somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গোলাম আযম-ফ কা চৌধুরীরা মুক্তি বাহিনী আ’লীগ ও হিন্দুদের হত্যার তাগিদ দিত : ‘৭১ সালে পাকিস্তানি কমান্ডো কর্নেল নাদির আলীর সাক্ষাৎকার

২২ শে মার্চ, ২০১১ বিকাল ৫:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সমকাল

20 March 2011 Author: সুভাষ সাহা ও বিভূতিভূষণ মিত্র

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সুভাষ সাহা ও বিভূতিভূষণ মিত্র

‘গোলাম আযম, ফজলুল কাদের চৌধুরী, মাওলানা ফরিদ আহমেদসহ শীর্ষস্থানীয় জামায়াত ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ মাঝে মধ্যেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনী, আওয়ামী লীগার ও হিন্দুদের ওপর অপারেশন চালানোর পরিকল্পনা হাজির করতেন এবং তারা এসব অপারেশন জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করার তাগিদ দিতেন। এভাবে বেসামরিক ব্যক্তিদের পরামর্শে কাজ করতে হচ্ছে বলে একজন সেনা কমান্ডো হিসেবে নিজেকে খুব ছোট মনে হতো। কিন্তু এটাই ছিল তখন ওপরের নির্দেশ। সিলেটে এদের পরামর্শে পরিচালিত একটা অপারেশনের কথা মনে আছে। ওই অপারেশনে অনেক সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।’ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের কমান্ডো বাহিনীর কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) নাদির আলী গত শনিবার ঢাকার ব্র্যাক ইনে সমকালের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে উলি্লখিত মন্তব্য করেন। ঢাকায় তিনি এক অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে শনিবার সস্ত্রীক ঢাকা ত্যাগ করেন।

বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কমান্ডো বাহিনীর যে ইউনিটটি পঁচিশে মার্চ কালরাতে বন্দি করে পরে সেটি তার অধীনে ছিল। কমান্ডো বাহিনী সরাসরি পূর্ব পাকিস্তান কমান্ডের অধীন ছিল। সে কারণে অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ সাক্ষী এই সাবেক কমান্ডো কর্নেল। তবে তিনি কখনোই সরাসরি বাঙালি নিধনযজ্ঞে অংশ নেননি। বরং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সঙ্গী সামরিক কর্মকর্তারা এবং জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগ নেতারা হত্যা, লুটপাট, বাড়িঘর জ্বালানো ও ধর্ষণসহ যেসব বিধ্বংসী এবং মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ বা ইন্ধন জোগাতেন, তার বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ড তার পক্ষে সহ্যের অতীত ছিল। সে কারণেই তিনি শেষ পর্যন্ত স্মৃতিভ্রংশের শিকার হন। যুদ্ধের একেবারে শেষ দিক থেকে পরের কয়েক বছর এ জন্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয় তাকে। হাসপাতালে তার অবস্থা স্বচক্ষে দেখে তার বৃদ্ধ পিতা সেখাইে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। পরে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি কবিতা ও গল্প লেখায় আত্মনিয়োগ করেন। ২০০৭ সালে বিবিসি উর্দু সার্ভিসে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা ও সাধারণ মানুষের দুর্দশার বিবরণ তুলে ধরেন।
তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন সহযোগী বাহিনীগুলোর কাছে নির্দেশ আসত : হিন্দুদের কতল কর ও নিশ্চিহ্ন করে দাও। এ ধরনের নির্দেশ তার কাছেও বিভিন্ন সময়ে এসেছে। তবে লোক দেখানো ছাড়া তিনি তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থাকা ইউনিটকে জনস্বার্থবিরোধী কাজে ব্যবহার করতেন না।

তরুণ ক্যাপ্টেন থেকে মেজর পদে উন্নীত হওয়া নাদির আলীর নেতৃত্বাধীন কমান্ডো ফোর্সকে ১৯৭১ সালের মধ্য এপ্রিলে গোপালগঞ্জ-ফরিদপুরে পাঠানো হয়। তখন তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়, ‘যত পার বাস্টার্ড হিন্দুদের হত্যা করবে, দেখবে একজন হিন্দুও যাতে জীবিত না থাকতে পারে।’ তখন তিনি এর প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, ‘স্যার, নিরস্ত্র কোনো ব্যক্তিকে আমি হত্যা করতে পারব না।’ এ জন্য তাকে অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। তিনি জানতেন এ ধরনের নির্দেশ প্রত্যেক সেনা কর্মকর্তার কাছেই গেছে। মধ্য এপ্রিলে গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর এসে তিনি দেখলেন, এলাকা শান্ত হয়ে এসেছে। গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। অথচ এই মানুষরাই যখন ফিরছিল তখন অদূরে অন্য বাহিনী সদস্যদের দ্বারা আক্রান্ত হন। সাধারণ মানুষকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে বলে জেনেছি।
এরপরের গন্তব্য ছিল বরিশাল।

‘আমি যদিও প্রত্যক্ষভাবে কোনো হত্যাযজ্ঞে অংশ নেইনি। তবে অনেক অপারেশনের কাহিনীই আমার কানে এসেছে বিভিন্ন বৈঠক ও ফেলো কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শোনার কারণে।’

৬ জুন তিনি ছিলেন বিলোনিয়া সীমান্তে ফেনীতে। সেখানে কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি তার বাহিনী। বরং সাধারণ মানুষের আতিথেয়তা পেয়েছিলেন তারা।

চট্টগ্রামেও তিনি থেকেছেন। সেখানে তৎকালীন ইপিআর বাহিনীর এক পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে বাঙালিরা হত্যা করে। এ ঘটনার পর বাঙালি কর্মকর্তারা প্রায় সবাই পালিয়ে যান। কিন্তু তাদের অধিকাংশের পরিবার-পরিজনকে তখনও পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেননি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিকদের পরিবার-পরিজনকে শিশুসহ লাইনে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। ‘একটি বাহিনীর কর্মকর্তা ও সিপাহিদের পরিবার-পরিজনকে এভাবে হত্যা করার ঘটনা আমার হৃদয়কে আলোড়িত করে। এ ঘটনা আমার মনে স্থায়ী দাগ ফেলে দেয়।’

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরতার বিবরণ দিতে গিয়ে সুদীর্ঘকাল পরও তিনি বারবার বিমর্ষ হয়ে পড়ছিলেন। অনেক সতীর্থ সেনা কর্মকর্তা কীভাবে বাঙালিদের হত্যা করতেন, তার বিবরণ দিতেন। তার দম বন্ধ হয়ে আসত এসব বর্বরোচিত ঘটনার বিবরণ শুনে। অনেক সময় সেনা কর্মকর্তা, এমনকি সিপাহিরা পর্যন্ত বাঙালিদের এক সারিতে দাঁড় করিয়ে এক গুলিতে কতজন মারা যায় তার প্র্যাকটিস করতেন। আসলে বাঙালি নিধনটা ছিল পাকিস্তানি অনেক সেনা কর্মকর্তার কাছে খেলার মতো। অনেক সময় সাধারণ মানুষকে দৌড় দিতে বলে লম্বা একটি দলের ওপর নির্বিচার গুলি চালানো হতো। একবার একদল লোককে ধরে এনে সারি করে দাঁড় করিয়ে তাদের ওপর নির্বিচার গুলি চালানো হয়েছিল। সবাই মরে গেছে মনে করে গুলিবর্ষণকারী বাহিনীর সদস্যরা চলে গেলে দেখা যায় এদের মধ্যে ভাগ্যক্রমে দু’জন বেঁচে আছেন। ওই দু’জনকে তিনি মুক্তি দেন বলে উল্লেখ করেন। মাসকারেনহাস তৎকালে বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালানোর যে বিবরণ তুলে ধরেন তা যথার্থ বলে পাকিস্তানি এ কমান্ডো স্বীকার করেন।

যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতি সংক্ষেপে তুলে ধরতে গিয়ে তার স্মৃতির মণিকোঠায় ভেসে ওঠে অনেক অশ্রুত ঘটনা। বাঙালিরা এক পর্যায়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ষাটের দশকের প্রথম দিকে তার সঙ্গী অনেক বাঙালি সামরিক কর্মকর্তার মধ্যেই তিনি পাঞ্জাবি বা পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা অবনমনের জ্বালা দেখেছেন। জিয়া, খালেদ মোশাররফ, তাহের, জিয়া উদ্দিন এক সময় তার সতীর্থ ছিলেন বলে উল্লেখ করেন কর্নেল নাদির আলী। তখন বাঙালি অফিসাররা একজন অন্যজনকে জেনারেল বলত। নাদির আলী এবং তার সহকর্মীরা তখন এটাকে তামাশা বলেই মনে করতেন। আসলে এটা যে তামাশা ছিল না, বাঙালি কর্মকর্তাদের মনের লালিত ক্ষোভের প্রকাশ ছিল, সেটা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

সিমলা চুক্তির মধ্য দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের জেলে আটক থাকা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়ার সময় যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের পাকিস্তান বিচার করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও তাদের বিচার কেন সম্পন্ন করা হলো না সে ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘৭১ সালের পর পাকিস্তানের ক্ষমতায় ভুট্টো এলেও মূলত তখনও প্রকৃত ক্ষমতার মালিক ছিল সেনাবাহিনী। তারা কি তাদের বাহিনীর অপকর্মের বিচার করবে? তদুপরি সাধারণ পাকিস্তানিদের মধ্যে বাংলাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো বা গণহত্যা চালানোর জন্য সেনাসদস্যদের বিচারের দাবি জোরদার হয়নি কখনও। প্রায় গোটা পাকিস্তানই এ ব্যাপারে নিশ্চুপ ছিল।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত করতে গেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সদস্যদের বিচারের বিষয়টি সামনে আসবে উল্লেখ করায় সাবেক কমান্ডো কর্নেল এ ব্যাপারে সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন, অভিযুক্ত অনেকেই এখন মৃত। এ ব্যাপারে বিস্তারিত তার জানা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে তিনি সে সময়ের ঘটনাবলির জন্য পাকিস্তান সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন।

এ অঞ্চলের শান্তি ও উন্নতির জন্য এক সময় একই রাষ্ট্রের অধীন এবং পরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতকে একসঙ্গে কাজ করা উচিত বলে বলে মনে করেন তিনি। সবশেষে তিনি বাংলাদেশের শুভ কামনা করে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×