চট্টগ্রামের বায়োজিদ বোস্তামীর (রঃ)মাজারের কচ্ছপগুলো দেখলে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই, জনশ্রুতি আছে এই কচ্ছপগুলির অনেকটারই বয়স নাকি ২০০-২৫০ বছর।
ভেবে দেখলে এমনিতে কচ্ছপের আয়ু অনেক বেশি, সাধারন ভাবেই তারা প্রায় ১০০ বছরের ওপরে বাঁচে। ফলে কচ্ছপগুলির বয়সজনিত ভক্ত আশেকানদের দাবী আমি ভক্তি ভরেই মেনে নেই, আর তাছাড়া আমি ভিন্ন কারনে এই কচ্ছপগুলার ওপর কৃতজ্ঞও বটে। প্রায় কয়েকশত বছরের পুরাতন এই মাজার এবং তৎসংলগ্ন এলাকার উন্নয়ন নিয়ে এখানে ফি বছরই অনেক পরিকল্পনা নেয়া হয়। এলাকার প্রবীন বুজুর্গ ব্যাক্তিগন তাতে সামিল হোন। এক হিসাবে পুরা মাজার এলাকায় জীবিত প্রানীর মধ্যে এই কচ্ছপগুলোই সবচেয়ে প্রাচীন, মাজারের শুরু থেকে না হলেও অনেকেই আছেন প্রায় লর্ড ক্লাইভের আমল থেকে।
অথচ এমনটা কখনো শুনা যাই নাই, তাদের কেউ কোনদিন মাজার উন্নয়ন কমিটির বৈঠকে গিয়ে টেবিল চাপড়ে বলেছেন—হেই মিয়া, এইসব পন্ডিতি ছাড়েন...। আমরা আপনাদের চেয়ে অনেক বেশি দেখছি, হটাৎ কইরা পন্ডিত হইয়েন না।
বোস্তামীর পবিত্র পুকুরে প্রায় তিনশত বছর ভেসে ভেসে পার করে দেওয়া বোদ্ধা কচ্ছপকুল এমনটা দাবী করতেই পারতো—তা যে তারা করেন নাই, ফলে কচ্ছপকুলের ওপর আমি যার পর নাই কৃতজ্ঞ।
সামহোয়্যারের দিকে তাকায়া দেখেন কেউ কেউ আমাদের এটাই বোঝানোর চেষ্টা করছেন, সামহোয়্যারের ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে এটা নিয়ে কথা বলার একমাত্র দাবীদার বোস্তামীর মাজারের বয়োবৃদ্ধ কচ্ছপকুল—যেহেতু একমাত্র তারাই শুরু থেকে এটার সাথে আছেন এবং তারাই যথেষ্ট আগামী দিনের বিষয়ে কথা বলার। নতুন কোন ব্লগার এবং তাদের নতুন চিন্তার আগমন এখানে নিষিদ্ধ।
মাত্র কয়েক মাসের সিনিয়ার বড়ভাই এর সামনে সিগারেট খাওয়ার অপরাধে শিষ্টাচার শিক্ষা দেওনের ক্যচাল সম্ভবতঃ শহরের এনলাইটেড এলাকার বাইরে এখনও বিদ্যমান। জেষ্ঠতা মানেই দ্বিধাহীন শ্রদ্ধার এ অপসংস্কৃতি আমরা এখনো পুরা দূর করতে পারি নাই, সীমিত ভাবে কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ক্যাডেট কলেজ গুলোতে এখনো শোনা যায় এ ধরনের সিনিয়ারিটি বেসড র্যাগিং এর ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে আর্ট ইনষ্টিটিউটের ঘটনার দিকে যদি আমরা তাকাই, যেখানে শুধু সিনিয়ার হওয়ার কারনে কেউ কেউ আপারহ্যান্ড নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যার বহিঃপ্রকাশ আমরা সেখানে দেখেছিলাম র্যাগিং এর মাধ্যমে। প্রবীণ বয়োবৃদ্ধ কচ্ছপদের এই র্যাগিং কি আমরা সামহোয়্যারেও চলতে দিবো?
জুনিয়রদের র্যাগিং করার সংস্কৃতি পয়দা হওয়ার যাবতীয় উপাদান, সামহোয়্যারে বহুদিন ধরেই বিদ্যমান, আমরা সেটা খেয়ালও করি, কিন্ত মাথা ঘামাই না। একজন ব্লগার কবে সামহোয়্যারে এসেছেন, এ যাবৎ কয়টা পোষ্ট দিয়েছেন আর মন্তব্য কয়টা পেয়েছেন—তা দিয়েই কি কোন বিষয়ে তার মতামত বা রায় দেওয়ার ন্যায্যতা আমরা ধার্য্য করিনা? পুরানা ব্লগাররা হলো বাঁমুন আর নতুন ব্লগাররা শুদ্রতুল্য! বোস্তামীর কচ্ছপকুল কি সেই সংস্কৃতি সামহোয়্যারের চারপাশে জারী রাখে নাই?
গতকাল যে ব্লগার ব্লগিং শুরু করেছে, তার জীবনও গতকাল শুরু হয়েছে এটা ভাবার মতো মুর্খামি আমি কেন দেখাবো? যখন আমি নিশ্চিত না, সামাজিক জীবন-সংগ্রামে এই ব্যক্তিটির সাফল্য কি, অর্জনই বা কি। সে যদি তার এক মাস বয়সী পোষ্টে শুধুমাত্র স্বরে আ লেখে, আর মন্তব্য পাওয়ার ঘর যদি তার শুন্যও হয়, তবে সে কেন ব্লগ মহাফেজখানা থেকে আবিস্কৃত বাংলাব্লগের ভবিষ্যত নির্ধারনী সেই অসাধারন পোষ্টে মন্তব্য করতে পারবে না? এটা নিয়ে কোন পন্ডিতি সুপারিশ দিতে পারবে না?
কয় বছর বোস্তামীর পুকুরে সাঁতার কাটলে পন্ডিতি দেখানোর লাইসেন্স পাওয়া যায়—এটা তো সামহোয়্যারের নীতিমালার কোন ধারাতেই উল্লেখ নাই। এ আলোচনা তুললে কচ্ছপ সাহেবদের এটা নীতিমালার বাইরের কোন বিষয়, যা কিতাবী স্টাইলে তোলা হয়েছে, এমন তো মনে হতেই পারে।
প্রায় তিনশ বছরের পুরানো কচ্ছপদের হাত থেকে জেষ্ঠ্যতা নিয়ে র্যাগিং এর এই সংস্কৃতিকে আমাদের উপড়ে ফেলতেই হবে। নতুন ব্লগারদের জন্য র্যাগিং এর এই সংস্কৃতি এক ধরনের প্রতিকুলতা। তারা এতে কমফোর্ট ফিল করে না। ব্যাপক সংখ্যক নতুন অনাগত ব্লগার, যাদের অনেককে এখনও আমরা হয়তো এমনকি পাঠক হিসাবেও পাই নি, তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে গেলে আমাদের দরকার প্রত্যেকটা ব্লগার যে একই মাত্রার অধিকার ভোগ করে এটা জোর দিয়ে বলা, বারবার বলা। গনতান্ত্রিকতার সেই চর্চা করা, যা আমাদের জেষ্ঠ্যতা নিয়ে র্যাগিং এর কুৎসিত অপসংস্কৃতিকে পরাজিত করবে। গনতান্ত্রিক পরিবেশ, নতুনদের বিকশিত হবার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সমানাধিকারের এই অনুশীলন করার পন্থা নীতিমালায় না থাকতেই পারে। কিন্ত ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেওয়ার মনোভাবকে যদি আমাদের অনুশীলনের অংশ করে তুলি, অগনতান্ত্রিকতার বিনাশ আমরা এই ব্লগেই করতে পারবো।
অগনতান্ত্রিকতার চর্চা শুধু জুনিয়ারিটি বা সিনিয়ারিটি নিয়েই নয়, এই চর্চা আরও আছে। দশজন এক জায়গায় জড়ো হয়ে আমরা যে সমাজ সৃষ্টি করি, তা পরিচালিত হওয়ার সব খুটিনাটি আমরা নীতিমালায় রাখি না, তা সম্ভবও নয়। মডারেশনের মধ্য দিয়ে এই নীতিমালার বাইরেও আমরা প্রাত্যহিকতায় এমন কিছু নর্ম চালু রাখি যা আমাদের ক্রিয়াশীল রাখে।
মডারেশন অর্থ অবশ্যই গলা টিপে ধরা নয়, এটা এক ধরনের গাইডলাইন, অনেকটা হাইওয়েতে কালো রাস্তার মাঝখানে টেনে দেওয়া সাদা দাগের মতন। বেশি ডাইনে চলে যেওনা, বেশি বাঁয়েও না, চেষ্টা করো ভারসাম্য বজায় রাখতে। এটাই হলো মডারেশন, যা শুধু ব্লগ কর্তৃপক্ষ নয়, আমরাও নিরন্তর ব্লগে আমাদের মন্তব্য, সমালোচনার মধ্য দিয়ে জারী রাখি, কখনো প্রশংসার উৎসাহ দিয়ে, কখনো সমালোচনার নিন্দা দিয়ে। ব্লগে যে কোন পোষ্টে ব্লগারের অবস্থান যদি আমাদের কাছে সামাজিক মুল্যবোধের গ্রস ভায়োলেশন মনে হয়, তবে মন্তব্য, সমালোচনা করার মধ্য দিয়ে আমরা তা নিরুৎসাহিত করি, ব্লগারও এতে সতর্ক হয়ে যান, তার লেখার সীমানা নিয়ে সচেতন হোন। ফলে এটা নিয়ে আমরা নিশ্চিত, মডারেশনবিহীন ব্লগ আসলে একজিস্ট করে না, কর্তৃপক্ষ অথবা সাধারন ব্লগার- মডারেশনের কাজটা কাউকে না কাউকে করতেই হয়।
সামহোয়্যারের ইতিহাসে আর এক মডারেটরের অস্ত্বিত্ব আমরা দেখেছি নিকট অতীতে। ব্লগে কি লেখা উচিত, কি ভাবে লেখা উচিত তার নির্দেশ এসেছে লাল নীল বিভিন্ন নামে সৃষ্টি মাসল দেখানো সেই গোষ্ঠি গুলোর কাছ থেকে। সাধারন ব্লগার কোন বিষয়ে তাদের মতামত চিন্তা ভাবনা প্রকাশ করতে পারবে কিনা, তার সনদ-স্বীকৃতি তাকে আগে গোষ্ঠির কাছ থেকে অর্জন করতে হয়েছে। নবীন ব্লগারদের আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে হয়েছে। সামহোয়্যারের ইতিহাসে মডারেশনের এই অভিজ্ঞতাও আমরা সম্ভবতঃ ভুলে যাই নাই। আমরা স্মরণ করতে পারি- এই ধরনের মডারেশন সব সময়ই নির্ভর করেছে-গোষ্ঠীর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্লগার এর তুল্যমুল্য সম্পর্কের উপরে। গোষ্ঠীর অধিপতিরা তাদের প্রভাববলয়ের মাঝখানে বসে নতুন ব্লগারদের স্বাধীন চিন্তাকে নিয়ন্ত্রন করতে চেয়েছেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে নির্দেশিত পথে আনতে চেয়েছেন, ব্লগারদের ব্যাখা বক্তব্যের সীমানা টেনে দিয়ে, প্রগতি-প্রতিক্রিয়ার সংজ্ঞা নির্ধারন করে দিয়ে—সর্বোপরী দেশপ্রেমের তকমা দেওয়ার একমাত্র শীলমোহরটি মুঠোর মধ্যে নিয়ে দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে তাদের মত করে ব্লগ মডারেশনের কাজটা তারা এই ব্লগে জারী রেখেছিলেন।
ফলে সাধারন ব্লগাররা মনে করে মডারেশনের প্রয়োজন যেহেতু আছেই- ফলে এই কাজটা ব্লগ কর্তৃপক্ষের ওপরই ন্যাস্ত থাকুক। কোন দলবাজ গোষ্ঠীর মেজাজ মর্জির ওপর নয়। এমনকি সারা শরীরে তিনশত বছরের শ্যাওলার মুল্য, যাদের কাছে নতুন চিন্তার তুলনায় অনেক বেশি—সেই সব পবিত্র কচ্ছপবৃন্দের কাছে ত নয়ই। এ ক্ষেত্রে সাধারন ব্লগার বা অংশ গ্রহনকারীরাই যথেস্ট, গনতান্ত্রিকতা আর সমানাধিকারের চর্চার মাধ্যমে ব্লগ কর্তৃপক্ষের সাথে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে। তবে নিশ্চয় এটাই চুড়ান্ত নয়, বরং অন্যরা কে কি ভাবছে এক্ষেত্রে সে সব সুপারিশ আরও বেশি বেশি মাত্রায় ব্লগে আসা উচিত। বিভিন্ন চিন্তা সুপারিশের সম্মিলনই আমাদের আগামী দিনের রাস্তা দেখাবে।
পবিত্র কচ্ছপবৃন্দ আপনারাও আমাদের সাথে থাকেন-আমাদের কোন আপত্তি নাই, তবে এক্ষেত্রে আপনাদের কুঁচকে যাওয়া নাক কে সোজা করতেই হবে। নতুন চিন্তা, নতুন সুপারিশ কে ওয়েল্কাম করতেই হবে। সমানাধিকারের চর্চায় সামিল হতে হবে। নতুন ব্লগারদের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃস্টি করতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে আমাদের চেয়ে বহুগুন মেধাবী, দক্ষ অনাগত ভবিষ্যতের সফল এবং শীর্ষ ব্লগার ব্লগের বাইরেও বিপুল সংখ্যায় আছে।
না হলে আপনাদের ফসিলে পরিনত হওয়া কেউ রুখতে পারবে না, আপনারা নিজেরা তো নয়ই।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ রাত ২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


