থেকেই তাই ইংলিশ ক্রিকেটারদের জন্য ছিলো--ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি I P L এ একটা ভালো ক্লাব খুজে নেওয়ারও মিশন।
বৃটিষ মিডিয়ার একাংশের অভিযোগ--একই সঙ্গে এই ক্লাব হান্টিং এ অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া আর তার ফলে মুল খেলার ফোকাস নড়ে যাওয়াই তাদের ৫-০ ভরাডুবি অন্যতম কারন। বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার-- বৃটিষ প্রেসের বরাত দিয়ে রিপোর্ট করছে-- কটকের ৫ম ম্যাচের আগে টিম যখন ০-৪ এ পিছিয়ে--ম্যাচের আগের দিন তারা নাকি কোন প্রাক্টিসেই আসেনি। I P L এর ক্লাব খুজতেই তারা ব্যস্ত ছিল বেশী। এমনকি ২৪ ঘন্টা পরে যে মাঠে তাদের খেলা হবে, খেলোয়াররা তার পিচ দেখতে যাওয়ারও কোন আগ্রহ বোধ করে নাই।
ফ্লিনটফ যেমন শুরু থেকে বৃটিষ প্রেসকে বুঝানোর চেষ্টা করছিলেন যে ভারতের ওয়ান ডে ক্রিকেটে দুর্ধষ্য সাফল্যের পিছনেই হলো বেশি বেশি ২০/২০ ম্যাচ খেলা, ফলে আমাদেরও I P L এ বেশি করে খেলা উচিত।
এখন ২০/২০ ম্যাচ খেলতে হলে কেন শুধু I P L এ, কেন অন্য দেশের ২০/২০ টুর্নামেন্ট নয়- এ প্রশ্ন অবশ্য ফ্লিনটফকে কেউ জিজ্ঞেস করেন নি।
তো শেষ পর্যন্ত ইংলিশ দল এলো ভারতে, সদলবলেই। ক্রিকেটের জন্য এটা সুখবর, আরো সুখবর সেই সব ইংলিশ ক্রিকেটারের জন্য যারা গত বছর I P L মিস করেছিল। টাকা পয়সা সবারই দরকার-ফ্লিনটফদের হয়তো একটু বেশি, এই যা।
ওই যে বব ডিলান It's Alright, Ma (I'm only Bleeding) গানে গেয়েছিলেন না "Money doesn't talk, it swears,"
[এই লিখার জন্য বিবিসি, দ্য ডেইলি মেল, হিন্দুস্তান টাইমস্ আর ক্রিকইনফোর সাহায্য নেয়া হয়েছে।]
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


