রক্তঝরা মার্চ -তোফায়েল আহমেদ (ইত্তেফাক ১২ মার্চ, ২০১১)
রক্তঝরা উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের আজ ছিল দ্বিতীয় পর্যায়ের পঞ্চম দিবস। ১৯৭১ সালের ১২ মার্চ ছিল শুক্রবার। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ- জাতির জনকের নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্র সংগ্রামী জনতা তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে থাকে। এমন সর্বাত্মক অসহযোগ ইতিহাসে নজিরবিহীন। এমনকি মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগকেও তা ছাপিয়ে যায়। এদিনে আমরা আমাদের যুবসমাজ ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করি। প্রতিদিন সকাল বিকাল আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে আমাদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে রিপোর্ট করি এবং তাঁর নির্দেশ নিই। বঙ্গবন্ধু আমাদের বলতেন, ওরা কালক্ষেপণ করছে। ওদের সময় দরকার, আমারও সময় প্রয়োজন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রতিদিন সৈন্য, অস্ত্র আনছে ঢাকায়। তোমরা তোমাদের কাজ চালিয়ে যাও। আমার এখনো মনে পড়ে, ১৯৭১ সালের ১৭ ফেব্রু-য়ারির কথা। বঙ্গবন্ধু আমাদের ডেকেছেন তাঁর বাসভবনে। আমরা চার জন, শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক এবং আমি। সেখানে আরও ছিলেন জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এইচএম কামারুজ্জামান। আমাদের কাছে বসিয়ে চারজনকে উদ্দেশ করে বললেন, "আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। তোমরা কলকাতার এই ঠিকানাটা মুখস্থ করো।" তখন একটি কাগজ-কলম নিয়ে তাতে একটা ঠিকানা লিখে আমাদের বললেন, "এই ঠিকানাটা তোমরা মুখস্থ করো।" আমার এখনো মনে আছে, "২১ নং রাজেন্দ্র রোড, নর্দান পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা।" এবং বললেন, "এইটা হবে তোমাদের ঠিকানা। আমি জানি ওরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। আমাদেরকে সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে।" অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বঙ্গবন্ধু আমাদের সহকমর্ী জাতীয় পরিষদ সদস্য ডা. আবু হেনাকে কলকাতা পাঠিয়েছিলেন এই ঠিকানায় সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখতে। তিনি যে পথে সে সময় কলকাতাস্থ এ ঠিকানায় গিয়েছিলেন পরবতর্ীতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঠিক সে পথেই আবু হেনা সাহেব আমাদের উপরোক্ত ঠিকানায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষারত ছিলেন শ্রী চিত্তরঞ্জন সুতার। তিনি জাতীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে আগেই সেখানে পাঠিয়েছিলেন। অর্থাৎ আগে থেকেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য বঙ্গবন্ধুর সার্বিক প্রস্তুতি ছিল। রক্তাক্ত এদিনেও অসহযোগ পালনের মধ্যদিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও নির্দেশে বাংলার মানুষ আসন্ন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সেই যুদ্ধ প্রস্তুতিই নিচ্ছিল। প্রতিটি নিরস্ত্র মানুষ সেদিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ প্রতিপালনের মধ্যদিয়ে সশস্ত্র হয়ে উঠছিল।
এদিকে পাকিস্তানের উভয়াংশের জাতীয় নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে বঙ্গবন্ধুর শর্তসমূহ মেনে নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি জোর দাবি জানান। ঢাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে ইশতেকলাল পার্টির প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান টানা তৃতীয় দিনের মতো আজও লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, "পশ্চিমাঞ্চলের কিছু লোক বলছে, পূর্ব পাকিস্তান যখন যাবেই তখন যত দ্রুত যায় ততই মঙ্গল।" তিনি এইসব কায়েমী স্বার্থান্বেষীদের উদ্দেশ করে বলেন, "তারা
ভেবে দেখেছেন কী, এ পন্থায় তারা রোগীর মৃতু্যকাল উপস্থিত ভেবে তাকে গলা টিপে হত্যা করার পরামর্শ দিচ্ছেন। দেশকে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষাকল্পে এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে প্রথম ফ্লাইটেই প্রেসিডেন্টের উচিত ঢাকায় গিয়ে শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করে মুজিব প্রদত্ত সকল শর্ত মেনে নেয়া। আমি শেখ সাহেবের ঐতিহাসিক বক্তৃতার পর ঢাকা গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে ঢাকার পরিস্থিতি দেখে এসেছি।" বিগত ১০ বছরের পাকিস্তানের রাজনীতির বিস্তারিত উলেস্নখ করে তিনি বলেন, "ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দু'বার নিজেই নিজের বিধান লঙ্ঘন করেছেন। এখন সংকট যেভাবে ঘনীভূত হয়েছে তাতে শেখ মুজিব ব্যতীত অন্য কেউই এ সংকট থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে পারবে না।" পরিশেষে তিনি তাঁর বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর কথার প্রতিধ্বনি করে বলেন, "দোষ করলো লাহোর আর গুলি চললো ঢাকায়।" অপরদিকে ন্যাপ (পিকিংপন্থী) সেক্রেটারি জেনারেল সি আর আসলাম সংবাদপত্রে প্রেরিত এক বিবৃতিতে বলেন, "কোন দেশপ্রেমিকই শেখ মুজির প্রদত্ত শর্তের বিরোধিতা করতে পারে না।" রাজনৈতিক সংকটের জন্য তিনি জনাব ভুট্টোকে দায়ী করে বলেন, "দেশের সংকটের জন্য একচেটিয়া পুঁজিপতি ও আমরাই দায়ী। জনাব ভুট্টো ৩ মার্চের অধিবেশনে যোগদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করার কারণেই এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।" জাতীয় লীগ সভাপতি আতাউর রহমান খান আজ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক বৈঠকে মিলিত হন। ময়মনসিংহে এক জনসভায় মজলুম নেতা মাওলানা ভাসানী এদিনও বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে বলেন, "পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্বের মুখে লাথি মেরে শেখ মুজিবুর রহমান যদি বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনে সঠিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হন তবে ইতিহাসে তিনি কালজয়ী বীররূপে, নেতারূপে অমর হয়ে থাকবেন।" এদিন বিবিসির সংবাদে বলা হয় যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আগামী শনিবার রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে আলাপ-আলোচনার জন্য ঢাকা আসছেন।
এদিকে দেশের সর্বস্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধু ঘোষিত কর্মসূচির সাথে একাত্ততা প্রকাশ করে মিছিল সহকারে ধানমন্ডির বাসভবনে আসতে থাকে। সারাদিন এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত সংগ্রামী জনতা বিভিন্ন শেস্নাগান ধ্বনিতে চারদিক প্রকম্পিত করতে থাকে। এদিন দেড়শতাধিক মিছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে আসে এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করে। নেতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকারি আধা-সরকারি কর্মচারী ঐক্যবদ্ধভাবে অফিস-আদালত বর্জন করে। জনসাধারণ খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দিয়ে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের ক্ষেত্রে নবতর অধ্যায়ের সূচনা করে। যথারীতি আজও সারা ঢাকা শহর স্বাধিকার আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে কালো পতাকার শহরে পরিণত ছিল। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবানে সাড়া দিয়ে অনেকেই সরকার প্রদত্ত খেতাব বর্জন শুরু করেন। জাতীয় পরিষদ সদস্য জনাব জহিরউদ্দীন তাঁর 'তমঘায়ে হেলাল কায়েদে আজম' খেতাব বর্জনের ঘোষণা দেন। বিশিষ্ট সংবাদ পাঠক সরকার কবীরউদ্দীন রেডিও পাকিস্তান বর্জনের ঘোষণা দেন। এককথায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশবাসী যে যার অবস্থানে থেকে তাদের অংশগ্রহণ চালিয়ে যেতে থাকে। এক ঘোষণায় স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ কালোবাজারী, মজুতদারী ইত্যাদি অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, "যারা এসব কার্যকলাপ চালাচ্ছে তারা স্বাধীনতা বিরোধী গণশত্রু। ধরা পড়লে এদের বিরুদ্ধে কঠিন এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।" এদিন শহীদদের স্মৃতিতে শোকপালনরত দেশবাসীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে দেশের ১৯টি প্রেক্ষাগৃহের মালিকরা তাদের সিনেমা হলগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং বঙ্গবন্ধু ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাহায্য তহবিলে ১৩ হাজার ২৫০ টাকা দান করেন। চলচ্চিত্রের সাথে সম্পর্কিত পেশাজীবিগণ, সাংবাদিক সমাজ, চারু ও কারুশিল্পীবৃন্দ সকলেই মিছিল সহকারে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে। এদিনে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে, সিএসপি ও ইপিসিএস কর্মকর্তাদের সংগঠন পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম শ্রেণীর প্রশাসকেরা এক সভায় মিলিত হয়ে বলেন, "এখন থেকে আমরা জননেতা শেখ মুজিবের সকল নির্দেশ মেনে চলবো" এবং এ মর্মে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। গত কয়েক দিনের মতো এদিনও বগুড়ার কারাগার ভেঙে ২৭ জন কয়েদী পালিয়ে যায়। পুলিশের গুলিবর্ষণে এদিনও ১ জন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়।
অসহযোগের মধ্যে স্বাধীনতা বিরোধীরা যাতে শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে না পারে সেজন্য গত রাত থেকে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী যে তৎপরতা শুরু করে তা সর্বমহলের প্রশংসা অর্জন করে। একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন জায়গায় লুটতরাজ শুরু করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সেজন্য রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পথ-ঘাট ও বিপণীকেন্দ্রগুলোর সামনে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কার্যত পুরো দেশে তখন আমাদেরই কর্তৃত্ব বহাল হয়। তখন মানুষ আমাদের প্রতি এতো ভালোবাসা, দরদ আর সহানুভূতিসম্পন্ন মনোভাব প্রকাশ করেছে যা ভাষায় বর্ণনাতীত। আমাদের কর্মসূচি পালনকালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশানুযায়ী আমরা যেমন নিজদের উজাড় করে দিয়েছি, ঠিক তেমনি সর্বস্তরের সাধারণ মানুষও আমাদের প্রতি সশ্রদ্ধ মনোভাব প্রকাশ করেছে এবং সর্বকাজে আমাদেরকে সাধ্যমত সবের্াচ্চ সাহায্য করেছে। বঙ্গবন্ধু যেমন আমাদের সকলকে আস্থায় নিয়েছিলেন, আমরাও তেমনি সংগ্রামী জনতার সাথে আন্তরিকভাবে মিশে গিয়েছিলাম। জনসাধারণও আমাদেরকে আপন করে নিয়েছিলেন। সেদিনকার প্রতিটি দিনই ছিল বৈপস্নবিক। আর এ বিপস্নবের প্রধান সমন্বয়ক তথা সর্বাধিনায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অসীম ধৈর্যশক্তি আর সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার অপার দক্ষতা তাঁর কাজে পরিপূর্ণতা এনে দিয়েছিল। এ আন্দোলন সংগঠিত করতে তিনি আশপাশের সকল দক্ষ ব্যক্তিবর্গকেই সবের্াচ্চভাবে কাজে লাগিয়েছেন। প্রত্যেকের পরামর্শকেই গুরুত্ব ও মনোযোগ সহকারে শুনে, এরপর নিজে বুঝে যাচাই করে নিয়ে তবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি ছিল যৌথতার ভিত্তিতে নেয়া যৌক্তিক এবং গণতান্ত্রিক। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা দেখবো তাঁর রাজনৈতিক জীবনে কোন ভুল ছিল না। আর তাইতো তিনি এই অসহযোগ চলাকালেই জনপ্রিয়তার চরম শিখরে উন্নীত হয়েছিলেন; আসীন হয়েছিলেন বাঙালি জাতির হূদয়ের মণিকোঠায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


