somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রিওতেই তো ওরা বলে-- পেলে থার্ড, আমি ফার্স্টঃ বাংলা কাগজে মারাডোনার সাক্ষাৎকার...

১৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রিওতেই তো ওরা বলে-- পেলে থার্ড, আমি ফার্স্ট...

[ভারতের একমাত্র সংবাদ পত্রে ডিয়েগো মারাডোনার বিস্ফোরন... প্রত্যাক্ষদর্শী গৌতম ভট্টাচার্য্য]

দোভাষীকে নিয়ে হাজির হলেন মারাডোনা। ইনি সেবাস্তিয়ান—মারাডোনার এজেন্ট। চাইলে আগের দিনও দোভাষীর কাজ করতে পারতেন। কিন্ত সফরের শুরুর দিকে স্প্যানিশ জানা স্থানীয় দোভাষীদেরই আন্ডারে ছিলেন মারাডোনা। পত্রিকার ইন্টারভিউ দিতে বসে শর্ত দিলেন, নিজের লোককে রাখতে হবে। তার হৃদয়ের ভাষা নাকি ঠিক ফুটছে না। যদি ইংরেজিই না জানেন, কি করে বুঝলেন হৃদয়ের ভাষা ফুটছে না? বাইপাশের ধারের হোটেলে আধ ঘন্টার সাক্ষাতকার নিতে গিয়ে কিন্ত মাঝেমধ্যেই সন্দেহ জাগল, ইংরেজি একেবারে জানেন না যেটা বলছেন, সত্যি নয়। ভাঙ্গা ভাঙ্গা বোঝেন, জানাতে চান না। ভাষাটা হয়তো ভেতর থেকে তার তীব্র অপছন্দ বলে। আর কে না জানে, মারাডোনার ভেতর রাজি না হলে বাইরের কি সাধ্যি রাজি হয়!

পত্রিকাঃ শুরুতেই একটা কথা পরিস্কার হয়ে যাওয়া ভাল। সম্বোধন করব কি বলে আপনাকে? ডিয়েগো, না মিস্টার মারাডোনা?

মারাডোনাঃ ডিয়েগো। ডিয়েগো। কোনও কথা আছে নাকি?

পত্রিকাঃ আপনি এমনই বিশাল ক্যানভাস যে ইন্টারভিউএর আগে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মতো। বেচারী ইন্টারভিউয়ার কোথা থেকে শুরু করবে? কোথায় হাত রাখবে? ডিয়েগো, আপনি একটু সাহায্য করতে পারেন? বিশ্ববিখ্যাত মারাডোনাকে কি প্রশ্ন করা উচিত ইন্টারভিউএর শুরুতে?

মারাডোনাঃ ওর সঙ্গে যখন শুরু করবেন, একদম সিম্পল থাকবেন। যত সিম্পল হবেন তত ভাল। ও ভাবে শুরু করলে যে কোন যায়গায় যেতে পারেন। যে কোনও প্রশ্নের উত্তর চাইতে পারেন। সব সময় মনে রাখতে হবে, লোকটা খুব সিম্পল।

পত্রিকাঃ আপনি কি জানেন, এই প্রদেশের বৃহত্তম বিভাজন আজ থেকে বাইশ বছর আগে আপনি ঘটিয়ে দিয়েছেন? বাইশ বছর আগে রাজ্যটা ছিল ব্রাজিলের অকৃত্রিম ভোটব্যাংক। আজ সেটা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে এমন দাড়িয়েছে, শহরের গলিতে গলিতে জঙ্গী আর্জেন্টিনা সমর্থক।

মারাডোনাঃ ভেরি গুড। মনে রাখবেন, আর্জেন্টিনা টিম তার পতাকার ভালবাসার জন্য খেলে। হৃদয়ের ডাক শুনে খেলে। আর্জেন্টিনা হারতে পারে, জিততে পারে, কিন্ত আর্জেন্টিনার ফুটবলে হৃদয় থাকবে। আমাদের শপথ হলো, মাঠে প্রথম হৃদয়টা উপুর করো, তার ওপর ফুটবলটা ঢেলে দাও।

পত্রিকাঃ সেদিন সন্ধ্যেবেলায় সল্টলেকে যাদের দেখলেন, তাদের জন্যও কি আপনার একই পেশক্রিপ্সন হবে? হারো-জেতো যাই হোক, ইন্ডিয়ান ভাইরা হৃদয় দিয়ে খেলো।

মারাডোনাঃ যে টিমের হৃদয় নেই, তাকে আমি টিম বলেই মনে করিনা।

পত্রিকাঃ আপনি একজন ভিভিআইপি। আপনাকে ঘিরে বডিগার্ড, সৈন্যসামন্ত সব সময় থাকবে-জানারই কথা। কিন্ত আপনি কি জানেন, নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালে যে রেফারি আপনার টিমের বিরুদ্ধে পেনাল্টি দিয়েছিলেন, কলকাতায় নামলে আজও তার বডিগার্ড লাগবে! সম্পুর্ন ভিন্ন কারনে অবশ্য। জঙ্গী কিছু আর্জেন্টিনা সমর্থক আজও লোকটাকে খুজেই চলেছে।

মারাডোনাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। আমার তো মনে হয়, মালটা বিশ্বের যেখানে যাবে সেখানেই ওকে নিরাপত্তা দেওয়া উচিত। এতগুলো প্লেয়ার ইনজিওরড ছিল আমার। কি ভাবে লড়তে লড়তে ফাইনালে গিয়েছিলাম। একটা নারকীয় সিদ্ধান্তে পুরো লড়াইটাকে মিথ্যে করে দিল!

পত্রিকাঃ আঠারো বছর কেটে গেছে। এতদিনে নিশ্চয়ই নিজগুনে মার্জনা করে দিয়েছেন।

মারাডোনাঃ ভাই ইতিহাস তো বদলানো যাবে না। স্কোরকার্ড তো আজও ০-১ই দেখিয়ে যাচ্ছে। আমি শুধু এটুকু প্রার্থনা করতে পারি, ওই কোডেসাল মেন্ডেস বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেনো, ওর মনে যেন শান্তি না থাকে।

পত্রিকাঃ কলকাতার আর এক অতিপ্রিয় মানুষের কথা বলছি। যিনি আপনার বিরুদ্ধে নিয়মিত মন্তব্য করে তীব্র গতিতে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন, হারিয়েছেন। পেলে। পেলে সম্পর্কে আপনার কি ধারনা?

মারাডোনাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। পেলে? ডিয়েগো পেলে সম্পর্কে কোনও খারাপ কথা বলবে না। গ্রেট ফুটবলার। দুর্ধর্ষ!

পত্রিকাঃ তাই?

মারাডোনাঃ উত্তরটা শেষ হয়নি। সমস্যা হলো, কোনও ফুটবলার পেলেকে দু’চোখে দেখতে পারে না।আমাদের মধ্যে আসল তফাতটাই হল ডিয়েগোকে ফুটবল পছন্দ করে। ফুটবলাররাও করে। ডিয়েগো ব্রাজিল খেলতে যাওয়ার আগে ব্রাজিলের লকার রুমে গিয়ে প্লেয়ারদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসতে পারে। পেলের এমন হাল, ব্রাজিলের লকার রুমেও ঢুকতে পারে না। আর্জেন্টিনা তো কোন ছাড়!

পত্রিকাঃ পেলে তা হলে চতুর, সুযোগসন্ধানী?

মারাডোনাঃ পেলে হল নিজের ক্ষীরটা খেয়ে যাওয়া লোক। সব লাইমলাইট নিজের ওপর রাখার লোক। সেটা করতে গিয়ে ফুটবল থেকে বারবার সরে গিয়ে যদি ফুটবল কর্তাদের গলায় উঠে পড়তে হয়, তাতে ওর কোনও সমস্যা নেই। আর সেটাই পেলে করে থাকে।

পত্রিকাঃ একটা ব্যাপার প্রায়ই খটকা লাগে। আপনার 'হ্যান্ড অব গড' গোল। ব্রিটিশ মিডিয়া ওই গোলটার কথাই বারবার করে লেখে। অথচ গোলটা বাদ দিয়েও আপনার পরের গোলে তো এমনিতেই ওরা ১-০ ম্যাচ হারে। এমন তো নয় যে ''হ্যান্ড অব গড''-এই মীমাংসা হয়েছিল।

মারাডোনাঃ ইংরেজদের বৈশিষ্ট্য হল, ইতিহাস যখন তখন প্রয়োজন মতো ভুলে যেতে পারে। ছেষট্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে একটা চুরি করে দেওয়া গোলে ওরা জার্মানীকে হারিয়েছিল। বলটা পুরো গোলেই ঢোকেনি। কিন্ত ওদের জিজ্ঞাসা করে দেখুন। মনেই করতে পারবে না। ওদের বিচিত্র ইতিহাস। যেখানে ''হ্যান্ড অব গড'' আছে কিন্ত ছেষট্টির চুরিটা নেই।

পত্রিকাঃ আচ্ছা ব্রিটিশ মিডিয়াকে কত দেবেন দশের ভেতর?

মারাডোনাঃ সাড়ে পাঁচ থেকে ছয়।

পত্রিকাঃ এই দুটো রেটিং করে দিন। ইতালিয়ান আর ব্রাজিল মিডিয়া।

মারাডোনাঃ ইতালি... হুঁ হুঁ হুঁ... একটু ভাবি... তাও সাত পাবে। ব্রাজিল আট।

পত্রিকাঃ ব্রাজিল এত ভাল?

মারাডোনাঃ হ্যাঁ, ব্রাজিল মিডিয়া আমার ওপর খুব ফেয়ার। ওখানকার মানুষও। ব্রাজিলীয় সাংবাদিক এবং জনগন দুটো ওপিনিয়ন পোলেই আমি পেলেকে হারিয়েছি। পেলে আর একটা ওপিনিয়ন পোলেও সেকেন্ড হয়েছে। সেখানে হেরেছে আয়ার্টন সেনার কাছে। সত্যি বলতে কি, নিজের দেশে ওপিনিয়ন পোল হারা থেকেই ওর এত রাগ আর হিংসে।

পত্রিকাঃ আপনার আর পেলের যখন দেখা হয়, তখন কি কথা বলেন?

মারাডোনাঃ আমরা কথাই বলিনা।

পত্রিকাঃ সে কি?

মারাডোনাঃ দুটো লোকের ফুটবল সম্পর্কে ভিন্ন চিন্তা। জীবন সম্পর্কে আলাদা দর্শন। কোথাও কোনও কিছুতে মিল নেই। কথা বলে কি হবে?

পত্রিকাঃ সবাই উত্তর খোঁজে মারাডোনার পর কে? মারাডোনা নিজে কি উত্তর পেয়েছেন?

মারাডোনাঃ রোনাল্ডিনহোর নাম করব। মেসির কথা বলব। এরা কেউ এক নম্বর হয়নি। তবে প্রচুর আনন্দ দিয়েছে। সত্যি বলতে কি, ছিয়াশির পর থেকে আমার অবস্থাটা রুপকার্থে বোঝাতে হবে। আমি আর পেলে যেন আকাশের নিঃসঙ্গ দুই নক্ষত্র। যারা কাছে আসার চেষ্টা করেও কেউ কাছে আসতে পারেনি।

পত্রিকাঃ বেকহ্যাম নিয়ে মাঝে খুব হইচই হচ্ছিল। আপনি তখন কি ভাবছিলেন?

মারাডোনাঃ ভাবছিলাম বেকহ্যামকে খুব ভাল দেখতে।

(হাসিতে ফেটে পড়ল গোটা ঘর। মারাডোনার দেহরক্ষী, বান্ধবী, দোভাষী। হাসি থামছে না কারও)

হাসি থামিয়ে মারাডোনাঃ আমি প্রথম থেকেই বলছিলাম, বেকহ্যামকে দিয়ে কিছু হবে না। কোনও দিনও এক নম্বর হবে না। প্রেস ওকে চড়িয়ে এমন বাজার করেছে যে, বেচারির প্রান যেতে বাধ্য। দিনের শেষে আমার মন্তব্য চান? বেকহ্যামের মার্কেটিং ঠিক আছে, ফুটবলটাই নেই।

পত্রিকাঃ তাহলে ফাইনাল রেটিং কি দাড়ালো? মারাডোনা এক, পেলে দুই, তিন পাওয়া যাচ্ছে না।

মারাডোনাঃ পেলের পাড়া (মহল্লা) রিওতেই তো ওরা বলে, পেলে থার্ড। মারাডোনা ফার্স্ট, গ্যারিঞ্চা সেকেন্ড।গ্যরিঞ্চাকে অনেক বেশি নম্বর দেয়।

পত্রিকাঃ চুরানব্বইয়ের বিশ্বকাপে মাদক নিতে গিয়ে আপনার ধরা পড়া নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ডোপ টেস্টটা ঠিক ছিল। কেউ কেউ বলেন। আপনাকে ফাঁসানো হয়েছিল। কোনটা ঠিক?

মারাডোনাঃ হান্ড্রেড পারসেন্ট ফাঁসানো হয়েছিল। আজ পর্যন্ত কেউ প্রমান করতে পারেনি, পারফরম্যান্স বলবর্ধক কোন ড্রাগ নিয়েছিলাম বলে। নাইজিরিয়াকে আমরা হারানোর পর যেই হই চই শুরু হল, সবাই বলতে লাগল আমরাই অবধারিত ওয়ার্ল্ড কাপ জিতব, অমনি ওর মাথাটা ঘুরে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে ষড়যন্ত্র শুরু করল ডিয়েগোকে কি ভাবে টাইট দেওয়া যায়।

পত্রিকাঃ 'ওর' মানে কার? মার্কিন প্রেসিডেন্টের?

মারাডোনাঃ না, না। ওই যে হ্যাভেলাঞ্জের। হ্যাভেলাঞ্জ তখন ফিফা মহাকর্তা। যেই দেখল আর্জেন্টিনাকে নিয়ে নাচানাচি শুরু হয়েছে, তখনই ব্রাজিলীয়র মুখ শুকিয়ে গেল। এমনিতেই রাজনীতি ফিফাতে খুব চলে। এ বার একদম জোর কদমে নেমে পড়ল।

পত্রিকাঃ হ্যাভেলাঞ্জ সম্পর্কে এখন আপনার কি মনোভাব?

মারাডোনাঃ কোন মনোভাব নেই এটাই মনোভাব।

পত্রিকাঃ আপনাকে যারা ভালবাসে বা ঘৃনা করে-দুপক্ষই একই রকম সঙ্কটে আক্রান্ত হয়। ছোখের সামনে তারা দুই মারাডোনাকে দেখে। একটা লোক, যে শিশুদের প্রচন্ড ভালবাসে। হৃদয় থেকে কথা বলে। বাচ্চাদের পাশে দাঁড়ায়। আর একটা লোক, যে কথায় কথায় অন্ধকার জগতে জড়িয়ে পড়ে। জার্নালিস্টকে হোসপাইপ দিয়ে জল ছিটিয়ে দেয়। যখন তখন বিস্ফোরক সব কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে। কোন মারাডোনাটা আসল? এক না দুই?

মারাডোনাঃ ডিয়েগো একটাই। সেই মানুষটা খুব ফেয়ার। ভেতর থেকে ভালবাসে। শ্রদ্ধা পেলে নিজের বড় হৃদয়টাকে উপুর করে দেয়। শ্রদ্ধা পাওয়াটা ওর কাছে খুব গুরুত্বপুর্ন। ডিয়েগো মনে করে, তুমি ফুটবল প্লেয়ার হতে পার, সাংবাদিক হতে পার, সবার আগে তুমি মানুষ হও। ওই মিটিং পয়েণ্টটায় এসো। তারপর আমরা তরতরিয়ে এগোব। কিন্ত তোমার মধ্যে শ্রদ্ধাই যদি না থাকে, তাহলে এগোব কোথায়?

পত্রিকাঃ ব্রিটিশ প্রেস কি এই শ্রদ্ধাটাই আপনাকে দেয় নি?

মারাডোনাঃ ওরা আসলে আমার ''হ্যান্ড অব গড'' গোলটা আজও ভুলতে পারে নি। আর তার পর থেকে তাই কখনও আমার ইন্টারভিউ নিতে আসেনি। তাতে আমার কোন সমস্যা নেই। এই সুন্দর পৃথিবীতে ওরা যদি ডিয়েগো মারাডোনা ছাড়া বাঁচতে পারে, তা হলে ডিয়েগো মারাডোনাও ওদের ছাড়া পরম সুখে বাঁচতে পারে।

পত্রিকাঃ রানির ভাষাটা শিখলেন না কি জাতটার প্রতি রাগে?

মারাডোনাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ (হাসি থামছে না)। আমি অন্ততঃ দশ বার চেষ্টা করেছি শেখার। সফল হইনি। তারপর মনে হল, ইতালিয়ান ভাষাটা এত ভালবাসি। ওটা নিয়ে থাকাই ভাল। আর একটা কথা। ভেতর থেকে ইংরেজি ভাষাটা আমার এতটুকু ভাল লাগে না।

পত্রিকাঃ ইতালির কথা বলতে মনে পড়ল ওখানে কাটানো আপনার অন্ধকার সময়ের কথা। ড্রাগ, মাফিয়া মহিলাচক্র। মনে করা যাক, কাল আর্জেন্টিনার কোন উঠতি ফুটবলার নেপোলিতে খেলতে যাচ্ছে। কি পরামর্শ দেবেন তাকে? কী ভাবে সে অন্ধকার জগতের খপ্পরে পড়া থেকে দূরে থাকবে?

মারাডোনাঃ (এই প্রথম উত্তর জন্য সময় নিলেন) এটা বলা খুব মুশকিল। প্রত্যেকের জীবন আলাদা। মানুষ হিসাবে আমরা সবাই আলাদা। এটা আমি বলতেই পারি যে, বন্ধু, ডিয়েগো যা যা সব করেছে সেগুলো রিপিট কোরো না। গাড্ডায় পড়ে যাবে। কিন্ত দিনের শেষে জীবনটা তার নিজের। কে কি ভাবে এগুলো হ্যান্ডল করবে সেটা নির্ভর করে কোন পরিবার থেকে সে এসেছে। উত্তরাধিকার সুত্রে কী কী পেয়েছে। তার বাবা-মা'র কাছে কি শিখেছে। আজ মাদার টেরেসার হোমে গিয়ে দেখছিলাম একটা জায়গায় লেখা, এভরিথিং স্টার্টস ইন দ্য ফ্যামিলি। নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছি, এর চেয়ে খাঁটি কথা আর হয় না।

পত্রিকাঃ আপনি এমন একটা জীবনে অভ্যস্ত, যেখানে সারা পৃথিবী জুড়ে আপনার সমর্থকেরা আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে আর নানান সব বর চায়। যে ভাবে লোকে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে। কখনও চেয়েছে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে জিতিয়ে দিন, কখনও বলেছে নাপোলিকে লীগ শীর্ষে নিয়ে যান। এখন বলা শুরু করেছে যে, কোচ হয়ে আর্জেন্টিনাকে আপনার বিশ্বকাপ দিতে হবে। ভক্তদের প্রার্থনা-প্রার্থনায় নিশ্চয় ফুটবল ঈশ্বরের প্রান জেরবার। জানতে ইচ্ছে করছে, সেই আপনি যখন প্রার্থনায় বসেন—কি বর চান? কিসের আবদার করেন ঈশ্বরের কাছে?

মারাডোনাঃ বর চাওয়া-টাওয়া বহুদিন ছেড়ে দিয়েছি। মাঝখানে একটা সময় প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। প্রায় মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ফিরে এসেছি। সেখান থেকে ফিরে এসে আজ এই সুস্থ, সবল চেহারায় দেশ ঘুরছি, এখানে ইন্টারভিউ দিচ্ছি, সেটাই তো ঈশ্বরের সব চেয়ে বড় কৃপা।
তবুও কখনও—সখনও যদি কিছু চাইবার হয়, সেটা চাই আমার দুই কন্যার জন্য। এটা জানলে আমার বাবা-মা অসন্তষ্ট হতে পারেন। এখানে আমার বান্ধবী ভেরোনিকা বসে শুনছে, ওর খারাপ লাগতে পারে। কিন্ত প্রকৃত সত্য এটাই যে, ওদের জন্য আমি ঈশ্বরের কাছে কিছু চাই না। আমার নিজের জন্যও কিছু চাই না। ঈশ্বর যেন শুধু আমার মেয়ে দুটোকে সুখে রাখেন।

পত্রিকাঃ এত সব চমক পরতে পরতে মিশে আছে আপনার জীবনে। কখনও কি ফিরে তাকিয়ে ভেবেছেন, নিজেকেই নিজে চমতকৃত করে দিচ্ছেন মোড়ে মোড়ে সব আকর্ষনীয় ঘটনায়?

মারাডোনাঃ একেবারেই নয়। চমক তৈরির ক্ষমতা এবং দুরদর্শিতা দুটোই আমার মধ্যে আছে। বাইরে থেকে যেগুলো চমক মনে হয়, সেগুলো আমার ভেতর থেকেই তৈরি হয়। ভবিষ্যত প্রতিটি মুহুর্তের জন্য আমি সজ্ঞানে থাকি। তা হলে সেগুলোকে চমক বলব কি করে?
এর পরেও বলব, কলকাতায় আমাকে ঘিরে যা দেখলাম তাতে কিন্ত আমি চমৎকৃত। আর আমাকে আশ্চর্য করাটা মোটেই সহজ নয়।

পত্রিকাঃ শুনছি কলকাতার ভালবাসায় ভিজে আবার নাকি এখানে ফিরবেন?

মারাডোনাঃ ঠিক শুনেছেন। আমার জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে আমি ভারতীয় ফুটবলকে সাহায্য করতে চাই। ভারতকে অন্তত সেকেন্ড লেভেলে যাতে নিয়ে আসা যায় তার জন্য যে যথাসাধ্য করব, কথা দিয়ে গেলাম।

(দেহরক্ষী টোকা দিয়ে গেলেন। অনেক হয়েছে, এবার লাস্ট কোয়েশ্চেন। আমি বললাম, প্লিজ লাস্ট টু। মারাডোনা আঙুল তুলে দেখালেন লাস্ট থ্রি)

পত্রিকাঃ কলকাতা তা হলে আপনার জন্য অপেক্ষায় থাকবে?

মারাডোনাঃ বলেছি তো, আমাকে যে ভালবাসা দেওয়া হয়েছে তাতে মনে হচ্ছিল, বিদেশে আসিনি। বাড়িতেই রয়েছি। আশা করব, পরের বার ফিরে দেখব এই শহরে ব্রাজিলীয় শার্ট-টার্ট কেউ না পরে সবাই আর্জেন্টিনারটাই কিনছে। [হাসি]

পত্রিকাঃ হাত দেখানোয় বিশ্বাস করেন?

মারাডোনাঃ করি।

পত্রিকাঃ জ্যোতিষীর পরামর্শ মেনে কাজ করেন?

মারাডোনাঃ না, ও সব মানি না।

পত্রিকাঃ আপনি কি জানেন, ভারতে বলিউড নামক একটা
ইন্ড্রাষ্ট্রি আছে? ক্রিকেট বলে একটা খেলা আছে?

মারাডোনাঃ ইয়েস, ক্রিকেট আমি জানি।

পত্রিকাঃ কি করে জানলেন?

মারাডোনাঃ আরে আমি এও জানি যে, ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমটা দারুন। রিসেন্টলি আপনারা ইংল্যন্ডকে সলিড হারিয়েছেন। এক দিন একটা ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যেতে চাই।

পত্রিকাঃ আপনাকে সবাই জানে প্রশাসন-বিরোধী মানুষ হিসাবে। সেই আপনি কোচ হয়ে গেলেন। কোচও তো প্রশাসনের অংশ। আপোষ করতে হবে না চিরবিদ্রোহী মারাডোনাকে?

মারাডোনাঃ যে মুহুর্তে দেখব আপোষ করতে হচ্ছে, প্রশাসনের অংশ হয়ে যাচ্ছি, তখনই দায়ীত্ব ছেড়ে দেব। আমি টিমটাকে কোচ করতে রাজি হয়েছি ফুটবলারদের জন্য। কর্তাদের কথা ভেবে নয়। সব কিছু পিছনে রেখে যাতে একমাত্র ফুটবলাররা উপকৃত হয়। দেশের ফুটবলটা বাঁচে। ফুটবল কর্তারা আমাকে স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করছে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আমাকে একমাত্র বাড়িতেই পাওয়া যাবে।

পত্রিকাঃ থ্যাঙ্ক ইউ-কে স্প্যানিশে কি বলে?

মারাডোনার দোভাষীঃ গ্রাসিয়াস।

পত্রিকাঃ ডিয়েগো, গ্রাসিয়াস।

মারাডোনাঃ থ্যাঙ্ক ইউ-কে আপনাদের ভাষায় কি বলে?

পত্রিকাঃ ধন্যবাদ।

মারাডোনাঃ ঢান্যাবাদ। ঢান্যাবাদ।

সর্বশেষ এডিট : ০২ রা আগস্ট, ২০০৯ সকাল ৭:২৪
১৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×