উত্তরাঞ্চলে দুই লাখ টন চালের অবৈধ মজুদ
সমকাল
রোববার | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১১ | ১৫ ফাল্গুন ১৪১৭ | ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩২
আলতাব হোসেন
উত্তরাঞ্চলে ২ লাখ টন চালের অবৈধ মজুদের সন্ধান পেয়েছেন গোয়েন্দারা। চলতি সপ্তাহেই এসব গুদামে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। তবে মজুদবিরোধী অভিযান শুরুর আগেই চাল ছেড়ে দিচ্ছেন মিলাররা। গত তিনদিনে পাইকারি মোকামে কেজিতে চালের দাম তিন এবং মণপ্রতি ১২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। পাইকারি বাজারে এখন মোটা চালের ক্রেতাই পাওয়া যাচ্ছে না। তবে পাইকারি বাজারের সুফল খুচরা বাজারে পড়েনি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে চালের দাম কেজিতে আরও তিন থেকে চার টাকা কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশের উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ ব্যবসায়ী ও চাতাল মিল মালিক ব্যাংক থেকে সিসি ঋণ নিয়ে চাল মজুদ করেছেন। সবচেয়ে ক্ষুদ্র মজুদকারীর কাছে ১৬ হাজার মণ ধান ও চাল রয়েছে। এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি মজুদ করেছেন বড় বড় মিলার ও পাইকার। ইসলামী ব্যাংকের ঋণে রংপুরের মাহিগঞ্জের মোল্লা মাস্টার প্রায় ২০ হাজার বস্তা চাল মজুদ করেছেন। তার কাছে ধানেরও ব্যাপক মজুদ রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, শুধু উত্তরাঞ্চলে মজুদ আছে ২ লাখ টন চাল। এসব মজুদদার গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন টিনের ঘর তৈরি করে চাল মজুদ করেছেন। মোল্লা মাস্টারই বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৫০টি গুদামে চাল মজুদ করেছেন। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এমন একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা।
মজুদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেওয়ার খবরে চাল ছাড়তে শুরু করেছেন মিলাররা। চালকল মালিকদের সিসি ঋণ পরিশোধে ব্যাংকের
চাপ, ১৫ দিন মিল চালানোর মতো ধান সংরক্ষণের বিধান রেখে মজুদবিরোধী আইন প্রণয়ন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার মজুদবিরোধী অভিযানের কারণে মজুদ করা ধান-চাল ছেড়ে দিচ্ছেন মিল মালিকরা। ফলে বাজারে চালের সরবরাহ বেড়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মজুদবিরোধী আইন শিগগির অনুমোদন পেতে যাচ্ছে। আইনে মিল মালিকদের ১৫ দিনের ধান সংরক্ষণের সময় বেঁধে দেওয়া আছে। এছাড়া পাইকারি পর্যায়ে ১ হাজার মণ ও খুচরা পর্যায়ে ৫০০ মণ চাল মজুদ রাখার বিধান রেখে ওই আইন করা হচ্ছে।
চাল ব্যবসায়ীদের নেওয়া সিসি ঋণ পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে চাপ দেওয়া শুরু করেছে। এক মাসের মধ্যে এসব ঋণ পরিশোধের জন্য অনেক ব্যাংক সময় বেঁধে দিয়েছে ব্যবসায়ীদের। ফলে সিসি ঋণ নিয়ে চাল মজুদকারীরা দ্রুত বাজারে চাল ছেড়ে দিয়ে ঋণ পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছেন।
জানা গেছে, খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকেও মজুদবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে
বিভিন্ন জেলায় চাল মিলগুলোতে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার লোক গিয়ে হাজির হচ্ছেন মিলগুলোতে। ফলে অবৈধভাবে মজুদ করা ধান-চাল এখন বাজারে চলে আসছে। এছাড়া আগামী দু'মাস পর নতুন ধান উঠবে। এ কারণে মজুদদাররা চাল বিক্রি করতে শুরু করেছেন। এর ফলে চালের দাম আরও কমবে। মিলার ও পাইকাররা পুরনো মজুদের চাল বাজারে ছাড়ছেন। এদিকে ভারত থেকে ৩ লাখ টন চাল সড়কপথে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে।
শুক্রবার উত্তরাঞ্চলে মোটা মানের স্বর্ণা চাল ৩০ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়। অথচ গত মঙ্গলবারও এ মানের চাল ৩৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তিনদিনে টনপ্রতি দাম কমেছে ৩ হাজার টাকা। চালের বড় আড়ত রংপুরের মাহিগঞ্জের চাল ব্যবসায়ী হাজি আবদুর রহিম বলেন, মোটা চালের ক্রেতাই পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারেও কমছে চালের দাম। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে চালের দাম বর্তমানে ৪০০ থেকে ৪৫০ ডলারে ওঠানামা করছে। এক সপ্তাহ আগেও চাল বিক্রি হয়েছে ৪২৫ থেকে ৪৭৫ ডলারে। আগামী চার মাসের মধ্যে চালের দাম বৃদ্ধির কোনো আশঙ্কা নেই বলে থাই ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন ট্রেড এবং লন্ডনভিত্তিক জ্যাকসন অ্যান্ড কোং আভাস দিয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশে ক্রমেই চালের দাম বাড়তে শুরু করে। ওই সময় এক কেজি চালের দাম ছিল ৩২ টাকা। ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ টাকায়। আর বর্তমানে খুচরা বাজারে এক কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৬ থেকে ৩৮ টাকায়। চিকন চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৪ টাকায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে খোলাবাজারে চাল বিক্রি, ফেয়ার প্রাইস কার্ডসহ নানা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের রেশনসহ গ্রাম পর্যায়ে ওএমএস চালু করা হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


