মেয়েরা কি পারে, কি পারে না...
জানালার ছিটকিনিটা বেশ শক্ত। এটে লাগাতে গেলে বিস্তর কসরত করতে হয়। এদিকে বৃষ্টির ছাট এসে ঘর ভেসে যাচ্ছে, জানালাটা বন্ধ করা দরকার। মেয়েটা চেষ্টা করবে একবার, দুইবার—তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে হাসি হাসি মুখে এক পাশে সরে দাঁড়াবে। সে যে এটা পারবে না, তার কাছে এটা অস্বাভাবিক মনে হয় না। এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল, তাই না? খুবই সঙ্গত, তার তো এটা পারার কথাই নয়।
সে অপেক্ষা করবে তার পুরুষের, কখন সে উদ্যোগ নেবে, জানালা এটে লেগে যাবে। আর মেয়েটা প্রস্তুতি নিতে থাকবে সপ্রশংস হাসিতে তার পুরুষটাকে তারিফ আর কৃতিত্বে ভরিয়ে দিতে। নতুন কিনে আনা আচারের বয়ামটা কিছুতেই খোলা যাচ্ছে না, মেয়েটা ভিজা হাত মুছে ট্রাই করবে, শুকনা কাপড় পেচিয়ে ট্রাই করবে একবার, দুইবার-বাসায় তার পুরুষটা মজুদ থাকলে সে কখনও তৃতীয় চেস্টা করবে না।
নারীর মধ্যে কোন ক্ষুদ্রতা নাই, মানুষের (পড়তে হবে পুরুষ) অবদানের স্বীকৃতি সে দিতে জানে। কিন্ত বিস্ময়, সে সম্ভবত জানে না কিভাবে এই তৃতীয় বা পরবর্তী প্রচেষ্টা গুলো নিতে হয়? সে কি জানে? নাকি জানে না? এর উত্তর আমার জানা নাই। অথচ নারী শ্রমবিমুখ? সে কায়িক শ্রম এড়াতে চায়? খুব ভুল কথা, ভুল ভাবনা।
পারিবারিক জীবনে যে কোন একটা সফরের কথা ভাবি—তা সেই হানিমুন করতে সেন্ট মার্টিন ভ্রমন হোক, অথবা যে কোন ছুটিতে কক্সবাজার যাওয়া হোক-মেয়েটার ভুমিকা সব সময় যেন অনুগামীর। ট্রান্সপোর্ট কি হবে, কোন হোটেলে থাকা হবে, কি খাওয়া দাওয়া হবে-মেয়েটা সেই সিদ্ধান্ত গ্রহনের আলোচনায় অংশগ্রহন করবে, তার মতামত জানাবে, কিন্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কোন ভুমিকা নিবে কি? বুকিং এর জন্য সে হোটেলে ফোন করবে কি? কিংবা বাসের টিকিটের জন্য কোচ অফিসে?
মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যদি ফিরে যাই, যখন ঝাঁক বেধে হাজার হাজার বিপন্ন মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য চলছে অজানার উদ্দেশ্যে। আমাদের মেয়েটিও ধরা যাক আছে এই দলে, কোলে তার শিশু সন্তান, সাথের ব্যাগে জরুরী কিছু ব্যাবহার্য্য। শারিরীক কষ্ট উপেক্ষা করে মেয়েটি চলছে তার স্বামীর সাথে। সামনে অজানা বিপদ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে মেয়েটি বিপর্যস্ত্য। অথচ এর মাঝেও এক দৃঢ় বিশ্বাস তার মনে কাজ করে... তার পুরুষ শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচিয়ে দেবে। মাথার ওপর ওত পেতে থাকা বিপদের দিনেও, সাথে তার স্বামীর উপস্থিতি তার চারপাশে এক ধরনের নিরাপত্তার বোধ তৈরি করে। তাকে বাড়তি সাহস যোগায়। এই পুরুষ তার কাছে একটা নিশ্চিন্তির জায়গা, যা তাকে ঘিরে রাখে, আগলে রাখে-তাকে নিরাপত্তা বোধের এক অনুভুতি যোগায়। মাথার ওপর ছাতা হয়ে থাকে।
কিন্ত বিপদের মাঝে দাড়িয়ে, তা থেকে রেহাই পাবার সেই রাস্তা খোঁজার কাজটা মেয়েটা নিজেও করে না কেন? কেন মেয়েটার ইচ্ছা জাগে না, কোন একটা পরিবারের ক্ষেত্রে নিজে ছাতা হয়ে ওঠার? এমনটা কি কখনও ঘটে? বিপদজনক কোন পরিস্থিতিতে মেয়েটা কি করা যায়, তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে? কোন উদ্যোগ নিচ্ছে? খোঁজার চেষ্টা করবে কোন এলাকায় বিপদের মাত্রা কতটুকু? সম্ভবত না।
এ পর্যন্ত আলোচনা যা এগুলো তাতে করে নারীর আচরনের একটা প্যাটার্ন কি দাড় করানো যায়? আমরা কি ভাবতে পারি, সমাজ সংসার-পরিবারে নারী এবং পুরুষের ভুমিকা স্থির নির্দির্ষ্ট? এই ভুমিকার বাইরে আমরা অন্য কিছু কল্পনাও করতে পারি না??
কিছুক্ষনের জন্য আমরা কল্পনার জগতে ফিরে যাই—কিছু দৃশ্যকল্পের কথা আমরা অনুমান করতে থাকি। আমাদের মেয়েটার কথায় আমরা আবার ফিরে যাই, চারদিকে ভয়াবহ যুদ্ধের পরিস্থিতি, মেয়েটা স্বামীকে নিয়ে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। আল্লাহ আমাকে মাফ করুক, আমরা ধরে নেই—কোন একটা ঘটনার আকস্মিকতায় তার স্বামীটা মারা গেল, চারপাশে মৃত্যু আর বিপদের অকুলপাথারে মেয়েটা এখন কি করবে? বিপদকে মোকাবিলা করার পরিকল্পনা সে কি করতে পারবে? এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক দৃঢ়তা দেখাতে পারবে? অসহায় নাজুক এই মেয়েটা কি দিশাহারা অবস্থায় নাস্তানাবুদ হয়ে দুনিয়া থেকেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে?
আসলে এরকম কিছু হয় না, আমরা নিশ্চিত, দৈব দুর্বিপাকে মারা না গেলে-আমাদের আলোচ্য মেয়েটিও বেঁচে থাকবে, তার সন্তান কে নিয়ে। খুবই সম্ভব তার চারপাশে তার স্বামীর নিরাপত্তার বলয়টা না থাকলেও মেয়েটা টিকে থাকবে তার শিশু সন্তান কে রক্ষা করে। এমনকি একটু এগিয়ে এমনটাও ভবিষ্যতবানী করে ফেলা যায়, এই শিশুটিও একসময় বড় হবে, যথাযথ যত্ন এবং শিক্ষা পেয়ে।
এটা এভাবে বলেই দেয়া যায়, কারন আমাদের চারপাশে এই সব সাহসী মায়েদের শত সহস্র উদাহরন আছে।মাথার উপর ছাতা হয়ে থাকা স্বামী মারা গেলেও মেয়েরা মোটেও ভেসে যান না, তারা সারভাইব করতে পারেন। প্রয়োজন পরিস্থিতির দাবী মেটাতে, এমনকি রাতারাতি মেয়েরা পারেন- তাদের আচার আচরন, ব্যক্তিত্বকে আমুল বদলে দিতে। নিজ সন্তান এবং পরিবারকে রক্ষার জন্য সে এমন এমন সব ভুমিকা নেয়, তার নিজের কাছেও তা অবিশ্বাস্য ঠেকে, হয়ে উঠে কল্পনার অতীত। নিজকে অতিমানবিক মনে হতে থাকে।
এমন কি অনেকাংশে এই মেয়েটা তার সন্তান আর পরিবারের হাল ধরেন—তার মৃত স্বামীর চেয়েও ভাল ভাবে, আরও পরিপক্কতা আর বিচক্ষনতা দিয়ে। সংসার চালানোর সাথে সাথে-- পারিবারিক ব্যাবসা বাণিজ্য থেকে শুরু করে সম্পত্তির দেখভাল, মামলা মোকদ্দমা কোন দিকটা না তাকে সামলাতে হয়? এমন উদাহরন আমাদের চারপাশে অজস্র আছে যখন মৃত স্বামীর ব্যবসার হাল ধরে সেই ব্যবসাকে সফল ভাবে আরও উন্নত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্বামীর হৃত সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করে তা আরও বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। এই শক্তি এই সাহস এই ধৈর্য্য মেয়েরা কোথা থেকে আমদানি করে? অলৌকিক ধরনের এই সব সাফল্য গাথা কি ভাবে লিখা হয়? মেয়েদের এই লড়াই করার শৌর্য্য বীর্য্যের কাহিনী আপনার আমার খুব কি অচেনা? রুপকথার কাহিনী মনে হয়??
মোটেও তা নয়।
যেমন সোনিয়া গান্ধী
সোনিয়া গান্ধী যখন গৃহবধু ছিলেন—কতখানি যোগ্যতার সাথে তিনি তার কুক, গাড়ীর ড্রাইভার আর ব্যক্তিগত কর্মচারীদের পরিচালনা করতেন? তাদের নির্দেশনা দিতেন? অন্ততঃ আমরা কখনো সোনিয়ার এমন অবিশ্বাস্য অভুতপুর্ব কোন বহুল আলোচিত গুনের রেফারেন্স পাই নাই। আমরা নিশ্চয় ভাবব না, তামিল আত্মঘাতি স্কোয়াডের হিটলিস্টে শুধু রাজীবের নামই ছিল, সোনিয়ার নাম ছিল না!! অথচ সে সব বাঁধা সাফল্যের সাথে মোকাবিলা করে- আজ সাফল্যের বিচারে সোনিয়া কি রাজীবকেও ছাড়িয়ে যান নাই? এত দীর্ঘ সময় ধরে দল এবং সরকার চালনায় এতটা সাফল্য কি রাজীব গান্ধী পেয়েছিলেন?
এবং খালেদা জিয়া
আমাদের বিএনপির বন্ধুরা যাকে দেশনেত্রী বলে সম্বোধন করেন-সেই বেগম খালেদা জিয়ার কথাই ধরি!!! তার শিক্ষাগত যোগ্যতার যে বিবরন পাওয়া যায় তা যেমন আমাদের মুগ্ধ করে না, তেমনি এই প্রশ্ন তোলাই যায়, জিয়ার জীবদ্দশায় বেগম জিয়া টেলিফোনে পারিবারিক কর্মচারীদের বাইরে কাউকে কখনও কোন নির্দেশ দিয়েছিলেন কিনা? জিয়া বেচে থাকলে আজ যিনি ঘর সংসার আর নাতি নাত্নীর বাইরে অন্য কিছু চিনতেন না—তিনি সফল ভাবে এরশাদ বিরোধী গনআন্দোলন চালনা সহ দুই টার্মে দেশের সরকারকে নেতৃত্ব দিলেন!!! জিয়াও তো এত মুরোদ দেখাতে পারেন নি!! এমন কি পারেন নি নিজকে বাঁচিয়ে রাখতে।
ফলে মেয়েরা চাইলে অনেক কিছুই পারে, মাথার ওপর থেকে ছাতা সরে গেলেও, তারা অন্যের মাথার ছাতা হয়ে উঠতে পারে।
প্রশ্ন হলো বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত মেয়েরা তাদের এত এত শক্তি কোথায় লুকিয়ে রাখে? কোথায় খরচ করে??
আপনারা কেউ জানেন??
প্রথম অংশের জন্য Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

