আমার প্রিয় পোস্ট
- আরব আমীরাতে চাকরি পেতে হলে যা জানা দরকার
- বিকল্প ধারা
- কিভাবে একা থাকা অবস্থায় হার্ট এ্যাটাক হলে নিজেকে রক্ষা করবেন? - ওসমাণ
- হে অবিশ্বাসীগণ দেখে (ভিডিও) যাও শিবির কখনো মিথ্যা বলেনা। - ইন্তাজ ভাই
- আউটলুক বিডি গেল, বিডিস্টল গেল; এইবার রেডিও তেহরানের পালা - পাকাচুল
- ২০১১ সালে অষ্কারে নমিনেটেড হল যারা। আপনার দেখা প্রিয় মুভী কোনটি? - বস শাকিল
- জিয়া ও স্বাধীনতা ঘোষণা - শাহেদ সাইদ
- ১৯৫ জনের হিসাব জানি, কিন্তু ৭৫২ জনের হিসেব কে দেবে? - নিঝুম মজুমদার
- মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের সাধারন ক্ষমা নিয়ে একজন আইনজীবির মিথ্যাচার এবং প্রকৃত ঘটনা - এস্কিমো
- দেশের সব জেলা, উপজেলা, থানার মানচিত্রের মেগা কালেকশন
(আপডেেটড) - মানব সন্তান
- বাংলার গর্ব ‘ওয়ারফেইজ’ এর গল্প ২ ! (২০০০-২০১১) - কবি ও কাব্য
- যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল নিয়ে জামাতের ব্রিটিশ আইনজীবি স্টিভেন এর সমালোচনা ও তার আইনী জবাবঃ পর্ব-১ - নিঝুম মজুমদার
- পলাশ ওরফে আকাশগঙ্গা ওরফে লিচুগাছ এর নাম ও পরিচয়



- পাওয়ার ফ্যালকন
- আমার ছাদে বাগানের ছবি পোষ্ট - ২০১১ - এহ্তেশাম
- আকাশগঙ্গা এই কইলজা নিয়া ব্লগিং হয় না - রাতমজুর
- এই দিন দিন নয় আরো দিন আছে, এখন যারা গদিতে তারাও একদিন রাজপথে নামবে - চন্দন
- "থাপড়ায়ে তোর দাত ফেলায়ে দেব, শুয়ারের বাচ্চা কোথাকার" (এটিএন ফুটেজ) - রায়হান রাহী
- হরতালের ভিডিওটা দেখুন । আর মন্তব্য করুন । পুলশ কি এমনি মেরেছে? নাকি বাধ্য হয়েছে ? - অনির্বাণ রায়।
- আরশিতে প্রিয়দর্শিণী, নারীত্বের অবসাদ, একটি গল্প, গল্পে গল্পে সাম্প্রতিক ব্লগ এবং আমার কিছু কথা! - আধাঁরি অপ্সরা
- বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধনী সমূহ - রাকা ও আমি
- আসুন, চিনে রাখি ইসলাম এবং মানবাধিকারের আড়ালে থাকা এক হিংশ্র হায়েনা শাবক - কেলেভুষো
- ধর্ম মানুষকে উদার করে, কিন্তু এর ধর্ম কি? - কালাম আজাদ বেগ
- ইমাম কর্তৃক কলেজ ছাত্রী ধর্ষিত - এম. মাসুদ আলম.
- শতাধিক বিদেশি আইনজীবী পুষবে জামায়াত - পাওয়ার ফ্যালকন
- ব্রেকিং নিউজ : ধর্ষনচেষ্টার অভিযোগে শিবিরকর্মী গ্রেফতার - সবাক
- পূর্ণিমার জবানবন্দি - কবীর হুমায়ূন
- বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে এসো-পুর্নিমা সমাচার। - আকাশের তারাগুলি
- সেনাবাহিনীর কুকীর্তির লিষ্ট : আমাদের গোল্ড ফিশ মেমরীকে ব্লগে সংরক্ষন - শূন্য আরণ্যক
- শহীদ জিয়ার সেই লেখা 'একটি জাতির জন্ম' - পাগশ্রাবনের মেঘ
- ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওয়েব সাইটে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে স্বীকৃতি !!! - আবুল হাসান নূরী
- জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক: কাদের সিদ্দিকী - মোঃ শরিফুল আলম
- Marriage is popular because it combines the maximum of temptation with the maximum of opportunity. - চির সবুজ ২৫
- যেভাবে একটি নতুন ধর্মের প্রবর্তন ঘটাবেন। - ধনাত্মক১০
- কিছুক্ষন আগে একটি প্রেমের লাইভ ট্রাজিক সত্য ঘটনা শুনে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করলাম.. - সমীর কুমার ঘোষ
- খালেদা জিয়া'র জন্মদিনের ডকুমেন্টস - সেলটিক সাগর
- কম্পিউটার, ইলেক্ট্রনিক্স এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনের এক গাদা বাংলা রিসোর্স - ইমতিয়াজ মাহমুদ সজিব
- আমাদের শিবিরের ভাইয়ারা আসলে খুব ভালো, তারা খালি হাতে চলাফেরা করেন। ২৮শে অক্টোবরও তারা খালি হাতেই এসেছিলেন! - ক্র্যাক কমান্ডো
- রূপগঞ্জে সামরিক ভুমি আগ্রাসন:“দিনরাত লেফ-রাইট করলে ক’মণ শস্য ফলে এক গন্ডা জমিতে?” - দিনমজুর
- সফলদের স্বপ্নগাথা-১: আশার কথা বলো স্বপ্ন দেখাও—অপরাহ উইনফ্রে - robot_eee
- অনলাইনেই সেরে নিন ফটোশপের কাজ - Arefin
- পর্যায় সারনী মুখস্থ করুন। (যাদের দরকার) - জিকসেস
- শিবিরের দুটি নৃশংস-ভয়ঙ্কর কিলিং মিশনের মধ্য থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া দুজন ছাত্রনেতার ভাষ্য - অসময়ের আমি
- পিরামিড ট্যুর। টুরিষ্ট কম্পানি খুলতে চাই, তাই পরামর্শ চাই। পার্টনারও চাই। - মাহমুদুল হাসান কায়রো
- বাংলাদেশ জিন্দাবাদঃ ছবিও কথা বলে (ইস্থির ছলচিত্র) - বৃষ্টি বালক
- ঢাবিতে ছাত্রদলের দুই গ্রুপে সংঘর্ষ ( ছবি ব্লগ) - অবিশ্বাসী
- ঢাবিতে ছাত্রদলের অ্যাকশন সমগ্র । (ছবি ব্লগ) - অবিশ্বাসী
- আপনি কি বাংলাদেশের সবগুলা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জানেন...?? বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা ওয়েবসাইট লিংক ও ক্যাম্পাসের ছবি সহ..। - সিষ্টেম ইন্জিনিয়ার
- ধর্মের নামে অত্যাচার এবং আমাদের নাগরিক জীবন - নাগরিক
- জামাত দিচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার সংবর্ধনা : আসুন আলোচনা হোক - শিপন আবদুর রাজ্জাক
- দীর্ঘ বারোঘন্টা ব্যাপী বিনেপয়সায় ইসলামী কনসার্ট শুনলাম! - কৌশিক
- ছিঃ কবি - ইফতেখার.আমিন
- জামায়াতের ধর্ম ব্যবসার কিছু নমুনা এবং জামায়াত থেকে যে কারণে দূরে থাকতে হবে। - হা...হা...হা...
- সঠিক পথে গাড়ী চালানোর লাইসেন্স পেতে যা করতে হবে... - মেসবাহ য়াযাদ
- শিবিরের নৃশংসতা মারুফ কি পঙ্গু হয়ে যাবে? - শওকত
- ভিভা এটিম! - লাল মিয়া
- এ'টিমের জন্মদিন ।। সময়ের নবকুমারদের জন্য তিনউল্লাস - হাসান মোরশেদ
- NEW YORK TIMES ঃ সোনার পুলা কোকো এর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এইবার মার্কিন আদালতে প্রামানীত!!(বিশ্ব মিডিয়ার লিংক সহ) - বৃষ্টি বালক
- আমেরিকায় সিমেন্সের বিরুদ্ধে ঘুস প্রদানের মামলায় খালেদা জিয়ার পুত্র ও সাংগপাংগদের ৩৭ কোটি টাকা ঘুস প্রদানের স্বীকারোক্তি - কৌশিক
- মুর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন ১: অপরাজেয় বাংলা - লাল দরজা
- মিথ্যার বেসাতি : নীল আর্মস্ট্রং এর মুসলিম হয়ে ওঠার ইসলামী কল্পকাহিনী - লাইটহাউজ
- উইকিতে ত্রিভূজের ভন্ডামী - মুনতাসির হাসান
- অনেকদিন পর টেকি মাতব্বরী করতে গিয়া ধরা খাইলাম
(যারা থান্ডারবার্ড ইউজ করবেন তাদের জন্য ফরজ) - আসিফ আহমেদ
- স্বাধীনতার পরিক্রমা - বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র - রাগিব
- পাগলের রাজণৈতিক প্রলাপ : ( বিশেষ পর্ব) [স্বঘোষিত রাজাকারদের অপপ্রচারের প্রতিবাদ] - এ. এস. এম. রাহাত খান
- উইনএক্সপি তে করাপটেড ফাইল যেভাবে ঠিক করবেন। - আহমদ কায়েস
- ধোলাইসমগ্র : একটি ক্ষুদ্র ক্রনোলজি - নার্ভাস নাইনটিজ
- অর্ন্তজালের বাংলা ওয়েব সাইটগুলোর একটা তালিকা তৈরী করলাম। - একজন ব্লগার
- জীবন এক অন্তহীন সম্ভাবনা , এসএসসি পাশ ছেলেমেয়েদের জন্যও সেই সম্ভাবনা উন্মুক্ত থাকুক - আরিফ জেবতিক
- হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধঃ২৫শে মার্চ ১৯৭১,আজ সেই কালরাতঃ পাকিস্তানি সৈন্যদের বরবর্তায় মুছেগেল হাসনাহেনার গন্ধ । - আবুল বাহার
- বাংলা বর্নমালা শিক্ষা - বড়বেলা - হাসিব
সাইদী সমগ্র
২২ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১১:৪১
![]()
=====================================
Click This Link
জামাতে ইসলামীর প্রথম সারির নেতা মওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী মুক্তিযুদ্ধকালে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কুখ্যাত। জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ ও শিশুসাহিত্যিক ড. জাফর ইকবালের পিতা তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমানসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা হত্যা, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ ও লুটপাটে অভিযুক্ত ধর্মের লেবাসধারী এই নেতা স্বাধীন বাংলাদেশেও দীর্ঘ সাড়ে ৩ দশক ধরে নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। মওলানা সাঈদী পবিত্র ইসলাম ধর্মকে পুঁজি হিসেবে
ষ প্রথম পাতার পর ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলসহ তার দল জামাতের হীন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে চলেছেন।
দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ (সদর ও নাজিরপুর উপজেলা) আসনে বিএনপি-জামাত জোটের প্রার্থী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হন। বিগত সপ্তম সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে নগণ্য ব্যবধানে জয়ী হলেও সাঈদীর এই জয়ের পেছনে ছিল সা¤প্রদায়িক অপপ্রচার, সংখ্যালঘু হিন্দু স¤প্রদায়ের ওপর নির্মম নির্যাতন, ভোট চুরিসহ নানা গুর"তর অভিযোগ।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজ জেলা পিরোজপুরে হিন্দু স¤প্রদায়ের ঘরবাড়ি, সম্পদ লুট করেছেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে গণহত্যা ও নির্যাতনে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেন সাঈদী। পিরোজপুরে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, নির্যাতন, লুটতরাজসহ নানা যুদ্ধাপরাধের অন্যতম হোতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী। তার এসব অপকর্মের বহু নজির ও সাক্ষী আজো পাওয়া যাবে তার হাতে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেঁচে থাকা পিরোজপুরের স্বজনহারা মানুষের ঘরে ঘরে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধী ও ঘাতক সাঈদীর দুষ্কর্মের কিছু বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে গঠিত জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট’-এ। ওই রিপোর্টে বলা হয় :
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই জামাত নেতা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য তার নিজ এলাকায় আল বদর, আল শামস এবং রাজাকার বাহিনী গঠন করেন এবং তাদের সরাসরি সহযোগিতা করেন। ১৯৭১ সালে তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না, তবে তথাকথিত মওলানা হিসেবে তিনি তার স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতা পরিচালনা করেছেন। তার এলাকায় হানাদারদের সহযোগী বাহিনী গঠন করে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে লুটতরাজ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, হত্যা ইত্যাদি তৎপরতা পরিচালনা করেছেন বলে তার বির"দ্ধে অভিযোগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি তার এলাকায় অপর চারজন সহযোগী নিয়ে ‘পাঁচ তহবিল’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, যাদের প্রধান কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী বাঙালি হিন্দুদের বাড়িঘর জোরপূর্বক দখল করা এবং তাদের সম্পত্তি লুণ্ঠন করা। লুণ্ঠনকৃত এ সমস্ত সম্পদকে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ‘গনিমতের মাল’ আখ্যায়িত করে নিজে ভোগ করতেন এবং পাড়েরহাট বন্দরে এসব বিক্রি করে ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পাড়েরহাট ইউনিয়নের সাবেক কমান্ডার মিজান তালুকদার একাত্তরে সাঈদীর তৎপরতার কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় লিপ্ত ছিলেন। তিনি ধর্মের দোহাই দিয়ে পাড়েরহাট বন্দরের হিন্দু স¤প্রদায়ের ঘরবাড়ি লুট করেছেন ও নিজে মাথায় বহন করেছেন এবং মদন নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীর বাজারের দোকানঘর ভেঙে তার নিজ বাড়ি নিয়ে গেছেন। দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সাহেববাজারের বিভিন্ন মনোহারি ও মুদি দোকান লুট করে লঞ্চঘাটে দোকান দিয়েছিলেন। দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর অপকর্ম ও দেশদ্রোহিতার কথা এলাকায় হাজার হাজার হিন্দু-মুসলিম আজো ভুলতে পারেনি। (মাসিক নিপুণ, আগস্ট ১৯৮৭)।
মিজান তালুকদার আরো বলেন, একাত্তর সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী তার বড়ো ভাই আব্দুল মান্নান তালুকদারকে ধরে পাড়েরহাটে শান্তি কমিটির অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে আব্দুল মান্নান তালুকদারের ওপর সাঈদী অকথ্য নির্যাতন চালায় এবং তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা মিজান তালুকদার কোথায় আছে জানতে চায় ও তার সন্ধান দিতে বলে।
গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা (বর্তমানে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়) পিরোজপুরের এডভোকেট আলী হায়দার খানও সাঈদীর বির"দ্ধে অনুরূপ অভিযোগ এনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সাঈদীর সহযোগিতায় তাদের এলাকার হিমাংশু বাবুর ভাই ও আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করা হয়েছে। পিরোজপুরের মেধাবী ছাত্র গণপতি হালদারকেও সাঈদী ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তৎকালীন মহকুমা পুলিশ প্রশাসক (এসডিপিও) ফয়জুর রহমান আহমেদ ( ঔপন্যাসিক হূমায়ূন আহমেদের পিতা), ভারপ্রাপ্ত মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) আবদুর রাজ্জাক এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান, স্কুল হেডমাস্টার আব্দুল গাফফার মিয়া, সমাজসেবী শামসুল হক ফরাজী, অতুল কর্মকার প্রমুখ সরকারি কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীদের সাঈদীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় হত্যা করা হয় বলে তিনি জানিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য সরবরাহকারী ভগীরথীকে তার নির্দেশেই মোটরসাইকেলের পিছনে বেঁধে পাঁচ মাইল পথ টেনে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
পাড়েরহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ আলাউদ্দিন খান জানিয়েছেন, সাঈদীর পরামর্শ, পরিকল্পনা এবং প্রণীত তালিকা অনুযায়ী এলাকার বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের পাইকারি হারে নিধন করা হয়। পাড়েরহাটের আনোয়ার হোসেন, আবু মিয়া, নূর"ল ইসলাম খান, বেনীমাধব সাহা, বিপদ সাহা, মদন সাহা প্রমুখের বসতবাড়ি, গদিঘর, সম্পত্তি এই দেলোয়ার হোসেন সাঈদী লুট করে নেন বলে তিনি গণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছেন।
পাড়ের হাট বন্দরের মুক্তিযোদ্ধা র"হুল আমীন নবীন জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদী এবং তার সহযোগীরা পিরোজপুরের নিখিল পালের বাড়ি তুলে এনে পাড়ের হাট জামে মসজিদের গনিমতের মাল হিসেবে ব্যবহার করে। মদন বাবুর বাড়ি উঠিয়ে নিয়ে সাঈদী তার শ্বশুরবাড়িতে স্থাপন করেন। র"হুল আমীন জানান, ১৯৭১ সালের জুন মাসের শেষের দিকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রেশন সংগ্রহ করতে পাড়েরহাটে গেলে দেখেন স্থানীয় শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৬০/৭০ জনের একটি দল পাড়ের হাট বন্দরে লুটপাট করছিল। পিরোজপুরের শান্তি কমিটি ও রাজাকার নেতাদের মধ্যে সেদিন পাকিস্তানি সেনা দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, সেকান্দার শিকদার, মওলানা মোসলেহ উদ্দিন, দানেশ মোল্লা প্রমুখ। এ ছাড়াও সাঈদীকে একটি ঘরের আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যেতে দেখেছিলেন র"হুল আমীন।
র"হুল আমীন নবীন আরো জানান, সাঈদী এবং তার সহযোগীরা তদানীন্তন ইপিআর সুবেদার আব্দুল আজিজ, পাড়েরহাট বন্দরের কৃষ্ণকান্ত সাহা, বাণীকান্ত সিকদার, তর"ণীকান্ত সিকদার এবং আরো অনেককে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছেন। সাঈদী হরি সাধু ও বিপদ সাহার মেয়েদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছেন। বিখ্যাত তালুকদার বাড়িতে লুটতরাজ করেছেন। ওই বাড়ি থেকে ২০/২৫ জন মহিলাকে ধরে এনে পাকসেনাদের ক্যাম্পে পাঠিয়েছেন।
ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শহীদের অপর পুত্র কথাশিল্পী মুহম্মদ জাফর ইকবাল জানিয়েছেন, দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর সহযোগিতায় ফয়জুর রহমান আহমেদকে পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করে এবং হত্যার পরদিন সাঈদীর বাহিনী পিরোজপুরের ফয়জুর রহমান আহমেদের বাড়ি সম্পূর্ণ লুট করে নিয়ে যায়।
======================================
Click This Link
"লোকটা দৌড়াচ্ছে। পিছনে এক বাঘ তাড়া করতেছে। লোকটা জীবন হাতে নিয়ে দৌড়াচ্ছে। প্রচন্ড বেগে দৌড়াতে হচ্ছে আর কিছুক্ষণ পরপর পিছনে ফিরে থাকাতে হচ্ছে কখন বাঘটা কাছে চলে আসে আবার। দৌড়াতে দৌড়াতে একটু দূরে একটা গাছ দেখা গেল। গাছের কাছে আসল। তাড়াতাড়ি গাছে বেয়ে উঠল। উঠে একটা ডালে উঠে বসল। নিচে বাঘটা এসে গাছের নিচে দাড়ি্য়ে আছে। যে পাশে বাঘ দাড়িয়ে আছে সেপাশ ছাড়া অন্য সবপাশে বিশাল গর্ত। গর্তের মধ্যে বিরাট বিরাট সাপ, বিচ্ছু অন্য ভয়ংকর পোকামকড়। নিচে নামলেই বাঘে ধরবে। গাছ থেকে পড়ে গেলেই সাপে খাবে। এমন সময়ে দেখা গেল একটা সাদা পাখি আরেকটা কাল পাখি যে ঢালে সে বসে আছে সে ঢালে ঠোঁট দিয়ে আঘাত করতেছে আর ঢালটা আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে। ঢাল কেটে গেলেই সে গর্তে পড়ে যাবে। মহাভয়ংকর অবস্থা। সে চিন্তা করে কাঁপতেছে প্রচন্ডভাবে। হঠাৎ তার মাথায় একটা কি যেন পড়ল। উপরের দিকে থাকিয়ে দেখে একটা মধুর চাক। সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা মধু পড়তেছে।একটু চেখে দেখল সে জিবে নিয়ে। খুব মিষ্টি। সে গাল হা করে মধু খেতে আরম্ভ করল। মধুর চাকের দিকে হা করে মধু খেতে খেতে সে বাঘের কথা, গর্তের কথা, সাপের কথা, পাখির কথা ভুলে গেল।সে সুমিষ্ট মধুর জগতে হারিয়ে গেল।"
হঠাৎ লোকটার স্বপ্ন ভেংগে গেল। বুঝল এতক্ষণ সব স্বপ্ন ছিল। এরকম অদ্ভুত স্বপ্ন দেখার কারন কি সে বুঝতে চেষ্টা করল। এক বুজুর্গ লোক ছিলেন এলাকায় যিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতেন। সকাল উঠেই তার কাছে গেল। তিনি সব শুনে বললেন "আসলে এটা সব মানুষের জন্যই বাস্তবতা, স্বপ্ন নয়। যে বাঘটাকে দেখলেন সেটা আজরাইলের প্রতিমূর্তী। মৃত্যু যে আমাদের প্রতিমুহুর্ত্যে তাড়া করতেছে সেটাই এটা বুঝাচ্ছে। গর্তটা হল কবর। কবরের আযাব বুঝাচ্ছে গর্তের মধ্যে সাপ, বিচ্ছু দিয়ে। পাখি দুটা দিন আর রাতকে বুঝাচ্ছে। গাছের ঢালটা হল আমাদের হায়াত। রাতদিন কাটতে কাটতে আমাদের হায়াত ফুরিয়ে যাচ্ছে। যেকোন সময় মৃত্যু হবে আর কবরে যেতে হবে। মধুটা হচ্ছে দুনিয়ার লোভ, সম্পত্তি, টাকা পয়সা। আর দুনিয়ার লোভে পড়ে আমরা মৃত্যুর কথা, কবরের কথা, হায়াতের কথা সব ভুলে বসে আছি, আছি দুনিয়ের সুখ নেওয়ার তালে।
২.
এই কাহিনীটা ছিল ক্লাশ ফাইভে থাকাকালীন সময়ে শুনা। সাইদীর ওয়াজের ক্যাসেট ছিল আমার কাজিনের কাছে। সেখানে প্রথম সাইদীর ওয়াজে শুনেছিলাম এটা। চট্টগ্রামে সাইদী'র সম্মেলন "ইসলামী সমাজকল্যান সংস্থা" নামক জামাত শিবিরের একটা সংগঠনের ব্যানারে হয়। সম্মেলনের নাম "তাফসীরুল কোরআন মাহফিল"। আমার এক চাচাতভাই সাইদীর খুব ভক্ত ছিল। সাইদীর ওয়াজের সব ক্যাসেট উনার কাছে ছিল। আমার সাইদীর সাথে পরিচয় খুব ছোট বয়সে। চাচাতভাইয়ের বাসায় সাইদীর ওয়াজের ক্যাসেট শুনলাম। বলতে দ্বিধা নেই যে সাইদীর ওয়াজ মনে খুব দাগ কেটেছিল। আমি প্রায়ই সাইদীর ওয়াজ শুনার জন্য চাচাতভাইয়ের কাছে যেতাম। সাইদীর কন্ঠ
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০০৮ রাত ১২:০৮ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
এস্কিমো বলেছেন:
জমা রাখলাম।
নাভদ বলেছেন:
মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরে ৩০ হাজার মানুষ হত্যা পিরোজপুর, ১৮ আগস্ট (শীর্ষ নিউজ ডটকম): পিরোজপুরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় হানাদার বাহিনী এ এলাকায় হত্যাযঞ্জ, ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ এবং লুটপাটও চালিয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের প্রধান সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ হেলাল উদ্দিন তদন্তের প্রথম দিনে এক প্রেস ব্রিফিং এ কথা জানিয়েছেন।
পুলিশ কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত দল পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ বুধবার পিরোজপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামে সরেজমিনে তদন্ত শুরু করেন। এসময় সাঈদীসহ ৫ রাজাকারের বিরুদ্ধে মানিক পশারী নামে এক ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীর দায়েরকৃত মামলায় ১২ জন সাক্ষী, রাজাকার কমান্ডার মমিন হাওলাদারের ছেলে আঃ কাদেরসহ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী তদন্ত টিমের কাছে সাক্ষী দেন। সাক্ষীরা তদন্তদলকে জানান, ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও তার সঙ্গীরা এ অঞ্চলে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।
সাক্ষীদেরমধ্যে মমিন হাওলাদারের ছেলে আঃ কাদের হাওলাদার তদন্ত দল ও সাংবাদিকদের বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার বাবা প্রায় ৪ শতাধিক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, নারীদের ধরে পাকসেনাদের ক্যাম্পে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর বেশ কিছুদিন পালিয়ে থেকে নিজেকে রক্ষা করেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, রাজাকারের ছেলে বলে মানুষ আমাদের ঘৃণা করে, এধরনের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া উচিত। মামলার বাদী মানিক পশারী তদন্ত দল ও সাংবাদিকদের বলেন, সাঈদীসহ সকল রাজাকারদের বিচার হবে বলে ৩৮ বছর ধরে দিন গুনেছি। জামায়াত নেতা সাঈদী ভয়ঙ্কর প্রকৃতির লোক। সে ও তার সঙ্গীরা আমার বাড়িতে লুটপাট, অগ্নি সংযোগসহ বাড়ির দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত ইব্রাহিমকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। তিনি অভিযোগ করেন মামলা দায়েরের পর সাঈদীর অনুসারী কবির মেম্বার, মোস্তফা আকন, মাহাবুব খলিফাসহ জামায়াতের ক্যাডাররা পায়ের রগকাটাসহ মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।
নাভদ বলেছেন:
পিরোজপুরে সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে।
পিরোজপুরে দায়ের করা ২টি মামলার তদন্তে সহকারি পুলিশ সুপারিনন্টেন্ড হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ট্রাইবুনালের ৩ সদস্যের একটি দল ১২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন।
আমাদের সংবাদদাতা জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরে সংগঠিত হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে মামলার বাদী পাড়েরহাটের চিথুলিয়া গ্রামের মানিক পসরীর বাড়িতে এ সাক্ষ্য নেয়া হয়। পুলিশের পরিদর্শক নূর হোসেন ও পরিদর্শক ওবায়দুল্লাহ এ সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। এ সময় মানিক পসরী বলেন,“আশা করি ঘাতকের বিচার হবেই। এতদিন পর এ সরকারের সময় বিচার পেতে পারি।”
এ সময় মানবতাবিরোধী যে কোনো অপরাধে বা অন্য মামলার সাক্ষ্যও গ্রহণ করবেন বলে জানান তারা। সহকারি পুলিশ সুপারিনন্টেন্ড হেলাল উদ্দিন বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার অঙ্গীকারে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। বিচার কাজটাও সেরকম হবে।”
এ ছাড়া তারা আরো বলেন, আন্তর্জাতিক মানের বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু করার চেষ্টা করবেন।
বৃহস্পতিবার মাহবুবুর রহমানের করা আরেকটি মামলায় জিয়ানগর উপজেলায় সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে।
নাভদ বলেছেন:
সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ মামলার তদন্ত শুরু
পিরোজপুর, অগাস্ট ১৮ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে।
গত বছরের ১২ ও ৩১ অগাস্ট পিরোজপুরের মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে গণতহ্যা, সংখ্যালঘু স�প্রদায়ের বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নি সংযোগের অভিযোগে সাঈদীর বিরুদ্ধে দু'টি মামলা হয়।
বুধবার সকাল ৯টার দিকে তদন্ত দলের তিন সদস্য পিরোজপুর সদর উপজেলার বাদুরা গ্রামে যান।
দলটির প্রধান হলেন- সহকারী পুলিশ সুপার মো. হেলাল উদ্দিন। সদস্যরা হলেন- পুলিশ পরিদর্শক মো. ওবায়দুল্লাহ ও নূর হোসেন।
বাদুরা গ্রামের মানিক পশারি (৬৫) গত বছরের ১২ অগাস্ট সাঈদীসহ পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা করেন।
তদন্ত দলটি মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই গ্রামে রাজাকার ও আলবাদর বাহিনীর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
এ সময় সেখানে পিরোজপুর সদর থানার ওসি মো. শেখ আবু যাহিদ ও স্থানীয় সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন।
বাদি মানিকের বাড়ির পাশে খোলা স্থানে বসে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তারা বাদি ও ১২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন। আরো ৪/৫ জন সাক্ষী এলাকায় না থাকায় তাদের সাক্ষ্য নেওয়া যায়নি।
জবানবন্দি গ্রহণকালে স্থানীয় নারী-পুরুষ এসে ভিড় করেন। এ সময় অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
সেসব ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কোনো কোনো সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন।
দুপুরের দিকে তদন্ত দলের প্রধান এএসপি হেলাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা মানিক পশারির দায়ের করা মামলার ১২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করেছি। আরো কয়েকজন সাক্ষী সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ায় তাদের জবানবন্দি পরে নেওয়া হবে।"
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার তারা অপর মামলাটির তদন্ত করতে জেলার জিয়ানগর উপজেলার টেংরাখালী গ্রামে যাবেন।
ওই মামলাটির বাদি হলেন- টেংরাখালী গ্রামের মাহবুবুল আলম (৫৫)।
জামায়াতের সাবেক সাংসদ সাঈদীর বাড়ি জিয়ানগর উপজেলার সাউথখালী গ্রামে।
সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলা দুটি গত ২১ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/প্রতিনিধি/ডিডি/এমএসবি/২০২২ ঘ.
নাভদ বলেছেন:
ভোরের কাগজ
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার : সাঈদীর বর্বরতার কাহিনী তুলে ধরলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা
আগস্ট ১৯, ২০১০, বৃহস্পতিবার : ভাদ্র ৪, ১৪১৭
কাজী সাইফুদ্দিন অভি : একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালিন পিরোজপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা তদন্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত টিম গতকাল বুধবার থেকে কাজ শুরু করেছেন। প্রথম দিনে তাঁরা ১২ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য গ্রহণসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন।
এ সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের এলাকায় মওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওরফে দেলুর নেতৃত্বে সংঘটিত গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনসহ বিভিন্ন নির্যাতনের লোমহর্ষক কাহিনী বর্ণনা করেন। সেই নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে তাদের চোখ ছলছল করে ওঠে। আবেগাক্রান্ত হয়ে ওঠেন তারা। ফিরে যান মুক্তিযুদ্ধের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে। এদিকে দীর্ঘদিন পর হলেও নরঘাতকদের বিচার শুরু হওয়ায় পিরোজপুরের মানুষ আশায় বুক বেঁধেছে। তাদের আশা, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরজুড়ে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, রাহাজানি করেছে তাদের বিচার বাংলার মাটিতে হবেই।
আমাদের পিরোজপুর প্রতিনিধি অনপু সিকদার, নাজিরপুর প্রতিনিধি এস এম নূরে আলম ও জিয়ানগর প্রতিনিধি আলমগীর কবির জানান, এএসপি হেলালউদ্দিনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ৩ সদস্যের টিম গত মঙ্গলবার রাতে পিরোজপুরে পৌঁছায়। টিমের অন্য ২ সদস্য হলেন এসআই মোঃ নূর হোসেন ও মোঃ ওবায়দুল্লাহ। বুধবার তারা তদন্ত কাজে মাঠে নামেন। সকাল ৯টায় টিমের সদস্যরা পিরোজপুর সদর উপজেলার চিথলিয়া গ্রামে পৌঁছেন। প্রথমেই তারা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানিক পশারীর দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত কাজ শুরু করেন। তদন্তের স্বার্থে সদস্যরা মামলার বাদী, সাক্ষী ও মামলাসংক্রান্ত লোক ছাড়া অন্যদের দূরে সরিয়ে দেন। মামলার ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। মামলার আলামত হিসেবে মানিক পশারীর ঘরের ছবি সংগ্রহ করেন টিমের সদস্যরা।
তদন্ত টিমের প্রধান এএসপি হেলালউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের ঘটনায় জামাতের শীর্ষ নেতা মওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওরফে দেলুর বিরুদ্ধে পিরোজপুর আদালতে দায়ের করা দুটি মামলার তদন্তসহ (যা বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন) মুক্তিযুদ্ধকালীন পিরোজপুরে সার্বিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধসমূহের তদন্ত করা হবে। তিনি বলেন, ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১২ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। বাকি ১২ জন উপস্থিত না থাকায় পরে তাদের সাক্ষ্য নেয়া হবে। মামলায় সাক্ষী হিসেবে নাম উল্লেখ নেই এমন কোনো প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেলে তাদের সাক্ষ্যও নেয়া হবে। অভিযুক্ত মওলনা সাঈদীসহ অন্যদের নামে দায়েরকৃত বিচারাধীন দুটি মামলার তদন্ত কাজ সম্পন্ন করতে যতোদিন লাগবে, আমরা ততোদিন পিরোজপুরে থাকবো।
তদন্ত টিমের প্রধান হেলাল জানান, ১৯৭১ সালে পিরোজপুর এলাকায় ২৫-৩০ হাজার মুক্তিকামী মানুষকে রাজাকারদের সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী হত্যা করে। এছাড়া লুটতরাজ, ধর্ষণ, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এক প্রশ্নের জবাবে তদন্ত টিমের প্রধান বলেন, মওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে বলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাঈদীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার এজহারে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন এজাজের সঙ্গে দেখা করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওরফে দেলু পাকিস্তান রক্ষার শপথ নেন। অন্যদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনী গঠন করে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালান। ৭১ সালের ৮ মে মুক্তিবাহিনীর আলমগীর পশারী, মাহবুব পশারী, চাঁন মিয়া পশারী ও জাহাঙ্গীর পশারীকে দেলু ও তার সহযোগীরা হত্যা করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। পিরোজপুরের চিশতিয়া গ্রামে এসব হত্যাকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ চলে। এতে আরো বলা হয়, ৭১ সালের ২ জুন পিরোজপুরের টেয়রাখালি গ্রামের পূর্ব সীমান্তে উমেদপুর গ্রামে দেলুর নেতৃত্বে তার বাহিনী হিন্দুপাড়া ঘেরাও করে। সেখান থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার লুট করে, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে, নারিকেল গাছে বেঁধে শান্তিপ্রিয় মানুষকে হত্যা করে ও নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেয়।
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের অভিযোগে জামাতে ইসলামীর মওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে পিরোজপুর সদর ও জিয়া নগর থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। গত ২ আগস্ট ২ নম্বর মামলায় সাঈদীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন। আদালত ৪ আগস্ট শুনানির দিন ধার্য করে। ওইদিন আদালত ১০ আগস্ট সাঈদীকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। কিন্তু ১০ আগস্ট সাঈদীর অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে তার আইনজীবীরা আবেদন করলে আদালত ২৪ আগস্ট পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করে ওইদিন তাকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে মিছিল : আমাদের জিয়ানগর প্রতিনিধি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত টিম গতকাল সকালে জিয়ানগরে পৌঁছলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনসহ মুক্তিযোদ্ধারা জামাত নেতা যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে।
নাভদ বলেছেন:
কালের কন্ঠপিরোজপুরে তদন্ত দল'রাজাকার' বাবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিল ছেলে
পিরোজপুর প্রতিনিধি
১৯ আগস্ট ২০১০
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল গতকাল বুধবার পিরোজপুরে সরেজমিনে তদন্ত কাজ চালায়।
তদন্ত দলের প্রধান হেলাল উদ্দিন, দুই সদস্য মো. ওবায়দুল্লাহ (পরিদর্শক) ও নূর হোসেন (পরিদর্শক) গতকাল সকালে সদর উপজেলার বাদুরা গ্রামে যান। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদীর নেতৃত্বে যেসব বাড়িতে লুটপাট ও আগুন লাগানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসব ঘরবাড়ি সরেজমিন গিয়ে দেখেন। যাদের স্বজনদের হত্যা, ধর্ষণ করা হয়েছে তাদের বক্তব্য এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। এ সময় তদন্ত দলের কাছে মামলার বাদী মানিক পশারিসহ ১২ জন যুদ্ধকালীন বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য তুলে ধরে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাড়েরহাট বন্দরের রাজাকার কমান্ডার আবদুল মবিন হাওলাদারের ছেলে কাদের উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে তার বাবার কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেয়। সে বলে, 'একাত্তরে আমার বাবা এমন কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ নাই, যা করে নাই। আমার মা ও আমরা তাকে ঘৃণা করি। মুক্তিযুদ্ধের সময় সে হত্যা, নারী ধর্ষণ, লুণ্ঠন করেছে। অনেক মা-বোনকে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছে। মানুষের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের পরও গর্ব করে সে এ কথা এলাকার অনেককে বলেছে। সাঈদী ছিল আমার বাবার দোসর।'
প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই সাঈদীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা তদন্ত যথেষ্ট স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানের করতে পারব_এমন মনোবল নিয়েই এ কাজ শুরু করেছি। আমরা এখন মানিক পশারির দায়ের করা মামলার ১২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করার কাজ করছি।' তিনি জানান, মামলার অনেক সাক্ষী মাছ ধরার কাজে সাগরে অবস্থান করছে। এ কারণে জবানবন্দি রেকর্ড করতে দেরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, তদন্ত দল বাদুরা গ্রামে কাজ শেষে আজ বৃহস্পতিবার সাঈদীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মামলার তদন্ত কাজে জিয়ানগর উপজেলার টেংরাখালী গ্রামের যাচ্ছে। সেখানেও তারা মামলার বাদী ও সাক্ষীদের জবানবন্দি রেকর্ড করবে।
এদিকে গতকাল তদন্ত দল পাড়েরহাট বন্দরে পেঁৗছালে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ জনগণ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে।
নাভদ বলেছেন:
পিরোজপুরে একাত্তরে ৩০ হাজার মানুষ হত্যা, দাবি তদন্তদলের
পিরোজপুর, সেপ্টেম্বর ২০ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার-আলবদরদের হাতে পিরোজপুরে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ হত্যার তথ্য পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল।
সোমবার জেলার বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের স্থান ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ওপর দ্বিতীয় দফা সাক্ষ্য গ্রহণের প্রথমদিন চার সদস্যের তদন্ত দল প্রধান এ দাবি করেন।
গত ১৮ অগাস্ট তদন্ত দল প্রথম পিরোজপুরে আসে। এ সময় তারা দু'দিনে ৩৫ জনের সাক্ষ্য নেন এবং জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
তারা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ নয়জনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের পৃথক দু'টি মামলায় ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
তদন্ত দলের প্রধান পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সহকারী পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট (এএসপি) মো. হেলাল জানান, পিরোজপুরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৯ হাজার ৯০৬ জনকে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরের পাড়েরহাট, জিয়ানগরসহ এ অঞ্চলে কয়েক হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছে। জেলায় মোট ১২টি বদ্ধভূমি রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনী এ অঞ্চলে অন্তত তিনশ নারীর ওপর নির্যাতন চালায়।
এছাড়া তারা তৎকালীন মহকুমা শহরে ট্রেজারিসহ প্রত্যন্ত এলাকায় ৩৫টি বাড়িতে লুটপাট ও ১৪৬টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে বলে জানান তিনি।
তদন্ত দলের অপর তিন সদস্য হলেন- সিআইডির ইন্সপেক্টর ওয়ায়দুল্লাহ, নূর হোসেন ও শাহজাহান।
সোমবার তদন্ত দল জিয়ানগর উপজেলার পাড়েরহাট রাজলক্ষ্মী উচ্চ বিদ্যালয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ নয়জনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের পৃথক দু'টি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ করে।
সাঈদীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সময় গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে মামলা দু'টি করা হয়।
এর মধ্যে সদর উপজেলার বাদুরা গ্রামের প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা সইজউদ্দীন পশারীর ছেলে মানিক পশারী গত ২০০৯ সালের ১২ অগাস্ট মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে সাঈদীসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।
একই বছরের ৩১ অগাস্ট জিয়ানগর উপজেলার টেংরাখালী গ্রামের জমিরউদ্দিনের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুল আলম একই অভিযোগে সাঈদী ও তার ভাই মোস্তফা সাঈদীসহ চারজনের বিরুদ্ধে অপর মামলাটি করেন।
গত ২৯ জুন জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়।
সোমবার তদন্ত দল সদরের বলেশ্বর খেয়াঘাট বধ্যভূমি, হুলারহাট স্টিমারঘাট বধ্যভূমি, মণ্ডলপাড়া গণহত্যার স্থান, তেজদাসকাঠী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বধ্যভূমি, জুজখোলা বধ্যভূমি পরিদর্শন করে।
সন্ধ্যায় তারা পিরোজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তদন্ত দলের প্রধান জানান, মঙ্গলবার তারা স্বরূপকাঠী উপজেলার কুরিয়ানা পেয়ারা বাগান বদ্ধভূমি পরিদর্শন করবেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/প্রতিনিধি/জেবি/ডিডি/এইচএ/২৩১০ ঘ.
নাভদ বলেছেন:
পিরোজপুরে ২৯,৯০৬ জনকে হত্যার তথ্য
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তদল গতকাল সোমবার পিরোজপুরে দ্বিতীয় দফা সফরের প্রথম দিনে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাক্ষ্য গ্রহণ এবং ঘটনাস্থল ও বধ্যভূমি পরিদর্শন করেছে। অত্যাচারিত পরিবারের সদস্যরা তদন্তদলের কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল-শামসদের বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন। সাক্ষ্য-প্রমাণে জেলায় ২৯ হাজার ৯০৬ জনকে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি হেলাল জানিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা বিভাগের এএসপি হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে চার সদস্যের দলটি জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ ৯ রাজাকারের বিরুদ্ধে দায়ের দুটি মামলার অসমাপ্ত ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। জিয়ানগর উপজেলার পাড়েরহাট রাজলক্ষ্মী উচ্চ বিদ্যালয়ে ওই সাক্ষ্য গ্রহণকালে ১৬৪ ধারায় সাক্ষীদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এর পর তদন্তদল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর সদরের বলেশ্বর খেয়াঘাট বধ্যভূমি, হুলারহাট স্টিমারঘাট বধ্যভূমি, মণ্ডলপাড়া গণহত্যার স্থান, তেজদাসকাঠী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বধ্যভূমি ও জুজখোলা বধ্যভূমি পরিদর্শন করে। সন্ধ্যায় তারা পিরোজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
তদন্তদলের প্রধান হেলাল উদ্দিন জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরের পাড়েরহাট, জিয়ানগরসহ এ অঞ্চলে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ হত্যা করা হয়েছে। জেলার ১২টি বধ্যভূমিতে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিকামী মানুষ ও সংখালঘুদের হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ অঞ্চলে গণহত্যা ছাড়াও অন্তত ৩০০ নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। তা ছাড়া তৎকালীন মহকুমা শহরে ট্রেজারিসহ প্রত্যন্ত এলাকায় ৩৫টি বাড়িতে লুটপাট ও ১৪৬টি বাড়িতে অগি্নসংযোগ করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকাররা।
আজ মঙ্গলবার তদন্তদল স্বরূপকাঠী উপজেলার কুরিয়ানা পেয়ারা বাগান বধ্যভূমি পরিদর্শন করবে। গত ১৮ আগস্ট ট্রাইব্যুনালের তদন্তদল প্রথমবারের মতো পিরোজপুরে আসে। এ সময় তারা দুই দিনে ৩৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও জবানবন্দি রেকর্ড করে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, অগি্নসংযোগ ও লুটতরাজের অভিযোগে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়। পিরোজপুর সদর উপজেলার বাদুরা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সইজউদ্দীন পশারীর ছেলে মানিক পশারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে সাঈদীসহ ছয় রাজাকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। একই বছর ৩১ আগস্ট জিয়ানগর উপজেলার টেংরাখালী গ্রামের জমিরউদ্দিনের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুল আলম একই অভিযোগে সাঈদী ও তাঁর ভাই মোস্তফা সাঈদীসহ চার রাজাকারের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। সাঈদীর বিরুদ্ধে তদন্তের ব্যাপারে এএসপি হেলাল বলেন, তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই এখন বলা যাচ্ছে না।
সাঈদীকে আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হচ্ছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্লার মুক্তির আবেদনসহ পৃথক আটটি আবেদনের ওপর আজ শুনানি হবে।
ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. শাহিনুর ইসলাম গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। তিনি বলেন, মাওলানা সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্য কারা কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত রয়েছে।
নাভদ বলেছেন:
যুদ্ধাপরাধী...??? - অনিমেষ হৃদয়
সাঈদী সাহেবের ওয়াজ যখন প্রথম শুনি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। চট্টগ্রামের হালিশহরে তাঁর বিরাট ওয়াজ মাহফিলে বাবার সাথে গিয়েছিলাম। ওয়াজ শুনতে শুনতে দেখি আশেপাশের লোকজন ভেউ ভেউ করে কাঁদছে। সুরেলা কণ্ঠে অসম্ভব আবেগ নিয়ে সাঈদী বলছিল, ‘ইয়া আল্লাহ! রহিম রহমান হইয়া তুমি কেমনে তোমার বান্দাদের আগুনে পুড়াবা…তোমার পাপী বান্দাদের তুমি ক্ষমা না করলে কে করব……’ আমিও সামলাতে পারলাম না। সাঈদীর আবেগমাখা কণ্ঠ শুনে আমারও চোখে পানি এসে গেল। ওয়াজের শেষে যথারীতি বেশ অনেকজন হিন্দু দেখলাম মুসলমান হচ্ছে। এই দেখে সাঈদীর প্রতি মনটা শ্রদ্ধায় আরো ভরে গিয়েছিল। আহা…কতোই না পূণ্যবান মানুষ দেলোয়ার হোসেন সাঈদী!
আমি যা বলা জন্যে বসেছিলাম ব্যক্তিগত কিছু কথা না বললে বোধহয় সেটা পরিষ্কার হবেনা। আমার বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের সভাপতি। আমার এখনো মনে আছে, বাবার জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনে আমিও একবার মিছিলে যাওয়ার জন্যে খুব কান্নাকাটি শুরু করেছিলাম! ক্লাস সিক্সে থাকার সময়ই আমাকে শিবিরের সমর্থক ফর্ম পূরণ করতে হয়েছিল, সেভেনে থাকতেই পুরোদস্তুর কর্মী। আমার নানা ছিলেন জামাতের রুকন। আমি ঢাকায় নানা-নানুদের সাথেই বেশি থাকতাম, বাবা চিটাগাং থাকতেন, মাঝে মাঝে আসতেন।
বাবার জামাতের বড় নেতা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জামাত নেতা আব্দুল্লাহ আবু তাহেরের সাথে কোন একটা কারণে প্রবল কারণের কারণ বাবা জামাত-শিবিরকে বর্জন করেছিলেন। প্রসঙ্গত বলি, এ নিয়ে আমার নানা ও বাবার মধ্যে দীর্ঘ বিরোধ তৈরী হয়েছিল।
ছোটবেলা থেকেই জামাত-শিবিরের কাছাকাছি থেকেছি, তাদের প্রচুর প্রোগ্রামে গিয়েছি। আমাদের মিরপুরের বাসায় জামাত নেতা কামরুজ্জামান আর এস এ খালেক বেশ কয়েকবার এসেছিলেন। সিক্সে থাকতে একবার নিজামীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। হ্যান্ডশেক করে প্রথম যে কথাটি আমার মাথায় এসেছিল তা হল, ‘হাতটা কি নরম!’ যাই হোক, তাদের বেশ কিছু কর্মকান্ড আমার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। ওই বয়সে খুব বেশি কিছু বুঝিনি, কিন্তু সবকিছুই মাথায় ছিল। পরবর্তীতে যতোই চিন্তা করেছি, ততোই অনেক কিছু আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে। ছাত্রশিবির যে মোটা মোটা কথা সমৃদ্ধ নিজস্ব বোধবুদ্ধিহীন জামাতের লেজবিশেষ, তা বুঝতে আমার বেশিদিন সময় লাগেনি। ইসলাম ইসলাম করে গলা ফাটালেও জামাতই তাদের ইসলাম। মাসে চারটা প্রোগ্রাম আর হাসি হাসি মুখে জামাতের ‘দাওয়াত’ ছাড়া তাদের কিছুই করার নেই। ‘লাখো শহীদের শহীদী কাফেলা’ কথাগুলো শুনলে একসময় রক্ত গরম হয়ে উঠত, এখন হাসি পায়। যাক, সেসব গল্প আরেকদিন। সাঈদীকে নিয়ে ছোট একটা কথা বলতে বসেছি, সেটাই বলি।
বাবা যখন জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন, তখন একবার চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম। সম্ভবত রামগড়ের কাছাকাছি এক জায়গায় সাঈদীর বিরাট ওয়াজ মাহফিল হওয়ার কথা ছিল। জামাত-শিবিরকে মনে মনে ততদিনে ঘৃণা করলেও সাঈদীর বেশ ভক্ত ছিলাম। তাই ঠিক করলাম ওয়াজে যাবো। নামাজ-কালাম তো ঠিকমতো পড়িনা, ওয়াজ শুনে যদি কিছু সওয়াব পাওয়া যায়!
হালিশহরে আমার এক বন্ধু ছিল, কট্টর শিবির। তার বাসায় গেলাম, ভাবলাম দুজনে মিলে ওয়াজ শুনতে যাই। শিবিরের কাজকর্মের জন্যে সে একসময় বাবার বেশ প্রিয়পাত্র ছিল।
বন্ধু আমার কথা শুনে মৃদু হাসল। বলল, ‘দোস্ত, অনেকদিন পর আসছিস, ভাল লাগতেছে। তবে তোকে একটা কথা কইয়া রাখি, শিবির-টিবিরের জন্যে আমার ভিতরে আর কোন টান নাই। খালি বাপের ভয়ে এখনো ঝুইলা আছি। আর সাঈদী সাবের ওয়াজ? হাহাহা…ওই সাঈদী সাব থেকেই তো এদের আসল রূপ চিনছি! তার যেই রূপ আমি দেখছি, এরপর আর এদের সাথে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না…’
ঢাক ঢাক গুড় গুড় না করে সব খুলে বলার জন্যে তাকে চেপে ধরলাম। প্রথমে কিছুক্ষণ ইতস্তত করলেও যখন বুঝতে পারল জামাত-শিবির সম্বন্ধে আমার মনেও আর বিন্দুমাত্র মমতা নেই, তখন সে বলল, ‘বেশ তো। আমার সাথে আজই রামগড় চল। নিজেই দেখবি।'
রামগড়ে বন্ধু আমাকে ছোট একটা বাসায় নিয়ে গেল। সেটা সম্ভবত মেস ছিল। দেখলাম সেখানে অনেকেই তাকে চেনে, খাতির করে বসালো। আমাকে সে পরিচয় করিয়ে দিল ঢাকায় থাকা ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ হিসেবে। বাড়িটার সামনে খোলা জায়গায় বেশ কিছু লোকজন বসে ছিল, আরো দু-তিনজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কিছু বোঝাচ্ছিল। আমাদের ভেতরে বসানো হয়েছিল, আমি কৌতূহল সামলাতে না পেরে বললাম, ‘কি করছে ওরা দেখে আসি…’
বন্ধু সাথে সাথে আমাকে হাত ধরে টেনে বসাল। বলল, ‘চুপ করে বসে থাক! তোর ওখানে যাওয়া যাবেনা। শুধু চেহারাগুলো চিনে রাখ। মিটিং শেষ হলে দু-একজনের সাথে কথা বলতে পারিস।‘
অগত্যা কৌতূহল চেপে বসে রইলাম। তখন যোহরের নামাজের সময় হয়ে গিয়েছিল, আমরা সবাই উঠানে জামাতে নামাজ পড়লাম। সেই লোকগুলোও ছিল। নামাজের পর আলাপের ভঙ্গীতে অল্পবয়সী একজনের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে জানতে পারলাম, তার নাম হামিদুর রহমান, বাড়ি নোয়াখালী। জানলাম, এখানে বেশিরভাগই স্থানীয় বটে, কিন্তু এই এলাকার নয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা এসেছে। দু-একজন আছে অন্যান্য জেলার। শুনে আমার তেমন কিছু মনে হল না। তবে আমার সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার কারণে সে বুড়োমতন একজনের কাছে ধমক খেয়েছিল বলে মনে হল।
পরদিনই সাঈদীর ওয়াজ মাহফিল ছিল। অনেকদিন পর গেলাম।
সাঈদীর অন্য কোন গুণ না থাকুক, এটা স্বীকার করি, তার বাচনভঙ্গী অসাধারণ। নিতান্ত অবিশ্বাসী মানুষটাও বোধহয় কান পেতে শুনবে লোকটা এতো সুন্দর সুর করে কি কথা বলছে।
যাই হোক। মনযোগ দিয়ে ওয়াজ শুনলাম। ছোটবেলার আবেগটা নেই বটে, কিন্তু মনে মনে এখনো তার ওয়াজের তারিফ না করে পারিনা। তবে খেয়াল করলাম নারী প্রসঙ্গ আসলেই সে কোন না কোনভাবে হাসিনা, মতিয়া চৌধুরীর দিকে নিয়ে যাচ্ছিল!
তার ওয়াজে বেশিরভাগ সময়ই কয়েকজন বিধর্মী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ওয়াজ শেষে এই পর্বটা দেখে উঠব ভাবছি, এই সময় ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম। আরো পাঁচ-ছয়জন লোকের সাথে হামিদুর রহমান নামে লোকটিও স্টেজের কাছে লাইন দিয়েছে! ভয়াবহ একটা কথা আমার মনে উঁকি দিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখার জন্যে বসে রইলাম।
অবশেষে যখন সুদূর মাইজদী থেকে আগত ‘হরিনাথ কুণ্ডু’র ডাক শুনে হামিদুর রহমান স্টেজে উঠল বাইয়াত গ্রহণের জন্যে, তখন আমার আর সন্দেহের অবকাশ থাকল না। খেয়াল করে দেখলাম, বাকি যারা ছিল, তাদের মধ্যেও পরিচিত মুখ চোখে পড়ছে, যাদের আমি আগের দিনই ওই বাড়িটায় দেখেছি।
বন্ধু বোধহয় আমার মনের কথা বুঝতে পারল। সান্তনার ভঙ্গীতে আমার কাঁধে হাত রাখল। আমি হনহন করে হেঁটে ওয়াজ মাহফিল থেকে বেরিয়ে এলাম। ধর্মের নামে এতো বড় অনাচার মানুষ করতে পারে, তা তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না! তারমানে ছোটবেলা যত ওয়াজ মাহফিলে দেখেছি মানুষজন হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করছে সাঈদীর মাধ্যমে, তার সবই ভুয়া? তারা সবাই আসলে অন্য এলাকা থেকে ধরে আনা গরীব মুসলমান? ধর্মের ভয় দেখিয়ে, কিংবা টাকার লোভে তাদের অভিনয় করানোর জন্যে আনা হয়েছে?
এই ভয়াবহ সত্যটা হজম করতে আমার সময় লেগেছিল। ঢাকায় এসে পরে আরো কিছু খোঁজখবর করে জানতে পেরেছি, বছরের পর বছর ধরে সাঈদী এই কাজই করে আসছে।
বলা বাহুল্য, জামাত-শিবিরের নামগন্ধও আমি এরপর থেকে সহ্য করতে পারিনা।
মজার ব্যাপার কি, অনেক নন-জামাতিও সাঈদীর ওয়াজের খুব ভক্ত। তারা নিজামী, মুজাহিদকে রাজাকার বলে গালী দেয়, কিন্তু সাঈদীর ওয়াজ শুনে কান্নাকাটি করে। সাঈদীকে যুদ্ধাপরাধী ভাবতে তারা নারাজ। অথচ মানুষের এই ভালবাসাকে সাঈদী কিভাবে ব্যবহার করেছে, ভাবলেও ঘেন্না হয়!
সেসব মানুষদের বলছি…আপনাদের চোখে সাঈদী যুদ্ধাপরাধী না হলেও সে যে প্রকৃতপক্ষে অতি বড় এক মানবতাবিরোধী ধর্ম ব্যবসায়ী তা কি আপনারা জানেন?
যারা সাঈদীকে রাজাকার বলে স্বীকৃতি দেন না তাদের বলি…একাত্তরে পিরোজপুর এলাকা সাঈদীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়েছিল। খুন, ধর্ষণ, পাকিস্তানিদের দালালির জন্যে ‘পাঁচ তহবিল’ নামে যে সংগঠন গঠিত হয়েছিল দক্ষিণে, সাঈদী ছিল তার নেতা। তবে দুঃখের বিষয়, তখনও সে সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না, যার ফলে তার কুকীর্তি সম্বন্ধে পরবর্তীতে সরাসরি খুব বেশি দলিলপত্র পাওয়া যায়না। কিন্তু কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আহসান হাবীবের বাবা ফয়জুর রহমানকে সাঈদীর ‘পাঁচ তহবিল’ বাহিনীর প্ররোচনায়ই হানাদাররা বলেশ্বরী নদীর তীরে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। পাড়ের হাট গ্রামে বিপদ সাহার মেয়ের উপর পাশবিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ সাঈদীর নামে রয়েছে। হিন্দু মেয়েদের হানাদারদের ক্যাম্পে পাঠানোয় সে অনেকসময় হিন্দু ভূমিকা পালন করেছে। স্থানীয় বিখ্যাত তালুকদার বাড়ির লুটপাটের নায়কও ছিল সাঈদী। দানেশ মোল্লা, মুসলিম মাওলানা, আজহার খাঁ তার এসব কুকীর্তির সঙ্গী ছিল।
সাঈদী যুদ্ধের আগে ছিল তার জন্ম স্থান পিরোজপুরের ইন্দুরকানি থানার একজন মুদির দোকানদার। মুক্তিযুদ্ধে দেশদ্রোহীতার পর রাতারাতি সে তার খোল পালটে ফেলে। জন্মগত চমৎকার বাচনভঙ্গীর কল্যাণে সে দ্রুত গ্রামগঞ্জের অশিক্ষিত মানুষের আস্থা অর্জন করে নিয়েছিল। স্বাধীনতার পর সাঈদী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে কয়েকটা সংগঠন গড়ে তোলে, যেগুলোর কারণে সে দেশের পাশাপাশি দেশের বাইরেও রাতারাতি খ্যাতি পেয়ে যায়। ১৯৮৫ সালের পর থেকে জামাতের মাধ্যমে তার উত্থান দ্রুত ঘটতে থাকে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিল করে করে সে তার শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে।
সাঈদী যে নীচু পর্যায়ের একজন ধর্ম ব্যবসায়ী ছাড়া কিছুই নয়, তার বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে সেটা ফুটে উঠেছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এক নির্বাচনী সভায় সে বলেছিল, এই নির্বাচন হবে ইসলাম আর আওয়ামী লীগের নির্বাচন। যারা আওয়ামী লীগে ভোট দেবে, তারা কাফির। এই ধরনের ইসলামবিরোধী কথার কারণে তখন প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। কিন্তু সাঈদী এ ব্যাপারে ক্ষমা পর্যন্ত চায়নি। তাকে দেখেশুনে মনে হয়, ‘ধর্ম মানুষের জন্যে না, মানুষই ধর্মের জন্যে।‘ সাঈদীর কথাই যেন চূড়ান্ত ইসলাম। এবং কিছু বিবেকবর্জিত মানুষ তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করতে দ্বিধা করেনা।
এছাড়া যখন তখন যাকে-তাকে কাফের, মোনাফেক বলে সে আখ্যায়িত করে, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে উষ্কে দেয়ার মত বিভিন্ন কথা তার বক্তব্যগুলোয় শোনা যায়। কয়েক বছর আগে লণ্ডনে তার দেয়া একটা সাক্ষাৎকারের বিরূদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল।
এসব ধর্ম ব্যবসায়ী ধর্মের জন্যে কলঙ্ক। নিজের আখের গুছানোর জন্যে ধর্মকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে তাদের বিবেকে বাধেনা। সাঈদীর মতো ধর্ম ব্যবসায়ীরা যতোদিন থাকবে, ততোদিন ইসলাম আরো বেশি কলঙ্কিত হবে। বাংলার মাটি চিরকালই বিশ্বাসঘাতকদের উর্বরভূমি; সাঈদীরা সেই মীর জাফর, উমিচাঁদদেরই বংশধর। যতোদিন এরা থাকবে, ততোদিন আমাদের দেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবেই থাকবে…যেই স্বপ্ন নিয়ে একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তা কোনদিন সফল হবেনা।
এ ব্যাপারে আরো জানতে এখানে ( Click This Link ) দেখতে পারেন। এ রকম আরো কিছু মানুষের কীর্তি জানার সুযোগ আমার হয়েছে, আশা করি ভবিষ্যতে সেসব জানাতে পারব।
নাভদ বলেছেন:
প্রথম আলো ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০১০, ১০ পৌষ ১৪১৭, ১৭ মহররম ১৪৩২
সাঈদীর বিরুদ্ধে হত্যা লুণ্ঠনে সহযোগিতার তথ্য-প্রমাণ মিলেছে
‘১৯৭১ সালের ৪ মে। মুক্তিযুদ্ধের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৯-২০ জন লোক মধ্য মাসিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে জমায়েত হন। এ সংবাদ পেয়ে স্থানীয় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও তাঁর এদেশীয় সহযোগীরা পাকিস্তানি সেনাদের গোপন খবর দিয়ে মধ্য মাসিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে নিয়ে আসে। পরে সেখানে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের গুলি করে হত্যা করে। তারপর পাকিস্তানি বাহিনী সাঈদীর দেখানো মতে, মণীন্দ্রনাথ মিস্ত্রির বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।...ওই দিন যাঁরা মারা যান, তাঁরা হলেন: বিজয়কৃষ্ণ মিস্ত্রি, উপেন্দ্রনাথ, জগেন্দ্রনাথ মিস্ত্রি, সুরেন্দ্রনাথ মিস্ত্রি, মতিলাল মিস্ত্রি, জগেশ্বর মণ্ডল, সুরেন মণ্ডল ও অজ্ঞাতনামা আরও ছয়জন।’
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তদন্ত সংস্থা আইনজীবীদের (প্রসিকিউটর) মাধ্যমে অগ্রগতির এ প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মো. শাহিনুর ইসলামের কাছে জমা দেয়। এ সময় আইনজীবী প্যানেলের সদস্য জেয়াদ-আল মালুম, মোখলেসুর রহমান, আলতাফ উদ্দিন আহমেদ এবং তদন্ত সংস্থার সদস্য মো. হেলাল উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:
আইনজীবী (প্রসিকিউটর) মোখলেসুর রহমান ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, সাঈদীর বিষয়ে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এতে সুষ্ঠু ও কার্যকর তদন্তের স্বার্থে যথার্থ সময় চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন পর্যন্ত তাঁকে আটক রাখার আরজি জানানো হয়েছে। মোখলেসুর রহমান জানান, ২৯ ডিসেম্বর এ আবেদনের বিষয়ে শুনানি হবে।
সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ:
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অপরাধী সাঈদীর নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একদল রাজাকার পাড়েরহাটের হিন্দুপাড়ায় ঢুকে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক হরলাল মালাকার, অরকুমার মির্জা, তরুণী কান্ত সিকদার, নন্দকুমার সিকদারসহ ১৪ জনকে আটক করে রশি দিয়ে বেঁধে পিরোজপুর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের গুলি করে হত্যা করে নদীতে লাশ ফেলে দেয়।
প্রসিকিউটর (আবেদনকারী) বনাম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওরফে দেলু (অপরাধ সংঘটনকারী) শিরোনামে গতকাল জমা দেওয়া প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওরফে দেলু ট্রাইব্যুনালের ২ নভেম্বর দেওয়া আদেশে বর্তমানে অন্য মামলায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক আছেন। তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী, শান্তিবিরোধী, গণহত্যার অভিযোগসহ পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে দেশে-বিদেশে আরও তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ২৩ ডিসেম্বর তদন্ত শেষ না হওয়ায় তদন্ত শেষে মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ প্রসঙ্গে এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হলো।
প্রতিবেদনে পরবর্তী তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ দিতে এবং অপরাধ সংঘটনকারীর আটকাবস্থা অব্যাহত রাখার আরজি জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তের স্বার্থে সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অন্যান্য আলামত সম্পর্কে তুলনামূলক পর্যালোচনার জন্য অপরাধীকে (সাঈদীকে) তদন্ত কর্মকর্তার হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন আছে।
অভিযোগ:
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পিরোজপুরের স্বাধীনতাকামী মানুষকে দাবিয়ে রাখার লক্ষ্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্নেল আতিক, মেজর নাদের পারভেজ, ক্যাপ্টেন এজাজ, ক্যাপ্টেন কাদরি, ক্যাপ্টেন এরশাদ, সুবেদার সেলিম, ইউসুফ (এরশাদের ভাগনে), হাবিলদার শাহনেওয়াজ, সুবেদার সেলিম (মৃত), সেপাই সিদ্দিকুর রহমানসহ অন্যরা পিরোজপুর জেলার দায়িত্ব নিতে যান। তাঁরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাট করেন। সাঈদীর শিক্ষাজীবনের বর্ণনা তুলে ধরে বলা হয়, সাঈদী জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
১৯৭১ সালের ২ জুন দুপুর ১২টার সময় অপরাধী সাঈদী, হাবিবুর রহমান মুন্সী, মো. মোস্তফা হাসান সাঈদী, ইউসুফ আলী সিকদার, মাওলানা মোসলেহউদ্দিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীসহ মাহবুবুর রহমান হাওলাদারের বাড়িতে ঢুকে তাঁর বড় ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদারকে (মৃত) তাঁদের কাছে হাজির করতে এবং সাক্ষীর বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের ধরে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। মজিদ অস্বীকার করলে অপরাধীরা তাঁর ঘরে ঢুকে স্বর্ণালংকার, ২০ হাজার টাকাসহ মোট তিন লাখ টাকা লুণ্ঠন করে।
আরও হত্যার অভিযোগ:
সাঈদীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এলাকার হিমাংশু বাবুর ভাই ও আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করার অভিযোগ আছে। পিরোজপুরের মেধাবী ছাত্র ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি গণপতি হালদারকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। তৎকালীন এসডিপিও ফজলুর রহমান আহম্মেদ, ভারপ্রাপ্ত এসডিও আবদুর রাজ্জাক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান ও স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল গাফফার মিয়া, সমাজসেবক শামসুল হক ফরাজী, অতুল কর্মকার প্রমুখ সরকারি কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীকে সাঈদীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় হত্যা করা হয়।
প্রতিবেদনে গোলাম আযম প্রসঙ্গ:
পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির গোলাম আযম ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল যথাক্রমে খুলনা ও কুষ্টিয়ায় দলীয় নেতা-কর্মীদের জামায়াতে ইসলামীর ব্যানারে একত্র হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ধ্বংসের ঘোষণা দেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি গ্রামে গ্রামে ‘পিস কমিটি’ গঠনের আহ্বান জানান।
শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠন:
গোলাম আযম ও পাকিস্তানের প্রাদেশিক মন্ত্রী ও খুলনা কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির সভাপতি এ কে এম ইউসুফের আদেশে জামায়াত নেতা দানেশ মোল্লার (মৃত) সভাপতিত্বে জামায়াত নেতা সেকেন্দার সিকদার (মৃত) ও অন্যরা পিরোজপুরে শান্তি কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্যরা স্থানীয় মাওলানা মোসলেম উদ্দিন, সাঈদী, হাবিবুর রহমান মুন্সী ও বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্রদের সমন্বয়ে পিরোজপুরে রাজাকার বাহিনী গঠন করে। দানেশ মোল্লা ও সেকেন্দার সিকদার নেতৃত্বে থাকলেও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওরফে দেলু আরবি ও উর্দু ভাষায় কথা বলার দক্ষতা ও বাকপটু হওয়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগসহ সব কর্মকাণ্ড রক্ষা করতেন। ফলে তাঁর নির্দেশ ও নেতৃত্বে সেখানে মানবতাবিরোধী সব কাজ পরিচালিত হয়।
নাভদ বলেছেন:
মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে সাঈদীর আর্থিক অবস্থা কী ছিল জানতে চেয়ে পুলিশকে তদন্ত সংস্থার চিঠি যাচাই করা হচ্ছে শহীদবাগের বাড়ির মালিকানা
এপ্রিল ১৪, ২০১১, বৃহস্পতিবার : বৈশাখ ১, ১৪১৮
শাহজাহান আকন্দ শুভ: মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে জামায়াতে ইসলামী নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আর্থিক অবস্থা কী ছিল তার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তদন্ত সংস্থা। তারা ৯১৪ শহীদবাগে অবস্থিত সাঈদীর বাড়ির মালিকানা সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইছে। এছাড়াও একাত্তর সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাঈদীর অবস্থান কোথায় ছিল এ ব্যাপারেও প্রকৃত তথ্য জানার চেষ্টা করছে তদন্ত সংস্থা। এসব ব্যাপারে তদন্তপূর্বক প্রাপ্ত তথ্য তদন্ত সংস্থাকে জানাতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ ও পিরোজপুর জেলা পুলিশ সুপারকে। ওই চিঠিতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর স্ত্রী, ছেলেমেয়ে সম্পর্কেও খোঁজখবর নিতে বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, তদন্ত সংস্থার চিঠি হাতে পাওয়ার পর এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে পুলিশ। এরই মধ্যে তারা এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে। তদন্ত সংস্থা সূত্র জানায়, এরই মধ্যে তারা সাঈদীর বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার বিস্তর তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে পিরোজপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে গণহত্যা ও নির্যাতনে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করার অভিযোগ আছে এ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে। এলাকায় আলবদর, আলশামস এবং রাজাকার বাহিনী গঠন করেন এবং তাদের সরাসরি সহযোগিতা করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদী তার এলাকায় অপর ৪ জন সহযোগী নিয়ে ‘পাঁচ তহবিল’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। যাদের প্রধান কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী বাঙালি হিন্দুদের বাড়িঘর জোরপূর্বক দখল, তাদের সম্পত্তি লুট। লুণ্ঠনকৃত সম্পদ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ‘গণিমতের মাল’ আখ্যায়িত করে নিজে ভোগ করতেন এবং পাড়েরহাট বন্দরে এসব বিক্রি করে ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
সূত্র জানায়, পিরোজপুরের মেধাবী ছাত্র গণপতি হালদার, তৎকালীন মহকুমা এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত এসডিও আবদুর রাজ্জাক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান, স্কুল হেডমাস্টার আব্দুল গাফফার মিয়া, সমাজসেবী শামসুল হক ফরাজী, অতুল কর্মকার প্রমুখ সরকারি কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীদের সাঈদীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় হত্যা করার তথ্য আছে তদন্ত সংস্থার কাছে। এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য সরবরাহকারী ভগীরথীকে তার নির্দেশেই মোটরসাইকেলের পেছনে বেঁধে পাঁচ মাইল পথ টেনে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শরীফ ফয়সাল
নাভদ বলেছেন:
সাঈদীর বিরুদ্ধে ৪ হাজার পৃষ্ঠার প্রতিবেদন ঢাকা, মে ৩০ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে একাত্তরে হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠনের অভিযোগের প্রমাণ সম্বলিত ৪ হাজার ৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরি করেছে যুদ্ধাপরাধ তদন্ত সংস্থা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিলের জন্য মঙ্গলবার তা প্রসিকিউশন টিমের কাছে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা সানাউল হক।
তিনি সোমবার বেইলি রোডে তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, "সাঈদী একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও গণহত্যায় জড়িত ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে।"
১৫ খণ্ডের ওই প্রতিবেদনে ৪ হাজার ৭৪টি পৃষ্ঠা রয়েছে বলে জানান তিনি।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সাঈদীকে গত বছর গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর সাঈদীর এলাকা পিরোজপুরে তদন্ত চালিয়ে যুদ্ধাপরাধে তার জড়িত থাকার প্রমাণ সংগ্রহ করেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তারপর গত ১২ মে সেফ হোমে তাকে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে গত বছরের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত জামায়াতের পাঁচ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিএনপিরও দুই নেতা একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের মধ্যে সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের কারাগারে থাকলেও জিয়াউর রহমান আমলের মন্ত্রী আব্দুল আলীম শর্তসাপেক্ষে জামিনে রয়েছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এসএন/এমআই/১২১৫ ঘ.
নাভদ বলেছেন:
কালের কন্ঠসাঈদীর অপরাধের ফিরিস্তি লিখতে ৪০৭৪ পৃষ্ঠা
জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত থাকার অভিযোগ লিখতে লেগেছে চার হাজার ৭৪ পৃষ্ঠা। গণহত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠনসহ নানা অভিযোগসংবলিত ১৫ খণ্ডের এ প্রতিবেদন আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিলের জন্য তা প্রসিকিউশন টিমের কাছে দেওয়া হবে। তদন্ত কর্মকর্তা এম সানাউল হক এ তথ্য জানিয়েছেন।
গতকাল সোমবার বেইলি রোডে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্টে তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, সাঈদীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ_গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগি্নসংযোগসহ নানা অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে ১৫ খণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তদন্তে সন্তোষ প্রকাশ করে সানাউল হক বলেন, 'প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে। অন্য মামলাগুলোর তদন্তেও অগ্রগতি আছে।'
তিনি বলেন, সাঈদীর অপরাধের অধিকাংশই পিরোজপুরে হয়েছে। অপরাধ সংঘটনের এলাকা অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীর এলাকার চেয়ে ছোট হওয়ায় তদন্ত কাজ দ্রুত শেষ করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পরও যদি নতুন কোনো তথ্য আসে তাও যুক্ত করা হবে। ট্রাইব্যুনাল ও প্রসিকিউশন বিভাগ চাইলে অধিকতর তদন্তও হতে পারে।
তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, '৪০ বছর আগে ঘটেছে এসব অপরাধ। এর মধ্যে অনেক সাক্ষী মারা গেছেন। অনেকে আবার বিদেশে চলে গেছেন। অনেক আলামত অবহেলায় নষ্ট হয়ে গেছে। আবার অনেক আলামত ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এ সব কারণে আমাদের বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।' একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সাঈদীকে গত বছর গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর এলাকা পিরোজপুরে তদন্ত চালিয়ে যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেন তদন্ত কর্মকর্তারা। এরপর গত ১২ মে ধানমণ্ডির সেফ হোমে তাঁকে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত সংস্থার তথ্যানুযায়ী, সাঈদীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, অগি্নসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগে জিয়ানগর এবং পিরোজপুর সদর উপজেলায় দুটি মামলা হয়। সদর উপজেলার বাদুরা গ্রামের প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা সইজউদ্দীন পশারীর ছেলে মানিক পশারী গত ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।
ওই বছরের ৩১ আগস্ট জিয়ানগর উপজেলার টেংরাখালী গ্রামের জমিরউদ্দিনের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুল আলম একই অভিযোগে সাঈদী ও তাঁর ভাই মোস্তফা সাঈদীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
গত ২২ সেপ্টেম্বর পিরোজপুরে দ্বিতীয় দফা তদন্তের পর তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল সাংবাদিকদের বলেন, জিয়ানগর, স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ) ও সদর উপজেলায় ১৭টি বধ্যভূমি এবং গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব বধ্যভূমিতে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে কবর দেওয়া হয়। এসব হত্যাকাণ্ডে সাঈদীর সংযোগ খুঁজে পাওয়া গেছে।
এদিকে গতকাল আবারও সাঈদীর জামিনের জন্য আবেদন করেছেন তাঁর আইনজীবী তানভীর আহমেদ আল আমিন। আবেদনটি ট্রাইব্যুনালে পেশ করা হয়। সাঈদী বর্তমানে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আজ তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার কথা রয়েছে।
নাভদ বলেছেন:
সাঈদীর বিরুদ্ধে ৭৩ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রথম আলো -> কুন্তল রায় | তারিখ: ১৭-০৭-২০১১
মুক্তিযুদ্ধের সময় ছয়টি আলাদা ঘটনায় ৭৩ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে। এর মধ্যে কয়েকটি হত্যার ঘটনায় তিনি সরাসরি এবং বাকিগুলোতে পরোক্ষভাবে জড়িত বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এখন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির। আগামী ১০ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু করা হচ্ছে।
তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, ১৯৭১ সালে বরিশাল জেলার পিরোজপুরে (বর্তমান পিরোজপুর জেলা) এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ছয়টি ঘটনায় যথাক্রমে ২০, ১৫, ১৪, ১৩, ১০ ও একজনকে হত্যা করা হয়। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়, এসব হত্যাকাণ্ডের কোনোটিতে সাঈদী নিজে জড়িত ছিলেন, কোনোটিতে তিনি পাকিস্তানি সেনাসদস্য ও স্থানীয় রাজাকার বাহিনীকে সহযোগিতা করেছেন।
জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু গতকাল শনিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগে সাঈদীর বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। ১৪ জুলাই ট্রাইব্যুনালের আদেশেও এ তথ্য বলা হয়েছে।
গত ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর জামিন আবেদনের শুনানি শেষে আদেশে বলা হয়েছিল, সাঈদী অর্ধশতাধিক হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত। এ জন্য ওই দিন সাঈদীর জামিন আবেদন খারিজ করা হয়।
পাড়েরহাট হত্যাকাণ্ড: তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাঈদীর নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি রাজাকার বাহিনী পাড়েরহাটের হিন্দুপাড়ায় আক্রমণ চালায়। সেখানে হরলাল মালাকার, অরকুমার মির্জা, তরুণী কান্ত সিকদার, নন্দ কুমার সিকদারসহ ১৪ জনকে বেঁধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। পাকিস্তানি বাহিনী তাদের গুলি করে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয়।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে আনা অন্য হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি।
পাঁচ তহবিল: আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়, পিরোজপুরে সাঈদী এবং আরও চার রাজাকার মিলে একটি দল গঠন করে, যা পাঁচ তহবিল নামে পরিচিত ছিল। এই দলের অন্য চারজন ছিলেন দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার সিকদার, মাওলানা
মোসলেমউদ্দিন ও হাবিবুর রহমান মুন্সি। দানেশ মোল্লা ও সেকেন্দার সিকদার ছিলেন ওই দলের নেতৃত্বে। তবে আরবি ও উর্দু ভাষায় কথা বলতে পারায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব ছিল সাঈদীর। ওই সূত্রে সাঈদী সহজে পাকিস্তানি সেনাদের ঘনিষ্ঠ হন।
অভিযোগে বলা হয়, ওই পাঁচজন লুটপাট করে পাওয়া স্বর্ণালংকার এবং অর্থ-সম্পদ ‘গণিমতের মাল’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ভাগ করে নিতেন। দলটি পরে ‘পাঁচ তহবিল’ নামে পরিচিত হয়।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনের সময় গঠিত গণতদন্ত কমিশন যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, তাতেও পাঁচ তহবিলের তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৯২ সালে গঠিত ওই গণতদন্ত কমিশনের প্রধান ছিলেন প্রয়াত কবি সুফিয়া কামাল।
মুক্তিযুদ্ধের পর নাম পরিবর্তন: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, সাঈদীর প্রকৃত নাম আবু নাঈম মো. দেলাওয়ার হোসেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে তিনি নিজ গ্রাম সউদখালী থেকে পালিয়ে যান। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর তিনি আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসেন।
অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় করা নিজের কুকীর্তি ঢাকতে তিনি নাম ও জন্মতারিখ পরিবর্তন করেন। নামের আগে ‘আল্লামা’ শব্দ জুড়ে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী নাম ধারণ করেন। এভাবে নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে তিনি স্বাধীন দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিল করতে থাকেন।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগে সাঈদীর নাম ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওরফে দেলু ওরফে দেইল্লা’ লেখা হয়েছে। তদন্তে পাওয়া গেছে, সাঈদী ‘দেলু’ ও ‘দেইল্লা’ নামেও এলাকায় পরিচিত ছিলেন।
নাভদ বলেছেন:
সাঈদীর অপরাধনামা ঢাকা, অক্টোবর ০৩ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- একাত্তরে ৩ হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা, নয় জনেরও বেশি নারীকে ধর্ষণ, বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভাংচুর এবং ধর্মান্তরে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে, যাকে একাত্তরে 'দেইল্লা রাজাকার' নামে চিনতো তার এলাকার লোকজন।
এসব অভিযোগের মধ্যে ২০টি বিবেচনায় নিয়ে সোমবার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার বিচার শুরুর দিন ঠিক হয়েছে আগামী ৩০ অক্টোবর।
অবশ্য কাঠগাড়ায় দাঁড়িয়ে সাঈদী অভিযোগ গঠনের সময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই 'মিথ্যা'।
যুদ্ধাপরাধ তদন্ত সংস্থা ১৫টি খণ্ডে ৪ হাজার ৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সাঈদীর বিরুদ্ধে এসব অপরাধের অভিযোগ আনে।
এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট ২০টি ঘটনা আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠনের আদেশে আদালত বলে, "প্রতিবেদন অনুযায়ী সাঈদী সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন। তার বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, হিন্দুদের জোর করে ধর্মান্তর করানো, লুটতরাজসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অপরাধ সংঘটিত হয় বরিশাল জেলার তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমায়।"
আদেশে বলা হয়, "একাত্তরের ৪ মে শান্তিবাহিনীর সদস্য হিসাবে মধ্য সদর উপজেলার মধ্য মাছিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে ২০ জন বেসামরিক বাঙালির জড়ো হওয়ার খবর পাকিস্তানী বাহিনীকে আপনি দিয়েছেন। তারা পৌঁছানোর পর পরিকল্পিতভাবে আপনি ওই বাঙালিদের হত্যা করেছেন। এর মাধ্যমে আপনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ এর ৩(২)১ অনুযায়ী মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছেন।"
একইদিন সাঈদী তার সহযোগীদের নিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগিতায় মাছিমপুর হিন্দুপাড়ায় আক্রমণ চালিয়ে বিজয় কৃষ্ণ মিস্ত্রী, উপেন্দ্রনাথ মিস্ত্রী, সুরেন্দ্রনাথ মিস্ত্রী, মতিলাল মিস্ত্রী, যজ্ঞেশ্বর মণ্ডল, সুরেন মণ্ডলসহ ১৩ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেন।
ওইদিন মাছিমপুর হিন্দু পাড়ায় মনীন্দ্র পসারী ও সুরেশচন্দ্র মণ্ডলের বাড়ি পুড়িয়ে দেয় সাঈদী ও তার সহযোগীরা। এরপর কালিবাড়ি, মাছিমপুর, পালপাড়া, শিকারপুর, রাজারহাট, ডুমুরতলা, কালামতোলা, নওয়াবপুর, আলমকুঠি, ডুকিগাথি, পারেরহাট এবং চিংড়াখালিতে হামলা চালায়।
একইদিনে সদর থানার এলজিইডি ভবন ও ধোপাবাড়িরে সামনে দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডল, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, পুলিন বিহারী ও মুকুন্দ বালাকে হত্যা করে রাজাকার বাহিনীর লোকজন।
আদালতের অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ৫ মে পিরোজপুরের এসডিও ফয়জুর রহমান আহমেদ, এসডিও মো. আব্দুর রাজ্জাক, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাঈফ মিজানুর রহমানসহ কয়েকজনকে আটক করে নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে সাঈদীর উপস্থিতিতে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যার পর লাশ নদীতের ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ দেশের জনপ্রিয় দুই লেখক হুমায়ূন আহমেদ ও জাফর ইকবাল এবং কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবের বাবা।
আদালত বলেন, "৭ মে আপনি শান্তিবাহিনীর একদল লোক নিয়ে পাকিস্তানী আর্মিকে নিয়ে আসেন। তারা পারের হাট বাজারে আওয়ামী লীগ নেতা, হিন্দু স¤প্রদায়ের লোকজন এবং স্বধীনতার সমর্থকদের দোকান এবং বাড়িতে হামলা চালায়। সেখানে মুকুন্দ লাল সাহার দোকান থেকে বাইশ সের স্বর্ণ ও রৌপ্য আপনি লুট করেছেন।"
৮ মে বেলা দেড়টায় সদর থানার ভাদুরিয়া গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তার বাবা নুরুল ইসলাম খানকে ধরে নিয়ে পাকিন্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেন সাঈদী। এরপর ওই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
"একইদিন বেলা ৩টায় আপনার নেতৃত্বে আপনার সাঙ্গপাঙ্গরা পাক বাহিনীর সহায়তায় চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারীর বাড়িতে হানা দিয়ে তার ভাই মফিজ উদ্দিন ইব্রাহিমসহ দুই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যান। সেখানে পাঁচটি বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেন। আপনি চিনিয়ে দেওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী ইব্রাহিমকে গুলি করে হত্যা করে। পরে পারের হাট বন্দরে হিন্দু স¤প্রদায়ের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।"
ইব্রাহীমের ভাই মানিক পসারী ২০০৯ সালের ১২ অগাস্ট সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুর সদর থানায় যুদ্ধাপরাধের মামলা করেন। ওই মামলা পরে ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।
আদালত বলেন, "২ জুন সকাল নয়টায় আপনার নেতৃত্বে একদল লোক নলবুনিয়ায় আব্দুল হালিম বাবুলের বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন। সে বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন। একইদিন সকাল ১০টায় আপনার নেতৃত্বে আপনার সহযোগিরা উমেদপুর হিন্দু পাড়ায় চিত্তরঞ্জন তালুকদার, জহর তালুকদার, হারেন ঠাকুর, অনীল মন্ডল, বিসাবালী, সুকাবালী, সতিশবালার বাড়িসহ ২৫টি বাড়িতে হামলা চালান। বিসবালীকে নারিকেল গাছের সঙ্গে বেধে হত্যা করা হয়েছে। আপনি সরাসরি ওইসব কাজে অংশ নিয়েছেন।
"একইদিন টেংরাখালির মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে হানা দিয়ে তার ছোট ভাই আব্দুল মজিদ হাওলাদারকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছেন। নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান সম্পদ লুট করেছেন।"
সাঈদী ও তার সঙ্গীরা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পারেরহাট বাজার হিন্দুপাড়ার হামলা চালিয়ে হরলাল মালাকার, অরো কুমার মির্জা, তরনিকান্ত শিকদার, নন্দকুমার শিকদারসহ ১৪ হিন্দুকে ধরে নিয়ে একরশিতে বেঁধে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দুই-তিন মাস পর নলবুনিয়ায় আজহার আলীর বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে ছেলেসহ ধরে এনে নির্যাতন করে সাঈদীর রাজাকার বাহিনীর লোকজন। সাহেব আলীকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
"যুদ্ধের শেষ দিকে ৫০ থেকে ৬০ জন রাজাকার আপনার নেতৃত্বে হোগলাবুনিয়ায় হিন্দুপাড়ায় হামলা চালায়। ১ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে হোগলাবুনিয়া গ্রামের মধুসুধন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামীকে আটক করে ধর্ষণ করেছেন। হিন্দুপাড়ায় আগুন দিয়েছেন।
"আপনার নেতৃত্বে যুদ্ধের শেষ দিকে যে কোনো এক দিন ১৫-২০ জনের একটি দল হোগলাবুনিয়া গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে তরণী সিকদার ও তার ছেলে নির্মল সিকদার, শ্যামকান্ত সিকদার, বানীকান্ত সিকদার, হরলাল শিকদর, প্রকাশ সিকদারসহ ১০ জনকে বেঁধে গুলি চালিয়ে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া হয়।"
পাড়েরহাট বন্দরের উমেদপুর গৌরাঙ্গ সাহার বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার তিন বোন মহামায়া, অন্যরাণী ও কমলা রাণীকে পাক হানাদারদের হাতে তুলে দেয় মাওলানা সাঈদীর লোকজন। সেখানে তারা টানা তিনদিন ধর্ষণের শিকার হন।
"আপনি এই অপরাধ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত", আদালত বলেন।
"স্বাধীনতা যুদ্ধকালে আপনি অন্য সহযোগীদের সঙ্গে বিপদ সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে নিজ বাড়িতে আটকে নিয়মিতভাবে ধর্ষণ করেছেন।"
আদেশে বলা হয়, ভাগিরথি নামে এক নারী পাকিস্তানী সেনাক্যাম্পে কাজ করতেন। পাকিস্তানি বাহিনী সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দেওয়ার অভিযোগে সাঈদী তাকেও আটক করে নির্যাতন করেন। পরে তাকে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
"স্বাধীনতাযুদ্ধকালে আপনি মধুসুদন ঘরামী, কৃষ্ট সাহা, ডা. গণেশ সাহা, অজিত কুমার শীল, বিপদ সাহা, নারায়ণ সাহা, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, নারায়ণ পাল, অমূল্য হালদার, শান্তি রায়, হরি রায় জুরান, ফকির দাস, টোনা দাস, গৌরাঙ্গ সাহা, হরিদাস, গৌরাঙ্গ সাহার মা ও তিন বোন মহামায়া, অন্যরাণী ও কামাল রাণীসহ ১০০/১৫০ জন হিন্দুকে জোর করে ধর্মান্তর করেছেন।"
আদালত সাঈদীকে বলেন, "নভেম্বর মাসের কোনো একদিন ইন্দুরকানি গ্রামের তালুকদার বাড়িতে হামলা করে ৮৫ ব্যক্তিকে আটক করেন। সেখানে পুরুষদের নির্যাতন এবং খগেন্দ্রনাথ সাহার মেয়ে দীপালি, স্ত্রী নিভারাণী, রাজবল্লভ সাহার মেয়ে মায়ারাণীকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছেন। তারা সেখানে ধর্ষণের শিকার হয়।"
অভিযোগ পড়ে শোনানোর পর আদালতের অনুমতি নিয়ে প্রায় আট মিনিট বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।
তিনি বলেন, "আমার বিরুদ্ধে চার সহস্রাধিক পৃষ্ঠার একটি রচনা তৈরি করা হয়েছে। এর প্রতিটি লাইন মিথ্যা, প্রতিটি শব্দ মিথ্যা। এটি সব মিথ্যা, মিথ্যা এবং মিথ্যা।"
এরপর আদালত ২০টি অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযোগ গঠন করে এবং আগামী ৩০ অক্টোবর এ মামলার শুনানি শুরুর তারিখ দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরে হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেপ্তার করা হয় সাবেক সংসদ সদস্য সাঈদীকে। চলতি বছর ১৪ই জুলাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।
সাঈদী ছাড়াও জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতাসহ চার জন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন-দলের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মো. মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামরুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্ল¬া।
এছাড়া দুই বিএনপি নেতাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে এ মামলায়। তাদের মধ্যে সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী আটক থাকলেও জিয়াউর রহমান আমলের মন্ত্রী আব্দুল আলীম শর্তসাপেক্ষে জামিনে রয়েছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এসএন/জেকে/২১১৪ ঘ.
নাভদ বলেছেন:
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারসাঈদীকে দিয়ে বিচার শুরু'এ দিনটির জন্য জাতি ৪০ বছর অপেক্ষা করেছে' একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার শুরু হয়েছে। আগামী ৭ ডিসেম্বর সাঈদীর মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। এই বিচারের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষ গতকাল রবিবার থেকে সূচনা বক্তব্য শুরু করেছে। আজ সোমবার অসমাপ্ত সূচনা বক্তব্য শেষ করবে রাষ্ট্রপক্ষ। এই সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ ৪০ বছর পর মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তির বিচার শুরু হলো।
এ বিচার শুরু করাকে জাতির জন্য মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউিটর গোলাম আরিফ টিপু। ট্রাইব্যুনালে সূচনা বক্তব্যে তিনি বলেছেন, 'এ বিচার রাজনৈতিক অভিলাষ বা ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নয়। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যই এ বিচার।' পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জাতি এ দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে ৪০ বছর ধরে।
তবে সাঈদীর আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বিচার শুরুকে বেমানান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শুনানি শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'যেখানে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের থাকাটা অনিশ্চিত, সেখানে বিচার শুরু বেমানান।'
এদিকে আগামী ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীদের তালিকা এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট দাখিল করতে সাঈদীর আইনজীবীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক কোন বিবেচনায় বিচারকাজ পরিচালনা করছেন, সে বিষয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার আদেশ দেবেন ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গতকাল সাঈদীর মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করে আদেশ দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষে বিচার শুরুর জন্য গতকাল সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন এবং কোন বিবেচনায় বিচারপতি নিজামুল হক বিচারকাজ পরিচালনা করছেন, সাঈদীর আইনজীবীদের সে আবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য ছিল। একই সঙ্গে বিচারকাজ তিন মাস মুলতবি রাখতে আসামিপক্ষে আরেকটি আবেদনেরও শুনানি ছিল গতকাল। এ জন্য সকাল সাড়ে ৯টার আগেই সাঈদীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হয়। সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সাঈদীর উপস্থিতিতে প্রথমেই বিচারপতি নিজামুল হকের বিচারকাজ পরিচালনার বিষয়ে শুনানি হয়। সাঈদীর পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন।
সাঈদীর আইনজীবীরা বলেন, ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার স্বার্থে নিজামুল হকের স্বেচ্ছায় সরে যাওয়া উচিত। নিজামুল হকের বিরুদ্ধে গণতদন্ত কমিশনের সচিবালয়ের সদস্য থাকার অভিযোগ ওঠার পর বিচারকাজ পরিচালনা করা ন্যায়বিচার হবে না। ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, 'যাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন বলে অভিযোগ, তাঁর বিচার আপনি (নিজামুল হক) করতে পারেন না। এরপরও বিচারকাজ পরিচালনা করলে জনমনে ধারণা হবে, ন্যায়বিচার হয়নি। তাই ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিতর্ক এড়াতে ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্যই আপনাকে সরে যাওয়া উচিত। এটা দেশ, জাতি, ট্রাইব্যুনাল ও নিজামুল হকের নিজের জন্য সম্মানজনক হবে।'
সাঈদীর আইনজীবীদের এ বক্তব্যকে আদালত অবমাননার শামিল বলে উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ট্রাইব্যুনালে বলেন, 'আপনি বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। এ অবস্থায় কেউ আপনার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না। সেটা তোলা আদালত অবমাননার শামিল। আপনার বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য থাকলে তা আপিল বিভাগে বলতে পারে। এ মামলায় রায় হওয়ার পর যখন আপিল বিভাগে শুনানি হবে তখন তাঁরা বলার সুযোগ পাবেন। মূলত তারা বিচার কাজ বিলম্বিত করার জন্যই এসব কথা তুলছে। তাদের আবেদন খারিজ করে সূচনা বক্তব্য শুরু করুন।'
শুনানির একপর্যায়ে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাককে উদ্দেশ করে বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, 'আমার প্রত্যাহারের বিষয়ে আপনাদের আবেদনের ওপর শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল ১৪ নভেম্বর আদেশ দেন। এ আদেশে বিষয়টি আমার সুবিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর আমি সব কিছুই দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাইব্যুনালে বসেছি। তাই নতুন করে আবার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কেন?'
পরে বিচারকাজ মুলতবি রাখার আবেদনটি উপস্থাপন করেন সাঈদীর আরেক আইনজীবী তাজুল ইসলাম। তিনি তিন মাস সময় চেয়ে বলেন, 'রাষ্ট্রপক্ষ এক বছর সময় পেয়েছে। আমরা কিছু ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেছি। আরো সংগ্রহ করার পথে। বিচারের জন্য আমরা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুতি নিতে পারিনি। সাক্ষীদের তালিকা ও ডকুমেন্ট সংগ্রহ এবং তা যাচাই-বাছাই করার জন্য তিন মাস সময় প্রয়োজন।'
উভয় পক্ষের বক্তব্য শেষে ট্রাইব্যুনাল আদেশ দেন। কোন বিবেচনায় বিচারপতি নিজামুল হক বিচারকাজ পরিচালনা করছেন, সেই আবেদনের ওপর ২৩ নভেম্বর আদেশের জন্য দিন ধার্য করা হয়। এ ছাড়া সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয় ৭ ডিসেম্বর। এদিন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের হাজির করতে রাষ্ট্রপক্ষকে এবং এদিন সাঈদীর পক্ষের তালিকা ও ডকুমেন্ট জমা দিতে সাঈদীর আইনজীবীদের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দুপুর ২টা থেকে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় রষ্ট্রপক্ষকে।
ট্রাইব্যুনালের এ আদেশের পর ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন মুলতবি রাখার আবেদন করেন। তবে ট্রাইব্যুনাল তাঁর আবেদন নাকচ করে দেন। এরপর দুপুর ২টা ৫ মিনিটে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু সূচনা বক্তব্য শুরু করেন। রাষ্ট্রপক্ষের লিখিত সূচনা বক্তব্যের অংশবিশেষ চিফ প্রসিকিউটর উপস্থাপনের পর তিনি বসে পড়েন। এরপর প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান বক্তব্য পাঠ করেন। ৮৭ পৃষ্ঠার সূচনা বক্তব্যের মধ্যে গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৬১ পৃষ্ঠা পাঠ করা হয়। এ অবস্থায় গতকালের বিচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আজ অসমাপ্ত বক্তব্য উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন।
সূচনা বক্তব্যে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব সিরাজুদ্দৌলার কাছ থেকে ব্রিটিশদের ক্ষমতা দখল, বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা, পাকিস্তানিদের ২৩ বছরের শাসন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট গঠন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, আটষট্টির গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের ৭ই মার্চের ভাষণ, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়ার বৈঠক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ১৪ দফা, ২৫ মার্চে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা (অপারেশন সার্চলাইট) এবং পরে মুজিবনগর সরকার গঠনের প্রসঙ্গ সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হয়।
সূচনা বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'আজকের এই আবেগঘন মুহূর্তে স্মরণ করতে চাই বিভীষিকাময় সেই দিনগুলোর কথা। যেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা চালায়। সেদিন স্বজনহারাদের কান্না আজও থামেনি। ইতিহাসের সেই জঘন্যতম অপরাধের বিচার হচ্ছে। এ বিচার রাজনৈতিক অভিলাষ বা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নয়।'
সূচনা বক্তব্যে আরো বলা হয়, স্বাধীনতাযুদ্ধে ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছেন, দুই লাখের বেশি মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। এক কোটি মানুষ প্রতিবেশী দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে রাষ্ট্রীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করতে আলশামস, আলবদর বাহিনী গঠন করা হয়েছে, শান্তি কমিটি করা হয়েছে। তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় শপথ নেয়।
সূচনা বক্তব্যে আরো বলা হয়, ইতিহাসের জঘন্যতম এ অপরাধের সঙ্গে অধ্যাপক গোলাম আযমসহ জামায়াতের নেতা-কর্মীরা জড়িত। ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল খুলনায় জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্ব জামায়াতের ৯৬ জন নেতা-কর্মী রাজাকার বাহিনী গঠন করে। পরে পাকিস্তান সরকার রাজাকার অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে রাজাকার বাহিনীকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়। রাজাকার বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করত জামায়াতে ইসলামী। পাকিস্তান সরকার একই বছরের ৯ এপ্রিল শান্তি কমিটি গঠন করে। এ কমিটিতে গোলাম আযম সদস্য ছিলেন। ১৪ এপ্রিল শান্তি কমিটির ২১ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটি করা হয়। এতে গোলাম আযম সদস্য ছিলেন। ওই দিন গোলাম আযমসহ বেশ কয়েকজনের নেতৃত্বে পাকিস্তানের পক্ষে বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে মিছিল বের করা হয়। ওই মিছিল হওয়ার পরপরই আজিমপুর কলোনিসহ বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাতে ছাত্রসংঘ জড়িত ছিল।
সাঈদীর অপরাধ সম্পর্কে বলা হয়, সাঈদী পিরোজপুরে ঘরজামাই ছিলেন। ছাত্রসংঘের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাঁকে ছারছিনা মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ১৯৬০ সালে তিনি আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। 'মাওলানা' বা 'আল্লামা' লেখার মতো ডিগ্রি তিনি অর্জন করেননি। কিন্তু নামের সঙ্গে মাওলানা ও আল্লামা লিখে তিনি আইনগত অপরাধ করেছেন। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্তে পাওয়া গেছে, সাঈদী পিরোজপুরের পাড়েরহাটে রাস্তার ওপর তেল, লবণ, মরিচ বিক্রি করতেন। তিনি এখন কোটিপতি। ঢাকায় বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে বহু সম্পদের মালিক তিনি। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বলা হয়, সাঈদী ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হলফনামা জমা দেন। এতে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, আবু নাঈম মো. দেলোয়ার হোসাঈন। তিনি আবু নাঈম মো. বাদ দিয়ে সাঈদী যুক্ত করেছেন। সাঈদীর নেতৃত্বে পিরোজপুর রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। রাজাকাররা পিরোজপুরের পাড়েরহাটে ফকিরদাসের বাড়ি দখল করে রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করে।
সূচনা বক্তব্যে আরো বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৩ মে কর্নেল আতিক, ক্যাপটেন এজাজ, কর্নেল এরশাদসহ বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনী পিরোজপুরে যায়। সেখানে তারা গণহত্যা চালায়। সাঈদী ও তাঁর বাহিনী তাদের সহযোগিতা করে। জাতিগত হত্যা, হিন্দু সম্প্রদায়কে ধর্মান্তরিত করা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অপহরণ ছিল তাদের কাজ। ৪ মে পাকিস্তানি বাহিনী পিরোজপুর শহরে আক্রমণ চালায়। তারা মাছিমপুর, পালপাড়া, শিকারপুর, পাড়েরহাট, টেংরাখালীসহ বিভিন্ন স্থানে হত্যাযজ্ঞ চালায়।
সূচনা বক্তব্যের একপর্যায়ে বিকেল ৪টা বেজে যায়। এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনাল আজ পরবর্তী বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য বিচারকাজ মুলতবি করেন।
ট্রাইব্যুনাল থেকে বেরিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু এবং সাঈদীর আইনজীবী ব্যারিস্টার রাজ্জাক আলাদা ব্রিফ করেন।
সাঈদীর পক্ষে শুনানির সময় জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, নিতাই রায় চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার ফকরুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, সৈয়দ রেজাউর রহমান, সৈয়দ হায়দার আলী, জেয়াদ আল মালুম প্রমুখ।
নাভদ বলেছেন:
সাঈদীর ২০ অপরাধ একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে গণহত্যা, লুটপাটসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ২০টি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এসব অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে। গতকাল রবিবার রাষ্ট্রপক্ষ বিচারের জন্য সূচনা বক্তব্য শুরু করেছে। আজ সোমবার সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আবার উপস্থাপন করবে রাষ্ট্রপক্ষ।
সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া আদেশের সংক্ষিপ্ত রূপ :
'১. একাত্তরের ৪ মে পিরোজপুরের সদর উপজেলার মধ্য মাছিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে জমায়েত হওয়া ২০ জন বেসামরিক বাঙালিকে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। আপনি শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে এই জমায়েত হওয়ার গোপন সংবাদ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে দিয়ে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(২)(এ) ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন।
২. একই দিন আপনি আপনার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় মাছিমপুর হিন্দুপাড়ায় আক্রমণ চালিয়ে বিজয় কৃষ্ণ মিস্ত্রি, উপেন্দ্রনাথ মিস্ত্রি, সুরেন্দ্রনাথ মিস্ত্রি, মতিলাল মিস্ত্রি, যজ্ঞেশ্বর মণ্ডল, সুরেন মণ্ডলসহ ১৩ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেছেন।
৩. একই দিন মাছিমপুর হিন্দুপাড়ায় মনীন্দ্র পসারী ও সুরেশচন্দ্র মণ্ডলের বাড়ি ধ্বংস করেন। এরপর কালীবাড়ি, মাছিমপুর, পালপাড়া, শিকারপুর, রাজারহাট, ডুমুরতলা, কালামতোলা, নওয়াবপুর, আলমকুঠি, ডুকিগাথি, পারেরহাট এবং চিংড়াখালিতে হামলা চালিয়ে অপরাধ করেছেন।
৪. একই দিন সদর থানার এলজিইডি ভবন ও ধোপাবাড়ির সামনে দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডল, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, পুলিন বিহারী ও মুকুন্দ বালাকে হত্যা করে অপরাধ করেছেন।
৫. ৫ মে পিরোজপুরের এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ (কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাবা), এসডিও মো. আবদুর রাজ্জাক, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাঈফ মিজানুর রহমানসহ কয়েকজনকে আটক করে নদীরপাড়ে নিয়ে গিয়ে আপনার উপস্থিতিতে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা এবং লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
৬. ৭ মে শান্তি কমিটির একদল লোক নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পারেরহাট বাজারে আওয়ামী লীগ নেতা, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এবং স্বাধীনতার সমর্থকদের দোকান ও বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন। সেখানে মুকুন্দ লাল সাহার দোকান থেকে ২২ সের স্বর্ণ ও রৌপ্য আপনি লুট করেছেন। ৭. ৮ মে দুপুর দেড়টায় সদর থানার ভাদুরিয়া গ্রামে নুরুল ইসলাম খানের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নুরুল ইসলামকে ধরে নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন। ওই বাড়ি আগুন ধরিয়ে ধ্বংস করে দেন।
৮. একই দিন বিকেল ৩টায় আপনার নেতৃত্বে আপনার সাঙ্গোপাঙ্গরা পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারীর বাড়িতে হানা দিয়ে তাঁর ভাই মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহিম ওরফে কুট্টি নামের দুই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে পাঁচটি বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আপনি চিনিয়ে দেওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী ইব্রাহিমকে গুলি করে হত্যা করে। ওই পারেরহাট বন্দরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে আগুন দিয়েছেন।
৯. ২ জুন সকাল ৯টায় আপনার নেতৃত্বে একদল লোক নলবুনিয়ায় আবদুল হালিম বাবুলের বাড়িতে হামলা চালিয়ে সে বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
১০. একই দিন সকাল ১০টায় আপনার নেতৃত্বে আপনার সহযোগীরা উমেদপুর হিন্দুপাড়ায় চিত্তরঞ্জন তালুকদার, জহর তালুকদার, হারেন ঠাকুর, অনীল মণ্ডল, বিসাবালী, সুকাবালী, সতিশবালার বাড়িসহ ২৫টি বাড়িতে হামলা চালায়। বিসাবালীকে নারিকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে হত্যা করা হয়েছে। আপনি সরাসরি ওই সব কাজে অংশ নিয়েছেন।
১১. একই দিন টেংরাখালির মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে হানা দিয়ে তাঁর ছোট ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদারকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছেন। নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সম্পদ লুণ্ঠন করেছেন।
১২. স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পারেরহাট বাজার হিন্দুপাড়ায় হামলা চালিয়ে হরলাল মালাকার, অরো কুমার মির্জা, তরণিকান্ত শিকদার, নন্দকুমার শিকদারসহ ১৪ হিন্দু ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে এক রশিতে বেঁধে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।
১৩. স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর দুই-তিন মাস পর নলবুনিয়ায় আজহার আলীর বাড়িতে হানা দিয়ে ছেলে সাহেব আলীসহ তাঁকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছেন। সাহেব আলীকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।
১৪. যুদ্ধের শেষের দিকে ৫০ থেকে ৬০ জন রাজাকার আপনার নেতৃত্বে হোগলাবুনিয়ায় হিন্দুপাড়ায় হামলা চালায়। সেখানে ১ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে হোগলাবুনিয়া গ্রামের মধুসূদন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামীকে আটক করে ধর্ষণ করা হয়। হিন্দুপাড়ায় আগুন দেন।
১৫. যুদ্ধের শেষের দিকে যেকোনো একদিন আপনার নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি দল হোগলাবুনিয়া গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে তরণী সিকদার ও তাঁর ছেলে নির্মল সিকদার, শ্যামকান্ত সিকদার, বাণীকান্ত সিকদার, হরলাল সিকদার, প্রকাশ সিকদারসহ ১০ জনকে বেঁধে গুলি চালিয়ে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেয়।
১৬. পাড়েরহাট বন্দরের উমেদপুরে গৌরাঙ্গ সাহার বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাঁর তিন বোন মহামায়া, অন্যরানী ও কমলা রানীকে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে তুলে দিয়েছেন। সেখানে তাঁরা টানা তিন দিন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আপনি এই অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে জড়িত।
১৭. স্বাধীনতা যুদ্ধকালে আপনি অন্য সহযোগীদের সঙ্গে বিপদ সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে নিজ বাড়িতে আটকে নিয়মিতভাবে ধর্ষণ করেছেন।
১৮. ভাগিরথি নামে এক নারী পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে কাজ করতেন। পাকিস্তানি বাহিনী সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দেওয়ার অভিযোগে আপনি তাঁকে আটক করে নির্যাতন করেন। পরে তাঁকে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।
১৯. স্বাধীনতা যুদ্ধকালে আপনি মধুসূদন ঘরামী, কৃষ্ট সাহা, ডা. গণেশ সাহা, অজিত কুমার শীল, বিপদ সাহা, নারায়ণ সাহা, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, নারায়ণ পাল, অমূল্য হালদার, শান্তি রায়, হরি রায়, ফকির দাস, টোনা দাস, গৌরাঙ্গ সাহা, হরিদাস, গৌরাঙ্গ সাহার মা ও তিন বোন মহামায়া, অন্যরানী ও কমলা রানীসহ ১০০ থেকে ১৫০ জন হিন্দুকে জোর করে ধর্মান্তর করেছেন।
২০. নভেম্বর মাসের যেকোনো একদিন ইন্দুরকানি গ্রামের তালুকদার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ৮৫ ব্যক্তিকে আটক করেন। সেখানে পুরুষদেরকে নির্যাতন এবং সেখান থেকে খগেন্দ্রনাথ সাহার মেয়ে দীপালি, স্ত্রী নিভারানী, রাজবল্লভ সাহার মেয়ে মায়ারানীকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছেন। তাঁরা সেখানে ধর্ষণের শিকার হন।'
নাভদ বলেছেন:
একাত্তরে পিরোজপুরজুড়ে সাঈদীর নৃশংসতা: সমকাল প্রতিবেদকগণহত্যা, ধর্ষণ, জাতিগত নিধন, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, লুণ্ঠন ও অগি্নসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষের 'সূচনা বক্তব্য' উপস্থাপন
মঙ্গলবার | ২২ নভেম্বর ২০১১ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪১৮ |
একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে পিরোজপুরে গণহত্যা, ধর্ষণ, জাতিগত নিধন, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, লুণ্ঠন ও অগি্নসংযোগের ঘটনায় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন শেষ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চে গতকাল সোমবার 'সূচনা বক্তব্য' (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর রেজাউর রহমান।
সূচনা বক্তব্যে একাত্তরে গোটা পিরোজপুরে সাঈদীর নৃশংসতা তুলে ধরা হয়। ৮৮ পৃষ্ঠার সূচনা বক্তব্যের ১১৫ ও ১১২ নম্বর প্যারায় বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভানু সাহাকে 'নিয়মিত ধর্ষণ' করতেন সাঈদী। বিপদ সাহার বাড়িতেই সাঈদীসহ রাজাকার সদস্যরা ভানু সাহাকে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করতেন। একইভাবে হুগলাবুনিয়া গ্রামের মুধুসূদন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামীকে ধর্ষণ করা হলে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তার গর্ভে কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বিভিন্ন কথা উঠলে লোকলজ্জায় দেশ ত্যাগে বাধ্য হন শেফালী। বর্তমানে ভানু সাহা ও শেফালী ঘরামী ভারতে অবস্থান করছেন।
রাষ্ট্রপক্ষ সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ধর্ষণের শিকার অনেকেই এখনও বেঁচে আছেন। বিচারের প্রয়োজনে তাদের ট্রাইব্যুনালে আনা হবে। গতকাল সকাল ১০টা ৩৫ থেকে এক ঘণ্টা সাঈদীর উপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন শেষ করা হয়। আগামী ৭ ডিসেম্বর সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু রোববার সূচনা বক্তব্য শুরু করলেও গতকাল প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান বাকি অংশ শেষ করেন।
সাঈদীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের আরও অভিযোগ : সূচনা বক্তব্যের ১১৫ নম্বর প্যারায় আরও বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৫ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে সাঈদীর নেতৃত্বে উমেদপুর পাড়েরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ সাহার বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার তিন বোন মহামায়া, অন্যরানী ও কমলা রানীকে সেনাক্যাম্পে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এ ছাড়া একইভাবে ২৫ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে পাড়েরহাট বন্দরের কিষ্ট সাহাকে হত্যার পর তার মেয়েসহ হিন্দুপাড়ার অসংখ্য নারীকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে ধর্ষণ করা হয়।
সাঈদীর আত্মগোপন :
গতকাল সূচনা বক্তব্যের ১১৮ নম্বর প্যারায় বলা হয়, স্বাধীনতার পর সাঈদী নিজের অপরাধ আড়াল করতে অস্ত্রসহ যশোরের মোঃ রওশন আলীর বাড়িতে আত্মগোপন করেন। অনেকদিন পর মুক্তিযুদ্ধে তার কর্মকাণ্ড জানাজানি হলে পরিবার নিয়ে অন্যত্র চলে যান সাঈদী। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তিনি প্রকাশ্যে আসেন এবং ভুয়া মাওলানা পরিচয়ে ১৯৮৬ সালে পিরোজপুরে ওয়াজ মাহফিল শুরু করেন। এভাবেই তিনি 'আল্লামা ও মাওলানা' পরিচয়ে অপরাধ আড়ালের চেষ্টা করেন।
ধর্মান্তরিতকরণ : প্যারা নম্বর ১১৪ তে বলা হয়েছে, সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী হিন্দু সম্প্র্রদায়ের ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালাত। তাদের বাড়ি-ঘর লুণ্ঠন করাসহ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিত। পরে লোকজন সব হারিয়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। যারা যেতে পারেননি এ রকম মধুসূদন ঘরামী, অজিত কুমার শীল, বিপদ সাহা, নারায়ণ সাহা, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, হরিলাল, অমূল্য হাওলাদার, শান্তি রায়, জুরান, ফকির দাস, জোনা দাসসহ ১০০-১৫০ জন হিন্দুকে সাঈদী ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করেন। তাদের নিয়ে তিনি মসজিদে নামাজ পড়াতেন, তাদের মুসলমান নামও দেন তিনি। স্বাধীনতার পর ধর্মান্তরিত এসব মুসলমান স্বধর্মে ফিরে যান বলে এলাকায় এখন তারা 'ধর্মান্তরিত' বলে পরিচিত।
সাঈদীর ভাষাগত যোগ্যতা :
সূচনা বক্তব্যের ৯৭ প্যারায় সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, 'সাঈদী আরবি ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী এবং বাকপটু। এ কারণে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন এজাজের সঙ্গে ছিল তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এসব যোগ্যতার কারণে তিনি রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার হতে সক্ষম হন। আর কমান্ডার হয়ে সাঈদী ক্যাপ্টেন এজাজসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্যদের পিরোজপুরের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু এলাকার মেয়ে, তরুণীদের ধর্ষণে সহায়তা করতেন।
সূচনা বক্তব্যে দৈনিক সমকাল :
মুক্তিযুদ্ধকালীন সাঈদীর কর্মকাণ্ড তুলে ধরে সমকালে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার বিষয়টি সূচনা বক্তব্যের ১২৫ নম্বর প্যারায় বলা হয়েছে, সাঈদী মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারের নেতা ছিলেন উল্লেখ করে দৈনিক সমকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও লুটপাটের সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে এ বিষয়ে প্রতিকার প্রার্থনা করে সমকাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করা হয়। মামলাটি পিরোজপুর যুগ্ম জেলা জজ আদালতে 'ডিসমিস' হয়ে যায়।
সাঈদীর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ :
সাঈদীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগের মধ্যে রয়েছে একাত্তরের ৮ মে মানিক পশারী ও তার ভাইয়ের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ইব্রাহিম কুট্টিকে ধরে নিয়ে হত্যা, ২৫ মে থেকে ৩১ জুনের মধ্যে নলবুনিয়া গ্রামে আজহার আলীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার ছেলে সাহেব আলীকে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া, ২ জুন বিশা আলীকে নারিকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা।
অন্য আরও অভিযোগে বলা হয়েছে, ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সময়ে আদাকুল গ্রামের বিমল হাওলাদারের ভাই ও বাবাকে ধরে কুড়িয়ানা হাইস্কুল ক্যাম্পে নিয়ে তাদেরসহ ২৫০০-৩০০০ নিরীহ বাঙালিকে পেয়ারা বাগানে নিয়ে হত্যা, ২৫ মে থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময়ের যে কোনো এক দিন হোগলাবুনিয়া গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে তরণী সিকদার ও তার ছেলে নির্মল সিকদার, শ্যামকান্ত সিকদার, বানীকান্ত সিকদার, হরলাল কর্মকার, মাইঠভাঙ্গারের প্রকাশ সিকদারসহ ১০ জনকে গুলি করে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া, ৪ মে থেকে ১৬ ডিসেম্ব্বরের মধ্যে পাড়েরহাটে আক্রমণ করে হরলাল মালাকার, অরকুমার মির্জা, তরণীকান্ত সিকদার, নন্দকুমার সিকদারসহ ১৪ হিন্দুকে রশিতে বেঁধে পাকিস্তানি সেনাছাউনিতে নিয়ে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
শেষাংশ :
১২৬ নম্বর প্যারায় সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, সাঈদী মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস) আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(সি), ৩(২)(জি) এবং ৩(২)(এইচ) ধারার শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ক্ষতিগ্রস্ত, প্রত্যক্ষদর্শী, এলাকাবাসী, একাত্তরের সংবাদপত্র এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রামাণ্য গ্রন্থের ভিত্তিতে সাঈদীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। মুক্তিকামী বাঙালি ও সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি ন্যায়বিচারের জন্য সাঈদীর শাস্তি হওয়া উচিত। আশা করি আদালতে বিচারে এ বিষয়টি প্রমাণিত হবে।
সাঈদীর বিরুদ্ধে গত ৩১ মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা একাত্তরে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনসহ অগি্নসংযোগের অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ সংবলিত ১৫ খ ের ৪ হাজার ৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশন টিমের কাছে জমা দেওয়া হয়। এরপর গত ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি ঘটনায় অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। গত ২৯ জুন থেকে সাঈদী কারাগারে আটক রয়েছেন।
প্রেস বিফিং :
সাংবাদিকদের কাছে সাঈদীর আইনজীবী তাজুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, এটা হচ্ছে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মিথ্যাচার। সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হলে এ বিষয়টি প্রমাণিত হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার দরকার নেই। তৎকালীন কর্মকা ের বিষয়ে গণমাধ্যম ও জীবত সাক্ষীরাই আদালতে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরবেন।
নাভদ বলেছেন:
গণহত্যা ধর্ষণ লুটকাঠগড়ায় সাঈদী (২২/১১/২০১১)
সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন শেষ ॥ সাক্ষ গ্রহণ শুরু ৭ ডিসেম্বর
জনকন্ঠ স্টাফ রিপোর্টার ॥ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার বেলা সাড়ে ১০টায় ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান সোমবার সূচনা বক্তব্য রাখেন। ৭ ডিসেম্বর থেকে প্রসিকিউটরদের সাক্ষ গ্রহণ শুরু হবে। অন্যদিকে চেয়ারম্যান বিচারপতি মোঃ নিজামুল হককে নিয়ে আবেদনের আদেশ বুধবার দেয়া হবে বলে ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে।
উলেস্নখ্য, জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পর দ্বিতীয় ব্যক্তি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী যার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। এর পর গ্রেফতারকৃত জামায়াতের চার শীর্ষ নেতা আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ইতোমধ্যে তদন্ত সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে দাখিল করেছে। তা ট্রাইবু্যনালে উত্থাপনও করা হয়েছে। আরেক বিএনপি নেতা আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ১৬ জানুযারির মধ্যে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল অথবা তদনত্মের অগ্রগতি প্রতিবেদন দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপৰের চীফ প্রসিকিউটরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দাখিল করেছে তদন্ত সংস্থা। প্রসিকিউটর তা ট্রাইব্যুনালকে অবহিত করেছে।
সূচনা বক্তব্যে প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদী বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহম্মেদ ও ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের পিতা এসডিপিও ফয়জুর রহমানকে চিঠি দিয়ে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এর পাশাপাশি সাঈদী ও তার রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা শেফালী ঘরামী, ভানু সাহা, কমলা রানী, মহামায়াসহ অসংখ্য যুবতী নারীকে অপহরণ করে পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের ধর্ষণ করা হয়। সাঈদী মুক্তিযুদ্ধকালে পাড়েরহাট বন্দরের বিপদ সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে নিয়মিত যৌন নিযর্াতন করতেন। বিপদ সাহার বাড়িতেই আটকে রেখে অন্যান্য রাজাকারসহ ভানু সাহাকে নিয়মিত ধর্ষণ করতেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। একসময় ভানু সাহা দেশত্যাগে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। এর আগে রবিবার সূচনা বক্তব্যের ৮৮ পৃষ্ঠার মধ্যে ৬১ পৃষ্ঠা ট্রাইবু্যনালে উপস্থাপন করা হয়। রবিবার চীফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু ও প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান সূচনা বক্তব্য ট্রাইবু্যনালে তুলে ধরেন। সোমবার ৬২ পৃষ্ঠা থেকে ৮৮ পষ্ঠা পর্যনত্ম সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান।
প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান ট্রাইবু্যনালে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদী পাড়েরহাটের বন্দরের কৃষ্ট সাহাকে হত্যা করে তাঁর মেয়েকে ধর্ষণ করার জন্য পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন। উমেদপুর গ্রামে চিত্তরঞ্জন তালুকদার, জহর তালুকদার, হরেন ঠাকুর, মোকেন ঠাকুর, অনিল ম-ল, বিশাবালি, সুকাবালি, সতীশ বালাসহ প্রায় ২৫টি পরিবারের ঘরের মালামাল লুট করা হয়। প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, 'সাঈদী আরবী ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী এবং বাকপটু। এর কারণে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন এজাজের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। এই কারণে তিনি রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার হতে সক্ষম হন।
১৯৭১ সালের ৪ মে দিনের বেলায় পাকিসত্মান হানাদার দখলদার বাহিনীর কর্নেল আতিক ও ক্যাপ্টেন এজাজের নেতৃত্বে সশস্ত্র পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনী ও সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী যৌথভাবে পিরোজপুর শহর আক্রমণ করে। তারা হিন্দু বাড়িগুলোতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাঈদীর সশস্ত্র রাজাকার বহিনী মাসিমপুর হিন্দুপাড়ায় প্রবেশ করে মনীন্দ্র নাথ মিস্ত্রি, সুরেশ চন্দ্র ম-লের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখানে ১৩ জন নিরীহ বাঙালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাজাকাররা চলে গেলে লাশগুলোকে কুকুরে খেতে দেখে স্থানীয় জনগণ। ঐ দিন গুলিতে নিহতদের মধ্যে ছিলেন বিজয় কুঞ্জ মিস্ত্রি, উপেন্দ্র নাথ, মতিলাল মিস্ত্রি, সুরেন ম-লসহ ৬ জন।
১৯৭১ সালের ৭ মে পাড়েরহাটের শানত্মি কমিটি ও সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী সেকেন্দার সিকদার, দানেশ মোলস্না (উভয়ই মৃত) সাঈদীসহ আরও অনেকে পাড়েরহাট বন্দরের উত্তর পাশে রিঙ্াস্ট্যান্ডে গিয়ে পাকিসত্মানী সেনাবাহিনীর আগমনের অপেৰায় দাঁড়িয়ে থাকে। ক্যাপ্টেন এজাজের নেতৃত্বে ২৬টি রিঙ্াযোগে মোট ৫২ জন সেনা পাড়েরহাটে বন্দরে আসে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পাকিসত্মানী সেনাবাহিনীকে স্বাগত জানান। পরে তাঁরা বাজারে আসেন। পাড়েরহাট বন্দরের বাজারে আওয়ামী লীগ, হিন্দু সম্প্রদায় ও মুক্তিযুদ্ধের পৰের নিরীহ লোকদের দোকান ও বাড়িঘর পাকিসত্মানী সেনাবাহিনীকে চিনিয়ে দেয়া হয়। পাকিসত্মানী ক্যাপ্টেন এজাজ শানত্মি কমিটি ও রাজাকারদের আদেশ দেয়, 'লে লেও'। এর পর তারা লুটপাট শুরম্ন করে। লুটতরাজের এক পর্যায়ে মাখন সাহার দোকানের মাটির নিচ থেকে একটি লোহার সিন্দুক হতে ২২ সের সোনা ও রম্নপা লুট করে।
১৯৭১ সালের ৮ মে সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী বাদুরিয়া গ্রামের শহিদুল ইসলাম ওরফে সেলিমের বাড়িতে যায়। তার বাবা নুরম্নল ইসলামকে আটক করে বলে, তুমি আওয়ামী লীগ কর। তোমার ছেলে মুক্তিযোদ্ধা। পাকিসত্মানী সেনাবাহিনী তাঁর ওপর অমানুষিক অত্যাচার করে। আসামি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নির্দেশে মানিক পশারী ও তাঁর ভাইদের ৫টি ঘর, ধানের গোলা ও কাচারি ঘরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
সূচনা বক্তব্যে আরও বলা হয়, সাঈদীর পরামর্শে পাকিসত্মানী সেনাবাহিনী গুলি করে ইব্রাহিম ওরফে কুট্টিকে হত্যা করে ব্রিজের মাথায় ফেলে দেয়। মফিজকে ক্যাম্পে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী পাড়েরহাটের হিন্দু পাড়ায় প্রবেশ করে। সেখানে হরলাল মালাকার, অর কুমার মির্জা, তরণী কানত্ম সিকদার, নন্দ কুমার সিকদারসহ ১৪ জনকে একই রশিতে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে।
সূচনা বক্তব্যে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধকালীন জুন মাসের মাঝামাঝি সাঈদীকে লুঙ্গি কোচামারা, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, বাম হাতে একটা ডেউটিন, মাথায় পিতল ও কাঁসার থালা, জগ, বদনা. বাটি ইত্যাদিসহ একটি ঝাকা নিয়ে উত্তর হতে দৰিণ দিকে ৫ তহবিলের অফিসের দিকে যেতে দেখা গেছে। উলিস্নখিত মালামাল লুট করে নিজ মাথায় বহন করছিল। পাড়েরহাট বাাজারের উত্তর পাশের পুলের কাছে মদন সাহার দোকান ও বসতঘর লুট করে সাঈদী ও তার রাজাকার বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন পাড়েরহাট বাজারের ব্রিজের নিকট লোহালক্কড়ের দোকানদার বসনত্ম ও সুরেন নিজ দোকানে বসে কাঁসার থালায় ভাত খাচ্ছিল। সাঈদী ও তার রাজাকার বাহিনী উক্ত দোকানের সামনে এসে লাথি মেরে তাদের গরম ভাত থালা থেকে ফেলে দেয়। ভাত ফেলে কাঁসার থালা দুটি জোর করে নিয়ে যায়।
মুক্তিযুদ্ধ শুরম্ন হবার দু' তিন মাস পরে রাজাকার সাঈদীর নেতৃত্বে পিস কমিটির দানেশ মোলস্না, সেকেন্দার সিকদার এবং আরও অনেকে আজাহার আলীর বাড়িতে প্রবেশ করে। আজাহার আলীকে আটক করে নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। সাঈদীর নেতৃত্বে হোগলাবুনিয়া গ্রামে ১০ জনকে একই রশিতে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে রয়েছে তরণী সিকদার, নির্মল সিকদার, শ্যাম কানত্ম সিকদার,বাণী কানত্ম সিকদার, হরলাল কর্মকার, প্রকাশ সিকদার, নির্মল সিকদার প্রমুখ।
সূচনা বক্তব্যে বলা হয়, সাঈদী জোর করে হিন্দুদের ধর্মানত্মরিত করে। আসামি নিজেও অন্যদের সহায়তায় পিরোজপুরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তার বিরম্নদ্ধে আনত্মর্জাতিক অপরাধ আইনের ৩(২) ধারায় অপরাধসমূহ সংঘটিত হয়েছে তার বিচার ও নিষ্পত্তি ট্রাইবু্যনালে রয়েছে। সোমবার ট্রাইবু্যনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোঃ নিজামুল হক নাসিমসহ দুই বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির এবং একেএম জহির আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইবু্যনালের সামনে ওপেনিং স্টেটমেন্ট পড়ে শোনানো হয়। এর আগে সাঈদীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইবু্যনালে হাজির করা হয়।
রবিবার সাঈদীর বিরম্নদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরম্ন হওয়ার কথা থাকলেও তার আইনজীবীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সাক্ষ্য গ্রহণ পিছিয়ে দেয়া হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের কেঁৗসুলিদের আগামী ৭ ডিসেম্বর সাক্ষীদের ট্রাইবু্যনালে হাজির করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। সাঈদীর আইনজীবী এ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেছিলেন, 'আমাদের প্রস্তুতি শেষ করতে পারিনি। সাক্ষীদের জেরা করতে আমাদের আরও প্রস্তুতি দরকার।' রবিবার ট্রাইবু্যনালে এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তাঁর বক্তব্যে বলেন, 'অভিযোগ গঠন হয়ে যাওয়ার পর কোন অভিযুক্ত বিচারপতিকে পদত্যাগ করতে বলা যায় না। এটা আদালত অবমাননা। শুধু সময়ক্ষেপণ করার জন্যই এটা করা হচ্ছে।
গত বছর ২৫ মার্চ আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল গঠনের পর প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি সময়ে এসে এই প্রথম অভিযুক্তের বিরম্নদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরম্ন করছে ট্রাইবু্যনাল। বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর দায়ের করা ধমর্ীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মামলায় গত বছরের ২৯ জুন সাঈদীকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ২ আগস্ট তাকে যুদ্ধাপরাধ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
এরপর শুনানি শেষে তার বিরম্নদ্ধে গত ১৪ জুলাই আনা অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল। ৩ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ পুরনো হাইকোর্ট ভবনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনাল স্থাপন করা হয়। ট্রাইবু্যনাল গঠনের পর ২০১০ সালের ২৯ জুন জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে একই বছরের ১৩ জুলাই গণহত্যা মামলায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারম্নজ্জামান এবং আব্দুল কাদের মোলস্নাকে গ্রেফতার করা হয়। সর্বশেষ ১৬ ডিসেম্বর বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১১ সালের ২৭ মার্চ বিএনপির আরেক নেতা আব্দুল আলীমকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি এখন শর্ত সাপেৰে জামিনে রয়েছেন।
নাভদ বলেছেন:
Sayedee in the DockHindus attacked, rapedProsecution tells tribunal about his links to war crimes
Tuesday, November 22, 2011Delawar Hossain Sayedee along with other collaborators kept a Hindu girl confined to her father's house at Parerhat in Pirojpur and raped her day after day during the Liberation War, the International Crimes Tribunal was told yesterday.
The victim, Bhanu Shaha, daughter of Bipod Shaha, left the country after liberation out of fear of public humiliation. She still lives in India, said Syed Rezaur Rahman, a senior prosecutor, while placing the opening statement against Sayedee.
In the tribunal's first trial since its formation on March 25 last year, the prosecution on Sunday got through 61 pages of the statement in court.
Yesterday, Rezaur read out the remaining 27 pages before the three-member panel of judges headed by Nizamul Huq.
On October 3, Jamaat-e-Islami Nayeb-e-Ameer Sayedee, one of the seven Jamaat-BNP leaders detained over war crimes links, was charged with 20 counts of crimes. The charges include genocide, murder, rape, arson, abduction and torture of civilians.
The tribunal will start taking depositions of witnesses on December 7.
Rezaur described the crimes against humanity allegedly committed by Sayedee in 1971 and also the background of the case.
He told the tribunal that Sayedee had led a 50-member team of the Razakar Bahini, an anti-liberation force, in attacking Hindu Para of Hoglabunia under Pirojpur.
Sensing the presence of the miscreants, members of the Hindu community had managed to flee.
The razakars, however, got hold of Shefali Gharami, wife of Madhusudan Gharami, and raped her.
Shefali gave birth to a baby girl after the war but, like Bhanu Shaha, she had to leave for India.
On May 5, 1971, Saif Mizanur Rahman, deputy magistrate of then Pirojpur Sub-Division; Foyezur Rahman Ahmed, sub-divisional police officer and father of famed writer Humayun Ahmed and noted educationalist-writer Muhammad Zafar Iqbal, and Abdur Razzak, SDO in charge of Pirojpur, were taken to the Baleshwar river bank and shot to death.
Sayedee as a member of the killing squad was present there.
Under his pressure, some 100-150 Hindus of Parerhat and other villages converted to Islam and had to go to a mosque, said the prosecutor.
He oversaw the creation of a fund with cash and other property looted by the razakars from the locals, mainly Hindu families. He also issued a Fatwa (religious edict) legalising war booty, said the prosecutor.
He also succeeded in allying himself with the Pakistan army, as he had a good command of Arabic and Urdu.
Sayedee went into hiding after the war but returned to his home district of Pirojpur in 1986. In the guise of an Islamic scholar, he began addressing waz mahfils or religious gatherings to hide his past, Rezaur said.
নাভদ বলেছেন:
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার: সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু (কালের কন্ঠ) একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুল আলম হাওলাদার গতকাল বুধবার দুপুরে ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তাঁর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। এর মধ্যদিয়ে এই প্রথম কোনো মামলায় ৪০ বছর আগের অপরাধের বিচারের জন্য সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হলো। রাষ্ট্রপক্ষ এ দিনটিকে ঐতিহাসিক দিন হিসেবে মন্তব্য করেছে। মাহবুবুল আলম ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় বসা সাঈদীকে দেখিয়ে বলেন, 'এই সেই আসামি, যাঁর নির্দেশে এক রাজাকার বিশাবালীকে গুলি করে হত্যা করে। রাজাকার, শান্তি কমিটির লোক ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন ও হিন্দু সমপ্রদায়ের লোকদের বাড়িঘর লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। আমি তাঁর বিচার চাই।'
বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে গতকাল বুধবার এ সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সাক্ষী হিসেবে অভিযোগকারীর জবানবন্দি নেওয়া শেষ হলেও আসামিপক্ষ আগামী রবিবার তাঁকে জেরা করব। অভিযোগকারীর সাক্ষ্য অসমাপ্ত থাকায় গতকাল ট্রাইব্যুনাল মামলার দুই নম্বর সাক্ষী রুহুল আমিন নবীনের জবানবন্দি নেওয়া শুরু করেছেন। আজ বৃহস্পতিবার তাঁর অসমাপ্ত জবানবন্দি গ্রহণ করবেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিকে সাক্ষ্যগ্রহণ মুলতবি রাখতে সাঈদীর আইনজীবীর আবেদনের ওপর শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও সাঈদীর আইনজীবীর মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের সতর্ক করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আসামি পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য রাখার সময় রাষ্ট্রপক্ষকে কোনো কথা না বলতে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি ঘটলে প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল থেকে বের করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি সাঈদীর আইনজীবী তাজুল ইসলামকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আপনি বিচারকাজকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেন না।
একইসঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন, চার হাজার পৃষ্ঠার ডকুমেন্টের মধ্যে যেসব ডকুমেন্ট পাওয়া যায়নি সেসবের কপি, রাষ্ট্রপক্ষের জব্দ তালিকার ডকুমেন্টের কপি এবং এসব কপি না পওয়া পর্যন্ত বিচারকাজ মুলতবি রাখতে সাঈদীর আইনজীবীর করা পৃথক দুটি আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু এজলাসে বিচারকরা বসার পর সাঈদীর আইনজীবী তিনটি আবেদন উপস্থাপন করেন। ডকুমেন্ট চাওয়া ও বিচারকাজ মুলতবি রাখা এবং পিরোজপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে আইনজীবীদের নিরাপত্তা চেয়ে এ আবেদন করা হয়। এগুলোর ওপর শুনানিকালে সাঈদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
এ পরিস্থিতিতে ট্রাইব্যুনাল উভয়কেই সতর্ক করে দেন। রাষ্ট্রপক্ষকে উদ্দেশ করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, 'এর আগেও আপনাদের সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু আপনারা আসামি পক্ষের বক্তব্যের সময় কথা বলছেন। আসামি পক্ষের বক্তব্যের সময় কথা বলবেন না। কিন্তু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করছেন। কেন এটা করছেন। এটা খেলার মাঠ নয়। আমরা ফুটবল খেলতে আসিনি। যদি একই কাজ করেন, তাহলে আমরা আপনাদের বের করে দিতে বাধ্য হবো।'
রাষ্ট্রপক্ষকে ধমক দেওয়ার পাশাপাশি সাঈদীর আইনজীবী তাজুল ইসলামকেও সতর্ক করে দেন ট্রাইব্যুনাল। তাজুল ইসলাম শুনানির একপর্যায়ে বলেন, এসব ডকুমেন্ট না পেলে বিচারকাজ চলতে পারে না। জবাবে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, আপনি এটা বলতে পারেন না। আপনি এ বক্তব্য দিয়ে কী বোঝাতে চাচ্ছেন। আদালতের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করতে হয়, তা কি জানেন না? এটা ট্রাইব্যুনাল। আপনি বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করতে পারেন না। বড়জোর বলতে পারেন, এসব ডকুমেন্ট না পেলে আপনার মক্কেল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মাহবুবুল আলম হাওলাদারের জবানবন্দি :
এ সাক্ষী নিজেকে ব্যবসায়ী ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে পিরোজপুরে গোয়েন্দা হিসেবে দায়িত্বপালনকারী হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ৯ নম্বর সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও এ কে এম আউয়াল তাঁকে গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ দেন।
মাহবুবুল আলম স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমি সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরে বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী উপায়ন্তর না দেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী গোলাম আযম, খুলনার এ কে এম ইউসুফ, পিরোজপুরের খান মো. আফজালসহ অনেককে নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী বাহিনী হিসেবে শান্তি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির লোকেরা মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের হত্যা করার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শান্তি কমিটি করতে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্র্মীদের নির্দেশ দেন। পরে স্বাধীনতাবিরোধী সেকেন্দার আলী শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মোসলেহ উদ্দিন মাওলানা, আজহার আলী তালুকদার, দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদী, মহসিন, আবদুল করিম, হাবিবুর রহমান মুন্সী, সোবহান মাওলানা, হাকিম কারিসহ আরো অনেককে নিয়ে পাড়েরহাটে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি স্থানীয় সদস্য মোসলেহ উদ্দিন মাওলানা, দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদী, মহসিন, হাবিবুর রহমান মুন্সী, সোবহান মাওলানা, হাকিম কারিসহ বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র এবং স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী রাজাকার বাহিনী গঠন করে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পিরোজপুরে আসে। ৭ মে সকালে আমি বাড়িতেই ছিলাম। লোকমুখে শুনি, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পাড়েরহাটে আসছে এবং পাড়েরহাটের শান্তি কমিটির লোকেরা পাড়েরহাট রিকশাস্ট্যান্ডে তাদের অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষা করছে। আমি পাড়েরহাটে গিয়ে রিকশাস্ট্যান্ডের আড়ালে থেকে গোপনে লক্ষ করি, পাড়েরহাটের শান্তি কমিটির লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর ২৬টি রিকশায় করে ৫২ জন পাক হানাদার বাহিনীর সদস্য রিকশাস্ট্যান্ডে নামে। শান্তি কমিটির লোকজন তাদের অভ্যর্থনা জানায়। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী উর্দু ভাষা জানতেন বিধায় তিনি ক্যাপ্টেন এজাজের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তাঁরা পাড়েরহাট বাজারের ভেতরে যান। যাওয়ার পথে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আওয়ামী লীগ ও হিন্দু সমপ্রদায়ের লোকদের দোকান ও বাড়িঘর ক্যাপ্টেন এজাজকে দেখিয়ে দেন। ক্যাপ্টেন এজাজ লুট করার নির্দেশ দেন। লুটপাট শুরু হয়ে যায়। অবস্থা খারাপ দেখে আমি দূরে সরে যাই। পরে আমি জানতে পারি, ৩০-৩৫টি দোকানঘরের মালামাল ও বসতবাড়িতে লুটপাট করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দায়িত্বে ভাগ বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়। পাড়েরহাটের বড় ব্যবসায়ী মাখন সাহার দোকানঘরের মাটির নিচে একটি লোহার সিন্দুক থেকে ২২ সের সোনা-রুপা লুট করে তারা। পুরোটাই ক্যাপ্টেন এজাজ নিয়ে নেন। ক্যাপ্টেন এজাজ একটি ঘরে এত সোনা পেয়ে পাড়েরহাটের নাম রাখের সোনার বাজার। সাঈদীর নেতৃত্বে পাড়েরহাটের উত্তর দিকে পুলের কাছে মদন সাহার দোকান ও বসতঘরে লুটপাট করা হয়। দোকান ও বসতঘর ভেঙে সাঈদীর শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যায়। পাড়েরহাটের লুটের মালামালসহ প্রায় ১৫ লাখ টাকা দিয়ে পাঁচটি তহবিল গঠন করা হয়।
স্বাধীনতার পর পরই আমি ও মুক্তিযোদ্ধারা ওই লুট করা দোকানঘর সাঈদীর শ্বশুরবাড়ি থেকে উদ্ধার করে মদন সাহাকে ফেরত দিই।'
মাহবুবুল আলম বলেন, প্রাণভয়ে নগরবাসী সাহা, তারক চন্দ্র সাহা ভারতে চলে গেলে তাঁদের ঘরের মালামাল লুট করে নগরবাসী সাহার ঘরে লুটের পাঁচ তহবিলের মালামাল সাঈদী নিজেই বেচাকেনা করতেন। আরো লুটের অর্থ এর সঙ্গে একত্র করা হতো। পরে লুটের এই টাকা ও সম্পদ দিয়ে সাঈদী খুলনায় অট্টালিকাসহ বহু সম্পদ করেন।
পরে বাধুরা, চিতলিয়া গ্রামে মানিক পসারী ও তাঁর ভাইদের বাড়িঘর লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাধুরার মুক্তিযোদ্ধা সেলিম খানের বাড়ি ঘর লুটপাট করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
মাহবুবুল আলম বলেন, সেকান্দার শিকদার ও দানেশ আলী মোল্লার নেতৃত্বে থাকলেও সাঈদী উর্দু ভাষা ভালো জানতেন বিধায় ক্যাপ্টেন এজাজের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সাঈদী শার্সিনা মাদ্রাসায় আলিম ক্লাসে পড়াকালে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁকে বহিষ্কার করে। ৭ মে এসব লুটপাটের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিয়ে সহযোগীরা পাড়েরহাট রাজলক্ষ্মী উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্যাম্প স্থাপন করে। পিরোজপুরের সব এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকদের নিয়ে ধর্ষণ ও লুটপাট, অগি্নসংযোগ, নিরীহ ও সাধারণ মানুষ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের গুলি করে হত্যা করে। মহিলাদের ধর্ষণের উদ্দেশ্যে জোরপূর্বক পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেয়।
মাহবুবুল আলম বলেন, গোয়েন্দা হিসেবে এসব এলাকার অপরাধগুলো কাছ থেকে অবলোকন করি এবং এ খবর সুন্দরবন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে সরবরাহ করি।
আলম বলেন, ৭ মে পাড়েরহাটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আসার আগেই ফকির দাসের ভবনে রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করে।
২ জুনের একটি ঘটনা উল্লেখ করে এই সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে বলেন, ওই দিন সকালে আমি বাড়িতেই ছিলাম। সাক্ষী খলিলুর রহমান ওই দিন ভোরে আমাদের বাড়িতে এসে গোপনে জানিয়ে দেয় যে আমাদের ঘরে যেসব মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন রয়েছে, তাদের ধরার জন্য সাঈদীর নেতৃত্বে শান্তি কমিটি ও রাজাকাররা তাদের একটি তালিকা করেছে। এ খবর পেয়ে আমি ও আমাদের যারা ছিল তাদের নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যাই। পরে লোকমুখে জানতে পারি, অনুমান সকাল ১০টায় সেকেন্দার আলী শিকদার, দানেশ আলী মোল্লা, মোমিন হাওলাদার, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, হাবিবুর রহমান মুন্সী, হাকিম কারিসহ আরো অনেক অজানা-অচেনা রাজাকার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে নিয়ে উমেদপুর গ্রামে হিন্দুপাড়ায় আক্রমণ চালায়। সেখানে চিত্তরঞ্জন তালুকদার, জহর তালুকদার, বিশাবালী, শুখবালী, অনিল মণ্ডলসহ আরো অনেকের ২৫-৩০টি ঘর লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। বিশাবালী অসুস্থ থাকায় তাঁকে ধরে একটি নারিকেলগাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে। এরপর সাঈদীর নির্দেশে জনৈক রাজাকার গুলি করে বিশাবালীকে হত্যা করে। ওই দিন অনুমান ১২টায় হিন্দুপাড়া থেকে বের হয়ে শান্তি কমিটি ও রাজাকাররা আমাদের বাড়িতে যায়। আমাকে এবং আমাদের বাড়িতে থাকা মুক্তিযোদ্ধা লোকদের হাজির করার জন্য আমার ভাই মজিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। তিনি অস্বীকার করলে তাঁর ওপর অত্যাচার করা হয়। আমার বাড়ি থেকে আলমারি খুলে ১০ ভরি স্বর্ণালংকার, ২০ হাজার টাকা, আমার মায়ের ঘর থেকে দুই ভরি স্বর্ণালংকারসহ প্রায় তিন লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায় এবং ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে।
মাহবুবুল আলম আরো বলেন, ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, লুণ্ঠনকারী, ধর্ষণকারী, লাখ লাখ নিরীহ মানুষ হত্যাকারীদের বিচারের জন্য বিগত দিনে কোনো সুযোগ ছিল না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসবের বিচার চেয়ে আমি পিরোজপুরের আদালতে মামলা করি। আদালত ইন্দুরকানি থানার ওসিকে এজাহার গ্রহণের নির্দেশ দেন। ২০০৯ সালে ৮ সেপ্টেম্বর এজাহার থানায় দায়ের করি। এরপর এসআই জাফর আলী হাওলাদারকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত শুরু হলেও কার্যকলাপ কী হয়েছে, তা আর জানা যায়নি। এ অবস্থায় আমি রেডিও-টিভির নিউজে দেখতে পাই, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ওই ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তারাই তদন্ত করবেন। এরপর ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধানের কাছে ২০১০ সালের ২০ জুলাই এই অভিযোগ দাখিল করি। আমি বিচার চাই।
আলমের জবানবন্দি দেওয়া শেষ হলে তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে রাষ্ট্রপক্ষ আলামত হিসেবে চারটি পোড়া ঢেউটিন, একটি পোড়া খুঁটি, একটি চৌকাঠ জব্দ করার তথ্য জানায়। এসব আলামত তদন্ত সংস্থা তার জিম্মায় রেখেছে বলে তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান।
এরপর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম এ সাক্ষীকে জেরা করার জন্য সময় চান। তিনি বলেন, এ সাক্ষী যেসব ঘটনাস্থলের কথা বলেছেন, সঠিক বিচারের স্বার্থে সেসব স্থান পরিদর্শন করা প্রয়োজন। এ জন্য জেরা করা সম্ভব নয়। তাঁর এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেন প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী। তিনি বলেন, জেরা শুরু হতে সমস্যা থাকতে পারে না। জেরা শুরু হোক। এরপর তাঁরা সময় পাবেন ঘটনাস্থল পরিদর্শনের। এরপর ট্রাইব্যুনাল জেরা শুরু করার নির্দেশ দিলে আসামিপক্ষে অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম সাক্ষীকে একটি প্রশ্ন করেন।
যেসব আলামত জব্দ করা হয়েছে, তার কোনোটিই আজ আদালতে নেই, আসামিপক্ষের এই জেরার জবাবে আলম বলেন, 'সত্য'। এই পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল তাঁর বাকি জেরার জন্য আগামী রবিবার দিন ধার্য করেন।
এরপর ট্রাইব্যুনাল ২ নম্বর সাক্ষী রুহুল আমিন নবীনের জবানবন্দি গ্রহণ শুরু করেন। এ সাক্ষী মুক্তিযুদ্ধের পেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন। এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল বিচার কাজ মুলতবি করে বাকি জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আজ বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন।
নাভদ বলেছেন:
ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী মাহবুবুল আলম
সাঈদীর নির্দেশে হিসাব বালীকে হত্যা করা হয়
সমকাল প্রতিবেদক
একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে পিরোজপুরে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগি্নসংযোগ, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার সাক্ষ্যগ্রহণের প্রথম দিনে পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ মাহবুবুল আলম হাওলাদার যুদ্ধকালীন সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাঈদীর মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড আদালতে তুলে ধরেন। এ সময় কাঠগড়ায় সাঈদী উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মাহবুবুল আলম হাওলাদার কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সাঈদীকে শনাক্ত করে বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আমি তার বিচার চাই। ন্যায্য বিচার চাই।' আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে গতকাল এ সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। পরে দ্বিতীয় সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন নবীন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান শুরু করলেও সময় স্বল্পতার কারণে বিকেল ৪টার দিকে আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় আদালত আবার বসবে।
এর আগে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে সাঈদীর বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম শুরু হলে তার আইনজীবী তাজুল ইসলাম সাক্ষ্যগ্রহণ মুলতবি রাখাসহ নতুন চারটি আবেদন আদালতের নজরে আনেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের কাছে সাঈদীর বিরুদ্ধে থাকা অব্যবহৃত তথ্য-প্রমাণ ও জব্দ তালিকা চেয়ে করা দুটি আবেদন শুনানি শেষে খারিজ করা হয়। এ ছাড়া তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে পিরোজপুরে যাওয়ার পর সাঈদীর আইনজীবীদের নিরাপত্তার বিষয়ে করা আবেদনে ট্রাইব্যুনাল স্থানীয় পুলিশ সুপারকে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে অপর এক আবেদনে সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীদের নামের তালিকা আগামী ১৪ ডিসেম্বর দাখিল করার নির্দেশ দিয়ে সময় মঞ্জুর করেন ট্রাইব্যুনাল।
সাক্ষ্যগ্রহণ :
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষী মাহবুবুল আলম হাওলাদার তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন, একাত্তরের ৭ মে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৫২ সদস্য ২৬টি রিকশাযোগে পিরোজপুরের পাড়েরহাট বন্দরে এসে পেঁৗছায়। এর আগেই পিরোজপুরে মাওলানা মোসলেহ উদ্দিন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মহসিন হাওলাদার, সুবহান মাওলানা, হাকিম কস্ফারী, বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে গঠিত হয় শান্তি কমিটি। এ শান্তি কমিটিই পাক হানাদার বাহিনীকে অভ্যর্থনা জানায়। এর জন্য ফকির দাসের বাড়ির পাশে গঠিত হয় রাজাকার ক্যাম্প। সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে। তিনি আরও বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওইদিন সকালবেলা খবর পেয়ে পাড়েরহাট বাজারের কাছে আড়ালে থেকে অভ্যর্থনাসহ এসব কর্মকাণ্ড তিনি প্রত্যক্ষ করেন। তিনি জানান, আটক সাঈদী উর্দু ভাষায় পারদর্শী হওয়ায় অন্যদের চেয়ে পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাপ্টেন এজাজের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। সাঈদীর পরামর্শেই ক্যাপ্টেন এজাজের বাহিনী পাড়েরহাট বাজারের আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধ সমর্থকদের দোকান, বসতঘরে লুটপাট এবং অগি্নসংযোগ চালায়। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যান। পরে জানতে পারেন, ৩০-৩৫টি দোকান ও বসতঘরে লুটপাট চালিয়ে সাঈদী এবং তার বাহিনী ভাগবাটোয়ারা করে নেয়।
মাহবুবুল আলম জানান, লুটের টাকা ও সম্পদ দিয়ে সাঈদী পাড়েরহাট বাজারে মদন সাহার বাড়িতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার পাঁচ তহবিল গঠন করে।
তিনি জানান, সাঈদীর নেতৃত্বাধীন বাহিনী পাড়েরহাট চিথলিয়া গ্রামের মানিক পশারী ও তার ভাইয়ের নতুন বাড়ি এবং উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার চিত্ররঞ্জন তালুকদার, জহর তালুকদার, বিশা বালী, শুকুর বালীসহ আরও অনেকের বাড়িঘরে অগি্নসংযোগ করে লুটপাট চালায়। তিনি বলেন, সাঈদীর নেতৃত্বাধীন বাহিনী তার বাড়িতেও গিয়েছিল। আমার ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান জানার চেষ্টা চালায়। আমার ভাই তথ্য না দিলে তাকে অত্যাচার করা হয়। বাড়িতে লুটপাট ও অগি্নসংযোগ চালিয়ে স্বর্ণ ও নগদ টাকা লুট করে। লুটপাটের অনেক মাল সাঈদী তার শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে জমা রাখত।
হত্যা ও অগি্নসংযোগ :
সাক্ষী জানান, সাঈদীর নির্দেশেই তার অনুগত বাহিনী ২ জুন হিসাব বালীকে নারিকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় জঙ্গলের মধ্যে অন্যদের মতো পালিয়ে থেকে প্রত্যক্ষ করি সাঈদী বলছে, 'ওটাকে যখন পেয়েছি, ওটাকে গুলি কর।' পরে দৌড়ে মাহতাব, আলতাব, লতিফসহ অন্যরা পালিয়ে জঙ্গলের ভেতরের দিকে গিয়ে আড়াল নিই।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মাহবুবুল আলম আদালতে সাঈদীর বিরুদ্ধে অপরাধের কিছু নমুনা উপস্থাপন করেন। এগুলোর জব্দকৃত নমুনা তদন্ত কর্মকর্তার হেফাজতে আছে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়। বিকেল সাড়ে ৩টায় সাক্ষ্য প্রদান শুরু করেন রাষ্ট্রপক্ষের অপর সাক্ষী রুহুল আমিন নবীন। তিনি আদালতকে জানান একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়ালেন। সাঈদীর বিরুদ্ধে তিনি আজ বিস্তারিত উপস্থাপন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
গতকাল ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের বক্তব্য ধারণ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য সাঈদী ও তার আইনজীবী এবং ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের তিনটি কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া বিচারকদের কাছেও ছিল তিনটি কম্পিউটার। ট্রাইব্যুনালের মধ্যে কয়েকজন কর্মচারী বসে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কম্পিউটারে বক্তব্য হুবহু লিখতেন।
সাঈদীর আইনজীবীর হুমকি :
ট্রাইব্যুনালে শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার বিষয়টি সাঈদীর আইনজীবী তাজুল ইসলামের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আদালত ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে তাজুল ইসলামের আচরণগত সমস্যার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ত্রুটিও কম নয়। পাশে থেকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বিরূপ মন্তব্য করায় ব্যাহত হচ্ছে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম। গতকাল এ রকম একটি ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের আসামিপক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলামের হুমকি ও দুর্ব্যবহারে আদালত উভয়পক্ষকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
নাভদ বলেছেন:
Trial Against SayedeeFirst witness testifies Ashutosh Sarkar and Rizanuzzaman Laskar
The International Crimes Tribunal yesterday recorded the first witness' deposition narrating how Jamaat-e-Islami leader Delawar Hossain Sayedee and other collaborators helped the Pakistani occupation forces to commit atrocities and crimes against humanity in 1971.
Prosecution witness and freedom fighter Mahabubul Alam Hawlader of Pirojpur completed his deposition yesterday while witness and freedom fighter Ruhul Amin Nabin of the same district began giving his deposition to the court recollecting the events that took place 40 years ago.
Hawlader, who was 20 years old in 1971, worked as a spy for the freedom fighters.
He narrated how Sayedee spearheaded groups of collaborators to loot over 60 houses and shops, and how he ordered the killing of Bisha Bali, a Hindu resident of Umedpur village of Pirojpur.
Sayedee, now 71 years old, stood in the dock at the back of the courtroom during the five-and-a-half-hour proceedings, with an hour's break.
He is the first among the seven accused of war crimes during the Liberation War with 20 specific charges were brought against him on October 3. A total of 68 prosecution witnesses are supposed to give their depositions in the case.
Hawlader, who introduced himself as a businessman, was not allowed to reveal his address for security reasons.
He identified Sayedee and said he knows Sayedee. “During the war, I was serving as a freedom fighter in the Sundarbans freedom fighters' camp. My responsibility was to be a spy and collect confidential information for the freedom fighters,” he said.
According to Hawlader, Major Ziauddin Ahmed and AKM Awal of the Sub-Sector-9 assigned him to be a spy.
“Throughout Pirojpur, the collaborators and peace committee members committed rapes, arsons, and murdered many innocent people and members of the Hindu community,” he told the court. “They also handed many women over to the Pakistani occupation forces so that they could be raped.
“As a spy, I observed all these criminal activities and delivered the information to the Sundarbans freedom fighters' camp.”
“During the war of liberation in 1971, I remained at my home,” Hawlader told the court.
He recollected the historic speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman on March 7, 1971, and how people from all walks of life prepared for war.
Many went to India for training. Many received guerrilla training inside the country. They collected weapons from their localities and formed resistance against the occupation forces, he said.
“With no solution in sight, the Pakistani forces formed an anti-liberation force, comprised of collaborators, called the Peace Committee with Ghulam Azam, Gulzar AKM Yousuf and Khan Mohammad Afzal of Pirojpur among others,” he added.
Members of the peace committee directed Jamaat-e-Islami members in different parts of the country to form local peace committees and kill freedom fighters and Liberation War supporters in their areas.
The Parer Haat peace committee of Pirojpur was formed this way.
Hawlader identified Sayedee, Sekandar Ali Shikder, Danesh Ali Majumder, Mohammad Salehuddin, Mawlana Azhar Ali Talukder, Mohsin, Abdul Karim, Habibur Rahman Munshi, Sobhan Mawlana and Hakim Kari among others as members of the peace committee of Parer Haat.
Most of the members were from local madrasas and anti-liberation organisations, he said.
As Sayedee joined student politics while studying in alim class at Pirojpur's Shashina Madrasa, the madrasa authorities suspended him, he added.
According to Hawlader, Pakistani occupational forces came to Pirojpur in the first week of May, 1971.
“On the morning of May 7, I was outside the house and heard that the occupation forces are coming to Parer Haat. And the Parer Haat peace committee members were waiting at the rickshaw stand to greet them,” he said.
“I went to Parer Haat and hid myself near the rickshaw stand. I saw 52 Pakistani army men arrive on 26 rickshaws and members of the peace committee greeted them,” he added. Sayedee, fluent in Urdu, spoke to Captain Ezaz, a captain of the occupation forces.
The collaborators then guided the Pakistani forces inside Parer Haat bazaar.
“They showed Captain Ezaz the shops and homes of Hindus and Awami League activists supporting the Liberation War,” said Hawlader, “Captain Ezaz than ordered his forces to raid those [shops and houses].”
After the raid had started, Hawlader saw the situation getting worse and he distanced himself from the spot.
According to Hawlader, he later came to learn that some 30 to 35 shops and homes were looted in the raid.
“The items looted during the raid were distributed under the leadership of Sayedee,” he told the court. During the raid, the Pakistani forces found approximately 20kg of gold (22 sher) in an iron safe buried under the shop of Makhan Saha, who was a big businessman in Parer Haat, Hawlader said.
Sayedee personally had led the raid at Makhan Saha's store, located in the northern side of Parer Haat, he claimed.
“After finding so much gold in one room, Captain Ezaz named it Shonar Parer Haat [golden parer haat],” he added.
The looted items were taken to Sayedee's father-in-law's house in the same area. “The collaborators created a fund with the looted goods and the gold, which totalled to around Tk 15 lakh [at that time],” said Hawlader, adding that Sayedee himself traded the looted goods.
“He used the money to make buildings and other assets in Khulna and Dhaka,” said Hawlader.
While Sekandar Shikder and Danesh Ali Mollah were the leaders of collaborators, Sayedee, being fluent in Urdu, had managed to build a close tie with Captain Ezaz, he said.
On June 2, Hawlader fled with a group of freedom fighters as he heard that the collaborators were coming to get them.
Later that day, he came to learn that the collaborators led by Danesh, Sekandar, Sayedee, Momin Hawlader, Hakim Kari and Habibur Rahman Munshi had attacked a Hindu-majority area near Umedpur village.
There they looted some 25 houses including those of Chitya Ranjan Talukder, Jahur Talukder, Bisha Bali, Shukur Ali and Anil Mandal.
According to Hawlader, the collaborators also tied ailing Bisha Bali to a coconut tree and beat him up. “Sayedee then ordered the collaborators to shoot Bisha Bali. One collaborator shot him dead.”
Recounting the events of the day, Hawlader said after the Pakistan army had sprayed the area with bullets, he along with a group of people hid inside a nearby jungle.
“Some people of the peace committee and the Razakar Bahini went to my home around noon that day. They put pressure on my bother Abdul Mazid and tortured him as he refused to tell them the whereabouts of freedom fighters and the Awami League men,” he said.
“They entered the house, looted 10 tolas of gold ornaments, Tk 20,000 from an almirah and looted two tolas of gold from my mother's room, and vandalised furniture costing around Tk 30,000. They damaged our valuables worth around Tk 3 lakh.”
“I seek trial of the people who committed crimes against humanity, war crimes, and killed lakhs of people during the Liberation War in 1971,” he told the court concluding his around two-hour-long testimony.
Before Hawlader began his deposition, the three judges' panel headed by its Chairman Justice Nizamul Huq, rejected two petitions filed by Sayedee.
One was filed seeking adjournment of the depositions while the other for necessary copies of some documents from the prosecution.
The tribunal ordered the defence to submit a list of their witnesses and documents before it by December 14.
In response to another petition submitted by the defence counsels, the tribunal said the superintendent of police will decide whether they (defence lawyers) would be given police protection when they visit places of offences allegedly committed by Sayedee.
After Hawlader's deposition, Mizanul Islam, a counsel for Sayedee, started cross-examining him yesterday. He asked the witness whether there is any evidence in the court that was seized by the investigators from him.
Hawlader replied in the negative.
The lawyers for Sayedee told the court that they were not prepared to cross examine Hawlader and that they want to start cross-examination of the witness on December 11.
The court then fixed December 11 for Hawlader's cross examination. After Hawlader, second prosecution witness Nabin began his deposition. He is scheduled to resume his testimony today.
Nabin, who was 21 then, said he heard over the radio and television that the International Crimes Tribunal was formed in Bangladesh and that the investigation team of the tribunal would probe the crimes committed during the Liberation War.
“I submitted a compliant to the tribunal chief on July 20 last year seeking justice against the war crimes and this is my statement,” he said.
Nabin said the Pakistani occupation forces formed peace committee, Razakar, Al Shams and Al Badr militia forces with the help of some agents and leaders and activists of Jamaat-e-Islami
নাভদ বলেছেন:
ট্রাইব্যুনালে ১৩তম সাক্ষীর জবানবন্দিতিন বোনকে সেনাক্যাম্পে দেন সাঈদী
প্রথম আলো নিজস্ব | প্রতিবেদক | তারিখ: ১৬-০১-২০১২
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ সোমবার জবানবন্দি দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের ১৩তম সাক্ষী। জবানবন্দিতে সাক্ষী তাঁর তিন বোনকে সাঈদীসহ রাজাকারদের পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে দেওয়ার এবং তাঁদের পুরো পরিবারকে জোর করে ধর্মান্তরিত করার বর্ণনা দেন।
বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৩তম সাক্ষী এই জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একদিন সাঈদী কয়েকজন রাজাকারকে নিয়ে পিরোজপুরে তাঁদের (সাক্ষীর) বাড়িতে যান। রাজাকাররা তাঁদের বাড়ি লুট করে এবং তাঁর তিন বোনকে ধরে নিয়ে পিরোজপুরে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে দিয়ে আসে। তিন দিন পর তিন বোনকে বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়। একাত্তরে তাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর।
তিন বোনের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাক্ষী কান্নায় ভেঙে পড়েন। জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, ওই ঘটনার কিছুদিন পর সাঈদী আবার কয়েকজন রাজাকার নিয়ে তাঁদের বাড়িতে যান। রাজাকাররা তাঁর মা-বাবা, ভাইবোনসহ পরিবারের সব সদস্যকে জোর করে ধর্মান্তরিত করে। তাঁর নাম দেওয়া হয় আবদুল গনি। তাঁদের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে বাধ্য করা হয়। এর কিছুদিন পর তিনি ছাড়া পরিবারের অন্য সবাই ভারতে চলে যান। স্বাধীনতার পর তিনি নিজ (হিন্দু) ধর্মে ফিরে আসেন।
জবানবন্দির এ পর্যায়ে সাক্ষী আবেগে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান এবং কাঁদতে থাকেন। ট্রাইব্যুনাল তাঁকে শান্ত হয়ে বসতে বলেন।
জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, তাঁকে ছাড়া আরও এক-দেড় শ হিন্দুসম্প্রদায়ের লোককে রাজাকাররা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণ সাহা, নিখিল পাল, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল। তাঁদের অনেকে মারা গেছেন। অনেকে ভারতে চলে গেছেন।
জবানবন্দি শেষে সাক্ষীকে জেরা শুরু করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। তিনি এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কয়েকজন সাক্ষীর নাম উল্লেখ করে সাক্ষীর কাছে জানতে চান, তাঁদের তিনি চেনেন কি না? সাক্ষী তাঁদের চেনেন বলে জানান। মিজানুল জানতে চান, সাক্ষীর তিন বোনকে নির্যাতন ও ধর্মান্তরিত করার ঘটনা ওই সাক্ষীরা জানেন কি না? জবাবে সাক্ষী বলেন, তাঁরা কী জানেন না-জানেন, তা তিনি বলতে পারবেন না।
বেলা একটায় এক ঘণ্টা বিরতির পর আবার জেরা শুরু হলে মিজানুল জানতে চান, সাক্ষী মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে লুট হওয়া জিনিসপত্রের কোনো তালিকা দিয়েছেন কি না? জবাবে সাক্ষী বলেন, ‘সবকিছু এমনকি ঘর ঝাড় দেওয়ার পিছা (ঝাড়ু) পর্যন্ত লুট হয়েছে।’ স্বাধীনতার পর নিজ ধর্মে ফিরতে কোনো প্রায়শ্চিত্ত করেছেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জীবনের মায়ায় ধর্মান্তরিত হয়েছি, এর জন্য প্রায়শ্চিত্ত দরকার নেই।’
বিকেল চারটার দিকে জেরা শেষ হলে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম কাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
(প্রথম আলোর নীতি অনুসারে সাক্ষী ও তাঁর বোনদের নাম প্রকাশ করা হলো না।)
নাভদ বলেছেন:
যুদ্ধাপরাধ: সাঈদীর নেতৃত্বে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় গৌরাঙ্গের বোনদের ঢাকা, জানুয়ারি ১০ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- একাত্তরে পিরোজপুরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী কীভাবে লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও ধর্মান্তরে বাধ্য করেছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে তুলে ধরেছেন সাক্ষী গৌরাঙ্গ চন্দ্র সাহা।
জামায়াতের নায়েবে আমীর সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলায় সোমবার ত্রয়োদশ সাক্ষী হিসেবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন ৬৭ বছর বয়সী গৌরাঙ্গ। পরে তাকে জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম ও মঞ্জুর আহমেদ আনসারী।
সকালে বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনালে কার্যক্রম শুরুর পর প্রসিকিউটর রানা দাসগুপ্তের সহায়তায় সাক্ষ্য দিতে শুরু করেন গৌরাঙ্গ।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একদিন সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা এসে তাদের বাড়িতে লুটপাট চালায়। তারা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় গৌরাঙ্গের তিন বোনকে।
পাড়েরহাটে রাজাকার ক্যাম্পে তিনদিন রেখে ধর্ষণ করা হয় তাদের। তিনদিন পর তাদের বাড়িতে ফেরত পাঠানো হলেও আবার আসে সাঈদী ও তার দলবল। জোর করে কলেমা পরিয়ে ধর্মান্তরিত করা হয় গৌরাঙ্গের পুরো পরিবারকে।
গৌরাঙ্গ বলেন, সাঈদীর লোকজন বাড়িতে এসে টুপি আর তসবি দিয়ে যায়। এই নির্যাতনের লজ্জা সইতে না পেরে তিনি ছাড়া পরিবারের সবাই এক পর্যায়ে ভারতে চলে যান।
আসামি পক্ষের আইনজীবীরা জেরায় গৌরাঙ্গের কাছে জোনতে চান, তিনি সাঈদীকে চেনেন কি না।
জবাবে গৌরাঙ্গ বলেন, পিরোজপুরের পাড়েরহাটে যেখানে তাদের বাড়ি, একাত্তরে তার কাছাকাছিই থাকতেন সাঈদী। তার শ্বশুরবাড়িও ওই এলাকাতেই। কাজেই এই জামায়াত নেতাকে ভালোভাবেই চেনেন তিনি।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সাক্ষী হিসেবে শহীদুল ইসলাম খানের সাক্ষ্য দেওয়ার কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণে তিনি আসেননি।
মানবতাবিরোধী ২০টি অপরাধে গত ৩ অক্টোবর প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরে হত্যা, লুণ্ঠন, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেপ্তার করা হয় এই সাবেক সংসদ সদস্যকে। চলতি বছর ১৪ই জুলাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।
সাঈদী ছাড়াও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্লা এবং দলের সাবেক আমীর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা চলছে ট্রাইব্যুনালে।
এ মামলায় বিএনপির সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কারাগারে এবং জিয়াউর রহমান আমলের মন্ত্রী আব্দুল আলীম শর্তসাপেক্ষে জামিনে রয়েছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/টিএ/জেকে/১৮১৫ ঘ.
নাভদ বলেছেন:
সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য: গৌরাঙ্গ সাহার কান্নায় শোকাবহ পরিবেশ ট্রাইব্যুনালে:
সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ঢাকা: মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আটক জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে দু’বার কান্নায় ভেঙে পড়লেন ৬৭ বছরের গৌরাঙ্গ সাহা। তার কান্নায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পুরো এজলাস কক্ষে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
গৌরাঙ্গ সাহা এ মামলায় সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৩ নম্বর সাক্ষী। সোমবার তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন। তার জবানবন্দী শেষে এখন তাকে জেরা করছেন সাঈদীর আইনজীবী মিজানুল ইসলাম।
গৌরাঙ্গ সাহা তার জবানবন্দীতে বলেন, একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদী আমাদের বাড়িতে গিয়ে লুটপাট করে। কিছু রাজাকার আমার তিন বোনকে ধরে নিয়ে যায় (ট্রাইব্যুনালের আদেশে তাদের নাম প্রকাশ করা হলো না)। এরপর পিরোজপুর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে আমার বোনদের নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।
বোনদের কথা বলতে গিয়ে এ সময় প্রথমবার কান্নায় ভেঙে পড়েন গৌরাঙ্গ সাহা। কান্না থামিয়ে তিনি বলেন, তিনদিন পরে বোনদের ফেরত পাঠায়।
গৌরাঙ্গ সাহা তার জবানবন্দীতে আরো বলেন, এ কিছুদিন পর সাঈদী আমাদেরকে জোর করে মুসলমান বানায়। মসজিদে নিয়ে গিয়ে জোর করে নামাজ পড়ায়। এ সময় সাঈদী আমার নতুন নাম দেয় আব্দুল গণি। গৌরাঙ্গ বলেন, সাঈদী আমার হাতে তসবি দিয়েছে। এ সময় লজ্জায় পরিবারের সবাই ভারতে চলে যান। এখানে এখন আমি একা।
একথা আবারো কান্নায় ভেঙে পড়েন গৌরাঙ্গ সাহা। কান্না থামিয়ে তিনি বলেন, সাঈদী অন্তত একশ’ থেকে দেড়শ’ জনকে মুসলমান বানিয়েছে। আমি এর বিচার চাই।
এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত কয়েকজনের নাম জানতে চাইলে গৌরাঙ্গ সাহা বলেন, নিখিল পাল, নারায়ণ সাহা, গৌরাঙ্গ পাল, সুনীল পাল, নারায়ণ ভৌমিক, আর কতো নাম কমু স্যার? অনেকে মারা গেছেন, অনেকে ভারতে চলে গেছেন।
গৌরাঙ্গ সাহা আরো বলেন, ৪০ বছর আগের ঘটনা, আর কি কমু?
রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত এ সময় সাঈদীকে চেনেন কিনা জানতে চাইলে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সাঈদীকে দেখিয়ে গৌরাঙ্গ সাহা বলেন, ওনাকে আমি চিনি। ওনার শ্বশুর বাড়ি আমার বাড়ির পাশে।
বাংলাদেশ সময়: ১৫৩৫ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৬, ২০১২
নাভদ বলেছেন:
সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ:মধুসূদন কাঁদলেন, কাঁদালেন Wed, Feb 1st, 2012 4:01 pm BdST
ঢাকা, ফেব্র“য়ারি ০১ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে এসে বুধবার আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েন অশীতিপর মধুসূদন ঘরামী, যিনি একাত্তরে ধর্মান্তরিত হয়েও রক্ষা করতে পারেননি স্ত্রীর সম্ভ্রম।
অসুস্থ মধুসূদনকে বুধবার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসার পর চিকিৎসকের উপস্থিতিতে ‘সিক বেডে’ শুয়ে সাক্ষ্য দেন তিনি। এ সময় তার গায়ে কম্বল জড়ানো ছিলো।
এ মামলার ২৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে মধুসূদন ট্রাইব্যুনালকে বলেন, একাত্তরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পরিচিত ছিলেন দেলাওয়ার সিকদার নামে।
“কৃষ্ণ সাহা, ডা. গণেশ আর আমাকে মসজিদে বসিয়ে এই দেলাওয়ার মুসলমান বানায়। তখন আমার নাম রাখে আলী আশরাফ, কৃষ্ণ সাহার নাম হয় আলী আকবর।”
ধর্মান্তরিত হয়েও বাঁচতে পারেননি কৃষ্ণ সাহা। কয়েকদিন পর তাকে হত্যা করে রাজাকার বাহিনী, যে সংগঠন গড়ে উঠেছিল সাঈদীর নেতৃত্বে।
“অথচ দেলাওয়ার বলেছিল, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে কাউকে মারা হবে না”, যোগ করেন তিনি।
একাত্তরে তিন হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা, অন্তত নয় জনকে ধর্ষণ, বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভাঙচুর এবং একশ থেকে দেড়শ হিন্দুকে ধর্মান্তরে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে সাঈদীর বিরুদ্ধে, যাকে একাত্তরে তার এলাকার লোকজন ‘দেইল্লা রাজাকার’ নামে চিনতো।
‘আমার চিন্তা করো না, পালাও’
একাত্তরে নিজে ধর্মান্তরিত হয়েও স্ত্রীর সম্ভ্রম বাঁচাতে পারেননি মধুসূদন। যুদ্ধ শেষে তার স্ত্রী একটি শিশুরও জন্ম দেন। সন্তানদের নিয়ে স্ত্রী ভারতে চলে যাওয়ার পর একা দেশে রয়ে গেছেন আশি পেরুনো এই বৃদ্ধ।
ট্রাইব্যুনালে তিনি বলেন, “একদিন বিকেলে ঘরে এসে জানতে পারি ৪টা কি সাড়ে ৪টার দিকে বাড়িতে রাজাকাররা এসেছিলো। স্ত্রী আমাকে বলে, ‘তোমাকে যে (সাঈদী) মুসলমান করেছিলো সে এসেছিলো। আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে, এর বেশি আমি বলতে পারছি না। আমার চিন্তা করো না, তুমি পালাও।’”
সিক বেডে শুয়ে জবানবন্দি দেওয়ার সময় এ পর্যায়ে এসে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন সাঈদীর রাজাকার বাহিনীর নির্মমতার শিকার মধুসূদন। তার দুই চোখ দিয়ে তখন অশ্র“ ঝরছিলো। মধুসূদনের কান্নায় স্তব্ধ এজলাসকক্ষে অনেকের চোখই ভিজে ওঠে তখন।
মধুসূদন আবার থেমে থেমে বলতে শুরু করেন। বলতে থাকেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য।
“যুদ্ধ শেষে আমার স্ত্রীর একটি কন্যা সন্তান হয়। আমি তার নাম রাখি সন্ধ্যা। স্ত্রীকে লোকজন গঞ্জনা দিলে, অপবাদ দিলে আমি আমার শ্যালককে বলি কি করবা? তখন শ্যালক বলে, ভারতে নিয়ে যাই। কিছুদিন পর আমার স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে শ্যালক ভারতে চলে যায়। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি।”
এ কথা বলে আবারও কন্নায় ভেঙে পড়েন মধুসূদন ঘরামী।
জবানবন্দির সময় প্রসিকিউশনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত মধুসূদনকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম ও মঞ্জুর আহমেদ অনসারী তাকে জেরা করেন।
গত ৩ অক্টোবর প্রথম ব্যক্তি হিসেবে জামায়াতে নায়েবে আমীর সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর আগে ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেপ্তার করা হয় সাবেক এই সংসদ সদস্যকে। চলতি বছর ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।
সাঈদী ছাড়াও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আব্দুল কাদের মোল্ল¬¬া এবং দলটির সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা চলছে।
এছাড়া একই অভিযোগের মামলায় বিএনপির সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কারাগারে এবং জিয়াউর রহমানের আমলের মন্ত্রী আব্দুল আলীম শর্তসাপেক্ষে জামিনে রয়েছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/টিএ/এএল/জেকে/১৫৪৭ ঘ.
নাভদ বলেছেন:
একজন মধুসূদন ঘরামীর কান্না ফজলুল বারী, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
একজন মধুসূদন ঘরামীর কান্নায় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত লোকজন কেঁদেছেন(যুদ্ধাপরাধী পক্ষ ছাড়া)! বাংলানিউজসহ দেশের প্রধান সব মিডিয়ার রিপোর্টে এর বৃত্তান্ত পড়ে চোখের পানি সামাল দিতে পারিনি। ৮১ বছর বয়সী অশীতিপর বৃদ্ধ, অসুস্থ মধুসূদন ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দেশের মানুষকে বলেছেন, আজকের জামায়াত ও চারদলীয় জোট নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দুর্বৃত্তপনায় মুক্তিযুদ্ধকালীন তার দুর্বিষহ জীবন লাঞ্ছনার কথা। হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় তার জীবনের দুর্ভোগ, বাধ্যতামূলক ধর্মান্তর, স্ত্রী শেফালী ঘরামীর ধর্ষিতা হবার সবিস্তার বর্ণনা দিয়েছেন মধুসূদন। এসব বলতে গিয়ে তিনি কেঁদেছেন, অন্যদেরও কাঁদিয়েছেন।
এমন কী কোনো পাষণ্ড আছে, একজনের জীবন লাঞ্ছনার বৃত্তান্ত শুনে যার প্রাণ কাঁদবে না? একাত্তরের বাংলাদেশে এমন হাজার হাজার মধুসূদন ছিলেন। তাদের অনেকে পরবর্তীতে হয়েছেন জন্মভূমি ছাড়া, দেশান্তরি। অনেকে এর মধ্যে মারা গেছেন। নিভু নিভু জীবন নিয়ে হয়তো বেঁচে আছেন কেউ কেউ। এই মধুসূদন ঘরামী তাদের প্রতীক, প্রতিনিধি। হয়তো দেশের মানুষকে তার জীবনের সত্য জানিয়ে যেতে এত দীর্ঘায়ু পেয়েছেন মধুসূদন ঘরামী। তিনি আরো দীর্ঘায়ু হোন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ, সাজা দেখার পরও নতুন এক বিশ্বাস-উপলব্ধির দেশে বেঁচে থাকুন, সে কামনা করি।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী শয়তানের হাতে তার ধর্ষিতা স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেওয়া যুদ্ধ শিশু সন্ধ্যা কী আজ বেঁচে আছেন? তার প্রতি আমাদের সহানুভূতি রইল। নিজের দেশে ফিরে এসো বোন। আমরা ভাইরা তোমার দায়িত্ব নেবো। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিশোধ নেবো দুর্বৃত্ত-দস্যুতার।
সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ নিয়ে সাম্প্রতিক এক বুদ্ধিজীবী প্রশ্ন তুললেও এ বিষয়গুলো নিয়ে ১৯৮৭ সাল থেকে মিডিয়ায় রিপোর্ট হয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধসমূহের কারণে দেশ স্বাধীন হবার পর পিরোজপুরের পাড়েরহাটের সাঈদখালী গ্রামের রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন এলাকা থেকে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি নামের সঙ্গে সাঈদী যোগ করে ওয়াজি মাওলানা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর আবার আকস্মিক নামের সঙ্গে নিজে নিজে যোগ করে নেন ‘আল্লামা’ পদবী! এভাবে পার্লামেন্টের এমপিদের নামের তালিকাতেও নিজের নাম ‘আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী’ লিখিত করে নিতে পেরেছেন! পাকিস্তানের জাতীয় কবি ইকবালের পর আর এই তল্লাটে আর কাউকে এভাবে ‘আল্লামা’ সাজতে দেখা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের পরপর রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইনের খুলনা এলাকায় আত্মগোপনের খবর জানা গিয়েছিল। গ্রেফতারকৃত যুদ্ধাপরাধী হিসাবে তার মামলাটি ট্রাইব্যুনালে আসার কারণে এখন জানা গেল যশোরের এক গ্রামেও তিনি আত্মগোপন করেছিলেন! খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ধরতে গেলে তিনি পর্দা-পুষিদার(!) বোরকা পরে গরুর গাড়িতে গ্রামীণ নাইওরির সাজে সেখান থেকে পালিয়ে যান। সাক্ষীদের বক্তব্য-জেরায় এমন আরো অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। এসবে জানা যাচ্ছে বর্তমান জামায়াত ও চারদলীয় নেতার ফুলের মতো চরিত্রের(!) বৃত্তান্ত!
অনলাইনে এখন জামায়াতিদের ছড়িয়ে ভিডিওগুলোতে তাকে পবিত্র একজন ধর্মীয় নেতা হিসাবে চিহ্নিত করে তার পক্ষে সহানুভূতি সংগ্রহের আপ্রাণ চেষ্টা আছে। এমন একটি ভিডিওর প্রচ্ছদে আছে, ট্রাইব্যুনালের কারা হেফাজতখানায় তার নামাজ পড়ে দোয়ার ছবি। সঙ্গে তার তেলাওয়াতের রেকর্ড! এসবের মাধ্যমে জামায়াতি প্রপাগান্ডায় বলার চেষ্টা হচ্ছে, ইনি একজন সুফি কিসিমের মানুষ। একাত্তরে লুট করেননি, ধর্ষণ করেননি, কাউকে জোরপূর্বক ধর্মান্তর, খুন করেননি! মুক্তিযুদ্ধের পর এমনি এমনিই হাওয়া বদল উপলক্ষে এলাকায় কিছুদিন ছিলেন না, এমন আর কী! এই জামায়াতিরা একাত্তরে এই বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতার সময়ও ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রচার-প্রপাগান্ডায় ছিলেন ধর্মদ্রোহী, ভারতীয় দালাল, দুষ্কৃতকারী! তাদের প্রচার-প্রপাগান্ডার স্টাইলটি এখনও অবিকল সে রকম! আমরা যারা এর বিচার চাচ্ছি তারা এখন ভারতীয় দালাল! আর যারা বাংলাদেশটাই চায়নি, তারা হয়ে গেছে সাচ্চা জাতীয়তাবাদী, বাংলাদেশি! ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে কিছু মিডিয়ার রিপোর্ট আমি মনোযোগ সহকারে পড়ি। সংগ্রাম-নয়া দিগন্তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে প্রকাশ্য ভূমিকাটি ঠাওর করা যায়। আরো কিছু মিডিয়ার রিপোর্ট একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে অাঁচ করা যায় তাদের ছদ্মবেশ!
যেমন, এদের সম্মিলিত প্রচার-প্রপাগান্ডার মূল সুরটি হলো একাত্তরে রাজাকার বাহিনীটি খুব খারাপ ছিল। এরা খুন-ধর্ষণ-লুচ্চামি সব করেছে। কিন্ত আটক জামায়াত-বিএনপির যুদ্ধাপরাধী নেতারা ছিলেন ফেরেস্তা প্রকৃতির! তারা এসব কিছুর চৌহদ্দি অথবা নিকট দূরত্বেও ছিলেন না। সাঈদীর ব্যাপারে এরা প্রমাণের মরিয়া চেষ্টা করছে, একাত্তরে ওই এলাকায় দেলোয়ার সিকদার নামের আরেক রাজাকার ছিল। যে পরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয়। সেই দেলোয়ার সিকদার অথবা দেলাওয়ার হোসাইন আজকের ‘আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী’ এক নন ইত্যাদি!
মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা মুক্তিযোদ্ধাদের দুষ্কৃতকারী বলার ধৃষ্ঠতা দেখিয়েছে। এখন প্রমাণের চেষ্টা করছে, ট্রাইব্যুনালে যতো সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে এসেছেন-আসছেন, প্রচারের চেষ্টা করছে, তারা সবাই ঠগ-জোচ্চর শ্রেণীর লোকজন! এরা আওয়ামী লীগ করেন কিনা বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, সেটিও অপরাধ হিসাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হচ্ছে! পিরোজপুরের মুক্তিযোদ্ধারা যেন সবাই মরে গেছেন, আর কী! ক্ষুদ্র দলীয় রাজনৈতিক কারণে ট্রাইব্যুনালে কি বিএনপির মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ সাক্ষ্য দিতে আসছেন বা আসবেন? সাদেক হোসেন খোকা কি এসেছেন?
মধুসূদন ঘরামী, একাত্তর যার জীবন ছারখার করে দিয়েছে, যুদ্ধ শিশুকে কোলে নিয়ে দেশান্তরি হয়েছেন যার ধর্ষিতা স্ত্রী, আর কিছু না পেয়ে ৮১ বছরের অশীতিপর বৃদ্ধের অপরাধ শনাক্তের চেষ্টা হয়েছে, তিনি বয়স্ক ভাতা নেন! যার জীবন-সংসারের বিনিময়ে এই দেশ, যেখানে আমরা নানাভাবে হোমরা-চোমরা, তাকে আমাদের কি দেবার দরকার ছিল, আর দিচ্ছি কয় টাকার বয়স্ক ভাতা?
বাংলাদেশের সংবিধান মানলেওতো পঁয়ষট্টি বয়ষোর্ধ্ব প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রের বয়স্ক ভাতা দেওয়ার কথা। মধুসূধন ঘরামীকে মাসে কয় টাকা দেয় রাষ্ট্র? এই বিচারের কাজকর্ম যতো এগোচ্ছে, ততো এখানকার কিছু ধৃষ্ঠ লোকজনের চেহারা-অপরাধসমূহ চিহ্নিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নতুন প্রজন্মের কাছে এদের আজকাল ধরা পড়া শুরু হয়েছে। আগামীতেও এমন দুর্বৃত্ত পাকড়াও চলবে। এর মাধ্যমে হয়তো সামান্য উসুল হবে মধুসূদন ঘরামীদের আত্মত্যাগের ঋণ।
এই এমন একজন লাঞ্ছিত জীবনের মধুসূদন ঘরামীর বাকি জীবনের সব দায়িত্ব নেবার জন্য রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানাই। রাষ্ট্র বা কেউ এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিলে আমরাও এ ব্যাপারে হাত বাড়াবো। মুক্তিযুদ্ধের কারণেই তো দেশ-বিদেশে আমরা গর্বিত বাংলাদেশি।
ফজলুল বারীঃ সিডনিপ্রবাসী সাংবাদিক
বাংলাদেশ সময়: ১৪৩৪ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১২
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...














